'যুদ্ধ ও মানবতা' শীর্ষক একটি প্রবন্ধ রচনা করুন।

Updated: 3 days ago
উত্তরঃ

ভূমিকা

যুদ্ধ হলো অন্য উপায়ে রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা।” -কার্ল ফন ক্লজেভিৎস।

যুদ্ধ ও মানবতা দুটি শব্দ মানবসভ্যতার দুটি বিপরীতমুখী বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতার লোভ, আধিপত্য, হিংসা, প্রতিশোধ ও ধ্বংস; অন্যদিকে মানবতা প্রকাশ করে সহমর্মিতা, ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে বর্তমান একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত যুদ্ধের ধরন ও প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু যুদ্ধের মূল মানবিক মূল্য কমেনি। বরং পারমাণবিক অস্ত্র, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার আক্রমণ ও তথ্যযুদ্ধের কারণে আধুনিক যুদ্ধের ধ্বংসক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্র বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠী, কিন্তু এর সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিতে হয় নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে। তাই যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও মানবতাকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

যুদ্ধের ধারণা ও প্রকৃতি

যুদ্ধকে সাধারণভাবে দুই বা ততোধিক রাষ্ট্র, জাতি, রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা সশস্ত্র পক্ষের মধ্যে সংঘটিত সংগঠিত ও ব্যাপক সশস্ত্র সংঘর্ষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। তবে যুদ্ধ কেবল সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি লড়াই নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও গভীরভাবে কাজ করে। কোনো রাষ্ট্র যখন কূটনীতি, আলোচনা ও সমঝোতার পরিবর্তে সামরিক শক্তির মাধ্যমে নিজের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তখন বিরোধ ধীরে ধীরে যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। ভূখণ্ড দখল, প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক আধিপত্য, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তার যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। আধুনিক যুগে যুদ্ধের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে; প্রচলিত সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি সাইবার আক্রমণ, ড্রোন, তথ্যযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিও যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে যুদ্ধের অভিঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; একটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, অবকাঠামো, পরিবেশ ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থাও এর দ্বারা গভীরভাবে বিপর্যস্ত হয়।

মানবতার ধারণা ও যুদ্ধের সঙ্গে তার বৈপরীত্য

মানবতা হলো মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি, সম্মান, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীল আচরণের সমন্বিত প্রকাশ। বর্ণ, ধর্ম, জাতি, ভাষা বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে মূল্য দেওয়া মানবতার মূল শিক্ষা। আধুনিক মানবাধিকারের ধারণাও এই সার্বজনীন মানবিক মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে এই মানবিক কাঠামোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরপরাধ মানুষের হত্যা, আহতদের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা যুদ্ধের অমানবিক রূপকে প্রকাশ করে। যুদ্ধ মানুষের মধ্যে ভয়, ঘৃণা ও প্রতিশোধের মানসিকতা বাড়িয়ে সামাজিক ও মানবিক সম্পর্ককেও দুর্বল করে। তাই যুদ্ধের মধ্যেও বেসামরিক মানুষের জীবন ও মৌলিক অধিকার রক্ষা, আহত ও অসহায় মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা সভ্যতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

যুদ্ধের প্রধান কারণ

  • ভূখণ্ড ও সম্পদ দখলের আকাঙ্ক্ষা : ভূখণ্ড, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা বহু যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। কোনো রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও সামরিক সুবিধা অর্জনের জন্য অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড, তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ বা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের বিরোধকে আরও তীব্র করে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
  • রাজনৈতিক আধিপত্য ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা : আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। কোনো রাষ্ট্র নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়াতে অন্য রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রও নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। এভাবে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
  • জাতিগত, ধর্মীয় ও মতাদর্শগত বিরোধ : জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং মতাদর্শগত পার্থক্য দীর্ঘদিনের সামাজিক বিরোধকে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ দিতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় পরিচয়কে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করলে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়। যথাযথ রাজনৈতিক সমাধান ও সংলাপের অভাবে এসব বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
  • সীমান্ত বিরোধ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস : সীমান্ত নির্ধারণ, ভূখণ্ডের মালিকানা কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। সীমান্তবর্তী কোনো অঞ্চল বা কৌশলগত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের দাবি থাকলে বিরোধ ক্রমে তীব্র হতে পারে। এর সঙ্গে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি যুক্ত হলে সামান্য সীমান্ত সংঘর্ষও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ : অতিরিক্ত অস্ত্রসঞ্চয়, সামরিক জোট এবং পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ায়। এক পক্ষ নিজের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করলে অন্য পক্ষও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আরও অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে। ফলে পারস্পরিক নিরাপত্তাহীনতার একটি চক্র তৈরি হয়, যেখানে আস্থা কমে এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
  • কূটনৈতিক ব্যর্থতা : আলোচনা, সমঝোতা ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান সম্ভব না হলে সংঘাত ক্রমে সামরিক রূপ নিতে পারে। কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগের অভাব, পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং আপসের মানসিকতার দুর্বলতা বিরোধকে আরও গভীর করে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো আলোচনা ও মধ্যস্থতা করা গেলে যে সংঘাত এড়ানো সম্ভব ছিল, কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে তা যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। তাই যুদ্ধ প্রতিরোধে সক্রিয় কূটনীতি ও নিয়মিত সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ ও মানবতার রক্তক্ষরণ

