'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধ মীর আলি। তিনি শারীরিক অবস্থার কারণে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
নীলগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধ মীর আলি। তার বয়স প্রায় সত্তর। তিনি চোখে দেখতে পান না। তার মতে, বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণা রাত-দুপুরে বাইরে যাওয়া। তিনি তার বড়ো ছেলে এবং ছেলের বউয়ের উপর নির্ভরশীল। ছেলের বউ মাঝে মাঝে তার উপর বিরক্তি বোধ করে। তার তখন মনে হয় অনুফা ভালো নয়। আবার মাঝে মাঝে তার জন্য মীর আলির মমতা হয়, যখন সে মীর আলির যত্ন করে। নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব শুরু হলে বৃদ্ধ মীর আলি অসহায় হয়ে পড়েন। তার ছেলে বদিউজ্জামান দোকান থেকে ফিরে আসে না। বৈশাখী ঝড়ের আণ্ডবে ঘরের টিন উড়ে যায়। অন্যদিকে অনুফা রান্না করা বন্ধ করে দেয়। ক্ষুধার যন্ত্রণা মীর আলি সহ্য করতে পারেন না। তাই তিনি বলেন, যুদ্ধ হলেও মানুষের ক্ষুধা-তৃষ্ণা তো চলে যায়নি। একদিকে অনিশ্চিত জীবন, অন্যদিকে ক্ষুধার যন্ত্রণা যেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারকেও ছাপিয়ে যায়। তাই বলা যায়, মীর আলির অসহায়ত্ব যুদ্ধের ভয়াবহতাকেও ছাপিয়ে যায়।
Related Question
View Allপশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এ অঞ্চলটিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দমিয়ে রাখতে গিয়ে একটা যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। যদিও যুদ্ধটা ছিল পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক পূর্বাঞ্চলের উপর চাপিয়ে দেওয়া এক অন্যায় যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রাথমিকভাবে জনযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ ছিল না। এর প্রথম পর্যায়কে গণহত্যা হিসেবে দেখা যায়। '১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের মধ্য দিয়ে এরই একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। '১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জ এক প্রান্তিক গ্রাম। গ্রামের পাশের জঙ্গলায় মুক্তিযোদ্ধারা দুজন পাকিস্তানি অফিসারকে আটক করে নিয়ে লুকিয়ে আছে এমন অভিযোগে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল সেই গ্রামে আসে। দলটি গ্রামে প্রবেশ করেই প্রথমে ভীতিসঞ্চার করতে চায়। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতি অনুরাগ-বিরাগ কিছুই প্রকাশ পায় না উপন্যাসের শুরুতে। তবে মানুষের মনে সৃষ্ট আতঙ্ককে বিরাগ হিসেবেই ধরা যায়। প্রাথমিক এই বিরাগ নীলগঞ্জের মানুষদের পাকিস্তানি বাহিনীর শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকান্ড পুরো নীলগঞ্জকেই তার শত্রু হিসেবে সাব্যস্ত করে। পাকিস্তানি বাহিনী নীলগঞ্জে প্রবেশ করেই স্থানীয় ইমাম এবং মাস্টারকে আটক করে নেয়। এই শ্রেণির মানুষেরা গ্রামে মান্যজন হিসেবেই বিবেচিত হন। তারা ইমাম ও আজিজ মাস্টারের উপর অমানবিক নির্যাতন করে। অকারণেই হত্যা করে নীলু সেনকে। তার ধর্মীয় পরিচয়ই ছিল এই হত্যার কারণ। কৈবর্ত যুবক মনাকে তার অপরাধের জন্য শাস্তিস্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার করেনি, বরং ত্রাস সৃষ্টি করেছে। সফদরউল্লাহর পরিবারের নারীদের ধর্ষণ করে। কৈবর্তপাড়া পুড়িয়ে দেয়।
নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর এমন সামরিক আগ্রাসনে ফুটে ওঠে পুরো পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্রাসনের প্রতিচ্ছবি। তারা রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে সামরিকভাবে মোকাবিলা করে। নীলগঞ্জের মতো সাধারণ একটি জনপদে পাকিস্তানি বাহিনী ত্রাস সৃষ্টি করতে গিয়ে সকল নিরীহ মানুষকেই শত্রু হিসেবে গণ্য করে। সেখানে তাদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা পুরো নীলগঞ্জকেই শত্রুতে রূপান্তরিত করে। এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে পুরো পূর্বাঞ্চলের এক সাধারণ চিত্র। সামরিক কায়দায় মোকাবিলা করতে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিরীহ মানুষের উপর ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মধ্য দিয়ে '১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জের মতো পুরো ভূখণ্ডকেই শত্রু বানিয়ে ফেলে। মুক্তিযুদ্ধ তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!