আরভিং এম কপির মতে, সংজ্ঞার উদ্দেশ্য পাঁচটি।
শব্দের অর্থ অনুধাবনের জন্যই প্রয়োজন হয় শব্দের সঞ্চয় বৃদ্ধি করার। সে ক্ষেত্রে একমাত্র যৌক্তিক সংজ্ঞায়নের মাধ্যমেই শব্দের সঞ্চয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। বস্তুত আমরা যখন কোনো শব্দ বা পদকে সংজ্ঞায়িত করি, তখন ঐ শব্দ বা পদটির অর্থ আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়, যার ফলে নতুন নতুন শব্দের সাথে আমাদের উত্তরোত্তর পরিচিতি ঘটে। আর এভাবেই সংজ্ঞা আমাদের শব্দের সঞ্চয় বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে থাকে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত মাহিতের পঠিত সংজ্ঞাটিতে 'স্পষ্ট ও সহজ ভাষার ব্যবহার' নিয়মটি লঙ্ঘিত হয়েছে। নিচে এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হলো-
A definition should be clearer than the term defined, and should not, therefore, be expressed in obscure, ambiguous of figurative language. অর্থাৎ কোনো পদের সংজ্ঞাদানের ক্ষেত্রে সেই পদের চেয়ে স্পষ্ট ও সহজ ভাষা ব্যবহার করতে হবে। সংজ্ঞাকে কোনো অবস্থায় দুর্বোধ্য বা রূপক ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সংজ্ঞার উদ্দেশ্য হচ্ছে পদের অর্থকে সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য করা। কিন্তু সংজ্ঞায় দুর্বোধ্য বা রূপক ভাষা ব্যবহার করলে সংজ্ঞার এ উদ্দেশ্যটি যথাযথভাবে অর্জিত হয় না। কারণ, এতে পদটি সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য হওয়ার পরিবর্তে আরও অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। কাজেই কোনো পদকে সংজ্ঞার মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হলে পদটিকে যথাসম্ভব স্পষ্ট ও সহজভাষা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করতে হবে।
উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয়, মাহিতের পঠিত সংজ্ঞাটিতে 'স্পষ্ট ও সহজ ভাষার ব্যবহার' নিয়মটি লঙ্ঘিত হয়েছে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত মাহিতের পঠিত সংজ্ঞাটিতে 'স্পষ্ট ও সহজ ভাষার ব্যবহার' নিয়মটি লঙ্ঘিত হয়েছে। এ নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য দুই ধরনের অনুপপত্তির উদ্ভদ্ধ ঘটে। নিচে তা বিশ্লেষণ করা হলো-
কোনো পদের সংজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করা হয়, তাহলে সংজ্ঞাটি জটিল আকার ধারণ করে দুর্বোধ্য সংজ্ঞা অনুপপত্তির উদ্ভব ঘটায়; যেমন: "বটবৃক্ষ হচ্ছে জটাজুট লাঞ্ছিত সবিতাতপ নিরোধক মহাস্থবির পাদপ।" এ ক্ষেত্রে বটবৃক্ষের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতে বটবৃক্ষের অর্থ সুস্পষ্ট হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। কারণ, এ ক্ষেত্রে বটবৃক্ষের সংজ্ঞায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই পৃথকভাবে সংজ্ঞার দাবিদার। উল্লেখ্য, দুর্বোধ্য বলতে কেবল জটিল ভাষাকে বোঝায়, তা নয়; বরং যে ভাষা সব মানুষের কাছে বোধগম্য নয়, এমন ভাষাকেও দুর্বোধ্য বলা যায়। যেমন: তাপকে সংজ্ঞায়িত করে বলা হয়, "তাপ হচ্ছে একধরনের বর্ণনাতীত লঘু জলীয় পদার্থ", তাহলে সংজ্ঞাটি একজন বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রের কাছে যতটা সহজবোধ্য হবে, একজন মানবিক বিভাগের ছাত্রের কাছে তা ততটা বোধগম্য নাও হতে পারে। অথচ সংজ্ঞাটিতে ব্যবহৃত ভাষা খুব একটা জটিল নয়। আবার ইংরেজি ভাষায় অজ্ঞ এমন কোনো ব্যক্তির সামনে যদি সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয় "Socialism is mean democracy extended to the economic field," তাহলে তার কাছে সংজ্ঞাটি দুর্বোধ্য মনে হবে। যদিও ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে অবগত এমন ব্যক্তির কাছে সংজ্ঞাটিকে একটি সহজ-সরল বাক্য বলেই বোধ হবে। মূলকথা, কোনো পদকে স্পষ্ট ও সহজভাবে বোঝাতে হলে এতে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যা জটিল নয় এবং সবার পক্ষে বোধগম্য, অন্যথায় তা দুর্বোধ্য আকার ধারণ করে সংজ্ঞায় ভ্রান্তির উদ্ভব ঘটাবে।
একইভাবে কোনো পদের সংজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি রূপক বা আলংকারিক ভাষা ব্যবহার করা হয়, তাহলে পদটি ভিন্ন অর্থ ধারণ করে। ফলে সংজ্ঞাটিতে রূপক সংজ্ঞা অনুপপত্তির সৃষ্টি হয়। যেমন: "শিশুরা হচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড"- এ সংজ্ঞায় শিশু কোন ধরনের তা ব্যক্ত হয়নি, বরং এ ক্ষেত্রে যা ব্যক্ত হয়েছে তাতে শিশুদের স্বরূপ মানুষের মনে একটি ভিন্ন আকার ধারণ করতে পারে। ফলে এতে সংজ্ঞেয় পদের প্রকৃত অর্থ অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। কাজেই সংজ্ঞেয় পদকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হলে এর সংজ্ঞায় সংজ্ঞার্থে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যা পদটির অন্তর্নিহিতরূপকে প্রকাশ করে, যা মূলত জাত্যর্থের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। অন্যথায় সংজ্ঞাটি রূপক ভাষার অন্তরালে থেকে ভ্রান্তির সৃষ্টি করবে।
Related Question
View Allযেকোনো পদের অর্থকে সুনির্দিষ্ট ও যথার্থভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে বিষয়বস্তু সম্পর্কিত ধারণাকে নির্ভুল ও সুস্পষ্ট করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে সংজ্ঞা।
যৌক্তিক সংজ্ঞার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হলো পদের তাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে, শব্দ বা পদকে তাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক দিক থেকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। কোনো শব্দ বা পদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে ঐ শব্দ বা পদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও অর্থপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়, যাকে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়ন বলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন পদার্থবিজ্ঞানীরা গতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, গতি হচ্ছে ভর এবং ত্বরণের ফল, তখন সংজ্ঞাটি হয়তো শব্দের সঞ্চয় বৃদ্ধি করে না বা কোনো শব্দের দ্ব্যর্থকতা অপসারণ করে না। তবে এ সংজ্ঞার মাধ্যমে গতি শব্দটি নিউটনের বলবিদ্যার প্রকাশিত রূপ হিসেবে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উদ্দীপকে সংজ্ঞার নিয়ম কানুন বলতে সংজ্ঞার যে নিয়মাবলিকে বোঝানো হয়েছে তা নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো-
প্রথম নিয়ম : কোন পদের সংজ্ঞা দিতে হলে সেই পদটির সম্পূর্ণ জাত্যর্থকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, জাত্যর্থের অতিরিক্ত কিংবা জাত্যর্থের অংশমাত্র উল্লেখ করা চলবেনা। অর্থাৎ, এ নিয়ম অনুসারে কোনো পদের সংজ্ঞা দেওয়ার সময় শুধু নিকট জাতি ও বিভেদক লক্ষণের উল্লেখ করতে হবে, এর বেশিও নয় কমও নয়।
দ্বিতীয় নিয়ম: যে পদের সংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে সে পদের ব্যক্তর্থ সংজ্ঞা বর্ণিত পদের ব্যক্তর্থের সমান হতে হবে, কম বা বেশি হলে চলবেনা। যেমন: মানুষ হয় বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণী; এখানে মানুষ। এর ব্যক্তর্থ এবং বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণীর ব্যক্তর্থ এক ও অভিন্ন।
