উত্তরঃ
যুবশক্তি ও রাষ্ট্র নির্মাণ
ভূমিকা:
"তারুণ্যের জয়গান গাও, যারা ভেঙে ফেলে সব জরাজীর্ণের বাঁধ
-কাজী নজরুল ইসলাম
একটি রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি, স্বপ্ন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার যুবশক্তি।" কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, আঠারো বছর বয়স যেন- "স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, ভাঙতে চায় সে পাথর বাধা-বিপত্তি।" যেকোনো দেশের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত রূপান্তরের নেপথ্যে থাকে যুবশক্তির অদম্য শক্তি, সাহসিকতা ও সৃজনশীলতা। যুবশক্তি হলো রাষ্ট্রের সেই প্রাণবন্ত অংশ, যারা গৌরবময় অতীতকে শ্রদ্ধা করে, বর্তমানকে সাহসের সাথে যাপন করে এবং ভবিষ্যৎকে প্রগতির আলোয় নির্মাণ করে। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো জাতি ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়েছে, যুবশক্তিই নিজেদের মেধা, শ্রম ও রক্তের বিনিময়ে মুক্তির নতুন দিশা দেখিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (4IR) আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন সাম্যের রাষ্ট্র বিনির্মাণে যুবশক্তির অগ্রণী ভূমিকা অনন্য ও অপরিহার্য।
যুবশক্তির ধারণা:
যুবশক্তি বলতে কেবল একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমার জনগোষ্ঠীকে বোঝায় না; বরং তরুণদের শারীরিক কর্মক্ষমতা, মেধা, সাহস, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং সমাজ পরিবর্তনের সম্মিলিত সামর্থ্যকে বোঝায় যা সরাসরি দেশের অনুৎপাদনশীল ও নির্ভরশীল জনসংখ্যাকে গতিশীল ও সচল রাখতে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘের সাধারণ সংজ্ঞায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের তরুণ বা যুব হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক ও জনমিতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে 'বাংলাদেশের জাতীয় যুব নীতি (২০১৭)' অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যেকোনো নাগরিককে যুবশক্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বিপুল, বৈচিত্র্যময় ও কর্মক্ষম তরুণ সমাজই মূলত যেকোনো রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক প্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি যাদের সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'Agents of Change' বা পরিবর্তনের নিয়ামক।
রাষ্ট্র নির্মাণ কী?
'রাষ্ট্র নির্মাণ'একটি সুদূরপ্রসারী, বহুমুখী এবং অত্যন্ত জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া। এটি কেবল ইট-পাথরের বাহ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা যান্ত্রিকভাবে জিডিপি বৃদ্ধির নাম নয়। রাষ্ট্র নির্মাণ হলো এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান প্রধান মৌলিক উপাদান। একটি টেকসই, কল্যাণমুখী ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং একটি দূরদর্শী দীর্ঘমেয়াদী ভিশন; যার প্রতিটি ক্ষেত্রে যুবশক্তির সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একান্ত অপরিহার্য।
রাষ্ট্র নির্মাণে যুবশক্তির গুরুত্ব:
যুবশক্তি একটি দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল শক্তি এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের কর্মস্পৃহা, সাহস, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, দ্রুত শেখার দক্ষতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর শক্তি যেকোনো জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, সামাজিক সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলাসহ রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিটি ক্ষেত্রে যুবশক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। যে জাতি তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারে, সে জাতি বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে দ্রুত উন্নয়ন অর্জন করে। তাই বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (Demographic Dividend) বা জনমিতিক সুবিধার এক স্বর্ণযুগে অবস্থান করছে, যেখানে দেশের সিংহভাগ মানুষই কর্মক্ষম তরুণ। এই বিপুল যুবশক্তিকে যদি মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করা যায়, তবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত ত্বরান্বিত হবে। শিল্পায়ন, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা সম্ভব। তাই তরুণ প্রজন্মকে অলস বসিয়ে না রেখে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই হলো রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান শর্ত।
বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ও রাষ্ট্র গঠনে যুবশক্তির ঐতিহাসিক ভূমিকা:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুবশক্তি কেবল অংশগ্রহণকারী নয়; বহু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সূচনাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাসের সেই বাঁক পরিবর্তনকারী ভূমিকাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- ভাষা আন্দোলন ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্র ও তরুণরাই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অগ্রভাগে ছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ তরুণদের আত্মত্যাগ শুধু মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি; বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকেও সুদৃঢ় করেছিল।
