তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?
মূলভাব: অপরের মন্দ আচরণ বা নিচু মানসিকতা দেখে আমাদের নিজেদের চরিত্রের মান নিচে নামানো উচিত নয়। আত্মমর্যাদা এবং নৈতিকতা বজায় রাখাই প্রকৃত মনুষ্যত্বের পরিচয়।
সম্প্রসারিত ভাব: পৃথিবীতে নানা স্বভাবের মানুষের বসবাস। কেউ সৎ, সজ্জন ও মার্জিত, আবার কেউ স্বভাবগতভাবেই সংকীর্ণমনা বা কুরুচিপূর্ণ।
সমাজজীবনে চলার পথে আমাদের প্রায়ই এমন মানুষের মুখোমুখি হতে হয়, যারা অশালীন আচরণ করে বা মন্দ পথে চলে। সাধারণ মানুষের প্রবৃত্তি হলো, কেউ খারাপ ব্যবহার করলে পাল্টা খারাপ ব্যবহার করা বা কেউ ক্ষতি করলে প্রতিশোধ নেওয়া। কিন্তু এটি কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যদি কেউ আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করে এবং আমরাও যদি তার সাথে একই ভাষায় বা অভদ্রতায় উত্তর দিই, তবে আমাদের আর তার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। সে যদি 'অধম' বা নিচু মানসিকতার হয়, তবে তার প্রভাবে আমাদের 'উত্তম' বা উন্নত চরিত্র বিসর্জন দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। বরং বিপক্ষের মন্দ আচরণের বিপরীতে নিজের সদাচরণ বজায় রাখলে নিজের মহত্ত্বই প্রকাশ পায়। অনেক সময় আমাদের ধৈর্য ও ভদ্রতা দেখে সেই ব্যক্তিটি নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং ভবিষ্যতে ভালো হওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। পরিশেষে বলা যায়, অন্যের দোষ বা মন্দ আচরণ যেন কখনোই আমাদের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন না করে। নিজের ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতাকে সমুন্নত রেখে সব পরিস্থিতিতেই সংযত থাকা উচিত। কারণ, প্রকৃত সজ্জন ব্যক্তি কখনোই অন্যের নীচতাকে নিজের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন না।
‘তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?’
মূলভাব: উত্তম আদর্শ অনুকরণীয় আর অধমের আদর্শ অবশ্যই পরিত্যাজ্য। অধমের অন্যায় আচরণের জবাবে অন্যায় আচরণ করা সমীচীন নয়। পরের সুকৃতিতে অনুপ্রাণিত হওয়া প্রশংসনীয় কিন্তু পরের স্বার্থপরতায় প্রভাবিত হওয়া অনাকাতি। অন্যের অন্যায়, অমানবিক ও অশুভ আচরণ কখনও মানুষের অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ হতে পারে না। আদর্শ জীবন গঠনে মানুষের সাধনা হওয়া উচিত সত্য, ন্যায় ও মানবিকতা।
সম্প্রসারিত ভাব: এ সংসারে কেবল ভালো বা মন্দ বলে কিছুই নেই। ভালো ও মন্দ নিয়েই গড়ে উঠেছে এ সংসার। চরিত্র বৈশিষ্ট্য ও মানসিকতার বিচার সংসারে সব মানুষ অভিন্ন চরিত্রের হয় না, মানুষের মধ্যে ভালো ও আছে মন্দও আছে। আমদের সংসারে ভালো লোকের তুলনায় মন্দ লোকের সংখ্যাই বেশি এবং এরা সর্বদাই অপরের তিসাধনে ব্যস্ত। সমাজে, সংসারে এরাই ঘিরে আছে আমাদের চারপাশে। মনুষ্যত্ব ও মানবতাবোধ বিবজিত অধম মানুষদের অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে এদের সাথে তাল মিলিয়ে আমাকেও মন্দ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ভালো হওয়া মানুষের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অন্যেরা মন্দ হতে পারে, কিন্তু আমার আছে ভালো হওয়ার। অধম হওয়ার পথ ভালো হওয়ার পথের চেয়ে সহজ। পক্ষান্তরে, উত্তম হওয়ার পথ কঠিন। নিজের সাধ্য ও সামর্থ্য মতো এরা অন্যের কল্যাণের চেষ্টার সচেষ্ট থাকেন। তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন। যারা উত্তম তারা শত বাধা-বিঘ্ন সত্ত্বেও মানুষের কল্যাণ কাজ করে যান। সংসারে যারা উত্তম মানুষ তারা শত লোভ-প্রলোভন উপেক্ষা করে আদর্শ ও নীতিতে অবিচল থাকেন। কখনো কখনো দেখা যায়, কেউ কেউ কোনো একটি অন্যায় কাজকে অন্য একটি অন্যায় দিয়ে রুখতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু কোনো হীন বা নীচ ব্যক্তি সমাজবিরোধী ক্ষতিকর কাজ করলেও তার প্রতিবিধান হীন কাজ দিয়ে করা সমীচীন নয়। উত্তম ব্যবহার কিংবা ক্ষমার আদর্শ দিয়ে তার অন্যায়ের সুবাহা করা উচিত। ক্ষমার এই উত্তম আদর্শ যাদের রয়েছে তাদের পথ অনুসরণ করে আমাদেরও পরহিতে জীবন উৎসর্গ করা উচিত এবং এটিই হচ্ছে মানুষের মধ্যে উত্তম হবার একমাত্র পথ। কারণ, এ পৃথিবীতে যারা উত্তম তারাই প্রকৃত মানুষ নামের যোগ্য। অধমের কার্যকলাপের বিপরীতে উত্তম কার্যকলাপের আদর্শ স্থাপনই মনুষ্যত্বের লক্ষণ।
সেই জন্যেই ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন:
কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে পায়,
তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে মানুষের শোভা পায়?
