সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সমর্থক, বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশ আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এর কবি প্রতিভার প্রকাশ ঘটে ছাত্রাবস্থায়। তাঁর রচিত কাব্যগুলোতে গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত চিত্র যে কুশলতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে তাতে আধুনিক শিল্প-চেতনার ছাপ সুস্পষ্ট। বাংলার গ্রামীণ জীবনের আবহ, সহজ-সরল প্রাকৃতিক রূপ উপযুক্ত শব্দ, উপমা ও চিত্রের মাধ্যমে তাঁর কাব্যে এক অনন্যসাধারণ মাত্রায় মূর্ত হয়ে উঠে। ষাটের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধের পদক্ষেপ নিলে তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেন।
জসীমউদ্দীন ১ জানুয়ারি, ১৯০৩ সালে ফরিদপুরের তাম্বুলখানা গ্রামে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস- ফরিদপুরের গোবিন্দপুর (বর্তমান- আম্বিকাপুর)।
প্রকৃত নাম: মোহাম্মদ জসীম উদদীন মোল্লা। ছদ্মনাম: জমীরউদ্দিন মোল্লা।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাঁর জামাতা।
১৯২১ সালে 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় 'মিলন গান' কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা।
বাংলা একাডেমি ২০১৯ সাল থেকে 'কবি জসীমউদদীন সাহিত্য পুরস্কার' প্রদান করে। প্রথম এ পুরস্কার পান কবি নির্মলেন্দু গুণ।
তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি ডি.লিট (১৯৬৯) ও একুশে পদক (১৯৭৬) পান।
তিনি ১৩ মার্চ, ১৯৭৬ সালে মারা যান। তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুসারে ১৪ মার্চ ফরিদপুরের আম্বিকাপুরে দাদীর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।
কর্মপরিধিঃ
জসীমউদ্দীনকে পল্লীকবি বলা হয় । তিনি এম.এ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ড. দীনেশচন্দ্ৰ সেনের আনুকূল্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লীগীতি সংগ্রাহক পদে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি ১৯৩১-১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে চাকরি করেন। ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে প্রচার বিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টরের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কবি জসীমউদ্দীন হল' আছে।
তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম 'মিলন গান' (১৯২১): এটি 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
তাঁর কাব্যগ্রন্থসমূহঃ
'রাখালী' (১৯২৭): এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যের ১৮টি কবিতার মধ্যে অন্যতম কবিতা 'কবর'। এটি কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। জসীমউদ্দীন কলেজে অধ্যয়নকালে 'কবর' কবিতা রচনা করে অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন। যা তাঁর ছাত্রাবস্থায় ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
'নক্সীকাঁথার মাঠ' (১৯২৯): এটি কবির শ্রেষ্ঠ কাহিনিকাব্য/গাথাকাব্য। এ গ্রন্থের প্রথম অংশে আছে চাষার ছেলে রূপাই ও পাশের গ্রামের মেয়ে সাজুর প্রথম পরিচয় থেকে অনুরাগের বিকাশ ও বিবাহ এবং কয়েক মাসের সুখময় জীবনের গল্প এবং দ্বিতীয় ভাগে তাদের বিচ্ছেদ। গ্রামীণ জীবনের মাধুর্য ও কারুণ্য, বৈচিত্র্যহীন ক্লান্তিকরতা এবং মানুষের অসহায়তা এ কাব্যের উপকরণ। ১৯২৮ সালে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার শিলাসী গ্রামে জসীমউদ্দীন ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করতে আসলে রূপাই নামক এক ব্যক্তির সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। এ ব্যক্তির বাস্তব জীবনীকে কেন্দ্র করে তিনি রচনা করেন 'নক্সীকাঁথার মাঠ'। চরিত্র: সাজু, রুপাই। E. M Milford এটিকে Field of the Embroidery Quilt নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।
'বালুচর' (১৯৩০): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'প্রতিদান' ।
'ধানখেত' (১৯৩৩): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'যাব আমি তোমার দেশে'।
'সোজন বাদিয়ার ঘাট' (১৯৩৪): এ কাহিনিকাব্য/ গাথাকাব্যটি ইউনেস্কোর উদ্যোগে 'Gypsy Wharf (১৯৬৯) নামে অনূদিত হয়। চরিত্র: সোজন, দুলী।
'এক পয়সার বাঁশি' (১৯৫৬): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'আসমানী'। আসমানী একটি বাস্তব চরিত্র। ফরিদপুর সদরের ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে জসীমউদ্দীনের বড় ভাই রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে তিনি আসমানীর দেখা পান এবং সেখানেই বসে তিনি 'আসমানী' কবিতাটি রচনা করেন। ৯৭ বছর বয়সে ১৮ আগস্ট, ২০১২ সালে আসমানী মারা যান।
‘চলে মুসাফির' (১৯৫২), ‘‘হলদে পরীর দেশ” (১৯৬৭), ‘যে দেশে মানুষ বড়' (১৯৬৮), 'জার্মানির শহরে ও বন্দরে’ (১৯৭৬)।
জসীমউদ্দীনের অন্যান্য রচনাবলিঃ
উপন্যাস:
‘ বোবাকাহিনি ' (১৯৬৪): এ উপন্যাসে মহাজনী শোষণের কারণে গ্রামের প্রান্তিক চাষি আজহারের ভূমিহীন হওয়া, শহরের সুবিধাবাদী উকিল ও ভণ্ড ধার্মিক কর্তৃক মেধাবী বছির নিগ্রহ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত। চরিত্র: বছির, আজহার, আরজান, রহিমুদ্দিন।
‘বউটুবানির ফুল’ (১৯৯০): এটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত উপন্যাস ।
‘কবর’: এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল' পত্রিকায়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত এ কবিতাটিতে ১১৮টি পঙ্ক্তি আছে। প্রিয়জন হারানোর মর্মান্তিক স্মৃতিচারণ ‘কবর’ কবিতার মূল বিষয়।
‘আসমানী’: কবিতাটি ‘এক পয়সার বাঁশি' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। কবির বড় ভাই রাজেন্দ্র সরকারি কলেজের অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদের শ্বশুরবাড়ি ছিল বর্তমান ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে। সেখানে কবি বেড়াতে গিয়ে আসমানীর দেখা পান এবং সেখানে বসেই তিনি ‘আসমানী' কবিতাটি রচনা করেন। ৯৭ বছর বয়সে আসমানী মৃত্যুবরণ করেন ১৮ আগস্ট, ২০১২ সালে ।