- স্বাধিকার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-যুবসমাজের সক্রিয় ভূমিকা পাকিস্তানি শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। তাদের সাহসী অংশগ্রহণ বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে গণদাবিতে পরিণত করে।
- মহান মুক্তিযুদ্ধে যুবশক্তি: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ ছিল তরুণ। দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা শিক্ষা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ত্যাগ করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেয়। তাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল।
- স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠন ও সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান: যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন, স্বেচ্ছাশ্রম, শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সময়ের পরিক্রমায় স্বৈরাচার বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে যুবশক্তি যেমন অগ্রণী ছিল, ঠিক তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে রাষ্ট্র সংস্কার ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের এক নতুন ঐতিহাসিক দ্বার উন্মোচন করেছে দেশের তরুণ সমাজ।
রাষ্ট্র নির্মাণে যুবশক্তির বহুমাত্রিক ভূমিকা:
একটি আধুনিক, উন্নত ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে যুবশক্তির ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। রাষ্ট্র নির্মাণে যুবশক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো-
- অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: যুবশক্তি একটি দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ। কৃষি, শিল্প, তৈরি পোশাক, সেবাখাত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জাতীয় উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুললে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, ই-কমার্স, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল সেবায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলাদেশের বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা গেলে জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
- শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন: দক্ষ মানবসম্পদ একটি আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি, আর যুবসমাজই সেই মানবসম্পদের প্রধান উৎস। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, প্রশাসন ও কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণরা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও উৎপাদনশীল সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। তাই শিক্ষিত ও দক্ষ যুবশক্তিই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
- প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং, গবেষণা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ডিজিটাল অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার সেবার মান উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
- গণতন্ত্র, সুশাসন ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: সচেতন ও দায়িত্বশীল যুবশক্তি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দুর্নীতি, বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি, গঠনমূলক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সুশাসনকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে তরুণদের নেতৃত্বের বিকাশ ভবিষ্যতের দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক ও নীতিনির্ধারক তৈরিতে সহায়ক।
- সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক সমাজ নির্মাণ: বাল্যবিবাহ, যৌতুক, মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তরুণদের সচেতন ভূমিকা সমাজকে আরও প্রগতিশীল করে। শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসচেতনতা, রক্তদান, স্বেচ্ছাসেবা এবং অসহায় মানুষের সহায়তায় তাদের অংশগ্রহণ সামাজিক সংহতি ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে। এভাবে যুবশক্তি একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ মোকাবিলা: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য পরিবেশসচেতন যুবশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃক্ষরোপণ, নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ, প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। পাশাপাশি বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, জনসচেতনতা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাষ্ট্রের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
যুবশক্তির বর্তমান সংকট ও অন্তরায়সমূহ:
রাষ্ট্র নির্মাণে যুবশক্তির অপার সম্ভাবনা ও অদম্য শক্তি থাকলেও, বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারা বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মুখোমুখি। যুবশক্তির বিকাশে প্রধান প্রধান অন্তরায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো
- বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব: বর্তমান যুবশক্তির সবচেয়ে বড় সংকট হলো তীব্র কর্মসংস্থানহীনতা। আমাদের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে বাস্তবমুখী কর্মবাজারের চাহিদার ব্যাপক অমিল রয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর উচ্চশিক্ষিত যুবকদের একটি বিশাল অংশ বেকার বা অর্ধ-বেকার থেকে যাচ্ছে, যা দেশপ্রেমিক তরুণদের বাধ্য করছে বিদেশে পাড়ি জমাতে এবং রাষ্ট্রকে 'ব্রেন ড্রেন' বা মারাত্মক মেধা পাচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
- মানসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব: আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো বহুলাংশে তত্ত্বীয় ও মুখস্থনির্ভর। এটি তরুণদের সৃজনশীল হতে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে বাধা দিচ্ছে। আধুনিক যুগের উপযোগী প্রযুক্তিগত, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় প্রথাগত ডিগ্রি অর্জন করেও তরুণরা বৈচ্ছিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
- মাদকাসক্তি, হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয়: মাদকের সহজলভ্যতা, বেকারত্ব, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং সুস্থ বিনোদনের সীমিত সুযোগ তরুণদের একটি অংশকে মাদকাসক্তি ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে।
- প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সাইবার ঝুঁকি: ডিজিটাল প্রযুক্তি যুবশক্তির সামনে অসীম সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও এর অপব্যবহার উদ্বেগের কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি, গুজব ও ভুয়া তথ্য প্রচার, অনলাইন প্রতারণা এবং সাইবার অপরাধে সম্পৃক্ততা তরুণদের সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
- সুযোগের বৈষম্য ও মেধাপাচার: শহর ও গ্রামের তরুণদের মানসম্মত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগে বৈষম্য রয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন ও উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে অনেক মেধাবী তরুণ বিদেশমুখী হয়। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের মেধাপাচার রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংকট উত্তরণে রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়:
যুবশক্তিকে রাষ্ট্র কাঠামোর সঙ্গে সুসংগঠিতভাবে যুক্ত করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে:
- শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও কর্মমুখী রূপান্তর: আমাদের প্রচলিত সনাতন ও তত্ত্বসর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে শিক্ষাক্রমকে সম্পূর্ণ কর্মমুখী, কারিগরি, বৃত্তিমূলক এবং আইসিটি ভিত্তিক করতে হবে। তাত্ত্বিক ডিগ্রির চেয়ে বাস্তবমুখী দক্ষতার ওপর জোর দিলে তরুণরা পড়ালেখা শেষ করেই সরাসরি কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।
- ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সহজ ঋণ সুবিধা: তরুণদের কেবল চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে 'চাকরিদাতা' বা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্যে নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে, কম সুদে এবং জামানতবিহীন 'স্টার্ট-আপ ঋণ' ব্যবস্থার পরিধি বাড়াতে হবে। একই সাথে তরুণদের যুগোপযোগী ব্যবসায়িক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
- মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলা: যুবশক্তিকে ক্ষতিকর মাদকাসক্তি, অপরাধ ও মনস্তাত্ত্বিক হতাশা থেকে দূরে রাখতে প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের মানসিক সুস্থতার দিকে বিশেষ নজর দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ সহজলভ্য করা প্রয়োজন, যা তাদের ইতিবাচক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করবে।
- নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়গুলোতে, যেমন: জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার কিংবা রাষ্ট্রীয় থিংক-ট্যাংকগুলোতে যোগ্য ও মেধারী তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দিলে রাষ্ট্রীয় নীতিতে তারুণ্যের প্রকৃত কণ্ঠস্বর, নতুন আইডিয়া ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, যা রাষ্ট্র সংস্কারে গতি আনবে।
উপসংহার:
যুবশক্তি একটি রাষ্ট্রের কেবল জনসংখ্যা নয়, তারা রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং চালিকাশক্তি। বায়ান্নর রক্ত আর একাত্তরের স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে একটি বৈষম্যহীন, উন্নত ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনে যুবশক্তির কোনো বিকল্প নেই। কবি সুকান্তের ভাষায় বলতে হয়- "এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।" রাষ্ট্রকে যুবশক্তির মেধার মূল্যায়ন করতে হবে এবং তরুণদেরও সস্তা আবেগ ও মোহের ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। রাষ্ট্র ও যুবশক্তির এই যুগলবন্দী সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল একটি স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব।