আরোহ অনুমানের লক্ষ্য হলো বস্তুগত সার্বিক সত্য প্রতিষ্ঠা করা।
গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল আরোহ অনুমান প্রক্রিয়াকে একটি 'যৌক্তিক (rational) প্রক্রিয়া' বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্তের মধ্যে অবস্থিত গুণাবলিকে প্রত্যক্ষ করে আমরা ঐ বিশেষ দৃষ্টান্তগুলো যে বৃহত্তম জাতির অন্তর্ভুক্ত সেই বৃহত্তম জাতির ওপর প্রয়োগ করি। যেমন- রীনা, রূপা, রীপা, রিপন প্রভৃতি মানুষের মরণশীলতা থেকে সার্বিক সিদ্ধান্তে বলা হয়, 'সকল মানুষ হয় মরণশীল।'
উদ্দীপকে তারেকের সর্বশেষ বক্তব্যের মাধ্যমে আরোহ অনুমানের প্রকারভেদ প্রতীয়মান হয়। যে আরোহে আরোহের প্রকৃত গুণ এবং প্রধান মৌলিক বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকে তাকে 'প্রকৃত আরোহ' বলে। অর্থাৎ যে আরোহে আরোহমূলক লম্ফ থাকে তাকে প্রকৃত আরোহ বলে। প্রকৃত আরোহকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা:
১। বৈজ্ঞানিক আরোহ: নিরীক্ষণ বা পরীক্ষণে প্রাপ্ত কতিপয় বিশেষ দৃষ্টান্তের ওপর প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতি ও কার্যকারণ নিয়ম প্রয়োগ এবং আরোহাত্মক উল্লম্ফন' দ্বারা সিদ্ধান্ত হিসেবে একটি সার্বিক সংশ্লেষক যুক্তিবাক্য স্থাপনের প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক আরোহ বলে।
২। অবৈজ্ঞানিক আরোহ: অবৈজ্ঞানিক আরোহ হচ্ছে এমন এক অনুমান পদ্ধতি, যেখানে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক ছাড়াই শুধু প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতি এবং ব্যতিক্রমহীন অবাধ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত হিসেবে একটি সার্বিক সংশ্লেষক যুক্তিবাক্য স্থাপন করা হয়।
৩। সাদৃশ্যমূলক অনুমান: দুটি বিষয়ে কতিপয় দিক থেকে সাদৃশ্যের প্রেক্ষিতে এদের একটিতে কোনো বিশেষ গুণ থাকলে অন্যটিতে ঐ গুণ থাকবে বলে যে অনুমান করা হয়, তাকে 'সাদৃশ্য অনুমান' বলে।
উদ্দীপকে তারেকের সর্বশেষ বক্তব্যের মাঝে বৈজ্ঞানিক এবং অবৈজ্ঞানিক আরোহের বৈসাদৃশ্য প্রতীয়মান হয়। প্রকৃত আরোহ অনুমানের অন্যতম দিক বৈজ্ঞানিক আরোহ এবং অবৈজ্ঞানিক আরোহ। কার্যকারণ নিয়ম ও প্রকৃতির নিয়ামানুবর্তিতা নীতির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে বৈজ্ঞানিক আরোহ। অন্যদিকে অবৈজ্ঞানিক আরোহে শুধু প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতা নীতি প্রয়োগ করা হয়। কার্যকারণ নিয়মের ওপর নির্ভর করায় বৈজ্ঞানিক আরোহের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয়। আর কেবল অবাধ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করায় অবৈজ্ঞানিক আরোহের সিদ্ধান্ত সম্ভাব্য হয়। বৈজ্ঞানিক আরোহে বিশ্লেষণের মাধ্যমে আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়। কিন্তু অবৈজ্ঞানিক আরোহে কোনো রূপ বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। বৈজ্ঞানিক আরোহে অপনয়ন সূত্রের সাহায্যে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বর্জন করে প্রকৃত ঘটনা উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে অবৈজ্ঞানিক আরোহে অপনয়ন সূত্রের কোনো রূপ প্রয়োগ দেখা যায় না। বৈজ্ঞানিক আরোহের সিদ্ধান্ত স্থাপনে পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, প্রকল্প প্রণয়ন, অপনয়ন, সার্বিকীকরণ ইত্যাদি স্তর অতিক্রম করা হয়। কিন্তু অবৈজ্ঞানিক আরোহের সিদ্ধান্ত স্থাপনের ক্ষেত্রে এরূপ কোনো স্তর অতিক্রমের প্রয়োজন হয় না। বৈজ্ঞানিক আরোহের দৃষ্টান্ত সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করা হয় বলে এর সিদ্ধান্ত নির্ভুল হয়। অন্যদিকে অবৈজ্ঞানিক আরোহে বিশেষ কোনো সতর্কতা না থাকায় এর একাধিক দৃষ্টান্ত সামান্য কারণেই ভুল হয়ে যায়।
Related Question
View Allকোনো কার্যকে ঘটানোর জন্য যে সকল পূর্ববর্তী ঘটনার প্রয়োজন হয় তাদের সমষ্টিকে 'কারণ' বলে।
কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো ঘটনাকে, সুনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রত্যক্ষণ করাই হলো 'নিরীক্ষণ'। আর কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষণাগারে যন্ত্রপাতির সাহায্যে উৎপাদিত ঘটনাবলির সুনিয়ন্ত্রিত প্রত্যক্ষণ হলো পরীক্ষণ। পরীক্ষণ এক ধরনের নিরীক্ষণ। পৃথিবীতে অনেক ঘটনা রয়েছে, যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়, যেমন- ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি। এগুলো নিরীক্ষণ ব্যতীত পরীক্ষণ করা। যায় না। পরীক্ষণের ক্ষেত্র কেবল গবেষণাগারে কিন্তু নিরীক্ষণের ক্ষেত্র সর্বত্র। এজন্য নিরীক্ষণের ব্যাপকতা পরীক্ষণ থেকে বেশি।
উদ্দীপকে বাঁশঝাড় সম্পর্কে ইকবালের ভাবনা ব্যক্তিগত ভ্রান্ত নিরীক্ষণের দিকটি নির্দেশ করা হয়েছে। নিরীক্ষণের মাধ্যমে আমরা অভিজ্ঞতার জগতের নানা বিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করি। অর্থাৎ বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো ঘটনাকে সুনিয়ন্ত্রিত প্রত্যক্ষণ হলো নিরীক্ষণ। নিরীক্ষণ সব সময় অ-ভ্রান্ত হয় না, ভ্রান্ত নিরীক্ষণও হয়। ভ্রান্ত নিরীক্ষণ বা নিরীক্ষণ জাতীয় অনুপপত্তিকে দুভাগে ভাগ করা হয়। ১. সদর্থক জাতীয় অনুপপত্তি, ২. নঞর্থক জাতীয় অনুপপত্তি। সদর্থক জাতীয় অনুপপত্তি হলো ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। এটি দুই ধরনের- ১. ব্যক্তিগত, ২. সর্বজনীন ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। বাঁশঝাড় সম্পর্কে ইকবালের ভাবনা ব্যক্তিগত ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। কারণ ভ্রান্ত নিরীক্ষণ হলো তাই যা- যখন কোনো বস্তু যেরূপ তাকে সেভাবে না দেখে ভিন্নরূপে দেখা। ইকবাল বাঁশঝাড়কে বাঁশঝাড়রূপে না দেখে ভিন্নরূপ ভূত বলে মনে করে চিৎকার করে। এটি ব্যক্তিগত কারণ নিরীক্ষণে কেবল ব্যক্তিবিশেষের বেলায় প্রযোজ্য দেখা যাচ্ছে যে দুজন একসঙ্গে যাচ্ছেলো কিন্তু ইকবাল 'ভূত' বলে চিৎকার করলেও তামিম সে ভুল করেনি। অর্থাৎ ইকবালের সে ভ্রান্ত ধারণা।
