মাটিতে বালি, পলি ও কর্দমকণার আনুপাতিক বা শতকরা হারই হলো মৃত্তিকা বুনট।
জৈব পদার্থ মাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা জীবজন্তুর মৃতদেহ, গাছপালা, লতাপাতা, প্রাণীর মলমূত্র প্রভৃতি পচে তৈরি হয়।
আদর্শ মাটিতে ৫% জৈব পদার্থ থাকে। জৈব পদার্থ মাটিস্থ অণুজীবগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানসমূহ গাছের গ্রহণ উপযোগী হয়। তাছাড়া জৈব পদার্থ মাটির গঠন উন্নত করে, পানি ধারণ ও বায়ু চলাচল ক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এসকল কারণে জৈব পদার্থকে "মাটির প্রাণ” বলা হয়।
উদ্দীপকে মিঃ রিপনের জমির মাটির pH ৪.৫ এর নিচে নেমে যাওয়ায় তীব্র অম্লত্বের সৃষ্টি হয়েছে।
যে মাটিতে H' আয়নের ঘনমাত্রা ১ × ১০-৭ গ্রাম/লিটারের বেশি অর্থাৎ pH এর মান ৭ এর কম থাকে সে মাটিকে অম্লীয় মাটি বলে। মাটিতে নানা কারণে অম্লত্ব সৃষ্টি হতে পারে। যেমন-
i. উৎস বস্তুর বৈশিষ্ট্য: অম্লীয় শিলা থেকে মাটি উৎপন্ন হলে মাটি অম্লীয় হয়। যেমন- গ্রানাইট ও বায়োটাইট জাতীয় অম্লীয় শিলা থেকে উৎপন্ন মাটি অম্লীয় হয়।
ii. অম্লীয় সার প্রয়োগ: মাটিতে দীর্ঘদিন ইউরিয়া, ডিএপি ও অ্যামোনিয়া জাতীয় অম্লীয় সার প্রয়োগ করলে মাটি অম্লীয় হয়।
iii. বৃষ্টিপাত: প্রচুর বৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানির সাথে ক্ষারীয় উপাদান যেমন- ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি মাটির গভীরে চলে যায়। ফলে ক্ষারীয় উপাদানের অনুপস্থিতিতে মাটির উপরের স্তরে অম্লত্বের সৃষ্টি হয়।
iv. খনিজ দ্রব্যের প্রাধান্য: মাটিতে আয়রণ, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি খনিজ দ্রব্য বেশি পরিমাণে থাকলে মাটি অম্লীয় হয়।
V. জৈব পদার্থের বিয়োজন: জৈব পদার্থ পচে মাটিতে অম্লীয় উপাদান হাইড্রোজেন আয়ন উৎপন্ন হয় যা মাটিকে অম্লীয় করে।
vi. অণুজৈবিক কার্যাবলী: মাটিতে বিভিন্ন জীবাণুর শ্বসন প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়ে মাটিস্থ পানির সাথে বিক্রিয়া করে কার্বনিক এসিড তৈরি হয়, যা মাটিকে অম্লীয় করে।
vii. সেচ : সেচের পানিতে অম্লীয় উপাদান বেশি থাকলে মাটি অম্লীয় হয়।
viii. এসিড বৃষ্টি: শিল্প প্রধান এলাকার বায়ুমন্ডলে সালফার ডাই- অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস বেশি থাকে। এসব গ্যাস বৃষ্টির পানির সাথে বিক্রিয়ায় এসিড তৈরি করে যা মাটিতে পড়ে মাটিকে অম্লীয় করে।
পরিশেষে বলা যায়, উল্লিখিত কারণে মাটিতে অম্লত্ব দেখা দিতে পারে। আর অম্লত্ব বেশি হলে তা মাটিতে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে যা ফসলের জন্যে ক্ষতিকর।
উদ্দীপকের কৃষি কর্মকর্তা মি. রিপনের জমির অম্লত্ব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। অম্লীয় মাটি বিভিন্ন উপায়ে সংশোধন করা যায়। যেমন-
i. চুন ব্যবহার: চুন অম্লীয় মাটিতে আয়রন ও অ্যালুমিনিয়ামের দ্রবণীয়তা কমিয়ে ফসফরাসের প্রাপ্যতা বাড়ায়। তাছাড়া মাটিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম যুক্ত হলে তা হাইড্রোজেন আয়নকে প্রতিস্থাপন করে হাইড্রোক্সিল আয়নের পরিমাণ বাড়ায়। ফলে মাটির অম্লত্ব কমে।
