জীবনানন্দ দাশের নিসর্গবিষয়ক কবিতা মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামী জনতাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
একটি সুন্দর মানবসমাজ নির্মাণে যাঁরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়েও অক্লান্তভাবে চেষ্টা করে যান, তাঁদের বোঝাতে কবি 'ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিক' শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন।
কবি জানেন পৃথিবীর ক্রমমুক্তির মাধ্যমে একটি ভালো মানবসমাজ নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। তার জন্য সামষ্টিক মানুষের সুচেতনার উজ্জীবন ও দীর্ঘ সময়ব্যাপী সাধনার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু কবি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শারীরিক ও মানসিকভাবে
বিধ্বস্ত হলেও নিরলস শ্রম ও মেধা দিয়ে যাবেন একটি মানবিক সমাজ নির্মাণে। কবি শ্রদ্ধার সঙ্গে এমন মানুষগুলোকে বিশেষিত করেছেন 'ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিক' শব্দবন্ধে।
উদ্দীপকটি 'সুচেতনা' কবিতায় উল্লিখিত অসুস্থ পৃথিবীর ধ্বংস ও ভাঙনের দিককে নির্দেশ করেছে।
'সুচেতনা' কবিতায় চূড়ান্ত পরিণামে আশাবাদী হলেও কবি সমকালীন সভ্যতার সংকটকে চিহ্নিত করেছেন সাবলীলভাবে। কবির মনে হয়েছে রণ-রক্ত-সফলতা নিয়ে ব্যস্ত যে নাগরিক ও আধুনিক সমাজ সেখানে সুচেতনা এখনো দূরবর্তী দ্বীপের মতোই দুর্লভ। সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি ঘটছে বহু যুদ্ধ-রক্তপাত-প্রাণহানি। প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও পৃথিবীতে স্বজন হননের মতো ঘটনা ঘটছে। এমন ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি বিবেচনা কবির অনুভব, 'পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন'।
উদ্দীপকের কবিতাংশে কবি 'সুচেতনা' কবিতার মতো সমকালীন সংকটকে উপস্থাপন করেছেন। উদ্দীপকের প্রথম চরণে কবি মানুষের সভ্যতার মর্মে বা চেতনায় ক্লান্তি অনুভব করেছেন। দ্বিতীয় চরণে সভ্যতা যেসব বড়ো বড়ো নগরী সৃষ্টি করেছে, কবি তার মাঝে অনুভব করেছেন বুকভরা ব্যথা। উদ্দীপকে বর্ণিত সভ্যতা ও শহরের এমন ক্লান্তি ও ব্যথা নিঃসন্দেহে বিপর্যন্ত পৃথিবীর তীব্র সংকটের প্রতিচ্ছবি, যাate V 'সুচেতনা' কবিতার অসুস্থ পৃথিবীর ধ্বংস ও ভাঙনের দিককে নির্দেশ করে।
উদ্দীপক ও 'সুচেতনা' কবিতা উভয়ক্ষেত্রেই সমকালীন সমাজ-সংকট প্রত্যক্ষ করে কবিহৃদয়ের রক্তক্ষরণের পরিচয় পাওয়া যায়।
'সুচেতনা' কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ শিল্পঋদ্ধ ভাষায় সভ্যতার সমকালীন সংকটকে প্রকাশ করেছেন। সভ্যতার ধ্বংসোম্মুখ আচরণ, মারণপ্রবণতা, অসার অর্থলিপ্সার গ্লানি কবিকে বিমূঢ় করে দিয়েছে বারবার। কবির চোখে বর্তমানে সুচেতনা যেন অবস্থান নিয়েছে দূরতর দ্বীপের নির্জনতায়। কবি প্রত্যক্ষ করেছেন, প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও পৃথিবীতে স্বজন হননের, মতো ঘটনা ঘটছে। ফলে সমকালীন জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ কবির অনুভব, 'পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন।'
