আধুনিক গীতিকবিতার কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি ও গীতোচ্ছ্বাস বিশুদ্ধভাবে তাঁর কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে। সৌন্দর্যপিয়াসী প্রকৃতি প্রেমিক কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতায় সমাজ-সমকাল ও সমকালীন সমস্যাবলি প্রাধান্য পায়নি। মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রকৃতির রস আস্বাদন করেছেন যেভাবে, সেই মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতার চরণে চরণে ঢেউ তুলেছে নূপুর-নিক্বণ। রবীন্দ্রনাথের মতে, 'বাংলা ভাষার একমাত্র কবি বিহারীলালই প্রথম নিভৃতে বসে নিজের ছন্দে নিজের মনের কথা লিখেছেন।'
বিহারীলাল চক্রবর্তী ২১ মে, ১৮৩৫ সালে কলকাতার জোড়াবাগান অঞ্চলের নিমতলায় জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস- ফরাসডাঙ্গায়।
তাঁর পারিবারিক পদবি- চট্টোপাধ্যায়।
গীতিকবিতার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের গুরু- বিহারীলাল চক্রবর্তী।
তিনি বাংলা সাহিত্যে আধুনিক গীতিকবিতার স্রষ্টা। এ জন্য রবীন্দ্রনাথ তাকে 'ভোরের পাখি' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন
তিনি 'পূর্ণিমা' (১৮৫৯), 'সাহিত্য সংক্রান্তি' (১৮৬৩), 'অবোধ বন্ধু' (১৮৬৮) পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।
তিনি ২৪ মে, ১৮৯৪ সালে কলকাতায় মারা যান।
যে কবিতায় কবির একান্ত ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা ও আনন্দবেদনা প্রাণের অন্তঃস্থল থেকে আবেগকম্পিত সুরে অখণ্ড ভাবমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে তাকে 'গীতিকবিতা' বলে। আধুনিক বাংলা গীতিকবিতার সূত্রপাত টপ্পাগান থেকে। বিহারীলালই প্রথম বাংলায় ব্যক্তির আত্মলীনতা, ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ও গীতোচ্ছ্বাস সহযোগে গীতিকবিতা রচনা করে নতুন এক ধারা সৃষ্টি করেন বলেই তাকে 'ভোরের পাখি' বলা হয়।
বিহারীলাল রচিত কাব্যগ্রন্থসমূহঃ
'বঙ্গসুন্দরী' (১৮৭০): এটি তাঁর প্রথম সার্থক গীতিকবিতার গ্রন্থ।
'সাধের আসন' (১৮৮৯): 'সারদামঙ্গল' কাব্যের পরিশিষ্ট 'সাধের আসন'। বিহারীলালের 'সারদামঙ্গল' কাব্য পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৌদি কাদম্বরী দেবী নিজের হাতে একটা আসন বুনে কবিকে উপহার দিয়েছিলেন। আসনের উপর প্রশ্নচ্ছলে কার্পেটের অক্ষরে লেখা ছিল 'সারদামঙ্গল' কাব্যের কয়েকটা লাইন। এর উত্তরে কবি রচনা করেন একটি কাব্য। কাদম্বরী দেবীর উপহারের কথা স্মরণ করেই বিহারীলাল এ কাব্যের নামকরণ করেন 'সাধের আসন'।
বিহারীলালের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ 'সারদামঙ্গল' (১৮৭৯)। এটি পাঁচ খণ্ডে স্তবকময় মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় রচিত। এ কাব্যে দেখা যায়, শুরুতে কবির মনোজগতে এক কাব্যলক্ষ্মীর আবির্ভাব, লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে কবির মানসভ্রমণ, কবিচিত্তের দ্বন্দ্ব এবং হিমালয়ের উদার প্রকৃতির মধ্যে প্রশান্তি লাভ এবং সবশেষে হিমালয়ের পূর্ণভূমিতে কবির আনন্দ উপলব্ধির চিত্র। শেলির মতো বিহারীলালও তাঁর প্রিয়তমার মধ্যে সারদাকে অন্বেষণ করেছেন এবং দীর্ঘ বিরহের পর হিমাদ্রি শিখরে ভাব-সম্মিলনের চিত্র অংকন করে কবি কাব্যের পরিসমাপ্তি টেনেছেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম গীতি কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪) কবিতার অতি আবেগ ছন্দে ও ভাষায় কিছু কিছু শিথিলতা নিয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও তার কবিতা বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কারণ আখ্যানকাব্য মহাকাব্য ধারার পর তিনিই প্রথম বাংলা কাব্যের ইতিহাসে গীতিকবিতার উৎস-মুখ খুলে দিয়েছিলেন। 'ভোরের পাখি' কবি বিহারীলালের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল সঙ্গীত শতক (১৮৬২), 'বঙ্গসুন্দরী' (১৮৭০), 'নিসর্গ সন্দর্শন' (১৮৭০), 'বন্ধুবিয়োগ' (১৮৭০), 'প্রেমপ্রবাহিনী' (১৮৭১), 'সারদামঙ্গল' (১৮৭৯) এবং সাধের আসন' (১৮৮৯)। সঙ্গীত শতক' কবির গানের সংকলন। 'নিসর্গ সন্দর্শন' কাব্যে মানবিক প্রকৃতির সঙ্গে কবি-হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন হতে দেখা যায়। প্রকৃতিকে যথাযথভাবে দেখার ফলে কবি হৃদয়ের মুগ্ধতার পরিচয় ছড়িয়ে আছে 'সমুদ্র-দর্শন', 'নভোমণ্ডল' প্রভৃতি কবিতায়। জননী-জায়া- কন্যা-ভগিনী-প্রভৃতি বিবিধ মূর্তিধারিণী নারীর স্নেহ-মায়া মমতাময় রূপ ও সৌন্দর্যের সন্ধান করেছেন কবি বঙ্গসুন্দরী কাব্যে। নিজের এবং বন্ধুবর্ণের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নিজের প্রেমানুভূতিকে কাব্যের আকারে রূপদান করেছেন কবি তাঁর বন্ধুবিয়োগ' ও 'প্রেমপ্রবাহিনী' কাব্যে। বিহারীলালের শ্রেষ্ঠ কাব্য হল 'সারদামঙ্গল', যেখানে কবির সৌন্দর্যচেতনা ও গীতিবৈশিষ্ট্য পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “যে প্রত্যুষে অধিক লোক জাগে নাই এবং সাহিত্য কুঞ্জে বিচিত্র কলগীত কৃজিত হইয়া উঠে নাই। সে ঊষা লোকে কেবল একটি ভোরের পাখি সুমিষ্ট সুন্দর সুরে গান ধরিয়াছিল সে সুর তাহার নিজের।" রবীন্দ্রনাথের বউঠান কাদম্বরী দেবীর অনুরোধে কবি বিহারীলাল 'সাধের আসন কাব্য তার সৌন্দর্যভাবনার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।