কবিগান বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতের ধারা, যেখানে দুজন কবি বা গায়কের দল উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে তাৎক্ষণিকভাবে গান ও ছন্দের মাধ্যমে বিতর্কে অংশ নেয়। এটি মূলত দুই পক্ষের মধ্যে প্রশ্ন-উত্তর, যুক্তি-তর্ক এবং ছড়ার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পরিবেশিত হয়, যা সাধারণত গ্রামীণ মেলা বা বিশেষ অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয়। এই গানের মাধ্যমে সামাজিক বার্তা, পৌরাণিক কাহিনী বা সমসাময়িক বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়। শ্রোতাদের বিনোদন এবং শিক্ষাদানের এটি একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।
কবিগান বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতির এক প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি এমন এক ধরনের গানের প্রতিযোগিতা, যেখানে দুজন কবি বা গায়ক তাদের দলবল সহ উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে তাৎক্ষণিকভাবে গান, ছড়া ও তর্কের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই প্রতিযোগিতায় এক পক্ষ প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং অন্য পক্ষ গানের মাধ্যমে তার উত্তর দেয়, যা প্রায়শই গভীর দার্শনিক, সামাজিক বা পৌরাণিক বিষয়বস্তু নিয়ে হয়ে থাকে। কবিগানের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রোতাদের বিনোদন দেওয়া, তবে এর মাধ্যমে সমাজকে বিভিন্ন বার্তা দেওয়া এবং জ্ঞান বিতরণও করা হয়। সাধারণত গ্রামীণ মেলা, পূজা-পার্বণ বা বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে কবিগানের আয়োজন করা হয়। এর জনপ্রিয়তা একসময় ব্যাপক থাকলেও, আধুনিক বিনোদনের প্রভাবে বর্তমানে এর প্রচলন কিছুটা কমেছে, তবে এখনও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলিতে এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন একজন খ্যাতিমান বাঙালি কবি ও লেখক। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ হলো রক্তরাগ, হাসনাহেনা, সাহারা, খোশরোজ, বনি আদম এবং আমারি স্বপ্ন। তিনি রূপের নেশা ও এক মন এক প্রাণ নামে দুটি উপন্যাসও রচনা করেছেন। এছাড়া তাঁর গদ্যগ্রন্থের মধ্যে বিশ্বনবী ও আমার চিন্তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেলীর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'দি ইভ অব ইস্টার'-এর অনুবাদও তিনি করেছিলেন।
‘কাঁশবনের কন্যা’ শামসুদ্দীন আবুল কালাম রচিত একটি বিখ্যাত আঞ্চলিক উপন্যাস। গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মানুষের সহজ-সরল জীবনের বিভিন্ন দিক এই উপন্যাসে দক্ষতার সাথে চিত্রিত হয়েছে। এটি লেখকের অন্যতম জনপ্রিয় সৃষ্টি এবং বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর একটি।
