কোনো জটিল, দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট বিষয়কে সুস্পষ্ট, সহজবোধ্য এবং সহজ-সরল করে তুলে ধরাকেই ব্যাখ্যা বলে।
ব্যাখ্যার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব বা তাৎপর্য হলো, কোনো ব্যক্তির জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি করা। প্রাকৃতিক জগতে কোনো একটি ঘটনা বুঝতে গেলে ঘটনার কারণ কী, তা আমাদের নির্ধারণ করতে হয়। ব্যাখ্যা দেওয়ার অর্থ হলো ঘটনাগুলোর কার্যকারণ নির্দেশ করা। যেখানে নিয়মটি অজ্ঞাত থাকে, সেখানে নিয়ম সম্পর্কে প্রকল্প প্রণয়ন করে উক্ত নিয়মকে বুঝতে হয়। ব্যাখ্যা হচ্ছে উপাদান বা বৈশিষ্ট্যসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝিয়ে দেওয়া। যুক্তিবিদ্যার কাজ হলো কর্মের যৌক্তিকতা, প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনে যৌক্তিক বিশ্লেষণ আর জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়কে সহজ করে তুলে ধরা ইত্যাদি। এসব কাজে ব্যাখ্যাকরণের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব খুবই বেশি।
যুক্তিবিদরা দুই ধরনের ব্যাখ্যাকরণের কথা বলেছেন। যথা : বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকরণ ও লৌকিক ব্যাখ্যাকরণ।
প্রকৃতির নিয়মকানুন অনুযায়ী ঘটনাবলির কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কার করে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যাদান করাই হলো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকরণ। অর্থাৎ ব্যাখ্যাকরণ হলো ঘটনার কারণ বা নিয়ম আবিষ্কার করা, অন্যান্য ঘটনার সাথে সাদৃশ্যগুলো খুঁজে বের করা এবং অল্প ব্যাপক নিয়মকে অধিক ব্যাপক নিয়মের অধীনে আনা। একটি ঘটনার কার্যকারণ নিয়মকে আবিষ্কার করে তাকে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন: জোয়ার-ভাটা এবং জড়বস্তুর ভূপতনের মতো অল্প ব্যাপক নিয়মকে অধিক ব্যাপক মাধ্যাকর্ষণ নিয়মের অধীনে এনে ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ উভয়ের মধ্যে আকর্ষণের নিয়ম কাজ করছে।
অন্যদিকে লৌকিক ব্যাখ্যাকরণের ক্ষেত্রে অতিপ্রাকৃত সত্তার কল্পনা করে ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এরূপ ব্যাখ্যাকরণের মূলে থাকে মানুষের অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও অতিপ্রাকৃত সত্তার বিশ্বাস। বস্তুত প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতা নীতি ও কার্যকারণ নিয়মের উপর নির্ভর না করে যে ব্যাখ্যার কোনো ঘটনাকে কোনো অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক শক্তির সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হয় তাকে বলে লৌকিক ব্যাখ্যা। যেমন : চন্দ্রগ্রহণের লৌকিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, রাহু নামক দৈত্য মাঝে মাঝে চন্দ্রকে গ্রাস করে বলেই চন্দ্রগ্রহণ হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা বলেন, চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে তখনই চন্দ্রগ্রহণ হয়।
যুক্তিবিদ মিল এর মতে, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তিন প্রকার; যথা: বিশ্লেষণ, শৃঙ্খলযোজন ও অন্তর্ভুক্তি। মূলত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার এই তিনটি রূপই কোনো ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কার করে। এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো-
সাধারণত 'বিশ্লেষণ' কথাটির অর্থ হলো কোনো বিষয় বা ঘটনাকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা। কয়েকটি কারণ মিলিতভাবে কাজ করার ফলে একটি মিশ্র কার্য উৎপন্ন হয়। এ মিশ্র কার্য যে বিভিন্ন কারণের মিলিত ফল, তা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় সে কারণগুলোকে আলাদা করে দেখানো হয়। এ প্রক্রিয়াকেই বিশ্লেষণ বলে।
উদাহরণস্বরূপ, একটি নৌকার গতি ব্যাখ্যা করার সময় নদীর স্রোত, বাতাসের শক্তি, দাঁড়ের ব্যবহার ইত্যাদি একসাথে কাজ করার বিষয় উল্লেখ করা হয়। নৌকার গতি সৃষ্টির পেছনে এ কারণগুলো মিলিতভাবে কাজ করে। যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় কোনো দূরবর্তী কারণ ও তার কার্যসমূহের মধ্যবর্তী ধাপগুলো আবিষ্কার করা হয়, তাকে শৃঙ্খলযোজন বলা হয়। এ ব্যাখ্যায় দেখানো হয়, কোনো কার্য প্রত্যক্ষভাবে কল্পিত কারণটি থেকে উদ্ভূত নয়; বরং কারণটি কোনো অন্তর্বর্তী কার্য থেকে উদ্ভূত। আবার অন্তর্ভুক্তি বলতে যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় একটি কম ব্যাপক নিয়মকে বেশি ব্যাপক নিয়মের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাকে বোঝায়। এ ধরনের ব্যাখ্যায় আমরা একটি কম ব্যাপক নিয়মকে বেশি ব্যাপক নিয়মের অধীনে এনে ব্যাখ্যা করি। যেমন: জোয়ার-ভাটার নিয়মকে অধিক ব্যাপক মাধ্যাকর্ষণ নিয়মের অন্তর্ভুক্ত 'করে তার ব্যাখ্যাদান করা। মাধ্যাকর্ষণ নিয়ম একটি সার্বিক নিয়ম। এ নিয়মের ক্ষেত্রে যে ব্যাখ্যা প্রযোজ্য, সেই ব্যাখ্যাই জোয়ার- ভাটার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তিনটি রূপই কার্যকারণ সম্পর্ককে বর্ণনা করে। কেননা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কারের মাধ্যমে আলোচ্য ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করার অর্থই হলো কোনো ঘটনা যেসব নিয়মের অধীন তার অন্তর্ভুক্তি করা এবং একই সাথে ঘটনাটি সংঘটনের কারণগুলোকে শৃঙ্খলযোজন করা।