তৃতীয় নিয়ম: যে পদের সংজ্ঞা দেওয়া হবে সংজ্ঞায় সেই একই পদ বা সেই পদের সমার্থক কোনো শব্দের উল্লেখ করা যাবে না। যেমন: 'বিচারক' হলেন সেই ব্যক্তি যিনি বিচার করেন, এক্ষেত্রে বিচারক। এর সমার্থক শব্দ 'যিনি বিচার করেন।'
চতুর্থ নিয়ম: যে পদের সংজ্ঞা দেওয়া হবে সংজ্ঞাটি সেই অপেক্ষা স্পষ্ট ও সহজবোধ্য হতে হবে এবং সংজ্ঞাটি কিছুতেই কোনো রূপকের মাধ্যমে বা দুর্বোধ্য ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ পদের অর্থকে সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল করে তুলতে হবে যেক্ষেত্রে রূপক বা অলংকারিক শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ।
পঞ্চম নিয়ম: সর্বক্ষেত্রে পদের সংজ্ঞা সদখৃক বা ইতিবাচক হতে হবে কোনাক্রমেই নঞর্থক বা নেতিবাচক হতে পারবেনা। কারণ নৈতিকবাচক সংজ্ঞায় পদটি কী নর- তাই শুধু বলা হয়।
উপর্যুক্ত নিয়ম কানুনগুলো মেনে সংজ্ঞা দিলে তা হবে সুস্পষ্ট, সহজ এবং যথার্থ। তাই সংজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো আমাদের অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
যৌক্তিক সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে কতিপয় নিয়ম পালন করতে হয়, যেগুলোর যথার্থ ও সঠিক প্রয়োগে সংজ্ঞা শুদ্ধ হয়। আবার এই নিয়মগুলোর অপপ্রয়োগ বা লঙ্ঘনে সংজ্ঞা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে বিভিন্ন অনুপপত্তি সংঘটিত করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো পদের সংজ্ঞায় জাত্যর্থের অতিরিক্ত কোনো গুণের উল্লেখ করা হলে এবং এই অতিরিক্ত গুণটি যদি সংশ্লিষ্ট পদের অবিচ্ছেদ্য অবান্তর লক্ষণ হয়, তাহলে প্রদত্ত সংজ্ঞাটিতে আপতিক বা অবান্তর লক্ষণজনিত সংজ্ঞানুপপত্তি ঘটবে; যেমন: 'মানুষ হয় বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন দ্বিপদ জীব।' এখানে 'দ্বিপদ' গুণটি হচ্ছে মানুষ পদের অবিচ্ছেদ্য অবান্তর লক্ষণ, যা মানুষের সংজ্ঞায় অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হওয়ায় সংজ্ঞাটিতে অবান্তর লক্ষণজনিত সংজ্ঞানুপপত্তি ঘটেছে। বস্তুত 'অবিচ্ছেদ্য' হচ্ছে এমন বিষয়, যা একটি শ্রেণির সকলের মধ্যেই সমানভাবে বিদ্যমান থাকে। আর 'অবান্তর লক্ষণ' হচ্ছে এমন গুণ, যা সেই শ্রেণির জন্য অপরিহার্য নয়। এরূপ গুণ সংজ্ঞায় ব্যবহৃত হলে সংজ্ঞা ভ্রান্ত হতে বাধ্য; যেমন: উপরের দৃষ্টান্ত অনুসারে মানুষের জন্য তার দুই পা থাকা অপরিহার্য নয়। কারণ দুই পা না থাকলে মানুষকে মানুষ বলা যাবে না, এমন নয়। অর্থাৎ পা ছাড়াও মানুষ মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারে। কাজেই সংজ্ঞায় দ্বিপদ গুণের সংযুক্তি একটি অবান্তর বিষয়মাত্র। অতএব বলা যায়, সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুনগুলো যেমন প্রয়োজন, তেমনি এ নিয়মগুলোর অপপ্রয়োগ এড়িয়ে সংজ্ঞাকে অনুপপত্তির আশঙ্কামুক্ত করাও অপরিহার্য। তা না হলে সংজ্ঞা ভ্রান্ত হয়, যা থেকে উদ্ভদ্ধ ঘটে অনুপপত্তির।
সংজ্ঞার উপাদান দুটি- সংজ্ঞেয় ও সংজ্ঞার্থ।
কোনো পদের সংজ্ঞায় স্বাধীনভাবে একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করে ইচ্ছানুযায়ী ঐ শব্দের অর্থ প্রদান করাকে আরোপক সংজ্ঞা বলে। এরূপ সংজ্ঞায় যেকোনো ব্যক্তি তার পছন্দ অনুযায়ী নতুন শব্দ আরোপ করে স্বাধীনভাবে ঐ শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে পারেন। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির উদ্দেশ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শব্দের অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে। বস্তুত আরোপক সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সত্যতা বা মিথ্যাত্ব আরোপ করা যায় না। এ জন্য এ ধরনের সংজ্ঞাকে তথ্যমূলক নয়, বরং নির্দেশনী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!