ii. জৈব সার ব্যবহার: মাটিতে জৈব সার যেমন- কম্পোস্ট, বায়োফার্টিলাইজার, ট্রাইকোডার্মা কম্পোস্ট, জৈব বালাইনাশক প্রয়োগ করে অম্লত্ব কমানো যায়।
iii. সবুজ সার ব্যবহার: সবুজ সার প্রয়োগ করা হলে তা মাটিতে পচে জৈব সার উৎপন্ন হয়, যা মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম সরবরাহ করে। ফলে মাটির অম্লত্ব হ্রাস পায়।
iv. অণুজীব সার ব্যবহার: অণুজীব সার হিসেবে রাইজোবিয়াম ব্যবহার করেও অম্লত্ব কমানো যায়। রাইজোবিয়াম বাতাসের নাইট্রোজেনকে মাটিতে সংবন্ধন করে। এগুলো মাটির জৈব পদার্থকে সংরক্ষণ করে এবং মাটির বাফার ক্ষমতা বাড়ায়। এই সার ব্যবহারে মাটিতে অম্লত্ব সৃষ্টিকারী সার বিশেষ করে ইউরিয়া প্রদানের প্রয়োজন পড়ে না। এতে মাটির অম্লত্ব হ্রাস পায়।
V. সেচের পানির মান উন্নয়ন: আয়রন ও অ্যালুমিনিয়াম মুক্ত পানি দ্বারা সেচ প্রদান করে মাটির অম্লত্ব রোধ করা যায়।
vi. সুষম সারের ব্যবহার: ফসলের জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে বিভিন্ন জৈব ও অজৈব সারের সমন্বয়ে সুষম সার ব্যবহার করলে অম্লত্ব বাড়ার সম্ভাবনা থাকে না।
vii. অম্লীয় সারের ব্যবহার কমানো: যেসব সার অম্লত্ব সৃষ্টি করে সেসব সারের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প সার ব্যবহার করতে হবে। যেমন- অ্যামোনিয়াম সালফেট সারের পরিবর্তে সোডিয়াম নাইট্রেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
viii. ঝিনুকের গুঁড়া ব্যবহার: ঝিনুকের গুঁড়ায় প্রচুর ক্যালসিয়াম কার্বনেট থাকে যা প্রয়োগে অম্লত্ব হ্রাস পায়।
পরিশেষে বলা যায়, যেহেতু মাটির অম্লমানের ওপর ফসলের ফলন নির্ভর করে। তাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করে মাটি সংশোধন করে ফলন বৃদ্ধি করা যায়।
Related Question
View Allযেসব ফসল সাধারণত বিস্তীর্ণ মাঠে বেড়াবিহীন অবস্থায় সমষ্টিগতভাবে পরিচর্যার মাধ্যমে চাষ এবং প্রক্রিয়াজাত করে খাওয়া হয় সেগুলোকে মাঠ ফসল বলে।
উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও তথ্য নিয়ে মতবিনিময় হয়।
কৃষি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের ফলে কৃষকদের জ্ঞান ও তথ্য আরো সমৃদ্ধ হয়। মতবিনিময়ের ফলে কৃষকদের জ্ঞান এবং কাজের স্পৃহা বাড়ে। এ ছাড়া হঠাৎ সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে সমস্যার প্রতিকার ব্যবস্থা জানা যায়। তাই কৃষিতে উঠোন বৈঠকের প্রয়োজন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত আফসার আলীর জমির মাটি কাদাযুক্ত এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এজন্য বলা যায়, জমির মাটি এঁটেল প্রকৃতির।
নিচে এঁটেল মাটির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা হলো-
i. এঁটেল মাটি ভারী মাটি নামে অভিহিত।
ii. এ মাটিতে কমপক্ষে ৩৫% বা তার বেশি কর্দম বা এঁটেল কণা থাকে।
iii. এ মাটিতে সূক্ষ্ম রন্দ্রের সংখ্যা খুব বেশি, তাই এর পানি ধারণ ক্ষমতা খুব বেশি, কিন্তু নিষ্কাশন ক্ষমতা কম।
