নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসার আবেগ ও অনুভূতিকেই দেশপ্রেম বলে।
ইংরেজি 'Nation' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Nasci' থেকে এসেছে, যার অতীত রূপ Natus থেকে উদ্ভূত (Nasci = to born, Natus = birth, race, people); যার অর্থ জন্ম, গোষ্ঠী, জনগণ প্রভৃতি। যদিও Nation শব্দটির গ্রহণযোগ্য বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। আমরা সুবিধার জন্য নেশনকে বেছে নিয়েছি।
RN Gilchrist বলেন, "Nation is a state plus something else;
the state looked at from a certain point of view, viz, that of the unity of the people organised into one state." (জাতি হলো রাষ্ট্র ছাড়াও অধিক কিছু; রাষ্ট্রকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে, অর্থাৎ, জাতি হলো রাষ্টের মধ্যে একটি সুগঠিত জনসমাজ।)
উদ্দীপকে জাতীয়তার ভাষাগত ঐক্য, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদান মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
ভাষাগত ঐক্য: ভাষা ও সাহিত্যগত ঐক্য জাতীয়তা গঠনে অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। ভাবের আদান-প্রদান দিয়ে মানবসমাজের সদস্যদের মধ্যে প্রথম যোগাযোগ শুরু হয়। এর পথ ধরেই অন্যান্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কারণ মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষার মাধ্যমে একজন অন্যজনকেসহজে বুঝতে পারে; একে অন্যের চাহিদা ও স্বার্থ সম্বন্ধে সহজে জানতে পারে এবং তা মেটাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। একই ভাষাভাষী জনসাধারণ তাদের নিজেদের ভাব-চিন্তা-চেতনা ইত্যাদির সাদৃশ্যের কারণে নিজেদেরকে অন্য জাতি থেকে পৃথক মনে করে। ফলে অতি সহজেই তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ, একাত্মবোধ তথা জাতীয়তার সৃষ্টি হয়।
ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদান: প্রচলিত রীতনীতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ঐক্য জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন একটি ভূখণ্ডে বসবাস করলে জনসমাজের মধ্যে ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি প্রভৃতির ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধনের ফলে ঐতিহ্যগত ঐক্য গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন একত্রে বসবাসের ফলে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং অন্য জনগোষ্ঠীর সাথে আদান-প্রদান, বন্ধুত্ব-বৈরিতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, টানাপড়েন প্রভৃতিকে সাহস ও শৌর্যের সাথে মোকাবিলা করার মাধ্যমে এটি গড়ে ওঠে, পূর্বসূরিদের এসব অতীত কার্যকলাপ পরবর্তীদের প্রেরণা ও গৌরববোধের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। তাদের আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি ইত্যাদি অন্যদের চেয়ে পৃথক ভাবতে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করে।
উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, উদ্দীপকে জাতীয়তার ভাষাগত ঐক্য, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদান মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
উদ্দীপকে জাতীয়তার ভাষাগত ঐক্য, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদান সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। 'জাতি গঠনের ক্ষেত্রে উক্ত উপাদানটি একমাত্র উপাদান নয়'-এর সপক্ষে নিচে যুক্তি দেওয়া হলো-
একই স্বার্থ যেমন- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও কৃষ্টি কোনো দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করার প্রেরণা দেয়। জনগণের স্বার্থ যদি অভিন্ন হয় তবে তারা একত্রে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। তারা নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করে এবং নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়। তবে জাতীয়তার জন্য এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নয়।
জাতীয়তা গঠনে ও বিকাশে অন্যান্য উপাদানের সাথে রাজনৈতিক চেতনাও বিশেষ ভূমিকা রাখে। অন্য উপাদানগুলো জনগণের অন্তরে বদ্ধমূল করে তাদের মধ্যে প্রেরণা ও নিজেদের মতো বাঁচার স্বপ্ন রাজনৈতিক চেতনার মাধ্যমে বাস্তবে রূপলাভ করে। রাজনৈতিক চেতনা না থাকলে ভৌগোলিক অখণ্ডতা, ধর্মীয় বা বংশগত ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ বা ইতিহাস ও ঐতিহ্যগত উপাদানসমূহকে জনমনে বদ্ধমূল করার কোনো উপায় বা পথ থাকে না। জাতীয়তার আরেকটি উপাদান হলো একই আশা-আকাঙ্ক্ষা। এটি একই বংশ, ভাষা, ধর্ম এবং ঐতিহাসিক উপাদানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া, আফ্রিকার অনেক জাতি এ উপাদানের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারিত হলে কোনো জাতি পূর্ণাঙ্গ জাতিতে পরিণত হয়।
