সৈয়দ বংশের প্রথম শাসকের নাম খিজির খান।
লোদি বংশের শাসকদের মধ্যে সিকান্দার লোদি ছিলেন শ্রেষ্ঠ সুলতান। বাহলুল লোদির মৃত্যুর পর ১৪৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তার পুত্র 'নিজাম খান' সিকান্দার শাহ উপাধি গ্রহণ করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। ২৯ বছর সগৌরবে রাজত্ব করার পর ১৫১৭ সালে তিনি আগ্রাতে পরলোকগমন করেন। সিকান্দার লোদি দৃঢ়চেতা ও ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন। তিনি কখনো মদ্যপান করতেন না। প্রতি বছর সাম্রাজ্যের গরিব ও দুস্থদের তালিকা করে তাদের ৬ মাসের রেশন দানের ব্যবস্থা করেন। তিনি ১৫০৪ খ্রিষ্টাব্দে আগ্রা নগরীর গোড়াপত্তন করে। দিল্লি হতে প্রশাসনিক দপ্তর সেখানে স্থানান্তরিত করেন। তিনি ত্রিহূত, বিহার প্রভৃতি অঞ্চল জয় করে সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেন। তাই তাকে লোদি বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান বলা হয়।
উদ্দীপকে দিল্লি সালতানাতের পতনের জন্য দায়ী সুলতানদের স্বৈরশাসনের কারণটি প্রতিফলিত হয়েছে। T
একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরশাসন ছিল দিল্লি সালতানাত যুগের শাসকদের প্রধান শাসননীতি। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, একনায়কতন্ত্র জনগণের জন্য সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই এর বিরুদ্ধে সব সময়ই বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে। দিল্লি সালতানাতের পতন এবং উদ্দীপকের মুহাম্মদ তকির ক্ষেত্রেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
অনেক বছর ধরে একটি রাজবংশ একনায়কতন্ত্রের নীতিতে শাসন করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের কাছে রাজবংশটির পতন ঘটে। অনুরূপ ফলাফল ঘটেছিল দিল্লি সালাতানাতের ক্ষেত্রেও। দিল্লি সালতানাত ছিল ব্যক্তিনির্ভর একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসন। এতে সমগ্র
ক্ষমতার উৎস ছিলেন স্বয়ং সুলতান। সুলতানের নিজস্ব ক্ষমতার ওপর সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতা নির্ভরশীল ছিল। বুঢ় হলেও সত্য যে দিল্লি সালতানাতের তিনশ বছরে সুলতান ইলতুৎমিশ, গিয়াসউদ্দিন বলবন, আলাউদ্দিন খলজি এবং মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছাড়া প্রায় সকল শাসকই অযোগ্য ছিলেন। ব্যক্তিনির্ভর একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এসব দুর্বল ও অযোগ্য সুলতানদের আমলে সর্বত্র বিদ্রোহ, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে উদ্দীপকের রাজবংশের ন্যায় দিল্লি সালতানাতের পতনও অনিবার্য হয়ে পড়ে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আলোচ্য দুটি প্রেক্ষাপটেই পতনের কারণ হিসেবে স্বৈরশাসন ক্রিয়াশীল।
উদ্দীপকে দিল্লি সালতানাতের পতনের কারণ হিসেবে শাসকদের স্বৈরশাসনের দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে, যা সালতানাত পতনের একমাত্র কারণ নয়।
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দিন আইবেকের মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দিল্লি সালতানাতের উত্থান ঘটেছিল। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে বাবরের সাথে ইব্রাহিম লোদির পানিপথের যুদ্ধের মাধ্যমে এ সালতানাতের পতন ঘটে এবং মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, একটি রাজবংশ মাত্র ১০০ বছর শৌর্যবীর্যে টিকে থাকতে পারে। এরপর অনিবার্যভাবে তার পতন ঘটবে। তাই মামলুক, খলজি, তুঘলক, সৈয়দ ও লোদি রাজবংশ স্বাভাবিকভাবে তাদের স্থিতিকাল অতিক্রম করায় তাদের পতন ঘটেছে। এছাড়া দিল্লি সালতানাত যুগে ইলতুৎমিশ, গিয়াসউদ্দিন বলবন, আলাউদ্দিন খলজি ছাড়া আর কোনো যোগ্য শাসক কেন্দ্রীয় শাসনকাঠামো সুদৃঢ় করতে পারেননি। সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধির ফলে এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা খুব কঠিন ছিল। একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র দিল্লি সালতানাত পতনের আরেকটি কারণ। দিল্লি সালতানাত ছিল সামরিক শক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, জনসাধারণের স্বাভাবিক আনুগত্য বা জাতীয়তাবোধের ওপর নয়। তাই সালতানাতের নিরাপত্তার ব্যাপারে জনগণের কোনো আগ্রহ ছিল না। অধিকাংশ সুলতান ধর্মান্ধতা ও সংকীর্ণ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিমগণ সর্বদাই সালতানাতের ধ্বংস কামনা করত। বাহ্যিক কিছু কারণ যেমন- মোঙ্গল আক্রমণ, তৈমুর লঙের আক্রমণ ও বাবরের আক্রমণের ফলে দিল্লি সালতানাতের পতনের পথ সুগম হয়। এভাবেই বিভিন্ন কারণের সমন্বয়ে দিল্লি সালতানাতের পতন ত্বরান্বিত হয়।
Related Question
View Allসালতানাতের শেষ সুলতান ছিলেন ইব্রাহিম লোদি।
আলাউদ্দিন খলজির শাসনামলে দিল্লি সালতানাতে প্রায় সাত বার মোঙ্গল আক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। তাই মোঙ্গলদের প্রতিহতকরণে তিনি কতিপয় কার্যকর মোঙ্গলনীতি গ্রহণ করেন।