মানবসভ্যতার ইতিহাস সংঘাত, প্রতিযোগিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। প্রাচীন ও মধ্যযুগে সাম্রাজ্য বিস্তার, ভূখণ্ড দখল, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এসব যুদ্ধে হত্যা, লুণ্ঠন, দাসত্ব ও জনপদ ধ্বংসের ঘটনা বারবার ঘটেছে। আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে যুদ্ধের ধ্বংসক্ষমতা আরও বেড়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) আধুনিক অস্ত্র ও রাসায়নিক যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রকাশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) হলোকোস্ট, নানচিং গণহত্যা এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে মানবতার ইতিহাসে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮): প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার যুদ্ধের ভয়াবহতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয় এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ট্রেঞ্চ যুদ্ধ, ভারী কামান, মেশিনগান ও রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধের নিষ্ঠুরতাকে নতুন মাত্রা দেয়। এর ফলে বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি। হলোকোস্টে বিপুলসংখ্যক নিরীহ মানুষ পরিকল্পিত গণহত্যার শিকার হয় এবং নানচিং গণহত্যাও যুদ্ধকালীন নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ মানবসভ্যতাকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ ধ্বংসক্ষমতার মুখোমুখি করে। এর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক প্রভাব যুদ্ধের অমানবিকতাকে আরও স্পষ্ট করে।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সংঘাত : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও যুদ্ধের অবসান ঘটেনি। কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে ও জীবিকা হারিয়েছে। এসব সংঘাত প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় মূল্য অনেক সময় সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১ : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয় ও মানবতার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন, গণহত্যা ও নির্যাতনের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয় এবং অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। নারী ও শিশুসহ সাধারণ জনগোষ্ঠীও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়। একই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জনগণের সংগ্রাম মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের এসব যুদ্ধ দেখায় যে যুদ্ধের আড়ালে মানুষের জীবন, মর্যাদা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি ঘটে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

যুদ্ধের বহুমুখী প্রভাব

যুদ্ধের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্র বা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত মানবজীবন, পরিবার ও সমাজ, নারী ও শিশু, অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ওপর বিস্তৃতভাবে পড়ে। যুদ্ধ শেষ হলেও এর ক্ষত বহু বছর, এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়। বিশেষত আধুনিক যুদ্ধের উন্নত অস্ত্র, প্রযুক্তি ও ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতার কারণে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও গভীর হয়েছে।

  • মানবজীবন ও সমাজের ওপর প্রভাব : যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। বোমাবর্ষণ, গোলাগুলি ও সশস্ত্র সংঘর্ষে অসংখ্য মানুষ নিহত ও আহত হয়; অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকার হয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য মারা গেলে পুরো পরিবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে। ঘরবাড়ি, জমি, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ধ্বংস হওয়ায় মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা হারায়। একই সঙ্গে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটও যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। ফলে যুদ্ধ মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
  • মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবিক বিকাশের ওপর প্রভাব : যুদ্ধের মানসিক অভিঘাত অনেক সময় শারীরিক ক্ষতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিস্ফোরণ, স্বজন হারানো, সহিংসতা ও প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়ের কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, উদ্বেগ, হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত সৃষ্টি হতে পারে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত ব্যাধি (PTSD)-এর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে মানসিক চাপের মধ্যে বেড়ে ওঠে। এর ফলে তাদের শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ বিকাশ দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
  • নারী ও শিশুর ওপর বিশেষ প্রভাব : নারী ও শিশুরা যুদ্ধের সবচেয়ে অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। শিশুরা শিক্ষা, পুষ্টি, চিকিৎসা ও নিরাপদ শৈশব থেকে বঞ্চিত হয় এবং পরিবার বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতার কারণে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। নারীরা স্বজন হারানো, দারিদ্র্য, খাদ্য ও চিকিৎসার সংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হতে পারেন। কোনো কোনো সংঘাতে যৌন সহিংসতাকেও প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই যুদ্ধের সময় নারী ও শিশুর সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
  • উদ্বাস্তু ও শরণার্থী সংকট : যুদ্ধের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ও জন্মভূমি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়। কেউ দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হয়, আবার কেউ আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থী হয়ে পড়ে। তাদের খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দেয় এবং সম্পদ ও সামাজিক পরিবেশ হারানোর কারণে অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমন আশ্রয়দাতা দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে যুদ্ধের মানবিক সংকট দ্রুত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
  • বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব: বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি পরস্পরনির্ভর হওয়ায় একটি অঞ্চলের যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হলে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। কৃষিজমি, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্যশস্যের সরবরাহ কমে গিয়ে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাতের ফলে শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। বিশেষত দরিদ্র ও আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি সৃষ্টি করে।
  • পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব: যুদ্ধ প্রকৃতির ওপরও ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী আঘাত হানে। বোমাবর্ষণ, রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ এবং শিল্পকারখানা ও তেল স্থাপনায় হামলার ফলে মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হতে পারে। কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের জীবিকা বিপন্ন হয়। বনভূমি, নদী, জলাভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। যুদ্ধের অবশিষ্ট বিস্ফোরক ও সামরিক বর্জ্য সংঘাত শেষ হওয়ার পরও পরিবেশ ও মানুষের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এর পরিবেশগত ক্ষতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বহন করতে হয়।
  • অস্ত্র বাণিজ্য ও সামরিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব: যুদ্ধের সময় অস্ত্র, গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার পরে প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বিপুল সম্পদ সামরিক খাতে ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই সামরিক ব্যয়ের একটি অংশ মানবকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয় করা অধিক ফলপ্রসূ।
  • আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব: একটি যুদ্ধ শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্পর্ক নষ্ট করে না; তা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তাহীনতায় নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, ফলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সামরিক জোট ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাত অন্যান্য রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও জটিল রূপ নিতে পারে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যুদ্ধ প্রতিরোধে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় করণীয়
"আমাদের অবশ্যই অহিংসার বিকল্প বেছে নিতে হবে, না হলে নিজেদের বিনাশ নিশ্চিত।" মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র

