লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০ সালে গৃহীত হয়।
পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাঙালির ওপর সীমাহীন শোষণ করা হয়। রাজস্ব খাতে, উন্নয়ন খাতে, শিক্ষাখাতে, শিল্পখাতে, সর্বত্রই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সর্বাপেক্ষা অধিক শোষিত ও নিষ্পেষিত হয়। ১৯৬২ সালের আইয়ুব খানের শাসনামলে বৈষম্য দূরীকরণের কথা সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোনো প্রয়োগ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস ছিল বঞ্চনার ইতিহাস, শোষণের ইতিহাস ও বৈষম্যের ইতিহাস। সমগ্র জাতীয় শিল্প সম্পদের ৬০ ভাগের বেশি ছিল পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বাইশ পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন। কলকারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান সবগুলো গড়ে ওঠে পশ্চিম, পাকিস্তানে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একচেটিয়া শোষণ বন্ধ করার জন্য ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
শহিদ বাবুল আক্তার যে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল তা হলো ভাষা আন্দোলন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাবুল আক্তারের মায়ের মতো অনেক মায়ের কোল খালি হয়। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা, কৃষ্টি, জীবনব্যবস্থা, সংস্কৃতি এমনকি মানসিক গঠনও আলাদা ছিল। শুধু ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় পাকিস্তানের ভাষাগত জনসংখ্যার একটি বিবরণীতে জানা যায়, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬০% বাংলা, ৭.২% উর্দু এবং বাকি অন্যান্য ভাষাভাষী লোক। উর্দু ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি ভাষাভাষী দিক থেকে তৃতীয়। পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু ভাষাভাষীর সংখ্যা ক্ষুদ্র হলেও ছিল প্রভাবশালী। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উর্দুর দাপট ছিল একচেটিয়া। অন্যদিকে, পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুর চর্চা হয়নি কখনো। ফলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি পূর্ব পাকিস্তানের ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের সম্ভাবনা যত এগিয়ে আসে, তত রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে আলাপ-আলোচনা হতে থাকে। ১৯৪৭ সালে সুশীল সমাজে এ নিয়ে জোর বিতর্ক চলে।
১৯৪৭ সালের মে মাসে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ 'দৈনিক আজাদে' একটি প্রবন্ধ লিখে এর প্রতিবাদ করেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার একটি ভাষণে বলেছিলেন, "আমরা হিন্দু মুসলিম যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।" শেষপর্যন্ত রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য ছাড়াই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জন্ম হয়।
বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ত আন্দোলনটি ছিল ভাষা আন্দোলন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিকে উপেক্ষা করে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের প্রথমদিকে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেন, "Urdu, only Urdu shall be the state Language of Pakistan". ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও তিনি অনুরূপ ঘোষণা করেন। উপস্থিত ছাত্ররা 'না' 'না' বলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আহূত হরতাল। দুই পক্ষই প্রস্তুতি নিতে থাকে। স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে ১০ জনের একটি দল বের হয়। আকস্মিক ভাবে পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার শহিদ হন। কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বানে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবসরূপে উদ্যাপন করা হয়। আবদুল গাফফার চৌধুরী 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' কবিতাটি রচনা করেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে।
Related Question
View Allএকজন ভাষাশহিদের নাম হলো আব্দুর জব্বার।
শহিদ মিনার নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো ভাষাশহিদদের স্মরণ ও ভাষার প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন।
১৯৫২ সালের ভাষার জন্য শহিদ হওয়া ব্যক্তিদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ ও তাদের স্মৃতিসংরক্ষণের জন্য ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা মেডিকেলের ছাত্ররা প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণ শুরু করে এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি শহিদ শফিউরের বাবা তা উদ্বোধন করেন। কিন্তু পুলিশ ও সেনাবাহিনী তা ভেঙে ফেললে ১৯৫৭ সালে বর্তমান স্থানে শহিদ মিনার স্থাপন শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নতুন শহিদ মিনারের উদ্বোধন করা হয়।
উদ্দীপকে উল্লিখিত মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সাথে আমার * পঠিত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সাদৃশ্য খুঁজে পাই।
উদ্দীপকে দেখা যায়, মানভূমের বাঙালিদের মধ্যে ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এসময় রাজনৈতিকভাবে স্কুল-কলেজ ও সরকারি দপ্তরের হিন্দি ভাষা জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ আন্দোলনের সাথে আমার পঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলনের * সাদৃশ্য লক্ষণীয়। অনুরূপ ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬.৪০% মানুষের মুখের ভাষা বাংলার পরিবর্তে মাত্র ৭.২০% মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তাছাড়া ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন নতুন মাত্রা ও সর্বাত্মক রূপলাভ করে। এ সময়ে তমদ্দুন মজলিস ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক হরতাল আহূত হলে স্থানীয় প্রশাসন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে এবং সকল সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারের এ ঘোষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অতঃপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে সালাম, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন, আব্দুল জব্বার শহিদ হন। যার ফলে বিশ্ব ইতিহাসে ভাষার জন্য আন্দোলনের এক অবিনশ্বর ইতিহাস রচিত হয়।
অতএব উদ্দীপকের ভাষা আন্দোলনের সাথে পূর্ব-বাংলার ভাষা আন্দোলনের মিল পরিলক্ষিত হয়। বাংলা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ উজ্জীবিত হয় যা স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল।
উদ্দীপকের ভাষা আন্দোলনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বাংলা ভাষা আন্দোলনে 'বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল' উক্তিটি যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।
ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি সর্বপ্রথম নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। আর এ চেতনাই পরবর্তীতে প্রতিটি গণআন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগায় এবং সকল বৈষম্য থেকে মুক্তির পথ সুগম করে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালি জাতি ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে শাসক দল মুসলিম লীগের সকল বৈষম্যমূলক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে গণরায় প্রদানের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টকে জয়ী করে। বাঙালি জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত বাঙালি জাতি পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্বাধিকারের প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। সর্বোপরি এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। ফলে বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের। তাই ঘটনা পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৫২ সালে। বাঙালি জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের যে জাতীয়তাবাদের শিক্ষা অর্জন করে তার ধারাবাহিকতাতেই স্বাধীনতা অর্জন করে।
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যে জাতীয়তাবাদের শিক্ষা দেয় তার মধ্যে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। তাই উদ্দীপকের উক্তিটি যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।
তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাশেম।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের রাতকে কালরাত্রি বলা হয়। কাল রাত বলতে নৃশংস ও ভয়ংকর রাতকে বোঝানো হয়। ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট নামে বাঙালি জাতির উপর যে জঘন্য ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় এ রাতকে কালরাত্রি বলা হয়। এ রাতে অসংখ্য নিরস্ত্র বাঙালিকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় এবং ঢাকা শহরের রাস্তায় লাশের স্তূপ তৈরি হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!