বাংলা কথ্যরীতিতে রচিত প্রথম গ্রন্থ হলো প্যারীচাঁদ মিত্রের 'আলালের ঘরের দুলাল'। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রচনা। এর পূর্বে বাংলা গদ্য সাহিত্য প্রধানত সংস্কৃত প্রভাবিত সাধু ভাষায় লেখা হতো। প্যারীচাঁদ মিত্র প্রচলিত কথ্যভাষা বা 'আলালী ভাষা' ব্যবহার করে একটি নতুন ধারার সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে চলিত রীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উপন্যাসে তৎকালীন বাঙালি সমাজের বাস্তব চিত্র, বিশেষ করে বিত্তবান পরিবারের সন্তানদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও তাদের পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছিল। পৌরাণিক, লৌকিক ও পৌরাণিক-লৌকিক সংমিশ্রিত দেব-দেবীর লীলামাহাত্ম্য, পূজা প্রচার ও ভক্তকাহিনি প্রভৃতি অবলম্বনে রচিত সম্প্রদায়গত প্রচারধর্মী ও আখ্যানমূলক কাব্য হলো মঙ্গলকাব্য। বিভিন্ন দেবদেবীর গুণগান এবং পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি মঙ্গলকাব্যের উপজীব্য। তবে 'মঙ্গল' কথাটি থাকলেও 'চৈতন্যমঙ্গল', 'গোবিন্দমঙ্গল' প্রভৃতি মঙ্গলকাব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়; এগুলো বৈষ্ণব সাহিত্যের অংশ। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে, প্রায় ৬২ জন কবি মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন।
মঙ্গলকাব্য
বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্যই মঙ্গলকাব্য। এটি রচনার মূল কারণ স্বপ্নদেবী কর্তৃক আদেশ লাভ। 'মঙ্গল' শব্দের অর্থ কল্যাণ। যে কাব্যে দেবতার আরাধনা বা মাহাত্ম্য-কীর্তন করা হয়; যে কাব্য শ্রবণ করলেও মঙ্গল হয় বা ঘরে রাখলেও মঙ্গল হয় অথবা ৮ দিনে অর্থাৎ এক মঙ্গলবার শুরু হতো এবং পরবর্তী মঙ্গলবার শেষ হতো, তাকেই বলা হয় মঙ্গলকাব্য। মূলত, লৌকিক দেব-দেবী নিয়ে রচিত কাব্যই মঙ্গলকাব্য। মঙ্গলকাব্যের মূল উপজীব্য: দেব-দেবীর গুণগান। এতে স্ত্রী দেবতাদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কাব্যগুলোর নামকরণ করা হত যে দেবতার পূজা প্রচারের জন্য কাব্যটি রচিত সে দেবতার নামানুসারে।
মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনি
চম্পক নগরের অধীশ্বর বণিক চাঁদ সওদাগর। জগতপিতা শিবের মহাভক্ত। চাঁদ জগতপিতা শিবের থেকে মহাজ্ঞান লাভ করেছেন। মানুষের পূজা ব্যতীত দেবত্ব অর্জন সম্ভব নয়, তাই মনসা চাঁদের কাছে পূজা চাইলেন। শিবভিন্ন অপর কাউকে পূজা করতে চাঁদ প্রত্যাখ্যান করলেন। এমনকি পত্নী সনকার মনসার ঘটে হেঁতালদণ্ড দিয়ে আঘাত করেন। পরিণামে মনসা কৌশলে চাঁদের মহাজ্ঞান হরণ করেন এবং ছয়পুত্রকে বিষ দিয়ে হত্যা করেন। তারপর সমুদ্রপথে চাঁদের বাণিজ্যতরী সপ্তডিঙা মধুকর ডুবিয়ে চাঁদকে সর্বস্বান্ত করেন। চাঁদ কোনোক্রমে প্রাণরক্ষা করেন। মনসা ছলনা করে স্বর্গের নর্তকদম্পতি অনিরুদ্ধ-ঊষাকে মর্ত্যে পাঠালেন। অনিরুদ্ধ চাঁদের ঘরে জন্ম নেয় লখিন্দর রূপে, আর উজানী শহরে সাধুবণিকের ঘরে বেহুলারূপে ঊষা জন্ম নেয়। বহুকাল পরে সহায় সম্বলহীন চাঁদ চম্পক নগরে পাগল বেশে আসে। অবশেষে পিতা পুত্রের মিলন ঘটল। বেহুলার সাথে লখিন্দরের বিবাহ স্থির হল। মনসা বৃদ্ধা বেশে এসে ছল করে বেহুলাকে শাপ দিল, 'বিভা রাতে খাইবা ভাতার'। সাতালি পর্বতে লোহার বাসরঘর বানানো হল। ছিদ্র পথে কালনাগিনী ঢুকে লখিন্দরকে দংশন করল। বেহুলা স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে কলার ভেলায় ভেসে পাড়ি দিল। বহু বিপদ অতিক্রম করে অবশেষে নেতো ধোবানির সাহায্যে দেবপুরে পৌছে