মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নয়
মূলভাব: কর্মহীন দীর্ঘজীবনের চেয়ে কর্মময় সংক্ষিপ্ত জীবন বেশি মর্যাদাবান। কর্মই মানুষকে অমরত্ব দান করে। আর সৎকর্মের মাঝেই মানুষ বেঁচে থাকে।
সম্প্রসারিত ভাব: মানুষ মাত্রই জন্ম-মৃত্যুর অধীন। প্রকৃতিতে বিচরণশীল জীবকুল প্রাকৃতিক নিয়মেই জন্মলাভ করে, বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। মৃত্যুর সাথে সাথেই তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ এক্ষেত্রে প্রকৃতি রাজ্যের অন্যান্য জীবের তুলনায় ব্যতিক্রম। মানুষের জন্ম-মৃত্যু প্রাকৃতিক নিয়মে হলেও মানুষ কর্মের মাধ্যমে জগতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলে মানুষকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়- এটা চিরন্তন সত্য। প্রকৃতির এ এক অমোঘ নিয়ম। অন্যান্য জীবের ন্যায় মানুষকেও মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয় কিন্তু তাঁর পেছনে পড়ে থাকে মহৎ কর্মের ফসল; যে কর্মের জন্য তিনি মরেও পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন। জন্ম-মৃত্যুর উপর মানুষের হাত নেই, কিন্তু কর্মের উপর মানুষের পরিপূর্ণ হাত রয়েছে। মানুষ চাইলেই ভালো বা মন্দ যেকোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে। কিন্তু কেউ যদি কোন ভালো কাজ না করে তবে সে জীবন অর্থহীন, নিষ্ফল। কেউ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে না।
পক্ষান্তরে যে মানুষের জীবন কর্মব্যস্ত, নিজেকে যিনি সদা জীবন ও জগতের উপকারার্থে নিয়োজিত রাখেন, তাকে সবাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, 'Man does not live in years but in deeds'.
মহামানবদের জীবনী পাঠ করলেও আমরা এই প্রবাদের সার্থকতা খুঁজে পাই। হাজী মোহাম্মদ মুহসীন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ মনীষীগণ তাঁদের কর্মের দ্বারাই পৃথিবীতে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন। আবার বিপরীত দিক থেকে মানুষ তার কর্মের জন্যেই ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়ে থাকে। ফেরাউন থেকে শুরু করে হিটলার, মীরজাফরদের পৃথিবী ঘৃণাভরে স্মরণ করে। তাই আয়ুষ্কাল যাই হোক না কেন কর্মই মানুষের পরিচিতি নির্ধারণ করে। আয়ুষ্কালের দিক থেকে কেউ স্বল্পায়ু বা দীর্ঘায়ুর অধিকারী হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তির কর্মই ব্যক্তিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঁচিয়ে রাখে। কীর্তিমান ব্যক্তির যেমন মৃত্যু নেই, তেমনি শেষও নেই, কারণ এ পৃথিবীতে সে নিজস্ব কীর্তির মহিমায় লাভ করে অমরত্ব।
কীর্তিমানের মৃত্যু হলে তাঁর দেহের ধ্বংস সাধন হয় বটে, কিন্তু তাঁর সৎ কাজ এবং অম্লান কীর্তি পৃথিবীর মানুষের কাছে বাঁচিয়ে রাখে। তাঁর মৃত্যুর শত শত বছর পরেও মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তাই সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায়, মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা কর্ম-সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল। যাদের কর্মে পৃথিবীর কোনো কল্যাণ সাধিত হয় না পৃথিবী তাদের মনে রাখে না। মৃত্যুর সাথে সাথেই তারা বিস্মৃত হয়ে যান।
মন্তব্য: কীর্তিমানের শারীরিক মৃত্যু থাকলেও মানসিক মৃত্যু নেই। কর্মের মহত্ত্বে কীর্তিমানরা মানুষের অন্তরে অনন্তকাল চিরঞ্জীব হয়ে ভাস্বর থাকেন।
Related Question
View Allসমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয় এবং সমাজে শত্রু-মিত্র উভয়ের সাথেই কোন না কোনভাবে মেলামেশা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হল শিক্ষা। মানুষের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মানদণ্ডটি অতীব জরুরি। কেননা, অশিক্ষিত বন্ধুর যত আন্তরিকতাই থাক না কেন, সে যে কোন মুহূর্তে নিজের অজ্ঞতাবশত অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলা হয়, মূর্খ ব্যক্তি পশুর সমান। ভালোমন্দ বিচার করার যথাযথ ক্ষমতা তার নেই। অনেক সময় বন্ধুর ভালোর জন্য কিছু করলেও তার অজ্ঞতার কারণে তা বন্ধুর ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এজন্য তাকে দোষও দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, শত্রুকে আমরা সাধারণত অনিষ্টের কারণ হিসেবেই বিবেচনা করি। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, একজন মুর্খ বন্ধু অজ্ঞতাবশত যা করতে পারে, একজন শিক্ষিত শত্রু সজ্ঞানে তেমনটি করতে পারে না। জ্ঞানের নির্মল পরশ অন্তত তাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে। যদি অনিষ্ট সে করে তবে সেটা হবে তার দুরাচার। আর মানুষ সব সময়ই শত্রুর দুরাচার সম্পর্কে সজাগ থাকে। ফলে শত্রুর এ চেষ্টা সফল নাও হতে পারে। কিন্তু বন্ধুর ব্যাপারে কোন সন্দেহ না থাকায় মানুষ এতটা সতর্ক থাকে না। অথচ এ অসতর্কতার ফাঁকে মূর্খ বন্ধুর অজ্ঞতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বন্ধু নির্বাচনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, জ্ঞান আলো এবং মূর্খতা অন্ধকারের সমতুল্য। আলোতে অনেক বিপদেও নিরাপদ থাকা যায়, অন্যদিকে অন্ধকারে সর্বদাই বিপদের আশঙ্কা থাকে
"ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন, কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।"
এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "যতদিন ছিলে" কবিতার একটি অংশ।
**ভাব-সম্প্রসারণ:**
এই উদ্ধৃতিটি একটি গভীর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। এখানে 'ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত চিন্তা, অনুভূতি বা ভাবনাগুলোকে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বা আবেগগতভাবে না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। 'নিলীন' শব্দের মাধ্যমে এখানে অভ্যন্তরীণ চিন্তা বা অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র অন্তরেও লুকিয়ে থাকলে চলবে না। অন্যদিকে, 'কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন' বাক্যে বলা হচ্ছে যে, আমাদের দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনতা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত। কর্মক্ষেত্রে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং যে কাজ করতে পারি, তা যেন আমাদের স্বাধীনতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হয়। এখানে স্বাধীনতার সাথে সক্ষমতার সম্মিলন প্রস্ফুটিত হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তি নিজের দক্ষতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা পায়। সংক্ষেপে, এই উদ্ধৃতিটি আমাদেরকে উৎসাহিত করে যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ভাবনা বা চিন্তাকে শুধু মনে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব জীবনের কাজে লাগিয়ে কার্যকরীভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হবে।
আমরা সবসময় ভাবের গহনায়, অনুভূতির গভীরতায় হারিয়ে থাকি, যেখানে কোনো এক নিস্তব্ধতা বা মাধুর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, বাস্তব জীবনে সেই ভাবনার পরিবর্তে আমাদের প্রমাণিত করতে হয় আমাদের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার। সেখানে ভাবের বন্দি হয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি শুধু ভাবনায় নিমজ্জিত থাকি, তবে বাস্তবতার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।
এখানে "ভাবের ললিত ক্রোড়ে" বলতে বোঝানো হচ্ছে যে আমরা আমাদের ভাবনাগুলোকে এতটাই গুরুত্ব দিই যে সেগুলো আমাদের কর্মক্ষমতা বা স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে আমাদের শক্তি এবং স্বাধীনতা আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। আমাদের উচিত আমাদের ভাবনার সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করা, যাতে আমাদের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পায়।
এইভাবে, কবি আমাদের শেখাতে চাইছেন যে ভাবনা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ভাবনার সৌন্দর্য বা গভীরতা তার স্থানেই মূল্যবান, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বাধীনতার প্রয়োগই আসল বিষয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!