কিয়াস অর্থ পরিমাপ করা, অনুমান করা বা তুলনা করা।
কিয়াসের রুকন চারটি। যথা ১. আছল বা মূল ২. ফরয়া বা শাখা ৩. ইল্লত এবং ৪. হুকুম। মূল বলতে ঐ বিষয়কে বোঝানো হয়, কুরআন, সুন্নাহর 'নস' অথবা ইজমার ভিত্তিতে যার বিধান সাব্যস্ত হয়েছে। শাখা বলা হয় সেই বিষয়কে যার হুকুম সম্পর্কে নস বিদ্যমান নেই এবং যাকে আছলের হুকুমের সাথে সম্পর্কিত করে একই হুকুম প্রদানের প্রয়াস চালানো হয়। ইল্লত হলো এমন নির্ধারিত প্রকাশ্য বৈশিষ্ট্য, যার ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আর হুকুম হলো শরিয়তের সেই হুকুম, যা আছল বা মূল সম্বন্ধে কুরআন ও হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে।
ইমাম সাহেব শরিয়তের চতুর্থ উৎস কিয়াসকে ভিত্তি করে ইয়াবাকে হারাম বলেছেন। কিয়াস অর্থ পরিমাপ করা, অনুমান করা বা তুলনা করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় বলা যায়, মূল আইন যে যুক্তি বা ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সে যুক্তির আলোকে উদ্ভুত নতুন সমস্যা সমাধানের আল্লাহ নির্দেশিত পদ্ধতিই কিয়াস। উদ্দীপকে ইমাম সাহেবের বক্তব্যে এই পদ্ধতিরই প্রতিফলন ঘটেছে।
ইমাম সাহেবের বক্তব্য অনুসারে মাদকাসক্ত মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না, মদ্যপানকারীর মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে এবং শরীরের নানা ক্ষতি হয়। এসব দিক তুলে ধরে ইয়াবাকে এর সাথে তুলনা করে তিনি রাসুল (স) এর একটি হাদিস উল্লেখ করেন, যার অর্থ প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্যই মদ; আর যাবতীয় মদ হারাম। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো ইয়াবা হারাম কি না সে বিষয়ে কুরআন হাদিসে সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই। কিন্তু নেশার উদ্রেক করায় ইয়াবা মদের সাথে তুলনীয়। মদ যেমন মাদকতার জন্য ক্ষতিকর, তেমনি ইয়াবাও একই কারণে ক্ষতিকর। এ কারণেই ইমাম সাহেব আলোচ্য উদ্দীপকের মদের সাথে তুলনা করে কিয়াসের ভিত্তিতে ইয়াবাকে হারাম বলেছেন। আর এভাবে শরিয়তের মূল বিধানের সাথে তুলনা করে কোনো নবোদ্ভাবিত সমস্যার সমাধানই কিয়াস। তাই বলা যায়, ইমাম সাহেব শরিয়তের বিধান মেনেই ইয়াবা সম্পর্কে যাথার্থ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন ।
ইমাম সাহেব মদের মাদকতার সাথে ইয়াবার নেশাকে তুলনা। করেছেন। যাবতীয় নেশাজাতীয় দ্রব্যের একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর সে বৈশিষ্ট্য হলো নেশাজাতীয় দ্রব্য মাদকতা সৃষ্টি করে। নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের ফলে মাদকতার কারণে মস্তিষ্কের বিকৃতিসহ নানা ধরনের অস্বাভাবিকতাও সৃষ্টি হয়। ইয়াবার ক্ষেত্রেও এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
ইমাম সাহেব যে হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন সেটিতে মদকে হারাম বলা হয়েছে। কুরআন মাজিদেও মদ, সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে। সুরা মায়েদার ৯০নং আয়াতে বলা হয়েছে, 'হে ইমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারক তীর শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাক।' ইমাম সাহেব কুরআন-হাদিসের এই নির্দেশনাগুলো কিয়াসের আছল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এখন মদের সাথে তুলনা করে তিনি ইয়াবা সম্পর্কিত বিধান অনুসন্ধান করেছেন। অর্থাৎ ইয়াবা হচ্ছে ফরয়া এক্ষেত্রে কিয়াসের ইল্লত হলো মদ ও ইয়াবার অভিন্ন নেশা সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্য। সেহেতু মদ ও ইয়াবা দুটি বস্তুই নেশার উদ্রেক করে এবং এগুলো নেশা হিসেবে গ্রহণ করায় মস্তিস্ক বিকৃতি ও শরীরে ক্ষতি হয়, তাই ইমাম সাহেব ইয়াবাকে মদের মতোই হারাম বলেছেন। এক্ষেত্রে তার তুলনার পদ্ধতি শরিয়তসম্মত।
ওপরের আলোচনা থেকে বলা যায় কিয়াসের রুকন মেনেই ইমাম সাহেব মদের সাথে ইয়াবাকে তুলনা করেছেন।
Related Question
View Allযার উপর কিয়াস করা হয়, তাকে আছল বলে।
কিয়াস ইসলামি শরিয়তের চতুর্থ উৎস হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত বলে এটি ছাড়া ইসলামকে সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা বলা যায় না। কিয়াস ব্যতীত ইসলাম একটি গতিহীন ও সংকীর্ণ জীবনাদর্শে পরিণত হয়। ফলে সব দেশের ও সব কালের দাবি মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিয়াসই ইসলামকে সর্বকালীন ও সর্বজনীন জীবনাদর্শে পরিণত করে। এ কারণেই কিয়াসকে ইসলামি শরিয়তের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি ইসলামকে পূর্ণতা দান করেছে।
১নং প্রেক্ষাপটে রাকিবের পিতার উপদেশে ইসলামের দ্বিতীয় উৎস তথা হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। হাদিস অর্থ কথা বা বাণী। ইসলামি পরিভাষায়, হাদিস বলতে মহানবি (স)-এর বাণী, কর্ম ও মৌন সম্মতিকে বোঝায়। হাদিস হলো শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস। এটি আল-কুরআনের মূলনীতিসমূহের বাস্তবরূপ ও ব্যাখ্যা। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা যে জীবনবিধান ও আদর্শ উপস্থাপন করেছেন সাধারণ মানুষের পক্ষে সব সময় তা বোঝা সম্ভব নয়। সেজন্য এথেকে তাদের উপকৃত হওয়া কষ্টকর। হাদিসে কুরআনের বক্তব্যসমূহকে সর্বসাধারণের উপযোগী করে পরিবেশন করা হয়েছে। হাদিসকে তাই কুরআনের ব্যাখ্যা গ্রন্থও বলা হয়। মূলত কুরআন ও হাদিস দুটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থ হলেও একটি অপরটির পরিপূরক। হাদিস ছাড়া যেমন কুরআন বোঝা সম্ভব নয় তেমনি কুরআন ছাড়াও হাদিসের নিজস্ব কোনো মান নেই।
১নং প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, রাকিব ফজর নামাজের পর দৈনিক অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াত করেন। এ প্রেক্ষিতে তার পিতা বলেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের পাশাপাশি এর সম্পূরক শিক্ষা হিসেবে দ্বিতীয় উৎসও রীতিমত অধ্যয়ন করতে হবে। অর্থাৎ তিনি এখানে কুরআনের পাশাপাশি শরিতের দ্বিতীয় উৎস হাদিস অধ্যয়নের কথা বলেছেন। সুতরাং বলা যায়, রাকিবের পিতার উপদেশে হাদিস অধ্যয়নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
২নং প্রেক্ষাপটে জনাব আবিরের কর্মটি হলো কিয়াস। যা কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য। কিয়াস শব্দের অর্থ পরিমাপ, অনুমান বা তুলনা করা। কিয়াস হলো ইসলামি আইন প্রবর্তনের একটি পদ্ধতি। মানুষের গতিশীল জীবনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটে। এ সমস্যাগুলোর সমাধান সরাসরি কুরআন ও হাদিসে পাওয়া না গেলে সাদৃশ্যপূর্ণ বিধান দ্বারা নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করাই হলো কিয়াস।
২নং প্রেক্ষাপটে জনাব আবির কুরআন-হাদিস গবেষণা করে নিজের চিন্তা বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে আধুনিক যুগের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানকল্পে একটি পাণ্ডুলিপি রচনা করেন। এখানে কিয়াসের কথাই বলা হয়েছে। কিয়াস আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স) এর নির্দেশিত ও নির্বাচিত বিষয়। মুসলিম জাতিকে আল্লাহ তায়ালা فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ অথ ঃ 'অতএব, হে দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষেরা, তোমরা চিন্তা ও গবেষণা করো' (সুরা আল হাশর: ২)। আবার কিয়াস রাসুল (স) এর পছন্দনীয় পদ্ধতি। হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা) কে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে প্রেরণ করার সময় কীভাবে বিচার ফয়সালা করবে? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মুয়াজ (রা) কুরআন-হাদিসের পর নিজের ব্যক্তিগত গবেষণার আলোকে বিচার ফয়সালা করার কথা বলেন। তাঁর এ জবাবে রাসুল (স) অত্যন্ত খুশি হন।
পরিশেষে বলা যায় যে, কিয়াসের বিধান কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই আবিরের কাজটি কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য।
সময়কাল এবং ইজমা সংঘটনের প্রকৃতি বিবেচনায় ইজমার স্বতন্ত্র স্তরবিন্যাসই 'মারাতিবুল ইজমা'।
কিয়াস ইসলামি আইনের চতুর্থ উৎস। কুরআন-মাজিদে কিয়াসের স্বীকৃতি রয়েছে। ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে কিয়াস কোনো নতুন সংযোজন নয়। রাসুল (স)- এর যুগে কিয়াসের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে। তিনি নিজে কিয়াস করার জন্য সাহাবি (রা)-দের বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর সাহাবিগণ কিয়াসের স্বাধীন প্রয়োগের মাধ্যমে একে ইসলামি আইনের চতুর্থ উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
অর্থ: হে চক্ষুষ্মাণগণ, তোমরা শিক্ষাগ্রহণ কর (সুরা আল-হাশর: ২)।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!