iv. এ মাটির বায়ু ও পানি চলাচল ক্ষমতা কম।
V. এঁটেল মাটি আঙুলে ঘষলে ট্যালকম পাউডারের মতো পিচ্ছিল মনে হয়।
vi. এ মাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সংযুক্তি (cohesion) খুব বেশি।
vii. আর্দ্র এঁটেল মাটি আঠালো ও চটচটে হয়, কিন্তু শুষ্ক অবস্থায় খুব শক্ত হয়। ফলে সহজে কর্ষণ করা যায় না।
viii. এ প্রকার মাটির ধনাত্মক আয়ন বিনিময় ক্ষমতা খুব বেশি। উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যাবলী থেকে এঁটেল মাটির প্রকৃতি জানা যায়।
উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানটি হলো বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট যা গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে অবস্থিত।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চ ফলনশীল এবং হাইব্রিড জাতের ধান উদ্ভাবন করে। এছাড়াও মৃত্তিকা, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, চাষাবাদ পদ্ধতি, পোকা-মাকড় ও রোগ দমন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি ও কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করে। এদের উদ্ভাবিত জাতগুলো তুলনামূলকভাবে রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। আবার এসকল জাতের ফলন স্থানীয় জাতের ফলনের তুলনায় অনেক বেশি। উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল, সুগন্ধি ও বিদেশে রপ্তানি উপযোগী জাতও রয়েছে। এসকল জাতসমূহ কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করে তোলার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, রয়েছে প্রদর্শনী প্লট ও মডেল কৃষক। এছাড়াও কৃষি তথ্য সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পুস্তিকা, ম্যানুয়াল, প্রতিবেদন, জার্নাল প্রভৃতি প্রকাশ করে। এ প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের উন্নত প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্য মাঠ দিবসের আয়োজন এবং কৃষি উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এসকল কার্যক্রমের ফলে কৃষকগণ সহজেই কৃষি সংশ্লিষ্ট তথ্য ও জ্ঞান লাভ করতে পারে। ফলে কৃষক মাঠ পর্যায়ে এসব জ্ঞান কাজে লাগিয়ে অল্প খরচে ফসল উৎপাদন করে লাভবান হয়। সর্বোপরি ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উল্লিখিত কার্যক্রমসমূহ পরিচালনা করে।
অভিজ্ঞ 'কৃষক হলো একজন স্থানীয় নেতা ও কৃষকদের পরামর্শদাতা যিনি নিজ উৎসাহে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেন ও নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন।
কোনো মাটিতে হাইড্রোজেন আয়ন (H') ও হাইড্রোক্সিল আয়নের (OH) পরিমাণ সমান থাকলে তাকে নিরপেক্ষ মাটি বলে। নিরপেক্ষ বা প্রশম মাটির অম্লমান ৭। এই ধরনের মাটিতে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য থাকে বিধায় ফসল চাষে সর্বাধিক উপযোগী। নিরপেক্ষ মাটিতে জৈব পদার্থ সহজে বিয়োজিত হয়। নিরপেক্ষ মাটিতে বীজের অঙ্কুরোদগম ভালো হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!