নাচের মাধ্যমে দেবতাদের তুষ্ট করল। তখন দেবতাদের আদেশে মনসা সব ফিরিয়ে দিল। বেঁচে উঠলো লখিন্দর, ভেসে উঠলো চৌদ্দ ডিঙা। চাঁদ পাগলের মত ছুটে আসলো বেহুলার কাছে। এসে শুনলো যে তাকে মনসার পূজা করতে হবে। কিন্তু এ শর্ত চাঁদ প্রত্যাখান করলো। বেহুলা গিয়ে কেঁদে পড়ল চাঁদের পায়ে এবং চাঁদ বেহুলার অশ্রুর কাছে পরাজিত হল। চাঁদ হেলাভরে মুখ ফিরিয়ে বাঁ হাতে একটি ফুল ছুড়ে দিল। মনসা এতেই খুশি। মর্ত্যবাসের মেয়াদ ফুরালে বেহুলা-লখিন্দর আবার ইন্দ্রসভায় স্থান পেল। আর পৃথিবীতে প্রচারিত হলো মনসার পূজা।
মঙ্গলকাব্যের সাধারণ লক্ষণ / বৈশিষ্ট্যগুলো
বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্যই মঙ্গলকাব্য। নিম্নে এর সাধারণ লক্ষণ /বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচিত হলো। ১. প্রায় সব কবি স্বপ্নে দেবতার নির্দেশ পেয়ে কাব্য রচনা করেছেন। ২. প্রথমেই সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশের বন্দনা। ৩. কাব্যের অধিকাংশ ঘটনা সাধারণ নয়, অসাধারণ। ৪. মঙ্গলকাব্যের নায়ক-নায়িকারা সবাই শাপভ্রষ্ট দেবতা, শাপান্তে স্বর্গে ফিরে যান। ৫. মর্ত্যে পূজা প্রচারের সময় দেবতাদের আচরণ মানুষের মতো।
মঙ্গলকাব্যে প্রধান শাখা ৪টি। যথা: ক. মনসামঙ্গল খ. চণ্ডীমঙ্গল গ. অন্নদামঙ্গল ঘ. ধর্মমঙ্গল।
মঙ্গলকাব্যের অংশ
মঙ্গলকাব্যের অংশ ৪টি। যথা: ক. বন্দনা খ. আত্মপরিচয় ও গ্রন্থ উৎপত্তির কারণ গ. দেবখণ্ড ঘ. নরখণ্ড।
Notes:
আদি মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গল। এটি মনসা দেবীর কাহিনি নিয়ে রচিত। এর অপর নাম 'পদ্মপুরাণ'।
মঙ্গলকাব্যের / মনসামঙ্গলের আদি কবি কানাহরি দত্ত।
সাপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসার অপর নাম কেতকী ও পদ্মাবতী। অস্ট্রিক সমাজের লৌকিক ভয়ভীতি থেকেই এ দেবীর উদ্ভব।
সাপের অধিষ্ঠাত্রী মনসা দেবীর কাহিনি নিয়ে মনসামঙ্গল কাব্য রচিত। এ কাব্য মোট ৮ দিনে পরিবেশন করা হতো। শেষ দিনে পরিবেশন করা অংশকে বলা হয় 'অষ্টামঙ্গল'। নিয়তির বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ এ কাব্যকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।
মনসামঙ্গল কাব্যের প্রতিনিধিস্থানীয় ও শ্রেষ্ঠ কবি হলেন বিজয়গুপ্ত। বরিশাল জেলার ফতেহাবাদের ফুল্লশ্রী গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম সুস্পষ্ট সন-তারিখযুক্ত মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা। তাঁর রচিত মনসামঙ্গল কাব্যগ্রন্থের একটি অংশের নাম 'পদ্মপুরাণ'। শ্রাবণ মাসের মনসাপঞ্চমীতে স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের শাসনামলে ১৪৯৪ সালে তিনি কাব্য রচনায় প্রবৃত্ত হন।
মনসামঙ্গলের জনপ্রিয়তার জন্য বিভিন্ন কবির রচিত কাব্য থেকে বিভিন্ন অংশ সংকলিত করে যে পদসংকলন রচনা করা হয়েছিল তাই বাংলা সাহিত্যে বাইশ কবির মনসামঙ্গল বা বাইশা নামে পরিচিত।
'বারোমাসী' বা 'বারোমাস্যা' শব্দের অর্থ পুরো এক বছরের বিবরণ। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের লৌকিক কাহিনি বর্ণনায় নায়ক-নায়িকাদের বারো মাসের সুখ-দুঃখের বিবরণ প্রদানের রীতি দেখা যায়, একেই 'বারোমাসী' বা 'বারোমাস্যা' বলে।
বিপন্ন নায়ক-নায়িকা চৌত্রিশ অক্ষরে ইষ্টদেবতার যে স্তব রচনা করে, তাকে বলে 'চৌতিশা'। ব্যঞ্জনবর্ণ ('ক' থেকে 'হ') পদের আদিতে প্রয়োগ করে 'চৌতিশা' রচিত হতো।
মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যান্য কবি / রচয়িতা:
নারায়ণ দেব: কিশোরগঞ্জ জেলার বোর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পনের শতকের কবি বলে ধারণা করা হয়। তার রচিত গ্রন্থের নাম 'পদ্মপুরাণ'।
দ্বিজ বংশীদাস: মনসামঙ্গল কাব্য ধারার অন্যতম কবি দ্বিজ বংশীদাস বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর পিতা। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার পাতোয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
ক্ষেমানন্দ: এ ধারার অন্যতম জনপ্রিয় কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ। কেতকাদাস তার উপাধি। তার কাব্যে মুকুন্দরাম ও রামায়ণের কাহিনির প্রভাব সুস্পষ্ট।
'মনসামঙ্গল' কাব্যের ৩ জন কবি হলেন: কানাহরি দত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই।
চণ্ডীমঙ্গল
চণ্ডীমঙ্গলের আদি কবি মানিক দত্ত।
চণ্ডীমঙ্গলের প্রধান কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তিনি ষোল শতকের কবি ছিলেন। তাঁর রচিত কাব্যের নাম 'শ্রী শ্রী চণ্ডীমঙ্গল'। তাঁকে দুঃখ বর্ণনার কবি হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ জমিদার রঘুনাথ রায় 'কবিকঙ্কন' উপাধি প্রদান করেন। মুকুন্দরামের জনপ্রিয় কাহিনিকাব্য 'কালকেতু উপাখ্যান'।
চণ্ডীদেবীর কাহিনি এটি দুই খণ্ডে বিভক্ত। প্রথমটি আখেটিক বা ব্যাধ কালকেতু-ফুল্লরার কাহিনি এবং দ্বিতীয়টি বণিক বা ধনপতি সওদাগরের কাহিনি।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের দ্বিজ মাধবকে 'স্বভাব কবি' বলা হয়। তাঁর রচিত কাব্যের নাম 'সারদামঙ্গল' (১৫৭৯)।
কালকেতু-ফুল্লরার কাহিনি: দেবীর অনুরোধে শিব তার ভক্ত নীলাম্বরকে শাপ দিয়ে মর্ত্যলোকে পাঠান। নীলাম্বর কালকেতু হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। কালকেতুর যৌবনপ্রাপ্তির পর তার পিতা ধর্মকেতু ফুল্লরার সাথে বিবাহ দেন। ব্যাধ কালকেতুর অতি দরিদ্র কিন্তু সুখী সংসার। এদিকে কালকেতুর শিকারে প্রায় নির্মূল কলিঙ্গের বনের পশুদের আবেদনে কাতর হয়ে দেবী স্বর্ণগোধিকা রূপে কালকেতুর শিকারে যাবার পথে প্রকট রূপ ধারণ করেন। কালকেতু শিকারে যাবার সময় অমঙ্গলজনক গোধিকা দেখার পর কোন শিকার না পেয়ে ক্রুব্ধ হয়ে গোধিকাটিকে ধনুকের ছিলায় বেঁধে ঘরে নিয়ে আসেন। কালকেতু গোধিকাকে ঘরে বেঁধে পত্নীর উদ্দেশ্যে হাটে রওনা হন। হাটে ফুল্লরার সাথে দেখা হলে তাকে গোধিকার ছাল ছাড়িয়ে শিক পোড়া করতে নির্দেশ দেন। ফুল্লরা ঘরে ফিরলে, দেবী এক সুন্দরী যুবতীর রূপে ফুল্লরাকে দেখা দিলেন। ফুল্লরার প্রশ্নের উত্তরে দেবী জানালেন যে, তার স্বামী ব্যাধ কালকেতু তাকে এখানে এনেছেন এবং তিনি এ গৃহেই কিছুদিন বসবাস করতে চান। দেবীকে তাড়াতে ফুল্লরা নিজের বারমাসের দুঃখ কাহিনি বিবৃত করলেন, তবুও দেবী অটল। শেষ পর্যন্ত ফুল্লরা ছুটলেন হাটে, স্বামীর সন্ধানে। উভয়ে গৃহে ফেরার পর দেবীকে বুঝিয়ে বললেও উল্টো দেবী বলে, সে কালকেতুকে ধন-দৌলত দিয়ে গুজরাটের রাজা করতে চায়। একথা শুনে কালকেতু ক্ষিপ্ত হয়ে দেবীকে তির (শর) মারতে চাইলেও পরে সে শর্ত দেয় যে, যদি সে আশ্বিন মাসে যেরূপে চণ্ডী আবির্ভূত হয় এবং মানুষ তাকে পূজা করে, সেরূপ ধারণ করলে তবেই কালকেতু দেবীকে বিশ্বাস করবে। অতঃপর চণ্ডী সেই রূপ ধারণ করে। এরূপ দেখে কালকেতু ও ফুল্লরা মূর্ছা যায়। দেবীর কৃপায় তাদের মূর্ছা ভাঙলে তারা সব বিশ্বাস করে। দেবীর অনুগ্রহে কালকেতু ধনী হয়ে পশু শিকার ত্যাগ করে। বনের পশুরাও নিশ্চিন্তে বসবাস করতে লাগল। দেবীর আশীর্বাদে কালকেতু ৭ ঘড়া ধনলাভ করে বন কেটে গুজরাট নগর পত্তন করেন। গুজরাট নগরে নবাগতদের মধ্যে ভাঁড়ুদত্ত নামে ছিল এক প্রতারক। প্রথমে কালকেতু তাকে বিশ্বাস করলেও প্রজাদের প্রতি অত্যাচার করায় তাকে তাড়িয়ে দেন। ভাঁড়ুদত্ত কলিঙ্গের রাজার কাছে গিয়ে তাকে কালকেতুর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে। কলিঙ্গের সেনাপতি গুজরাট আক্রমণ করে কালকেতুকে বন্দী করেন। কিন্তু দেবীর কৃপায় কালকেতু মুক্তি পান এবং কাল পূর্ণ হলে ফুল্লরাসহ স্বর্গে ফিরে যান।
অন্নদামঙ্গল
অন্নদামঙ্গল ধারার প্রধান কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (১৭১২-১৭৬০)। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাগরিক কবি এবং মঙ্গলযুগের শেষ কবি। তিনি নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে 'অন্নদামঙ্গল' (১৭৫২-৫৩) কাব্য রচনা করেন। 'সত্য পীরের পাঁচালী' (১৭৩৭-৩৮) তাঁর রচিত অন্যতম গ্রন্থ। ১৭৬০ সালে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে। 'রায়গুণাকর' ভারতচন্দ্রের উপাধি।
অন্নদামঙ্গল কাব্য টি খণ্ড। যথা:
১. শিবনারায়ণ অন্নদামঙ্গল,
২. বিদ্যাসুন্দর কালিকামঙ্গল,
৩. মানসিংহ-ভবানন্দ অন্নদামঙ্গল। [এ তিনটি খণ্ডেই দেবী অনুদার বন্দনা আছে।]
'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের কাহিনি সংক্ষেপেঃ
নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ৩টি খণ্ডে 'অন্নদামঙ্গল' কাব্য রচনা করেন। প্রথম খণ্ডের উপাখ্যানে সতীর দেহত্যাগ ও উমারূপে জন্মগ্রহণ, শিবের সঙ্গে বিয়ে ও ঘরকন্না, অন্নপূর্ণা মূর্তিধারণ, কাশী প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি পৌরাণিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এরপরে বসুন্ধর ও নলকুবেরের হরিহোড় ও ভবানন্দ মজুমদাররূপে মর্ত্যে আগমন, দেবীর হরিহোড়ের গৃহে প্রবেশ এবং শেষে হরিহোড়ের গৃহ পরিত্যাগ করে ভবানন্দের গৃহে গমন পর্যন্ত প্রথম খণ্ডের কাহিনি বিদ্যমান। দ্বিতীয় খণ্ড বিদ্যাসুন্দরের কাহিনি। বর্ধমানের রাজা বীরসিংহের সুন্দরী কন্যা বিদ্যা ও কাঞ্চীর রাজকুমার সুন্দর এর প্রেমকাহিনি বর্ণিত হয়েছে।
তৃতীয় খণ্ডের কাহিনি মানসিংহের যশোর গমন, দেবীর অনুগ্রহে ভবানন্দ মজুমদারের সাহায্যে রাজা প্রতাপাদিত্যের পরাজয় এবং ভবানন্দের দিল্লি গমন। ভবানন্দ সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে দেবীর প্রশংসা করলে বাদশাহ হিন্দু ধর্মও দেবী সম্পর্কে কটূক্তি করেন এবং ভবানন্দকে বন্দি করেন। পরে দেবীর কৃপায় সম্রাট জাহাঙ্গীর বাধ্য হয়ে ভবানন্দকে মুক্তি দিয়ে 'রাজা' উপাধি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ভবানন্দ কিছুকাল রাজত্ব করে পরলোকগমন করেন। এ খন্ডে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর জাহাঙ্গীর, মানসিংহ ও ভবানন্দসহ অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছেন।
