বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক শওকত ওসমানের সাহিত্যকর্মে তাঁর তীক্ষ্ণ সমাজসচেতন ও প্রগতিশীল ভাবধারার শৈল্পিক ফসল। মুক্তিযুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে তিনি ছিলেন উচ্চকিত কন্ঠের অধিকারী।
১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় ৫ বছর কলকাতায় নির্বাসনে ছিলেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং ১৯৭২ সালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
শওকত ওসমান ২ জানুয়ারি, ১৯১৭ সালে হুগলীর সবল সিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান।
বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান তাঁর ছেলে।
প্রয়াত হুমায়ুন আজাদ শওকত ওসমানকে 'অগ্রবর্তী আধুনিক মানুষ' নামে অভিহিত করেন।
জীবনের শেষ প্রান্তে আত্মজীবনী 'রাহনামা' লেখা শুরু করেন কিন্তু শেষ করতে পারেননি।
তিনি কিছুদিন 'কৃষক' পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।
তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), একুশে পদক (১৯৮৩), ফিলিপস পুরস্কার (১৯৯১), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭) পান।
তিনি ১৪ মে, ১৯৯৮ সালে ঢাকায় মারা যান।
শওকত ওসমানের গ্রন্থাকারে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থঃ
'জননী' (১৯৫৮): এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস। সন্তানের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য একজন মা গোপনে যে কোনো পথ অবলম্বন করতে পারেন, শওকত ওসমান সে কথাই এ উপন্যাসে ব্যক্ত করেছেন। মহেশডাঙ্গার দরিয়াবিবি সন্তান মোনাদি'কে আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য ইয়াকুবের শয্যাসঙ্গিনী হয়। ইয়াকুবের ঔরষে তার গর্ভে সন্তান এলেও সামাজিক সকল বিপত্তি এড়িয়ে অসীম মমতায় তাকে লালন-পালন করে। এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে মুসলিম সমাজের শরিয়তি দ্বন্দ্ব, বিত্তবানদের স্বার্থপরতা, গ্রামের দরিদ্র মানুষদের পারস্পরিক বিবাদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। ওসমান জামাল এটি ইংরেজিতে 'জননী' (১৯৯৩) নামেই অনুবাদ করে অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশ করেন। চরিত্র: দরিয়া বিবি, আজহার, মোনাদি, ইয়াকুব, চন্দ্রকোটাল।
তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসসমূহঃ
'জাহান্নম হইতে বিদায়' (১৯৭১): 'দেশ' পত্রিকার সম্পাদক শ্রী সাগরময় ঘোষের অনুরোধে শওকত ওসমান উপন্যাসটি সাতটি পর্বে সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সালে কলকাতায় বসে লেখেন। 'দেশ' পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়। এতে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সময়কার চালচিত্র ফুটে উঠেছে। কেন্দ্রীয় চরিত্র: শিক্ষক গাজী রহমান।
'বনি আদম': এটি ১৯৪৬ সালে দৈনিক আজাদের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
'ক্রীতদাসের হাসি' (১৯৬২): এটি তাঁর প্রতীকাশ্রয়ী উপন্যাস। উপন্যাসটি আরব্য রজনী 'আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা' এর শেষ গল্প 'জাহাকুল আবদ' এর অনুবাদ কিন্তু সর্বাংশে নয়। এ উপন্যাসে বাগদাদের বাদশা হারুন অর রশিদের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানিদের বিরূপ শাসনের সমালোচনা করা হয়েছে। বাগদাদের বাদশা হারুন অর রশিদ অত্যাচারী। সে ক্রীতদাস তাতারি ও বাঁদি মেহেরজানের প্রণয়ে বাঁধা সৃষ্টি এবং তাতারিকে গৃহবন্দী ও অত্যাচার করে। তাতারি আমৃত্যু বাদশা হারুনের নির্যাতনের প্রতিবাদ করে যায়। এখানে তাতারি বাঙালি জনতার এবং বাদশা হারুন আইয়ুব খানের প্রতীক। এর জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি 'আদমজী সাহিত্য পুরস্কার' লাভ করেন। কবির চৌধুরী এটি ইংরেজিতে 'এ স্লেভ লাফস' (১৯৭৬) নামে অনুবাদ করে দিল্লি থেকে প্রকাশ করেন।
'আর্তনাদ' (১৯৮৫): ভাষা আন্দোলনভিত্তিক উপন্যাস। চরিত্র: জাফর আলী।