'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ আহমেদ এবং তার সহযোগী রফিকের সম্পর্ক মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জটিল পরিস্থিতি এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন তুলে ধরে। রফিক একজন মুক্তিযোদ্ধা। রফিকের দেশপ্রেমের কারণে মেজর এজাজ তাঁকে চিনতে পারেনি। উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল চরিত্র রফিক। রফিক মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে নীলগঞ্জ গ্রামে আসেন। মেজর এজাজের নির্দেশে গ্রামে স্থানীয় মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জানতে তিনিও কৌতূহলী হয়ে ওঠেন কিন্তু তিনি মেজরের বিভিন্ন পদক্ষেপে বাধা দিতে থাকেন। রফিকের সমালোচনা ও বাধা দেওয়া মেজর এজাজের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। মেজর এজাজ বুঝতে পারে তার সহযোগী একজন মুক্তিবাহিনীর সদস্য। মেজর তাই রফিককে জলাভূমিতে পাঠায় এবং দুইজন মিলিটারিকে নির্দেশ দেয় রফিককে গুলি করার জন্য। রফিক মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও রক্তিম সূর্যের মতো জলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। রফিকের পরিবর্তন মেজরকে দুশ্চিন্তায় ফেলে। তার মনে হয় এ যেন এক অন্য রফিক। এই রফিককে সে আগে কখনো দেখেনি। এই রফিক যেন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও রাহক। তাই বলা যায়, ১৯৭১ উপন্যাসের রফিক একজন দেশপ্রেমিক ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীদের রক্ষার কৌশল ছিল খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, যা ছিল মেজর এজাজের কাছে অপ্রত্যাশিত।
Related Question
View Allযে উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল, ভাষার প্রশ্নে তার সম্ভাবনা শুরুতেই হোঁচট খায়। এরপর ভাষাগত পার্থক্যের পথ ধরে দেশটির আঞ্চলিক দূরত্ব এগোতে থাকে নানাবিধ বৈষম্যের দিকে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক এককেন্দ্রিকতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পাকিস্তান রাষ্ট্রকে আরও বিপন্ন করে তোলে। পশ্চিম পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি দিনে দিনে আত্মগরিমায় রূপ নিতে থাকে। বাঙালিদের দেখতে থাকে নীচ হিসেবে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে জাতিগত উন্নাসিকতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিপীড়িত পূর্বাঞ্চল যখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ঘুরে দাঁড়াতে যায়, তখন সে টের পায়, তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বৈষম্যের মতোই আরেকটি উপাদান পদানত করে রেখেছে। তার নাম জাতিগত বিদ্বেষ। যার চূড়ান্ত পরিণতি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। '১৯৭১' উপন্যাসের লেখক তারই একটি স্বরূপ তুলে ধরেছেন নীলগঞ্জে আগত পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্য দিয়ে।
'১৯৭১' উপন্যাসে লেখক নীলগঞ্জ নামক একটি সাধারণ গ্রামের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দেখাতে চেয়েছেন। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল এসে যুদ্ধের বিভীষিকা ছড়িয়ে দেয়। দলটির অধিনায়ক মেজর এজাজ। লেখক মেজর এজাজকে এখানে উপস্থিত করেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের একজন প্রতিনিধি হিসেবে। তার ভাষা, চিন্তা, কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সম্মিলিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। রফিকের সাথে মেজর এজাজের কথোপকথনে ফুটে ওঠে তার গোষ্ঠীগত চেতনার স্বরূপ। এজাজ এ দেশের মানুষদের ভীরু, কাপুরুষ, বেইমান হিসেবে উল্লেখ করে। এ দেশের মুসলমানরা তার চোখে পুরোপুরি মুসলমান নয়। ধর্মীয় সমতার ধারণা এখানে ভেঙে পড়ে। সে এ অঞ্চলের মুসলমানদের চিহ্নিত করে আধা-হিন্দু হিসেবে। হিন্দুদের প্রতি রয়েছে তার জাতিগত বিদ্বেষ। হিন্দুদের মূর্তি নিয়ে তার মন্তব্যে ঝরে পড়ে তাচ্ছিল্য। এ অঞ্চলের নারীদের প্রতি তার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি তির্যকভাবে প্রকাশ পায়। উপন্যাসের কাহিনির অগ্রগতির সাথে এ দেশের মানুষকে মানুষ মনে করাই তার জন্য দুরূহ হয়ে ওঠে। এ অঞ্চলের মানুষের মান-অপমান থাকা তার বিশ্বাসের বাইরে মনে হয়। সে মূলত এ দেশের মানুষদের বিশ্বাসেরই যোগ্য মনে করে না। ইমাম সাহেব, আজিজ মাস্টার, জয়নালের মতো নীলগঞ্জের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিরা তার কাছে ক্রীড়নকে পরিণত হয়। এমনকি, তাদের সাহায্যে নিবেদিত রাজাকাররা ভালো মুসলমান হিসেবে বিবেচিত হলেও ওঠা-বসা কিংবা মেলামেশার ক্ষেত্রে এ দেশের 'অধিবাসী হিসেবে নিচু দৃষ্টিভঙ্গির আওতায়ই থেকে যায়। এর সবকিছুর পিছনে যুদ্ধের বাহ্যিক আয়োজনের সাথে কাজ করে পাকিস্তানিদের জাতিগত অহংকার।
'১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জের মধ্য দিয়েই দেখা যায় পুরো পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে। আর মেজর এজাজের চিন্তা ও কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সামগ্রিক চেতনা। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বাইরে জাতিগত বিদ্বেষের একটি স্বরূপ ফুটে উঠেছে উপন্যাসের এজাজসহ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কর্মকান্ড ও চিন্তার মধ্যে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!