'সুচেতনা' কবিতার মতো উদ্দীপকে বর্ণিত কবিতাংশের কবিও জীবনানন্দ দাশ। 'মিতভাষণ' কবিতার এই অংশটুকুতে আছে কবির অসামান্য শিল্পবোধের পরিচয়। উদ্দীপকের প্রথম চরণে কবি সমকালীন টানাপোড়েনে পিষ্ট মানুষের এবং সভ্যতার মর্মের ক্লান্তির কথা শোনান আমাদের। আর দ্বিতীয় চরণে মানবসভ্যতার অসামান্য সৃষ্টি নগরের বুকে যে ব্যথার দ্যোতনা সৃষ্টি হয়েছে তা কয়েকটি শব্দের সুনিপুণ ব্যবহারে পাঠককে জানিয়ে দেন। আলোচ্য কবিতায়ও একইভাবে সভ্যতার এমন সংকটাপন্ন দশার চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে।
উদ্দীপক ও 'সুচেতনা' কবিতা সম্পর্কিত উপর্যুক্ত আলোচনায় আমরা দেখলাম, উভয়ক্ষেত্রেই কবি জীবনানন্দ দাশ সমকালীন সমাজ, সভ্যতা, ও মানুষের যন্ত্রণার কথা বলেছেন। মানুষ সেখানে সফলতা-বিফলতার অর্থহীন টানাপোড়েনে দগ্ধ। মানুষের জীবনযন্ত্রণা সভ্যতা ও নগরীকেও ক্লিষ্ট করে তুলেছে। আর এসব বর্ণনায় কবি যে শিল্পঋদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তা অসামান্য। তাই 'সুচেতনা' কবিতা ও উদ্দীপকের আলোকে বলা যায়, 'কবিতায় সমকালীন জীবনযন্ত্রণার উন্মোচনে জীবনানন্দ দাশ সিদ্ধহস্ত।'- মন্তব্যটি যথার্থ।
Related Question
View All'সুচেতনা' কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ন করা হয়েছে।
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন'- উক্তিটিতে কবির সমসাময়িক পৃথিবীতে বিরাজমান ধ্বংসোম্মুখ অবস্থার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে।
মানবপ্রেমী কবি তাঁর সমকালীন পৃথিবীতে মানুষে মানুষে বিরাজমান অসহিষ্ণুতার ভয়ংকর রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন। অগণিত প্রাণহানি, রক্তপাতের ঘটনা তাঁকে মর্মাহত করেছে। এই ধ্বংসাত্মক রূপকে তিনি পৃথিবীর 'গভীর গভীরতর অসুখ' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; যার পরিসমাপ্তিই কবির একমাত্র প্রত্যাশা।
উদ্দীপকটিতে 'সুচেতনা' কবিতায় বর্ণিত পৃথিবীতে বিদ্যমান অশুভ চেতনার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
'সুচেতনা' কবিতাটিতে কবি অশুভ চেতনার স্থলে শুভ চেতনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। কবি প্রত্যক্ষ করেছেন পৃথিবীতে অন্ধকার তথা অশুভ শক্তির ভয়ংকর বিস্তার। স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষ লিপ্ত, ভালোবাসার পরিণামে পৌছাতে স্বীকার করতে হয় বহু আত্মত্যাগ। পৃথিবীব্যাপ্ত এ গভীর অসুখ বা বিপর্যয় থেকে মানুষের মুক্তি প্রয়োজন। আর একমাত্র শুভচেতনার আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমেই তা সম্ভব।
