'অন্বয়' শব্দের অর্থ হচ্ছে মিল।
ব্যতিরেকী পদ্ধতির দুটি সুবিধা নিচে উল্লেখ করা হলো-
১। ব্যতিরেকী পদ্ধতি মূলত একটি পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি : এর দৃষ্টান্তগুলো একটু বিশেষ ধরনের। কেবল পরীক্ষণের সাহায্যে তাদের সুষ্ঠুভাবে সংগ্রহ করা যায়। এ পদ্ধতিতে অপরাপর অবস্থাকে অপরিবর্তিত রেখে একটি বিশেষ অবস্থাকে একবার হাজির করে তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায় এবং একবার তাকে সরিয়ে দিয়ে তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়।
২। একই পদ্ধতির মাধ্যমে কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করা যায় বলে একে প্রমাণের পদ্ধতিও বলে। এর সাহায্যে শুধু আবিষ্কার করা হয় না, প্রমাণও করা হয়। অন্বয়ী পদ্ধতি কার্যকারণ সম্পর্কের যে আভাস দেয়, ব্যতিরেকী পদ্ধতি তাকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে।
উদ্দীপকে বর্ণিত বিষয়ের সাথে পাঠ্যপুস্তকের কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণের পরীক্ষণ পদ্ধতি হিসেবে পরিশেষ পদ্ধতির সাদৃশ্য রয়েছে। নিচে পরিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
'পরিশেষ পদ্ধতি' কথাটির অর্থ হচ্ছে বিয়োগফল বা অবশিষ্ট অংশ। এ পদ্ধতি হচ্ছে এমন এক পদ্ধতি, যার দ্বারা কোনো জটিল ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার সময় যদি দেখা যায়, পূর্ববর্তী ঘটনার সমষ্টির মধ্যে কিছু অংশ অনুবর্তী ঘটনা সমষ্টির কিছু অংশের কারণ বলে আমাদের পূর্ব থেকেই জানা আছে, তাহলে আমরা সমগ্র অংশ থেকে জানা অংশকে বিয়োগ করে অবশিষ্ট পূর্ববর্তী ঘটনাকে অবশিষ্ট পরবর্তী ঘটনার কারণ বলে সিদ্ধান্ত করি। মিল এর মতে, পরিশেষ পদ্ধতি হচ্ছে ব্যতিরেকী পদ্ধতির একটি বিশেষ পরিবর্তিত অবস্থা।
পরিশেষ পদ্ধতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মিল বলেন, "প্রদত্ত কোনো ঘটনা থেকে এমন অংশ বাদ দিতে হবে, যা ইতিপূর্বেই। আরোহ অনুমানের সাহায্যে পাওয়া কতগুলো পূর্ববর্তী ঘটনার কার্য বলে জানা গেছে। তাহলেই ঘটনাটির বাকি অংশ হবে অবশিষ্ট পূর্ববর্তী ঘটনার কার্য।"
যুক্তিবিদ মেলোন এর প্রয়োগ করতে গিয়ে বলেন, "একটি জটিল ঘটনার কোনো অংশবিশেষ যখন নির্ণীত কারণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না, তখন ঐ অবশিষ্ট অংশের জন্য অন্য একটি কারণ খুঁজতে হবে।" পরিশেষ পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে অপনয়ন সূত্রের নির্দেশ করতে গিয়ে যুক্তিবিদ যোসেফ বলেন, "যা ভিন্ন একটি ঘটনার কারণ হতে পারে না।" অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট কার্যের পেছনে শুধু একটি নির্দিষ্ট কারণই নিহিত থাকে।
সুতরাং যে ঘটনাটি অন্য কোনো ঘটনার কারণ বলে পরিচিত, তা কিছুতেই আরেকটি ঘটনার কারণ হতে পারে না।
উদ্দীপকে উল্লিখিত পরিশেষ পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধা নিচে উল্লেখ করা হলো-
সুবিধাসমূহ :
⇨ পরিশেষ পদ্ধতিতে কোনো একটি ঘটনাকে কার্য বলে জানা গেলে যেমন এর কারণ নির্ণয় করা যায়, তেমনি একটি ঘটনাকে কারণ বলে ধরা হলে তার কার্য নির্ণয় করা যায়।
⇨ বিজ্ঞানের ইতিহাসে পরিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করে বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে।
⇨ পরিশেষ পদ্ধতি বহুকারণ সম্ভাবনাকে অনেকাংশে দূর করতে সক্ষম। এর ফলে এ পদ্ধতির মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রায় নিশ্চিতের কোঠায় গিয়ে পৌঁছায়।