Related Question
View Allজগতের যাবতীয় জটিল ঘটনাকে সহজবোধ্য করার প্রেক্ষিতে মানবমনের সার্বিক কৌতূহল বা জিজ্ঞাসা নিবৃত্ত করার মাধ্যমে মানুষের বোধশক্তিকে পরিতৃপ্ত করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ব্যাখ্যা।
যেকোনো বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর করে মানবজীবনে বিষয়টির প্রয়োজনীয়তার উপর। আর ব্যাখ্যাকরণের প্রক্রিয়া হচ্ছে এমনই একটি বিষয়, মানবজীবনে যার অপরিসীম প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। তাই শুধু দৈনন্দিন জীবনেই নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর গুরুত্বের কারণেই বর্তমানের জ্ঞান- বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার ধারায় ব্যাখ্যাকরণের প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি বিষয় হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। সুতরাং যুক্তিবিদ্যায় ব্যাখ্যার প্রাসঙ্গিকতার গুরুত্ব অপরিসীম।
উদ্দীপকে মনির কলম কিনতে গিয়ে প্রথম কলমটি পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও সে অন্য দোকানে গিয়ে একটি কলম কিনল। যার কালি অনেক ভালো, এতে লেখা সুন্দর হয় এবং কলমটি দিয়ে বেশ দ্রুত লেখা যায়।
কলম কেনার ক্ষেত্রে উদ্দীপকের মনির যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছিল, তা হলো শৃঙ্খলযোজন। আর শৃঙ্খলযোজন কথাটির অর্থ হলো 'কতগুলো ঘটনার পর্যায়ক্রমিক পারস্পরিক সংযুক্তি'; অর্থাৎ মনির এই পদ্ধতি অবলম্বন করেই সব বিষয় পর্যালোচনা করে অন্য দোকানে তার দেখা দ্বিতীয় কলমটি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা কলমটির আকার সুবিধাজনক, যার ফলে ব্যবহার সুবিধাজনক হবে।
সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, মনিরের দ্বিতীয় কলমটি কেনার সিদ্ধান্তটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আলোকে সঠিক ছিল।
আপাতদৃষ্টিতে কোনো বিষয়কে সঠিক মনে হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ভুলও হতে পারে।- উক্তিটি উদ্দীপকের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো-
উদ্দীপকের মনির দোকানে কলম কিনতে গিয়েছে। এক দোকানে সে একটি কলম দেখল, যার আকার ও রং অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং কলমটি বেশ দামি। এ ছাড়া কলমটি একটি নামি কোম্পানির তৈরি; কিন্তু কলমটি না কিনে মনির অন্য একটি দোকানে যায়। সেখানে সে এমন একটি কলম দেখল যার কালি অনেক ভালো, এতে লেখা সুন্দর হয় এবং কলমটি দিয়ে বেশ দ্রুত লেখা যায়। এ ছাড়া কলমটির আকার এমন, যার ব্যবহার অত্যন্ত সুবিধাজনক। মনির কলমটি কেনার সিদ্ধান্ত নিল এবং মনে মনে পর্যালোচনা করে দেখল সিদ্ধান্তটিতে কোনো ভুল আছে কিনা। কেননা আপাতদৃষ্টিতে কোনো বিষয়কে সঠিক মনে হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ভুলও হতে পারে। যেমন: কোনো নামি কোম্পানির কলম হলেই যে সেটি ভালো হবে এবং সাধারণ কোম্পানির কলম হলে তা খারাপ হবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। তাই উদ্দীপকের মনির উক্ত বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার 'বিশ্লেষণরূপের' আলোকে পর্যালোচনা করে দ্বিতীয় কলমটি কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সাধারণত 'বিশ্লেষণ' কথাটির অর্থ হলো কোনো বিষয় বা ঘটনাকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে এর গুরুত্ব অনুধাবন করা। উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, উদ্দীপকের উক্তিটি যৌক্তিক ও যথার্থ।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় সংযোগ ক্রিয়া বর্তমান।
যে ব্যাখ্যায় অতিপ্রাকৃত সত্তা কল্পনা করে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা করা হয় তাকে লৌকিক ব্যাখ্যা বলে। সাধারণভাবে বলতে গেলে সাধারণ লোকের সাধারণ বিশ্বাস এবং মনগড়া চিন্তা ও প্রচলিত ধারণার দ্বারা কোনো ঘটনার যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা-ই হচ্ছে লৌকিক ব্যাখ্যা। তাই লৌকিক ব্যাখ্যা হচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে বাসা বাঁধা বিভিন্ন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রতিফলন।
সুতরাং লৌকিক ব্যাখ্যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা যায়, যে ব্যাখ্যায় অতিপ্রাকৃত সত্তা কল্পনা করে কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে লৌকিক ব্যাখ্যা বলে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!