বাংলাদেশের ছোটগল্পের ধারায় অত্যন্ত শক্তিমান লেখকরূপে স্বীকৃত হাসান আজিজুল হক। বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনার আলোকে তিনি সমাজ জীবনের অবক্ষয়, সাম্প্রদায়িকতা, নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনের প্রকৃত রূপ, হতাশা ও দারিদ্র্যের নিখুঁত চিত্র নির্লিপ্ত শিল্পীর মত অঙ্কন করেছেন।
হাসান আজিজুল হক ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
রাজশাহী কলেজে পড়াকালীন ভাঁজপত্র 'চারপাতা'য় আমের মাহাত্ম্যবিষয়ক তাঁর প্রথম লেখা ছাপা হয়।
তিনি 'অসীমান্তিক' (১৯৯৮) নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
তিনি 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার' (১৯৭০), 'আদমজী সাহিত্য পুরস্কার' (১৯৬৭), 'একুশে পদক' (১৯৯৯), 'আনন্দ পুরস্কার' (২০০৭) পান।
তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন এবং ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'বঙ্গবন্ধু চেয়ার' পদের জন্য মনোনীত হন।
তিনি ১৫ নভেম্বর, ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলো:
‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ' (১৯৬৭): দেশ বিভাগের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তিচরিত্রের নৈতিক স্খলন, সাম্প্রদায়িকতা এবং সংশ্লিষ্ট কারণে সৃষ্ট চরম হতাশা ও দারিদ্র্য, উত্তেজক পরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত হয় ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ' গল্পগ্রন্থ ।
‘নামহীন গোত্রহীন' (১৯৭৫): এ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক।
‘আমরা অপেক্ষা করছি' (১৯৮৮): এ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলোতে নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনের চিত্র, দারিদ্র্যের কষাঘাতে বিবর্ণ নর- নারীর প্রেমহীনতা, অসুস্থ রাজনীতির কালো থাবায় সন্তানহারা পিতার শোক ইত্যাদি বিষয় ফুটে উঠেছে।
‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য' (১৯৬৪), ‘জীবন ঘষে আগুন’ (১৯৭৩), ‘পাতালে হাসপাতালে' (১৯৮১), ‘রাঢ়বঙ্গের গল্প’ (১৯৯১), ‘রোদে যাবো' (১৯৯৫), ‘মা মেয়ের সংসার’ (১৯৯৭), ‘বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প' (২০০৭)।
তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসগুলোঃ
‘ আগুনপাখি ' (২০০৬): হাসান আজিজুল হকের পৈতৃক নিবাস বর্ধমানের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ওই এলাকার মানুষের সংগ্রামী জীবন এবং বিভেদকামী রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার যথাযথ রূপায়ণ 'আগুনপাখি' উপন্যাস। চরিত্র: মেঝ বউ।
‘সাবিত্রী উপাখ্যান' (২০১৩): ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন, ভারতের প্রথম নির্বাচন, ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি গঠন, জমিদারি ও মহাজনি প্রথা, ব্রাহ্মণধর্মীয় এক নারী ধর্ষণ নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত এ উপন্যাস।
'ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মতো।' – এই উক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ছোটগল্প 'একরাত্রি' থেকে নেওয়া হয়েছে। গল্পে রামনাথ তার স্ত্রী সুরবালার প্রতি এক ধরনের করুণা মিশ্রিত কর্তব্যবোধ অনুভব করেন, কিন্তু তাদের দাম্পত্যে ভালোবাসার সজীবতা ও আবেগ অনুপস্থিত। এই উপমাটি সেই অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করে।
এখানে 'বাসি ফুল' বলতে দাম্পত্য জীবনের সেই অবস্থাটিকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে ভালোবাসার সজীবতা, সতেজতা ও প্রাণবন্ততা হারিয়ে গেছে। ফুল যেমন বাসি হয়ে গেলে তার সৌন্দর্য ও সৌরভ হারায়, তেমনি রামনাথের মনে সুরবালার প্রতি কোনো তীব্র প্রেম বা আকর্ষণ অবশিষ্ট নেই। 'ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা' উপমাটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, তাদের সম্পর্কটি কেবল সামাজিক রীতি বা কর্তব্যবোধের কারণে টিকে আছে, কৃত্রিম উপায়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এটি ভালোবাসার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ নয়, বরং এক ধরনের প্রচেষ্টা মাত্র।
এই উক্তিটির মাধ্যমে রামনাথের অন্তরের দোটানা ও সুরবালার প্রতি তার অনুভূতি অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তিনি সুরবালাকে ভালোবাসেন না, কিন্তু তাকে অবহেলাও করতে পারেন না। তাদের সম্পর্কটি দায়বদ্ধতা ও করুণার উপর দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রেম ও আবেগ অনুপস্থিত। এই বিশ্লেষণ গল্পে রামনাথের মানসিক জটিলতা এবং তাদের দাম্পত্য জীবনের বিষাদময় চিত্রকে পাঠকের সামনে স্পষ্ট করে তোলে।