⇨ সব আরোহ পদ্ধতিই কম-বেশি পরিশেষ পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল।
⇨ পরিশেষ পদ্ধতি ব্যতিরেকী পদ্ধতির মতোই নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কার করতে সক্ষম। আর এজন্য এর সিদ্ধান্তও নিশ্চিত হয়ে থাকে।
⇨ এই পদ্ধতির সাহায্যে জটিল ও মিশ্র ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম; যেমন: আরগন গ্যাস আবিষ্কার।
অসুবিধাসমূহ :
⇒ এই পদ্ধতির প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, কার্যকারণ সম্বন্ধ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একে প্রথমই প্রয়োগ করা যায় না।
⇒ সমজাতীয় কার্য সংমিশ্রণে এ পদ্ধতিতে কার্যকারণ সম্বন্ধ নির্ণয় করা গেলেও ভিন্ন জাতীয় কার্য সংমিশ্রণের ক্ষেত্রে ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করা যায় না।
⇨ এ পদ্ধতিতে একটি শর্তকে সম্পূর্ণ কারণ বলে ভুল করার আশঙ্কা আছে।
⇨ কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকলেও প্রকারান্তে এটি ব্যতিরেকী পদ্ধতিরই একটি অংশ। তাই ব্যতিরেকী পদ্ধতির অনেক ত্রুটি এর উপরও বর্তায়।
⇨ কোনো বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রাথমিক স্তরে এটি প্রয়োগযোগ্য নয়। কারণ অনুসন্ধানাধীন ঘটনায় কারণের অংশবিশেষ জানা না থাকলে এ পদ্ধতিটি প্রয়োগের সম্ভাবনা থাকে না।
⇨ গাণিতিক হিসাব-নিকাশ এ পদ্ধতিতে চলে না, প্রকৃতির জটিল ঘটনাবলি সবসময় চুলচেরা গাণিতিক নিয়মে পরিমাপ করা যায় না।
Related Question
View Allযুক্তিবিদ জে. এস. মিল সর্বপ্রথম 'অন্বয়ী' শব্দটি ব্যবহার করেন।
যৌথ অন্বয়ী ব্যতিরেকী পদ্ধতিটি আসলে অন্বয়ী পদ্ধতির দ্বিবিধ প্রয়োগ, যা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলে দুই ধরনের দৃষ্টান্তগুচ্ছের প্রয়োজন হয়। একটি সদর্থক দৃষ্টান্তগুচ্ছ এবং অন্যটি নঞর্থক দৃষ্টান্তগুচ্ছ। এ পদ্ধতিতে প্রথমত, আলোচ্য ঘটনাটি উপস্থিত থাকে, এমন কয়েকটি দৃষ্টান্ত আহরণ করতে হয়, সে দৃষ্টান্তগুলোতে একটিমাত্র অবস্থার দিক থেকে সবার মধ্যে মিল বা অন্বয় লক্ষ করা যায়।
দ্বিতীয়ত, আলোচ্য ঘটনাটি অনুপস্থিত থাকে এমন কয়েকটি দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু লক্ষণীয় যে, সদর্থক দৃষ্টান্তগুচ্ছের মধ্যে যে একটিমাত্র অবস্থা সবসময় উপস্থিত দেখা দিয়েছিল, সেটিই শুধু এ দৃষ্টান্তগুচ্ছে অনুপস্থিত থাকে। কাজেই এ পদ্ধতির মাধ্যমে কার্য থেকে কারণ এবং কারণ থেকে কার্যে গমন করা যায়।
উদ্দীপকে তপু লাইব্রেরিতে যুক্তিবিদ্যা বইয়ে কোনো ঘটনাবলির পর্যবেক্ষণ থেকে বাদ দেওয়ার যে বিষয়টি দেখতে পায় তা হলো অপনয়ন। নিচে অপনয়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো-
ব্যাপক অর্থে কোনো ঘটনাবলির অনাবশ্যক ও অবান্তর বিষয়কে পর্যবেক্ষণ থেকে বাদ দেওয়াকে অপনয়ন বলে। অপনয়নের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যুক্তিবিদ কার্ভেথ রিড বলেন, “গুণগতভাবে কোনো ঘটনার কারণ হলো উক্ত ঘটনার অপরিবর্তনীয়, শর্তহীন ও অব্যবহিত পূর্ববর্তী ঘটনা এবং পরিমাণগতভাবে কারণ হচ্ছে কার্যের সমান।"
যুক্তিবিদ বেইন অপনয়নের তিনটি সূত্র এবং যুক্তিবিদ যোসেফ বেইন এর সূত্রের সাহায্যকারী সূত্র হিসেবে সর্বমোট চারটি সূত্রের উল্লেখ করেন। সূত্রগুলো হলো-
