অধ্যাপক ক্লদ লেভি স্ট্রস ফ্রান্সের নৃবিজ্ঞানী ছিলেন।
সমাজবিজ্ঞান ন্যায়-অন্যায় বোধ নিরপেক্ষ অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিপ্রবণ বিজ্ঞান।
বিজ্ঞানের ধর্মই হচ্ছে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। সমাজবিজ্ঞানও যেহেতু বিজ্ঞান, তাই প্রকৃতিগত দিক থেকে শাস্ত্রটি নিরপেক্ষ। এজন্য সমাজবিজ্ঞান বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে সামাজিক সত্যকে তুলে ধরে। ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা বা অন্য কোনো গুণাগুণ বিচার করা সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত নয়। আর তাই সমাজবিজ্ঞান একটি মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান হিসেবে বিবেচিত হয়।
উদ্দীপকের মি. 'ক'-এর মাধ্যমে প্রখ্যাত সমাজ গবেষক অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিমের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। কেননা এ কে নাজমুল করিম বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তিনিই ছাত্রজীবনে 'ভূগোল ও ভগবান' শীর্ষক প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন, যা উদ্দীপকে বর্ণিত মি. ক-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ. কে. নাজমুল করিম ছিলেন একজন মানবতাবাদী সমাজবিজ্ঞানী।
একজন মানবতাবাদী সমাজবিজ্ঞানীকে মানবসমাজ অধ্যয়ন করতে হয়। সমাজবিজ্ঞানী নাজমুল করিমও মানবসমাজ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার রচিত 'Changing Society in India and Pakistan' এ অঞ্চলের সমাজ সম্পর্কিত অন্যতম গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি নিজেই শুধু বাংলাদেশের মানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গবেষণা করেননি, সেইসাথে তার ছাত্রদেরকেও মানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গবেষণা করতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে নাজমুল করিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নয়নপুর গ্রামের সামাজিক পরিবর্তন ও স্তরবিন্যাসের ওপর ইংরেজ শাসনের প্রভাব পর্যালোচনা করেন। তার এ গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাসের রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়েছে, যা পরবর্তীতে সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেছে। তিনি মানবতাবাদী ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠারও সমর্থক ছিলেন। তার রচনার মধ্য দিয়ে তিনি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। নাজমুল করিমের এ ধরনের রচনার মধ্যে 'Social and Economic Background of Islam', 'Political Elite and Agrarian Radicalism in East Pakistan' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। উপরোক্ত আলোচনায় সুস্পষ্ট যে, অধ্যাপক নাজমুল করিম মেধা, মনন এবং কর্মকাণ্ডে ছিলেন একজন মানবতাবাদী সমাজবিজ্ঞানী।
প্রশ্নে উক্ত বিজ্ঞান বলতে সমাজবিজ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের প্রতিষ্ঠায় উদ্দীপকে নির্দেশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ. কে. নাজমুল করিমের অবদান সর্বাধিক।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞানকে একটি আলাদা বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড. এ কে নাজমুল করিমের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৫৪ সালে ফরাসি ইউনেস্কো বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্লদ লেভি স্ট্রস বাংলাদেশ সফরে আসার পর অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিম এবং অধ্যাপক অজিত কুমার সেন তার সাথে দেখা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইউনেস্কোর সহযোগিতা কামনা করেন। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম 'সমাজবিজ্ঞান' নামে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিম সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সমাজবিজ্ঞান বিভাগে যোগদানকারী বাঙালি শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিম সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন। অধ্যাপক নাজমুল করিম হলেন প্রথম বাঙালি যিনি সমাজবিজ্ঞানের ওপর সর্বপ্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন। তার লিখিত 'Changing Society in India, Pakistan, Bangladesh', গ্রন্থটি সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পুস্তক হিসেবে এখনও সবার কাছে সমাদৃত। তার লিখিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'The Dynamics of Bangladesh Society', 'Social Life of the Tiparas', 'সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষণ' ইত্যাদি। বস্তুত অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিম ও তার ছাত্র-ছাত্রীদের ঐকান্তিক সাধনার ফলেই এদেশে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন ও আলোচনা বিস্তৃতি লাভ করেছে। সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে বিভাগীয় যাদুঘর প্রতিষ্ঠা, মনোগ্রাফ লেখার ব্যবস্থা, গ্রামীণ প্রশ্নমালা পূরণের কার্যক্রম সবই তার অবদান।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, বিভিন্ন শিক্ষাবিদ বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে অবদান রাখলেও অধ্যাপক ড. এ. কে. নাজমুল করিম সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছেন।
Related Question
View Allচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাজবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে সমাজের মানুষের অবদান ও অধিকার সম্পর্কে জানা যায়। শুধু সামাজিক অধিকারই নয়, সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কেও সমাজবিজ্ঞান আমাদের জ্ঞান দান করে। আর সে কারণেই বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন জনসংখ্যা সমস্যা, নিরক্ষরতা, অপরাধ ইত্যাদি মোকাবিলায় সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য। বস্তুত সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করা ও সমাধানের দিক নির্দেশনা দেওয়া আমাদের সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এসব কর্তব্য পালনের জন্য অর্থাৎ সমাজ সংস্কারের জন্য সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন।
উদ্দীপকে বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারার পরিচয় ফুটে উঠেছে। কেননা ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান পাঠ শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞান নামে একটি নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উক্ত বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞান চর্চা শুরু হয়। এছাড়া বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের জনক এ কে নাজমুল করিম ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন যা উদ্দীপকে বর্ণিত 'ক' দেশের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
উত্ত দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা একটিমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে- বক্তব্যটি আমি সমর্থন করি না। এর সপক্ষের যুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন শুরু হলেও পরবর্তীতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এটি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৪ সালের ২৪ আগস্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন শুরু হয়। ১৯৭০ সালে এখানে সম্মান কোর্স চালু হয়। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭০ সালে সমাজতত্ত্ব নামক আলাদা একটি বিভাগের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে সিলেটে অবস্থিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়। এর পরবর্তী দশকে ২০০২ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া ২০১২ সাল থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কিছু কলেজে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর স্তরে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হচ্ছে।
সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এ বিষয়ে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও অবদান রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞান মানবতাবাদী বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃত।
পঠন পরিসর ও উদ্দেশ্যের কারণে সমাজবিজ্ঞানকে মানবতাবাদী প্রায়োগিক বিজ্ঞান বলা হয়।
সামাজিক প্রয়োজন ও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার আলোকেই সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা প্রবাহিত হয়। উদাহরণস্বরূপ পরিবারের কথা বলা যায়, পরিবার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- একক পরিবার, যৌথ পরিবার, পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, মাতৃতান্ত্রিক পরিবার ইত্যাদি। সমাজবিজ্ঞান সবধরনের পরিবারকেই স্বীকৃতি দেয়। আর এ কারণেই সমাজবিজ্ঞান মানবতাবাদী প্রায়োগিক বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!