প্রয়োজনে যে মরিতে প্রস্তুত, বাঁচিবার অধিকার তাহারই
মূলভাব: এই উক্তিটি জীবনের সার্বিক সার্থকতা ও সাহসের গভীর দার্শনিক সম্পর্ককে নির্দেশ করে। এর মূল বক্তব্য হলো, শুধুমাত্র দীর্ঘকাল ধরে জৈবিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই জীবনের উদ্দেশ্য নয়। বরং যে ব্যক্তি মহৎ আদর্শ, ন্যায়বিচার, বা বৃহত্তর কল্যাণের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ (অর্থাৎ জীবনদান) স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে, সেই ব্যক্তিই প্রকৃত অর্থে পৃথিবীতে সসম্মানে ও সার্থকভাবে বেঁচে থাকার নৈতিক অধিকার লাভ করে।
সম্প্রসারিত ভাব: মানব জীবন একটি নিরন্তর সংগ্রাম। এই সংগ্রামে জীবনকে ধরে রাখার চেয়ে জীবনের মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্য রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি। ভীরুতা বা আত্মস্বার্থ মানুষকে যেকোনো মূল্যে জীবন আঁকড়ে ধরে থাকতে উৎসাহিত করে, কিন্তু সেই জীবন প্রায়শই অন্তঃসারশূন্য ও অর্থহীন হয়। এর বিপরীতে, একজন সাহসী ও আদর্শনিষ্ঠ মানুষ যখন দেখে তার স্বাধীনতা, দেশ, বা মানবজাতির মর্যাদা বিপন্ন, তখন সে দ্বিধাহীন চিত্তে সেই বিপদের মোকাবিলা করে। সে বোঝে যে, এই সংগ্রামে যদি তার মৃত্যুও ঘটে, তবে সেই মৃত্যু হবে অমরত্বের সমান। ইতিহাসের পাতায় এমন বহু মহৎ প্রাণের উদাহরণ রয়েছে, যারা ব্যক্তিগত জীবনের মোহ ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতা বা গণমানুষের অধিকার রক্ষায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন জাতি তাদের এই আত্মত্যাগকেই চিরদিন শ্রদ্ধার আসনে রেখেছে, কারণ তাদের আত্মবলিদানই অন্যদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন এনে দিয়েছে। যারা জীবন বাঁচানোর ভয়ে অন্যায় মেনে নেয় বা দাসত্ব বরণ করে, তারা শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও, আত্মিকভাবে তারা সমাজের চোখে মৃত।
সুতরাং, উক্তিটির বার্তা হলো: জীবনকে সার্থক ও মর্যাদাপূর্ণ করতে হলে ঝুঁকি নেওয়ার এবং চরম ত্যাগের মানসিকতা অপরিহার্য। অমর্যাদা ও আদর্শের কাছে যে জীবন তুচ্ছ করতে পারে, সেই জীবনই মহৎ, চিরস্মরণীয় এবং প্রকৃত অর্থে বেঁচে থাকার সম্মান অর্জন করে।
আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনী উঠল রাঙা হয়ে
মূলভাব: এটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি। এর মূল কথা হলো: জগৎ বা বস্তুর নিজস্ব কোনো অপরিবর্তনীয় রূপ নেই; বস্তুর সৌন্দর্য, রঙ বা অর্থ আসলে আমাদের নিজস্ব চেতনা, অনুভূতি এবং দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সৃষ্টি ও প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ, বাইরের জগৎ নয়, বরং মানুষের অন্তরের উপলব্ধির মাধ্যমেই তা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সম্প্রসারিত ভাব: সাধারণভাবে আমরা মনে করি, জগতের বস্তুগুলো নিরপে ভাবে বিদ্যমান পান্না তার রাসায়নিক ধর্মের জন্য সবুজ এবং চুনী তার উপাদানের জন্য লাল। কিন্তু কবি বলছেন, বস্তুর এই রঙগুলো তখনই সজীব ও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন তা আমাদের সচেতন মন বা চেতনার স্পর্শ পায়। মানুষের মন হলো এক সৃজনশীল লেন্স। এই লেন্সের মধ্য দিয়ে আমরা যখন জগৎকে দেখি, তখন আমরা কেবল বস্তুটিকে দেখি না, বরং তার সঙ্গে আমাদেরআনন্দ, বিষাদ, কল্পনা এবং অভিজ্ঞতার রঙ মিশ্রিত করে দিই। উদাহরণস্বরূপ, একই সূর্যাস্ত একজন উদাসীন মানুষের কাছে কেবল আলো-আঁধারের খেলা, কিন্তু একজন কবির কাছে তা অপার বিস্ময় ও গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়। যখন মন আনন্দে পূর্ণ থাকে, তখন চারপাশের সাদামাটা দৃশ্যও উজ্জ্বল ও সুন্দর মনে হয়। আবার মন যখন বিষাদে আচ্ছন্ন, তখন উজ্জ্বলতম জিনিসও স্নান ও বিবর্ণ লাগে। এটি প্রমাণ করে যে, বস্তুজগতের সৌন্দর্য বস্তুর মধ্যে নয়, বরং তা দ্রষ্টার চেতনার মধ্যেই বাস করে।
