মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গণমানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ) নামক একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন, যা 'দ্বিতীয় বিপ্লব' নামে পরিচিত।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিরাট অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখার বিরাট অংশ ছিল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা। বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারা স্বাধীনতার বিজয় পতাকা ছিনিয়ে আনতে সহায়তা করে। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজ বিজয় অর্জনকে ত্বরান্বিত করে।
উদ্দীপকের ১নং-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের ঐতিহাসিক বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে (অর্থাৎ ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর) গ্রেফতার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ঘোষণাটি ইংরেজিতে ছিল, যাতে বিশ্ববাসী ঘোষণাটি বুঝতে পারেন। স্বাধীনতার এ ঘোষণা বাংলাদেশের সকল স্থানে তদানীন্তন ইপিআরের ট্রান্সমিটার, টেলিগ্রাম ও টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. হান্নান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে একবার এবং সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দ্বিতীয়বার প্রচার করেন। উদ্দীপকে ১নং এ উক্ত ঘোষণারই কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় একই বেতার কেন্দ্র থেকে সামরিক অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার সমর্থনে বক্তব্য প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর প্রতি বাঙালি সামরিক, আধা সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর সমর্থন ও অংশগ্রহণের খবরে স্বাধীনতাকামী জনগণ উজ্জীবিত হয়। স্বাধীনতা ঘোষণার বাংলা অনুবাদ: "ইহাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছে, যাহার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ কর। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।” (বাংলাদেশ গেজেট, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, ৩রা জুলাই, ২০১১)।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের ১নং এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের ঐতিহাসিক বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।
উদ্দীপকের ২নং এ বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ৭ মার্চের ভাষণটি উদ্ধৃত হয়েছে। যার সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক শুরুর সম্পর্ক রয়েছে।
৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত কর্মসূচি এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের আহ্বানের প্রতি সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়। উদ্দীপকে ২নং-এ বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ৭ মার্চের ভাষণের অংশবিশেষ তুলে ধরা হয়েছে। এ ভাষণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলার সকল অফিস,. আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা করতে। এ সময় ভুট্টোও ঢাকায় আসেন। অপরদিকে গোপন আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও গোলাবারুদ এনে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। ১৭ মার্চ টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামক কর্মসূচির মাধ্যমে বাঙালির ওপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড পরিচালনার নীলনকশা তৈরি করে। ২৫ মার্চ রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম গণহত্যা, 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হয়। কিন্তু এ স্বাধীনতা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত এ ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হওযার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা পায়। এ ভাষণের পরই বাঙালি জাতির সামনে একটিমাত্র গন্তব্য নির্ধারিত হয়ে যায়, তা হলো 'স্বাধীনতা'। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ডাক দেন, সে ডাকেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। উদ্দীপকে ২নং এ উক্ত ভাষণের অংশবিশেষই তুলে ধরা হয়েছে, যার সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক শুরুর সম্পর্ক রয়েছে
Related Question
View Allবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে 'গণযুদ্ধ' বা 'জনযুদ্ধ' নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। ওই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা আদেশ'।
আরিফার বাবা স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার একটি গণমাধ্যম। অর্থাৎ, আরিফার বাবা গণমাধ্যমে কাজ করতেন। মুক্তিযুদ্ধে উক্ত মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন। পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে। এছাড়া মুজিবনগর সরকারের প্রচার সেলের তত্ত্বাবধানে 'জয় বাংলা' পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অতএব বলা যায়, আরিফার বাবার মতো সংস্কৃতিকর্মী এবং প্রচারমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে আরিফার মায়ের মতো অনেক নারীর ভূমিকাই ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে উল্লিখিত আরিফার মা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে খাবার সরবরাহ করতেন। মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করতেন। আরিফার মায়ের ন্যায় মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তাতে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্রচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অপরদিকে, সহযোদ্ধা হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষা, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এদেশের অগণিত নারী মুক্তিসেনা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হন প্রায় তিন লক্ষ মা-বোন। তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযাত্রী এবং ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারিভাবে তাদেরকে 'বীরাঙ্গনা' উপাধিতে ভূষিত করেন।
উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে আরিফার মায়ের মতো অনেক নারীই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যে তহবিল থেকে প্রসূত নারীদের অনুদান প্রদান করা হয় সেই তহবিল হচ্ছে 'ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল'।
কোনো দেশের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে যে পরিষদ বা কমিটি গঠন করা হয়, তাকে গণপরিষদ (Constituent Assembly) বলে। যেমন- স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু 'বাংলাদেশ গণপরিষদ' নামে একটি আদেশ জারি করেন। এ আদেশবলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণ গণপরিষদের সদস্য বলে পরিগণিত হন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!