প্রকৃতপক্ষে একত্রে বাস করার আন্তরিক ইচ্ছা না থাকলে অভিন্ন ভাষা, ধর্ম, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইত্যাদির কোনোটিই মানবসমাজকে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে না। অধ্যাপক স্পেংলার বলেন, জাতীয়তার উপাদান কুলগত বা ভাষাগত ঐক্য নয় বরং মনোগত ঐক্য। অধ্যাপক লাঙ্কি তাই মত দেন, জাতীয়তার ধারণা এক প্রকার মানসিক ধারণা।
এছাড়াও অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভাবগত ঐক্য উপাদান রয়েছে। তাই বলা যায় জাতি গঠনের ক্ষেত্রে উদ্দীপকের উপাদানটি একমাত্র উপায় নয়-বক্তব্যটি সঠিক ও যথার্থ।
Related Question
View AllNationality' শব্দের অর্থ জাতীয়তা।
জাতীয়তাবাদ একটি মহান আদর্শ, যা মূলত এক প্রকার মানসিক অনুভূতি। বিভিন্ন উপাদান থেকে এর উৎপত্তি। কিন্তু এ জাতীয়তাবাদ যদি এমন হয় যে, তা অন্য জাতিকে ঘৃণা করতে শেখায়, নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায় এবং অন্যকে নিজের অধীন রাখার মতো হীনমানসিকতাকে জাগিয়ে তোলে, তবে তা হবে উগ্র জাতীয়তাবাদ। এটি একটি বিবৃত মানসিকতা যা ব্যক্তিকে অন্ধ দেশপ্রেমে প্রলুব্ধ করে। জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনী এরূপ জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিল, যার ফলাফল প্রলয়ঙ্করী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ঐতিহাসিক বিষয়। এর বিকাশ ঘটেছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করে, যা প্রধান শিক্ষক উদ্দীপকে উল্লেখ করেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশের পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক মাইলফলক। বাঙালি দামাল ছেলেরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক ইতিহাস রচনা করে। এ ভিত্তিতেই রচিত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশ। ৫২'র ভাষা আন্দোলন ছিল স্বাধিকার আদায়ের প্রথম ধাপ। এ আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ৫৪'র নির্বাচন, ৬২'র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬'র ছয় দফা, ৬৯'র গণঅভুত্থান, ৭০'র নির্বাচন এবং ৭১'র স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে। বাঙালি জাতি এক ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিজয় অর্জনে এটি আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
জাতীয়তা একটি বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রত্যয়। এটি গড়ে ওঠার পেছনে অনেকগুলো factor কাজ করে থাকে। উদ্দীপকে প্রধান অতিথি যে কথাটি বলেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা শুধু ভাষাগত মিল একটি জাতীয়তা নির্মাণের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশের ভাষা ইংরেজি হলেও তারা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা জাতি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের লোকজনের ভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও এরা আলাদা দুটি জাতি। আবার ভারত বহু ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও তাদের জাতীয়তা এক। এভাবে ভাষাগত সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য একরূপ জাতীয়তা সৃষ্টি বা আলাদা করতে ভূমিকা পালন নাও করতে পারে। জাতীয়তা নির্মাণের পথ অত্যন্ত জটিল ধারায় আবর্তিত হয়।
জাতীয়তা নির্ধারণের অন্যান্য যেসব উপাদান রয়েছে তার মধ্যে প্রধান হলো একই ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, সাহিত্য, ভৌগোলিক ঐক্য, মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক অভিন্ন উদ্দেশ্য ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির লোক জড়ো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন বসবাস করছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য তাদেরকে একই সূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে এবং শক্তিশালী জাতীয়তা নির্মাণে সহায়তা করেছে। তাদের সবার জাতীয়তা নির্ধারিত হয়েছে মার্কিনী। এরূপ কালের পরিক্রমায় দীর্ঘ পরিসরে মানুষের জীবনধারার প্রেক্ষিতে একটি জাতীয়তা গড়ে উঠেছে।
অনুরূপভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের মধ্যেও ইতিহাসের বিবর্তন ধারায় গড়ে উঠেছে জাতীয় চেতনা। এ চেতনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে জাতীয়তাবোধ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এরূপ লক্ষ করা যায়। Activate
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।
জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমষ্টির রাষ্ট্রগুলোকে জাতি-রাষ্ট্র বলা হয়। জাতীয়তার উপাদানগুলোর মাধ্যমে সংগঠিত ও স্বাধীন হয়ে এরূপ রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিরাষ্ট্র ধারণার প্রবক্তা ম্যাকিয়েভেলি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি জাতি-রাষ্ট্র।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!