ধর্মমঙ্গল
ধর্মমঙ্গল কাব্যে ধর্মঠাকুরের জয়গান ধ্বনিত হয়েছে । ধর্মঠাকুর নামে কোনো এক পুরুষ দেবতার পূজা হিন্দু সমাজের নিচু স্তরের লোকদের বিশেষত ডোম সমাজে প্রচলিত ছিলো। ধর্মঠাকুর প্রধানত দাতা, নিঃসন্তান নারীকে সন্তান দান করেন, অনাবৃষ্টি হলে ফসল দেন, কুন্ঠ রোগীকে রোগ থেকে মুক্ত করেন। ধর্মঠাকুরকে কেন্দ্র করে যে কাব্যধারা রচিত হয় তাই ধর্মমঙ্গল কাব্য।
ধর্মমঙ্গল কাব্যের আদি কবি ময়ূরভট্ট। তাঁর রচিত কাব্যের নাম 'হাকন্দপুরাণ'। এ কাব্যের আরও দুজন প্রখ্যাত কবি হলেন- রূপরাম চক্রবর্তী ও ঘনরাম চক্রবর্তী। ঘনরাম চক্রবর্তী অষ্টাদশ শতকের মঙ্গলকাব্যের শ্রেষ্ঠকবি। তাঁর রচিত কাব্যের নাম ‘শ্রী ধর্মমঙ্গল’ ।
ধর্মমঙ্গল কাব্য ২টি পালায় বিভক্ত ।
যথা:
১. রাজা হরিশচন্দ্রের কাহিনি, ২. লাউসেনের কাহিনি।
কালিকামঙ্গল
কালিকামঙ্গল কাব্যে দেবী কালীর স্তুতি করা হয়েছে । এ কাব্য 'বিদ্যাসুন্দর' নামেও অভিহিত যা সাবিরিদ খান কর্তৃক রচিত। সাবিরিদ খান কর্তৃক রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ 'রসুল বিজয়'। প্রকৃতপক্ষে এটি মঙ্গলকাব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। দেবী কালীর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা এর মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। রাজকুমার 'সুন্দর' ও বীরসিংহের অপরূপা কন্যা 'বিদ্যা'র গুপ্ত প্রণয়কাহিনি এ কাব্যের প্রধান উপজীব্য। এগার শতকের কাশ্মীরের বিখ্যাত সংস্কৃত কবি বিলহন এর কাব্য 'চৌরপঞ্চাশিকা' অবলম্বনে কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর কাব্য রচিত।
কালিকামঙ্গল কাব্যের আদি কবি কবি কঙ্ক। সাবিরিদ খান ও রামপ্রসাদ সেন এ কাব্যের বিখ্যাত কবি। রামপ্রসাদ সেন শ্যামাসংগীত রচনায় পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর উপাধি 'কবিরঞ্জন'।
শিবমঙ্গল কাব্য
কৃষিভিত্তিক সমাজ জীবনে বৈদিক দেবতা রুদ্র শিবের রূপ ধারণ করে। বাঙালি হিন্দুদের জীবনে শিব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বাঙালির সুখ-দুঃখ ভরা সংসারের কথা স্থান পেয়েছে শিবমঙ্গল কাব্যে। পৌরাণিক ও লৌকিক উপাদান মিশ্রিত হয়ে শিবমঙ্গল বা শিবায়ন কাব্য রচিত।
শিবমঙ্গল কাব্যের প্রথম কবি রামকৃষ্ণ রায়।
এ ধারার প্রথম কাব্য দ্বিজ রতিদেব রচিত 'মৃগলুব্ধ' (১৬৭৪)।
এ ধারার শ্রেষ্ঠ কাহিনি রচয়িতা রামেশ্বর ভট্টাচার্য। তার রচিত কাব্যের নাম 'শিবকীর্তন'।
এ ধারার অন্যান্য কবি- দ্বিজ কালিদাস, দ্বিজ মণিরাম প্রমুখ।
অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিখ্যাত পঙ্ক্তি:
→ ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’
→ ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’
→ ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।’
→ ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ! ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ।’
উত্তরঃ