প্রথম সূত্র: যে পূর্ববর্তী ঘটনাকে পরবর্তী ঘটনার কোনো ক্ষতি না করে বাদ দেওয়া সম্ভম্ব, তা কারণের কোনো অংশ হতে পারে না।
দ্বিতীয় সূত্র: যে পূর্ববর্তী ঘটনাকে কোনো পরবর্তী ঘটনার ক্ষতি না করে অপসারণ সম্ভব, তা উক্ত পরবর্তী ঘটনার কারণ বা কারণের অংশ হতে বাধ্য।
তৃতীয় সূত্র: পরিমাণের দিক থেকে পরবর্তী ঘটনার হ্রাস-বৃদ্ধি না ঘটিয়ে যে পূর্ববর্তী ঘটনার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে তা অসম্ভব।
চতুর্থ সূত্র: যা একটি ভিন্ন ঘটনার কারণ বলে পরিচিত, তা কখনোই আলোচ্য ঘটনার কারণ হতে পারে না।
অপনয়নের উপরিউক্ত সূত্রসমূহ থেকে দেখা যায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সূত্র যথাক্রমে মিল এর অন্বয়ী, ব্যতিরেকী, সহপরিবর্তন ও পরিশেষ পদ্ধতির ভিত্তি। আবার প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্র দুটি যৌথভাবে যৌথ অন্বয়ী ব্যতিরেকী পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
উদ্দীপকে তপুর শেষ উক্তিটি হলো, "উক্ত অধ্যায়ের বৈজ্ঞানিক মতবাদগুলো জানার চেষ্টা করছি।" তপুর উক্তিটি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ পদ্ধতি অধ্যায়ের বৈজ্ঞানিক মতবাদ থেকে বলা।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো ঘটনার কারণ হচ্ছে একটি অপরিবর্তনীয়, শর্তহীন পূর্ববর্তী ঘটনা। কালের বিবেচনায় কারণ সবসময়ই কার্যের একটি পূর্ববর্তী ঘটনা। কিন্তু যেকোনো পূর্ববর্তী ঘটনাই কোনো কার্যের কারণ নয়। কারণ হতে হলে তাকে অবশ্যই কার্যের পূর্বে ঘটতে হবে। শুধু তা-ই নয়, কারণ হতে গেলে তাকে শর্তহীনও হতে হবে। অর্থাৎ, ভিন্ন কোনো শর্তের প্রভাবমুক্ত হয়ে সবসময় কার্যের পূর্বগামী হতে হবে। বিজ্ঞানের মতে, কারণ একটি একক ঘটনা নয়। কারণ হচ্ছে সদর্থক ও নঞর্থক শর্তসমূহের একটি সমষ্টি। কোনো একটি কার্য উৎপাদনের জন্য যতগুলো শর্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে, তাদের সবগুলোর সমষ্টিকেই কারণ বলে। যুক্তিবিদ বেইন বলেন, “বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত বা অবস্থা কার্য উৎপাদনের পক্ষে প্রয়োজন, তাদের সম্পূর্ণ সমষ্টিকেই কারণ বলে গণ্য করা হয়।" যেমন : নদীতে নৌকা ডুবে একটি ছেলের সলিল সমাধি হলো বা পটল তুলল। এখানে ছেলেটির পটল তোলার ব্যাপারে অনেকগুলো শর্তের সন্ধান পাওয়া যায়। এগুলো হলো নদীর প্রখর স্রোত, দমকা বাতাস, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই, মাঝির অদক্ষতা ইত্যাদি শর্তের উপস্থিতির পাশাপাশি মাঝির অভিজ্ঞতা, ছেলেটির সাঁতার জ্ঞান, উদ্ধারকারী নৌকা ইত্যাদি শর্তের অনুপস্থিতি। এ ক্ষেত্রে ছেলেটির মৃত্যুর কারণ হচ্ছে সদর্থক বা নঞর্থক শর্তসমূহের সমষ্টি।
'পরিশেষ পদ্ধতি' কথাটির অর্থ হচ্ছে বিয়োগফল বা অবশিষ্ট অংশ।
জে. এস. মিল প্রবর্তিত পরীক্ষণমূলক পদ্ধতির অন্যতম একটি হলো ব্যতিরেকী পদ্ধতি, যা অন্বয়ী পদ্ধতির সমস্যাগুলো দূর করার মানসে অবতারণা করা হয়। ব্যতিরেকী পদ্ধতির অর্থ হচ্ছে পার্থক্যের পদ্ধতি, যা মাত্র দুটি উদাহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এদের একটিতে আলোচ্য ঘটনা এবং তার সাথে অপর একটি অবস্থা উপস্থিত থাকে। দৃষ্টান্ত দুটির মধ্যে অনেক দিক দিয়েই মিল থাকে, শুধু একটি বিষয়ে পার্থক্য থাকে, তা হলো আলোচ্য ঘটনা এবং একটি অবস্থার উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি। এদিকে লক্ষ রেখে উভয়ের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!