মন্তব্য: তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন এই সম্পর্ক সমাজে ভালো ও মন্দ এ উভয় শ্রেণির লোকই বাস করে। মন্দ পরিহার করে ভালো লোকের সাথেই জীবনযাপন করা উচিত। প্রকৃত মানুষ হতে হলে অন্যের কদর্য ব্যবহার প্রভাবিত হলে চলবে না।
Related Question
View Allসমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয় এবং সমাজে শত্রু-মিত্র উভয়ের সাথেই কোন না কোনভাবে মেলামেশা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হল শিক্ষা। মানুষের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মানদণ্ডটি অতীব জরুরি। কেননা, অশিক্ষিত বন্ধুর যত আন্তরিকতাই থাক না কেন, সে যে কোন মুহূর্তে নিজের অজ্ঞতাবশত অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলা হয়, মূর্খ ব্যক্তি পশুর সমান। ভালোমন্দ বিচার করার যথাযথ ক্ষমতা তার নেই। অনেক সময় বন্ধুর ভালোর জন্য কিছু করলেও তার অজ্ঞতার কারণে তা বন্ধুর ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এজন্য তাকে দোষও দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, শত্রুকে আমরা সাধারণত অনিষ্টের কারণ হিসেবেই বিবেচনা করি। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, একজন মুর্খ বন্ধু অজ্ঞতাবশত যা করতে পারে, একজন শিক্ষিত শত্রু সজ্ঞানে তেমনটি করতে পারে না। জ্ঞানের নির্মল পরশ অন্তত তাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে। যদি অনিষ্ট সে করে তবে সেটা হবে তার দুরাচার। আর মানুষ সব সময়ই শত্রুর দুরাচার সম্পর্কে সজাগ থাকে। ফলে শত্রুর এ চেষ্টা সফল নাও হতে পারে। কিন্তু বন্ধুর ব্যাপারে কোন সন্দেহ না থাকায় মানুষ এতটা সতর্ক থাকে না। অথচ এ অসতর্কতার ফাঁকে মূর্খ বন্ধুর অজ্ঞতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বন্ধু নির্বাচনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, জ্ঞান আলো এবং মূর্খতা অন্ধকারের সমতুল্য। আলোতে অনেক বিপদেও নিরাপদ থাকা যায়, অন্যদিকে অন্ধকারে সর্বদাই বিপদের আশঙ্কা থাকে
"ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন, কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।"
এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "যতদিন ছিলে" কবিতার একটি অংশ।
**ভাব-সম্প্রসারণ:**
এই উদ্ধৃতিটি একটি গভীর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। এখানে 'ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত চিন্তা, অনুভূতি বা ভাবনাগুলোকে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বা আবেগগতভাবে না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। 'নিলীন' শব্দের মাধ্যমে এখানে অভ্যন্তরীণ চিন্তা বা অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র অন্তরেও লুকিয়ে থাকলে চলবে না। অন্যদিকে, 'কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন' বাক্যে বলা হচ্ছে যে, আমাদের দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনতা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত। কর্মক্ষেত্রে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং যে কাজ করতে পারি, তা যেন আমাদের স্বাধীনতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হয়। এখানে স্বাধীনতার সাথে সক্ষমতার সম্মিলন প্রস্ফুটিত হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তি নিজের দক্ষতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা পায়। সংক্ষেপে, এই উদ্ধৃতিটি আমাদেরকে উৎসাহিত করে যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ভাবনা বা চিন্তাকে শুধু মনে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব জীবনের কাজে লাগিয়ে কার্যকরীভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হবে।
আমরা সবসময় ভাবের গহনায়, অনুভূতির গভীরতায় হারিয়ে থাকি, যেখানে কোনো এক নিস্তব্ধতা বা মাধুর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, বাস্তব জীবনে সেই ভাবনার পরিবর্তে আমাদের প্রমাণিত করতে হয় আমাদের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার। সেখানে ভাবের বন্দি হয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি শুধু ভাবনায় নিমজ্জিত থাকি, তবে বাস্তবতার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।
এখানে "ভাবের ললিত ক্রোড়ে" বলতে বোঝানো হচ্ছে যে আমরা আমাদের ভাবনাগুলোকে এতটাই গুরুত্ব দিই যে সেগুলো আমাদের কর্মক্ষমতা বা স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে আমাদের শক্তি এবং স্বাধীনতা আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। আমাদের উচিত আমাদের ভাবনার সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করা, যাতে আমাদের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পায়।
এইভাবে, কবি আমাদের শেখাতে চাইছেন যে ভাবনা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ভাবনার সৌন্দর্য বা গভীরতা তার স্থানেই মূল্যবান, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বাধীনতার প্রয়োগই আসল বিষয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!