বিজয়গুপ্তর দেশ বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রাম। তিনি মনসামঙ্গল উপাখ্যান নিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কাব্য রচনা করেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বিজয়গুপ্ত। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ঐতিহাসিকরা মনে করেন তাঁর জন্ম অধুনা বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রামে। এটি একটি জনশ্রুতি যা তাঁর কাব্যেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বিজয়গুপ্ত মূলত মনসামঙ্গল কাব্যের একজন প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর রচিত মনসামঙ্গল কাব্য 'পদ্মাপুরাণ' নামেও পরিচিত। এই কাব্যের মূল উপাখ্যান হলো দেবী মনসার মর্ত্যলোকে পূজা প্রচলন এবং চাঁদ সদাগরের সাথে তাঁর সংঘাত। তিনি মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে (১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বা ১৪৮৪ শকাব্দে কাব্য রচনা সমাপ্ত হয় বলে কাব্যে উল্লেখ আছে)।
মনসামঙ্গল কাব্যধারার পঞ্চকবিদের মধ্যে বিজয়গুপ্ত অন্যতম এবং তাঁর কাব্য সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও বিস্তারিত বলে বিবেচিত হয়। এই কাব্য মধ্যযুগের বাংলার সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে, যেখানে লৌকিক দেব-দেবী এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের মধ্যে সংঘাত ও সমন্বয়ের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় কারণ তিনি বাংলা গদ্যকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ ও শৃঙ্খলা দান করেন। এর আগে বাংলা গদ্যে তেমন কোনো নিয়মশৃঙ্খলা ছিল না এবং এটি সাধু ভাষার কঠোরতা ও সংস্কৃতের প্রভাবযুক্ত ছিল।
তিনি বাংলা গদ্যে যেসব উল্লেখযোগ্য সংযোজন করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো:
বিরামচিহ্নের প্রবর্তন ও সঠিক ব্যবহার: আধুনিক বাংলা গদ্যে কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি বিরামচিহ্নের ব্যবহার তিনিই প্রথম সুসংবদ্ধভাবে চালু করেন, যা গদ্যের অর্থ ও পঠনযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
সরল ও প্রাঞ্জল বাক্যবিন্যাস: বিদ্যাসাগর কঠিন ও জটিল বাক্যকে সহজ-সরল ও সুপাঠ্য বাক্যবিন্যাসে রূপান্তরিত করেন, যা সাধারণ পাঠকের জন্য গদ্যকে সহজলভ্য করে তোলে।
গদ্যের শৈল্পিকতা ও গতিশীলতা: তিনি বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতের প্রভাবমুক্ত করে এক নতুন শিল্পরূপ দেন। তাঁর গদ্য ছিল সাবলীল, গতিময় ও সুমধুর।
নির্দিষ্ট কাঠামো ও রূপ: তাঁর হাতেই বাংলা গদ্য প্রথম একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও শৈলী লাভ করে, যা পরবর্তী গদ্য লেখকদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়।
তাঁর রচিত 'বেতাল পঞ্চবিংশতি', 'শকুন্তলা', 'সীতার বনবাস' ইত্যাদি গ্রন্থগুলি বাংলা গদ্যের বিকাশে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
কারবালার বিষাদময় ঘটনা অবলম্বনে মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) ইংরেজ আমলে 'বিষাদ সিন্ধু' মহাকাব্য রচনা করেন। এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ শোকগাথা। গ্রন্থটি মূলত তিনটি খণ্ডে বিভক্ত:
প্রথম খণ্ড: মহরম পর্ব (১৮৮৫)
দ্বিতীয় খণ্ড: উদ্ধার পর্ব (১৮৮৭)
তৃতীয় খণ্ড: এজিদ বধ পর্ব (১৮৯১)
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়ে লেখক কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী রূপে উপস্থাপন করেছেন, যা বাংলা সাহিত্য ও মুসলিম সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
'চণ্ডীমঙ্গল কাব্য' মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় কাব্য। এর রচয়িতা কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। কাব্যটি আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৫৪০-১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দ) রচিত হয়েছিল।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর কাব্যে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য প্রচার করেছেন। এটি দুটি প্রধান খণ্ডে বিভক্ত: আখেটি খণ্ড (বুনো খণ্ড) এবং বণিক খণ্ড (শহুরে খণ্ড)। আখেটি খণ্ডে কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান এবং বণিত খণ্ডে ধনপতি ও শ্রীমন্ত সওদাগরের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। এই কাব্যটি তৎকালীন গ্রামীণ বাংলার সমাজচিত্র, জনজীবন, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কারের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ভাষাশৈলী, চরিত্রায়ণ এবং হাস্যরস কাব্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে।
ভানুসিংহ ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছদ্মনাম। তিনি এই ছদ্মনামে "ভানুসিংহের পদাবলী" নামক একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই কাব্যগ্রন্থটি মূলত বৈষ্ণব পদাবলীর ঢঙে লেখা একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে গঠিত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কৈশোরকালে বৈষ্ণব সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই কবিতাগুলো লেখেন, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিরহ ও মিলনকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। এটি বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রাথমিক কাব্যপ্রতিভার এক অনন্য নিদর্শন এবং একটি স্বতন্ত্র সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এটি বিখ্যাত সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'মহেশ' গল্পের একটি অংশ। এই গল্পে দরিদ্র কৃষক গফুরের একমাত্র অবলম্বন ছিল তার প্রিয় বলদ মহেশ। গফুর মহেশকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতো এবং মহেশও ছিল গফুরের অত্যন্ত অনুগত। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, বিশেষত খরা ও অভাবের কারণে গফুর মহেশকে ঠিকমতো খেতে দিতে পারছিল না, যার ফলস্বরূপ মহেশকে চূড়ান্ত দুঃখজনক পরিণতির শিকার হতে হয়।
গল্পটি গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, মানুষের প্রতি পশুর নিবিড় ভালোবাসা, জমিদারী প্রথার শোষণ এবং তৎকালীন সমাজের নির্মম বাস্তবতাকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরে। এটি শরৎচন্দ্রের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সৃষ্টি।