এই উক্তির দার্শনিক তাৎপর্য হলো: বহির্জগতের বস্তু ও প্রকৃতি হলো কেবল উপকরণ বা ক্যানভাস। এগুলিকে প্রাণ ও সৌন্দর্য দিতে প্রয়োজন মানুষের সৃজনশীল মনন ও আত্মিক উপলব্ধি। আমাদের চেতনার মাধ্যমেই বস্তুজগত মূল্য লাভ করে, আলোকিত হয় এবং অর্থবহ হয়ে ওঠে। মানুষের ভেতরের ভাবনাই বাইরের জগৎকে নির্মাণ করে।
'ভাব-সম্প্রসারণ' কথাটির অর্থ কবিতা বা গদ্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে ব্যাখ্যা করা, বিস্তারিত করে লেখা, বিশ্লেষণ করা। আবৃতকে উন্মোচন, সংকেতকে নির্ণীত করে তুলনীয় দৃষ্টান্ত ও প্রবাদ-প্রবচনের সাহায্যে সহজ ভাষায় ভাবের বিন্দুকে বিস্তার করার নাম ভাব-সম্প্রসারণ।
- ভাব-সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি দিকের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। যেমন:
ক. প্রদত্ত চরণ বা গদ্যাংশটি একাধিকবার মনোযোগ সহকারে পড়ে অন্তর্নিহিত ভাবটি কী, তা সঠিকভাবে বুঝতে হবে। মূল ছত্রটি হুবহু ব্যবহার করা উচিত নয়।
খ. অন্তর্নিহিত মূলভাবটি কোনো উপমা, রূপক-প্রতীকের আড়ালে প্রচ্ছন্ন থাকে, তবে ভাব-সম্প্রসারণের সময় প্রয়োজনে অতিরিক্ত অনুচ্ছেদ-যোগে ব্যাখ্যা করলে ভালো হয়।
গ. সহজ ভাষার, সংক্ষেপে ভাবসত্যটি উপস্থাপন করা উচিত। প্রয়োজনে যুক্তি উপস্থাপন করে তাৎপর্যটি উদ্ধার করতে হবে।
ঘ. মূল ভাব-বীজকে বিশদ করার সময় সহায়ক দৃষ্টান্ত, প্রাসঙ্গিক তথ্য বা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা চলে।
ঙ. ভাব-সম্প্রসারণ করার সময় মনে রাখতে হবে যে, যেন বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বারবার একই কথা লেখা ভাব-সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দূষণীয়।
চ. ভাব-সম্প্রসারণকে প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়। যথা: প্রথম অংশে ভাবের অর্থ, দ্বিতীয় অংশে ভাবের ব্যাখ্যা, তৃতীয় অংশে ভাবের তাৎপর্য।
ছ. ভাব-সম্প্রসারণ করার সময়ে প্রদত্ত অংশের রচয়িতার নাম উল্লেখ করাতে হয় না।
জ. প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
Related Question
View Allসমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয় এবং সমাজে শত্রু-মিত্র উভয়ের সাথেই কোন না কোনভাবে মেলামেশা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হল শিক্ষা। মানুষের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মানদণ্ডটি অতীব জরুরি। কেননা, অশিক্ষিত বন্ধুর যত আন্তরিকতাই থাক না কেন, সে যে কোন মুহূর্তে নিজের অজ্ঞতাবশত অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলা হয়, মূর্খ ব্যক্তি পশুর সমান। ভালোমন্দ বিচার করার যথাযথ ক্ষমতা তার নেই। অনেক সময় বন্ধুর ভালোর জন্য কিছু করলেও তার অজ্ঞতার কারণে তা বন্ধুর ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এজন্য তাকে দোষও দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, শত্রুকে আমরা সাধারণত অনিষ্টের কারণ হিসেবেই বিবেচনা করি। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, একজন মুর্খ বন্ধু অজ্ঞতাবশত যা করতে পারে, একজন শিক্ষিত শত্রু সজ্ঞানে তেমনটি করতে পারে না। জ্ঞানের নির্মল পরশ অন্তত তাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে। যদি অনিষ্ট সে করে তবে সেটা হবে তার দুরাচার। আর মানুষ সব সময়ই শত্রুর দুরাচার সম্পর্কে সজাগ থাকে। ফলে শত্রুর এ চেষ্টা সফল নাও হতে পারে। কিন্তু বন্ধুর ব্যাপারে কোন সন্দেহ না থাকায় মানুষ এতটা সতর্ক থাকে না। অথচ এ অসতর্কতার ফাঁকে মূর্খ বন্ধুর অজ্ঞতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বন্ধু নির্বাচনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, জ্ঞান আলো এবং মূর্খতা অন্ধকারের সমতুল্য। আলোতে অনেক বিপদেও নিরাপদ থাকা যায়, অন্যদিকে অন্ধকারে সর্বদাই বিপদের আশঙ্কা থাকে
"ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন, কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।"
এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "যতদিন ছিলে" কবিতার একটি অংশ।
**ভাব-সম্প্রসারণ:**
এই উদ্ধৃতিটি একটি গভীর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। এখানে 'ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত চিন্তা, অনুভূতি বা ভাবনাগুলোকে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বা আবেগগতভাবে না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। 'নিলীন' শব্দের মাধ্যমে এখানে অভ্যন্তরীণ চিন্তা বা অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র অন্তরেও লুকিয়ে থাকলে চলবে না। অন্যদিকে, 'কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন' বাক্যে বলা হচ্ছে যে, আমাদের দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনতা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত। কর্মক্ষেত্রে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং যে কাজ করতে পারি, তা যেন আমাদের স্বাধীনতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হয়। এখানে স্বাধীনতার সাথে সক্ষমতার সম্মিলন প্রস্ফুটিত হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তি নিজের দক্ষতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা পায়। সংক্ষেপে, এই উদ্ধৃতিটি আমাদেরকে উৎসাহিত করে যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ভাবনা বা চিন্তাকে শুধু মনে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব জীবনের কাজে লাগিয়ে কার্যকরীভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হবে।
আমরা সবসময় ভাবের গহনায়, অনুভূতির গভীরতায় হারিয়ে থাকি, যেখানে কোনো এক নিস্তব্ধতা বা মাধুর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, বাস্তব জীবনে সেই ভাবনার পরিবর্তে আমাদের প্রমাণিত করতে হয় আমাদের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার। সেখানে ভাবের বন্দি হয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি শুধু ভাবনায় নিমজ্জিত থাকি, তবে বাস্তবতার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।
এখানে "ভাবের ললিত ক্রোড়ে" বলতে বোঝানো হচ্ছে যে আমরা আমাদের ভাবনাগুলোকে এতটাই গুরুত্ব দিই যে সেগুলো আমাদের কর্মক্ষমতা বা স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে আমাদের শক্তি এবং স্বাধীনতা আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। আমাদের উচিত আমাদের ভাবনার সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করা, যাতে আমাদের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পায়।
এইভাবে, কবি আমাদের শেখাতে চাইছেন যে ভাবনা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ভাবনার সৌন্দর্য বা গভীরতা তার স্থানেই মূল্যবান, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বাধীনতার প্রয়োগই আসল বিষয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!