আলাউদ্দিন খলজি মোঙ্গলদের মোকাবিলায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সাথে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মোঙ্গলদের আক্রমণ পথে তিনি পুরাতন কেল্লা সংস্কার ও নতুন কেল্লা স্থাপন করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। তিনি উন্নতমানের অস্ত্রের জন্য কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব বিশ্বস্তদের ওপর ন্যস্ত করেন। এছাড়া তিনি মোজঙ্গলদেরকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত সৈন্য সংগ্রহ করেন। এভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিনি মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবিলায় সাফল্য লাভকরেন। তার রাজত্বকালে মোঙ্গলরা আর ভারত আক্রমণে সাহস করেনি।
উদ্দীপকে শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সঙ্গে দিল্লির সালতানাতের মহিলা শাসক সুলতান রাজিয়ার সাদৃশ্য রয়েছে।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা চিরকালই অবহেলিত হয়ে আসছে। এই অবহেলার মাঝেও নারীরা স্বীয় যোগ্যতাবলে সমাজের উন্নয়নে অংশীদার হয়েছে। নানা বাধার সম্মুখীন হয়েও তারা সফল হয়েছে; সকল সমালোচনার উচিত জবাব দিয়েছে। উদ্দীপকের শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এবং সুলতান রাজিয়া এমনই দুজন নারী ব্যক্তিত্ব।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েক ছিলেন আধুনিক বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বিভিন্ন দেশের কিছু অভিজাত শ্রেণির সমালোচনার মুখোমুখি হন। তারা নারী বলে শ্রীমাভো বন্দরনায়েককে শাসনকার্যে অনুপযোগী ও অদক্ষ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু নিজ মেধা, তেজস্বিতা আর কর্মদক্ষতার গুণে শ্রীমাভো সকল বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি প্রতিহত করে দেশের উন্নতি সাধন করেন। সুলতান রাজিয়াও একইভাবে ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির সিংহাসনে বসে সুলতানি শাসন পরিচালনা করেন। তার ৪ বছরের রাজত্বকাল মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ প্রতিহত করেন। তিনি উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা শাসনকর্তা। তার সাহসিকতা, দক্ষতা ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব তুর্কি জাতির সাহসিকতা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে। তার উদার রাজনৈতিক চিন্তাধারা বস্তুত মুসলিম শাসনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। সুতরাং দেখা যায় উদ্দীপকের শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এবং সুলতান রাজিয়া শাসন পরিচালনার দিক দিয়ে একে অন্যের প্রতিরূপ।
ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে সুলতান রাজিয়া ছিলেন দিল্লির সিংহাসনে আরোহণকারী প্রথম ও একমাত্র মহিলা।
সালতানাতের এক সংকটকালে সুলতান রাজিয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-উস-সিরাজের হিসেব মতে, তিনি ৩ বছর ৬ মাস ৬ দিন রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং অসাধারণ প্রতিভাশালী একজন নারী। প্রচলিত মুদ্রায় তিনি নিজেকে উমদাদ-উল-নিসওয়ান (নারীদের মধ্যে বিশিষ্ট) বলে উল্লেখ করেন। মিনহাজ-উস-সিরাজ তাকে মহান নৃপতি, বিচক্ষণ, ন্যায়পরায়ণ ও মহানুভব বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি একজন সার্বভৌম নৃপতির প্রয়োজনীয় গুণাবলি ও - যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এ. বি. এম. হবিবুল্লাহর মতে, সাহসিকতা ও অদম্য দৃঢ়তাই (Courage and unflincing determination) ছিল রাজিয়ার আদর্শ।
চারিত্রিক দৃঢ়তায় সুলতান রাজিয়া নিজেকে পুরুষ অপেক্ষা যোগ্যতর প্রমাণ করেন। ব্যক্তিগত দৃঢ়তা ও যোগ্যতাই তার ক্ষমতা ও অস্তিত্বের চাবিকাঠি ছিল। সুলতান রাজিয়া প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিগত শক্তি-সামর্থ্য প্রমাণের লক্ষ্যেই মহিলা পোশাক পরিত্যাগ করেন, অশ্বারোহণে জনসমক্ষে বের হন এবং প্রকাশ্যে দরবার পরিচালনা করেন। অধ্যাপক কে. এ. নিজামী যথার্থই বলেছেন, "অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে, তিনি ছিলেন ইলতুৎমিশের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যোগ্যতম।"
পরিশেষে বলা যায় যে, সুলতান রাজিয়া ছিলেন অপরিসীম কৃতিত্বের অধিকারী।
তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (শাসনকাল ১৩২০-১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ)।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন এবং মোজাল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের গৃহীত নিষ্ঠুর ও কঠোর পদক্ষেপই 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি' (Blood and Iron policy) নামে পরিচিত।
সিংহাসনে আরোহণ করেই বলবন নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল আমির-ওমরাহ ও অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান ঔদ্ধত্য, দ্বন্দ্ব-কলহ ও ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ, দিল্লির সন্নিকটস্থ মেওয়াটি দস্যুদের উপদ্রব, উপর্যুপরি মোঙ্গল আক্রমণ প্রভৃতি। এসব সমস্যা সাম্রাজ্যের ভিতকে হুমকির সম্মুখীন করে তোলে। তাই নিজের ক্ষমতা সুসংহত করে সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি গুপ্তচর প্রথা চালু, বিচার ব্যবস্থার পুনর্গঠন, মোঙ্গল নীতি প্রভৃতি বিষয়ে কঠোর ও নিষ্ঠুর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এগুলোই বলবনের 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি' হিসেবে স্বীকৃত।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!