উদ্দীপকে তামিম এবং ইকবাল দুজনেই ভ্রান্ত ধারণা বা ভ্রান্ত নিরীক্ষণের শিকার। তামিমের ভ্রান্ত নিরীক্ষণ ছিল সর্বজনীন ভ্রান্ত নিরীক্ষণ এবং ইকবালের যে ভ্রান্ত নিরীক্ষণ ছিল তা হলো ব্যক্তিগত ভ্রান্ত নিরীক্ষণ।
নিরীক্ষণ হলো- যা কিছু আমরা প্রত্যক্ষ করি এবং যা কিছুকে আমরা মনের সম্মুখে রাখি। নিরীক্ষণজনিত ভুল হলো ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। কোনো বস্তু বা ঘটনাকে যেভাবে দেখার কথা সেভাবে না দেখে ভিন্নভাবে বা ভুলভাবে দেখা হলো ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। ইকবাল অন্ধকারে বাঁশঝাড় দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠে ভূত ভূত বলে। আসলে সেটি ভূত যে নয়, সেটি বাঁশঝাড় ছিল। তামিম, ইকবালকে সেটাই দেখালো এবং তাঁর ভুল ভাঙালো। ইকবালের এই ভ্রান্ত ধারণা ছিল ব্যক্তিগত। দুজন একসঙ্গে থেকেও ইকবাল বাঁশঝাড়কে ভূত মনে করলেও তামিম তা করেনি। সুতরাং ইকবালের বাঁশঝাড় সম্পর্কে যে ভুল ছিল তা হলো ব্যক্তিগত ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। তামিম, ইকবালের ব্যক্তিগত ভুল ভাঙালো কিন্তু সে যে ভুল করলো সেটা হলো সর্বজনীন ভুল। যে ভ্রান্ত নিরীক্ষণ কেবল ব্যক্তিবিশেষের বেলায় নয় বরং সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সেটা মূলত সর্বজনীন ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। উদ্দীপকে তামিমের মতো প্রায় সবাই বলে যে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে যার ফলে সন্ধ্যা হয়। সূর্য কখনো পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে না বরং পৃথিবী যেহেতু সূর্যের চারদিকে ঘুরে, সেহেতু একটা সময় আসে যখন পৃথিবীর একটা অংশ সূর্য থেকে আড়াল হয় এবং অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। সুতরাং, তামিম ও ইকবালের ধারণা বা নিরীক্ষণ ভ্রান্ত নিরীক্ষণ। ইকবালের ব্যক্তিগত ভ্রান্ত নিরীক্ষণ এবং তামিমের যে ভ্রান্ত নিরীক্ষণ তা হলো সর্বজনীন ভ্রান্ত নিরীক্ষণ।
যা কিছুকে আমরা প্রত্যক্ষ করি এবং যা-কিছুকে আমরা মনের সম্মুখে রাখি তাই হলো নিরীক্ষণ।
পরীক্ষণের সকল ক্ষেত্রে নিরীক্ষণ সম্ভব। নিরীক্ষণ ব্যতীত পরীক্ষণ সম্ভব নয়। কোনো বিষয় বা ঘটনাকে পরীক্ষণ করতে গেলে নিরীক্ষণ করতে হয়। অর্থাৎ পরীক্ষণ নিরীক্ষণের উপর নির্ভরশীল। পরীক্ষক পরীক্ষা কার্য চালাতে গেলে আগে নিরীক্ষণ করতে হয়। নিরীক্ষণ সুষ্ঠু ও নিশ্চিত হলেই কেবল পরীক্ষণকার্য সত্য হয় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করা যায়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!