মিথিলার রাজসভার কবি, বৈষ্ণব কবি ও পদসঙ্গীত ধারার রূপকার বিদ্যাপতি। তিনি বাঙালি না হয়েও বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছেন। বিদ্যাপতির রচিত পদ চৈতন্যদেব বিশেষভাবে শ্রবণ করতেন। তাঁর কৌলিক উপাধি ঠক্কর বা ঠাকুর।
বিদ্যাপতি আনুমানিক ১৩৮০ সালে মিথিলার দ্বারভাঙ্গা জেলার সীতাময়ী মহকুমার বিসফী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি পদাবলির প্রথম কবি।
তিনি মিথিলার রাজা কীর্তি সিংহ কর্তৃক সভাপণ্ডিত নিযুক্ত হন এবং রাজা দেব সিংহ ও শিব সিংহের রাজসভার কবি ছিলেন।
তিনি মৈথিলি, অবহটঠ ও সংস্কৃত ভাষায় পদ রচনা করেন।
তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ব্রজবুলিতে রচিত রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ রচনা।
তাঁর রচিত কাব্যকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'রাজকন্ঠের মণিমালা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বিদ্যাপতির কবিতা স্বর্ণহার, বিদ্যাপতির গান মুরজবীণাসঙ্গিনী স্ত্রীকণ্ঠগীত।’
তিনি আনুমানিক ১৪৬০ সালে মারা যান।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ১৩৯০-১৪৯০ সালের মধ্যেই বিদ্যাপতির জীবন আবর্তিত হয়েছে।
ড. আহমদ শরীফ বলেন, বিদ্যাপতি ১৩৬০-৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪৫৫ সালের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।
ব্রজবুলিঃ
ব্রজবুলি হলো বাংলা ও মৈথিলি ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি একপ্রকার কৃত্রিম কবিভাষা। মিথিলার কবি বিদ্যাপতি এ ভাষার স্রষ্টা। এ ভাষা কখনো মানুষের মুখের ভাষা ছিল না; সাহিত্যকর্ম ব্যতীত অন্যত্র এর ব্যবহার নেই। এতে কিছু হিন্দি শব্দ আছে। ড. সুকুমার সেনের মতে, 'অবহট্ট থেকে ব্রজবুলির উৎপত্তি হয়েছে।' এ ভাষায় চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, জ্ঞানদাস বিভিন্ন বৈষ্ণব পদ রচনা করেন। বিদ্যাপতি ছিলেন বৈষ্ণব পদাবলির অবাঙালি কবি।
মৈথিল কোকিলঃ
মিথিলার কবি বিদ্যাপতিকে 'মৈথিল কোকিল' বলা হয়। তিনি পদাবলির আদি বৈষ্ণব কবি এবং পদসঙ্গীত ধারার রূপকার। তিনি বাংলা সাহিত্যে একটি পঙ্ক্তি না লিখেও বাংলায় স্মরণীয় কবি। তিনি ব্রজবুলি ভাষায় রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদ রচনা করেন।
বৈষ্ণব পদাবলি ধারায় বিদ্যাপতির বিশেষত্বঃ
মধ্যযুগের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বৈষ্ণব পদাবলির বিখ্যাত কবি ও পদসঙ্গীত ধারার রূপকার বিদ্যাপতি। তিনি ছিলেন মিথিলার রাজসভার কবি। তিনি ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেন। ব্রজবুলি হলো বাংলা ও মৈথিলি ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি একপ্রকার কৃত্রিম কবিভাষা। তাঁর কাব্যে অলৌকিক প্রেমকাহিনিকে মানবিক প্রেমকাহিনি হিসেবে রূপ দিয়েছেন। তিনিই প্রথম কাম-প্রেমরসের বিচিত্র বর্ণালি জগৎ তৈরি করেন। তাঁর রচিত রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক প্রেমলীলা পদের মধ্যে রাধার বয়ঃসন্ধি, অভিসার, আক্ষেপানুরাগ, বিরহ ও ভাবসম্মিলনের পদগুলো বিশেষ উৎকর্ষপূর্ণ। রাধা-কৃষ্ণ প্রেমলীলা বিষয়ক যে উৎকৃষ্ট পদাবলি রচনা করেছেন তাই তাকে অমরতা দান করেছে।
বিদ্যাপতির সাহিত্যকর্মসমূহঃ
গ্রন্থ
বর্ণনা
কীর্তিলতা
কীর্তিসিংহের আদেশে অপভ্রংশ (অবহট্ঠ) ভাষায় রচিত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ।
কীর্তিপতাকা
রূপনারায়ণের আদেশে অবহট্ঠ ভাষায় রচিত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ।
পুরুষপরীক্ষা
শিবসিংহের আদেশে সংস্কৃত ভাষায় রচিত মণীষা ও শিল্পকৃতির সমন্বয়রূপ কথাসাহিত্য।
দানবাক্যাবলী
নরসিংহ পত্নী ধীরমতির আদেশে রচিত পাণ্ডিত্য বিচার সম্বলিত স্মৃতিগ্রন্থ।
লিখনাবলী
দ্রোণবারের রাজা পুরাদিত্যের আদেশে রচিত অলঙ্কার শাস্ত্রবিষয়ক গ্রন্থ।
বিভাগসার
দর্পনারায়ণ নরসিংহের আদেশে রচিত পাণ্ডিত্য বিচার সম্বলিত স্মৃতিগ্রন্থ।
গঙ্গাবাক্যাবলী
পৌরাণিক হিন্দুর পূজা ও সাধনপদ্ধতির সঞ্চয়ন।
দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী
কংসনারায়ণ ধীরসিংহ ও ভৈরবসিংহের আদেশে রচিত পৌরাণিক হিন্দুর পূজা ও সাধনপদ্ধতির সঞ্চয়ন।
বর্ষক্রিয়া
পৌরাণিক হিন্দুর পূজা ও সাধনপদ্ধতির সঞ্চয়ন।
শৈবসর্বস্বসার
পদ্মসিংহ ও তৎপত্নী বিশ্বাসদেবীর আদেশে রচিত।
ভূপরিক্রমা
গরুড়নারায়ণ দেবসিংহের আদেশে রচিত ভৌগোলিকের তীর্থ পরিক্রমা।
গোরক্ষবিজয়
নাটক
বিদ্যাপতির উক্তি
এ সখি হামারি দুঃখের নাহি ওর। এ ভরা বাদর মাহ ভাদর / শূন্য মন্দির মোর ।।
নব অনুরাগিণী রাধা।/ কিছু নাহি মান এ বাধা।।
কি কহব রে সখি আনন্দ ওর। চিরদিনে মাধব মন্দিরে মোর।।