উদ্দীপকের কবিতাংশে পৃথিবীব্যাপী অশুভ শক্তির প্রতাপ পরিলক্ষিত হয়। সমাজের সর্বস্তরে অযোগ্য দুশ্চরিত্র লোকেরাই সর্বেসর্বা। পক্ষান্তরে জ্ঞানী-গুণীরা অবহেলিত। পৃথিবীর বৈষম্যময় সমাজব্যবস্থাই মূলত এর জন্য দায়ী। 'সুচেতনা' কবিতার বিষয়বস্তুতেও আমরা পৃথিবীতে এমন অশুভ শক্তির বিস্তার লক্ষ করি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, উদ্দীপকটিতে আলোচ্য কবিতায় বর্ণিত পৃথিবীতে বিদ্যমান অশুভ চেতনার দিকটিই প্রতিফলিত হয়েছে
উদ্দীপকে কেবল পৃথিবীব্যাপী অশুভ শক্তির বিস্তারের বিষয়টি উঠে এলেও 'সুচেতনা' কবিতার আশাবাদের দিকটি উন্মোচিত হয়নি।
'সুচেতনা' কবিতাটিতে কবি তাঁর প্রার্থিত, আরাধ্য এক চেতনানিহিত বিশ্বাসকে শিল্পিত করেছেন। যে চেতনা পৃথিবীতে বিরাজিত সকল অন্যায়, অনিয়ম, যুদ্ধ, মৃত্যুসহ যাবতীয় গভীরতর ব্যাধিকে অতিক্রম করে সুস্থ ইহলৌকিক পৃথিবীর মানুষকে জীবন্ময় করে রাখবে। কবির মতে, জীবন্মুক্তির এই চেতনাগত সত্যই পৃথিবীতে ক্রমমুক্তির আলোকে প্রজ্বালিত রাখবে, মানবসমাজের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করবে। ইতিবাচক এ আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমেই সকল অশুভ শক্তি থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
উদ্দীপকে, পৃথিবীতে এক অদ্ভুত আঁধারের বিস্তার দেখানো হয়েছে। যে আঁধারে অযোগ্যরাই যোগ্যতর হিসেবে মর্যাদা লাভ করে আর যোগ্য ব্যক্তিরা হয় অবমূল্যায়িত। পৃথিবী যেন আজ অযোগ্য মানুষদের পরামর্শ ও নেতৃত্বেই চলছে। যোগ্য, জ্ঞানী, মহৎ মানুষদের মর্যাদা আজ নেই। উদ্দীপকের মতো সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি 'সুচেতনা' কবিতায়ও বিদ্যমান। তবে কবিতায় এ সংকট উত্তরণে মুক্তির পথের দিশারও অনুসন্ধান করা হয়েছে।
উদ্দীপক ও 'সুচেতনা' কবিতার বিষয়বস্তু পর্যালোচনা শেষে বলা যায়, উদ্দীপকে কেবল পৃথিবীতে বিরাজমান অশুভ শক্তির প্রভাবের দিকটি প্রকাশ পেয়েছে, যা 'সুচেতনা' কবিতার একটি মাত্র দিক। 'সুচেতনা' কবিতায় এ বিষয়টি ছাড়া আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে। অশুভ শক্তির স্থলে শুভশক্তির বা শুভ চেতনার বিজয় কবিতাটিতে তাৎপর্যপূর্ণ রূপ লাভ করেছে। ইতিবাচক এ চেতনার মাধ্যমেই সকল বিপর্যয় থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে- এমন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই বলা যায়, "উদ্দীপকটিতে 'সুচেতনা' কবিতার সমগ্র দিক উন্মোচিত হয়নি।" উক্তিটি যথার্থ।
কবি জীবনানন্দ দাশের মায়ের নাম কুসুমকুমারী দাশ
কবির সুচেতনা মূলত শুভচেতনা বা শুভবোধের স্মারক।
সুচেতনা মূলত কবির এক ধরনের চেতনাজাত বিশ্বাস, যা সমস্ত নেতিবাচকতা ধ্বংস করে এবং ইতিবাচক চিন্তার বিকাশ ঘটায়। কবির দৃষ্টিতে এটি তাঁর চেতনাগত সত্য। সংগত কারণেই পৃথিবীর নানা অভিঘাতে বা রক্তপাতের ঘটনায় এর কোনো পরিবর্তন হয় না। এ সত্যই শেষ পর্যন্ত আমাদের এক আলোয় ভরা, সুখী ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়। তবে এই চেতনা দূরবর্তী এক দ্বীপের মতোই অধরা। এর বিস্তার সর্বত্র হলেও সব জায়গায় এটি উপস্থিত নয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!