কূটনৈতিক ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে সংলাপ, আলোচনা, মধ্যস্থতা ও আন্তর্জাতিক সালিশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সীমান্ত, প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্য, পানি বণ্টন ও রাজনৈতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনা ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করলে ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই কূটনীতির মাধ্যমে সংঘাত প্রতিরোধ করা অধিক কার্যকর ও মানবিক।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা : বিশ্বশান্তি ও রক্ষায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর, নিরপেক্ষ প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে। সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, মধ্যস্থতা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা গেলে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ: অতিরিক্ত অস্ত্রসঞ্চয় ও সামরিক প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়। তাই পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিস্তার রোধে কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তি ও পারস্পরিক আস্থা প্রয়োজন। প্রচলিত অস্ত্রের অবাধ বিস্তার ও অবৈধ অস্ত্র বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সামরিক ব্যয়ের একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবিক উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।

শান্তি ও মানবিক শিক্ষার প্রসার : দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য মানুষের চিন্তা ও মূল্যবোধের পরিবর্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহনশীলতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা দিতে হবে। জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বনাগরিকত্বের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

নাগরিক সমাজ ও জনমতের ভূমিকা : যুদ্ধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রকাশ এবং গুজব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিস্তার রোধ করতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক উদ্যোগ যুদ্ধের মানবিক ক্ষতি তুলে ধরে শান্তির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে পারে। সমাজের প্রতিটি স্তরে শান্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা যুদ্ধ প্রতিরোধের ভিত্তি শক্তিশালী করবে।

উপসংহার

যুদ্ধ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; এটি নতুন সংঘাত, ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয়ের বীজ বপন করে। প্রযুক্তির অগ্রগতি যুদ্ধকে আরও নিখুঁত ও শক্তিশালী করলেও তাকে মানবিক করে তুলতে পারেনি; বরং ড্রোন, অও, সাইবার আক্রমণ ও আধুনিক অস্ত্রের কারণে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাই কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থই মানুষের জীবন ও মর্যাদার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। যুদ্ধের পরিবর্তে সংলাপ, প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার, আধিপত্যের পরিবর্তে সহযোগিতা এবং হিংসার পরিবর্তে মানবতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনকে কার্যকর করা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং নতুন প্রজন্মকে শান্তি ও সহমর্মিতার শিক্ষায় গড়ে তোলা জরুরি। মানবসভ্যতার প্রকৃত বিজয় যুদ্ধ জয়ে নয়; বরং এমন একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠায়, যেখানে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা কোনো যুদ্ধের বলি হবে না।

Md Zahid Hasan
Md Zahid Hasan
2 days ago
8

Related Question

View All
উত্তরঃ

একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।

একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।

একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।

সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।

একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।

একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।

অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।

সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।

লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।

3.8k
উত্তরঃ

সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।

আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।

সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।

3.2k
উত্তরঃ

আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।

শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।

বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।

আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।

arif
arif
3 years ago
3.8k
উত্তরঃ

আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ

 

বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।

অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র

য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

2.5k
উত্তরঃ

"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ: 

সাম্যবাদের পতন:

১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:

সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ: 

অর্থনৈতিক সংকট:

সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের উত্থান:

অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা:

নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।

সামাজিক পরিবর্তন:

পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক: 

  • এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
  • যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল। 

Satt Team 10
Satt Team 10
1 year ago
2.3k
উত্তরঃ

পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে  দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান  বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-

১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ  পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:

সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়  একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।

অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা  জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে,  ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।

২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে।  [ঊর্মি হোসেন]

Md. Aminul Islam
Md. Aminul Islam
3 years ago
4.6k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews