যে কোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা কর :

Updated: 9 months ago
উত্তরঃ

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তার প্রতিকার 
অথবা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

[ সংকেত : ভূমিকা; প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বাংলাদেশের অবস্থান এবং দুর্যোগ; প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বন্যা; সাইক্লোন ও জলােচ্ছাস; ঝড়-ঝঞা; অনাবৃষ্টি বা খরা; নদী ভাঙন; ভূমিকম্প; লবণাক্ততা; প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরােধের উপায় বা দুর্যোগ মােকাবিলা করার উপায়; দুর্যোগ মােকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা; দুর্যোগ মােকাবিলায় সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাবলি; উপসংহার । ]

ভূমিকা : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রায় প্রতিবছর কোনাে না কোনাে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। 

 



প্রাকৃতিক দুর্যোগ : যেসব ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে ব্যাহত করে, মানুষের সম্পদ ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে এবং যার জন্য আক্রান্ত জনগােষ্ঠীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টার মাধ্যমে মােকাবিলা করতে হয় তাদের দুর্যোগ বলে । আর প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট দুর্যোগকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হয়।

 



বাংলাদেশের অবস্থান এবং দুর্যোগ : হিমালয় ও ভারত থেকে নেমে আসা ৫৪টি নদী, বিশাল পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার প্রবাহের সাথে মিশে শত শত নদী বয়ে গেছে এদেশের ওপর দিয়ে। নদী মিশেছে সাগরে। মূলত নদীবাহিত পলিমাটিতে তৈরি একটি বদ্বীপ এই বাংলাদেশ। এর সঙ্গে মিলেছে বঙ্গোপসাগর থেকে ওঠা উপকূলীয় অঞ্চল এবং দ্বীপসমূহ। বাংলাদেশের দক্ষিণাংশ জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর । ফলে সাগরে ঝড় উঠলে তা প্রবল বেগে ধেয়ে আসে উপকূলে। সঙ্গে ভয়ংকর জলােচ্ছাস ৮/১০ ফট উচ হয়ে আছড়ে পড়ে, মুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উপকূলীয় অঞ্চলের বাড়িঘর

 


মানুষ, গবাদিপশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় ভেঙে পড়ে গাছপালা । ঐসব অঞ্চল পরিণত হয় এক বীভৎস মৃত্যুপুরীতে। যারা বেঁচে থাকে তাদের হাহাকারে আর স্বজন হারানাের বেদনায় আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। সর্বস্ব হারানাে নিঃস্ব মানুষগুলাের বেঁচে থাকাই যেন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

 



 প্রাকতিক দুর্যোগের কারণ : পরিবেশ দূষণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর বহু দেশে সৃষ্টি হচ্ছে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক কারণে হয়তাে হতে পারে। তবে বেশিরভাগ পরিবর্তন হচ্ছে মনুষ্য সৃষ্ট। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলাে। এদের অতি ভােগবিলাসিতা ও যন্ত্রনির্ভরশীলতার জন্য পৃথিবীতে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব দেশের কলকারখানা ও গাড়ি থেকে অতিমাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের ফলে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে তাপমাত্রা তাতে মেরু অঞ্চল ও বিভিন্ন পর্বতে জমে থাকা বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র ও নদীর কম্পন বাড়ছে ফলে নদী ও সমুদ্রের উপকূলে ভাঙনের হারও বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলাে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে । জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বেশিরভাগ নদী শুকিয়ে যাচ্ছে । পলি জমে বেশকিছু নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। দেশের প্রধান নদীগুলাে বিভিন্ন স্থানে এসে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মাধ্যমে হিমালয় থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশের নদীগুলােতে পানি এলেও এগুলাের স্রোতধারা অনেকটা কমে গেছে । ব্রহ্মপুত্রের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পদ্মার বুকেও বিভিন্ন স্থানে চর পড়ে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কার প্রভাবে গত তিন দশকে বাংলাদেশের ৮০টি নদীর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এক সময়ের খরস্রোতা নদী হিসেবে পরিচিত দেশের ১৭টি নদী মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। আরও ৮টি নদী মৃতপ্রায়। এসব নদী ড্রেজিং করে সচল করারও কোনাে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে বর্ষাকালে নদীর উপচে পড়া পানি প্লাবিত করে ফসলের মাঠ, জনবসতি। প্রতি বছরই বন্যা এদেশের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন উজাড় করাও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আরেকটি কারণ। প্রত্যেক দেশের মােট আয়তনের ২৫% বনাঞ্চল থাকা যেখানে প্রয়ােজন সেখানে বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে মাত্র ১৬% ভাগ বনাঞ্চল রয়েছে।

 



বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ : নদ-নদী, বন-বনানী, এল নিনাে ও লা-নিনার (প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে ঘটে যাওয়া এনসো (ENSO) চক্রের দুটি বিপরীত অবস্থা হল এল নিনো ও লা নিনা।) প্রভাবে এদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিনিয়ত হানা দেয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে : বন্যা, সাইক্লোন, জলােচ্ছ্বাস, ঝড়-ঝঞা, খরা, নদী ভাঙন, ভূমিকম্প, লবণাক্ততা ইত্যাদি।

বন্যা : প্লাবন বা বর্ষার ভয়াল রূপ হলাে বন্যা। বন্যার করাল গ্রাসে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে যায় । অসংখ্য মানুষ ও গৃহপালিত পশু প্রাণ হারায়, ঘর-বাড়ি ও কৃষিফসল বিনষ্ট হয়। বিগত চার দশক থেকে বন্যা বাংলাদেশের একটি বার্ষিক সমস্যায়। পরিণত হয়েছে। ১৯৪৫ ও ১৯৫৫ সালের বন্যা মানুষের মনে এখনও বিভীষিকারূপে বিরাজ করছে। ১৯৬৪ সালের বন্যায় সারা দেশ প্লাবিত হয়েছিল। ১৯৭০ সালেও দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭৪ ও ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ১৯৯৮ সালের বন্যাও ছিল ভয়াবহ। এসব বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানিসহ ফসল ও সম্পদের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয় । শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয় ১৯৯৮ সালে। এ দীর্ঘস্থায়ী মহাপ্লাবনে দেশের বহু ক্ষেতের ফসল, ঘর-বাড়ি ও মূল্যবান সম্পদের। মারাত্মক ক্ষতি হয়। স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হলাে ২০০৪ সালের বন্যা। এ বন্যায় দেশের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।

 



সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাস : সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাস এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ । এ দুর্যোগ প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশে কম-বেশি আঘাত হানে। বাংলাদেশে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ১৯৭০, ১৯৯১, ২০০৭ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্মরণকালের সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাস ছিল খুবই ভয়াবহ। এসব সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাসে ১৯৭০ সালে প্রায় ৫ লাখ, ১৯৯১ সালে প্রায় দেড় লাখ এবং ২০০৭ সালে প্রায় লক্ষাধিক লােকের প্রাণহানি ঘটে। আশ্রয়চ্যুত হয় লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ। এ সাইক্লোন ও জলােচ্ছ্বাসের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসহ যােগাযােগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ল ভন্ড হয়ে যায় সবকিছু। ফলে মানুষ পতিত হয় অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায়।

ঝড়-ঝঞা : গ্রীষ্মকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আমাদের দেশে প্রতি বছরই অনেক ঝড়-ঝঞা সংঘটিত হয়ে থাকে। এসব ঝড় সাধারণত বৈশাখ ও আশ্বিন মাসে হয়। ঝড়ের তাণ্ডব নৃত্যে এদেশের প্রচুর ঘর-বাড়ি এবং খেতের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।

 



অনাবৃষ্টি বা খরা : বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল । কিন্তু প্রকৃতির হেয়ালিপনার। শিকার এদেশ প্রায় প্রতি বছরই অনাবৃষ্টি বা খরার মতাে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পতিত হয়। খরার প্রচণ্ড তাপদাহে মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সংঘটিত খরার প্রকোপে ব্যাপক ফসলাদিসহ জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। খরার হিংস্র থাবার ফলে দেখা দেয় খাদ্যাভাব ও বিভিন্ন রােগ-শােক।

নদী ভাঙন : নদীমাতৃক বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে গেছে হাজারাে ছােটো-বড়াে নদী। নদীর ধর্মই হলাে— এপাড় ভেঙে ওপাড় গড়া। কিন্তু নদীর এ সর্বনাশা ভাঙন এক মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ । প্রতি বছরই এদেশের প্রচুর সম্পদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় । এ দুর্যোগের কবলে পড়ে এদেশের বহু লােককে তাদের ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করতে হয়।

 



ভূমিকম্প : প্রাকৃতিক দুর্যোগের এক ভয়াবহ রূপ হলাে ভূমিকম্প। বিভিন্ন কারণে এদেশে মাঝে মাঝে ছােটো-বড়াে ভূমিকম্প আঘাত হানে। তবে অন্যান্য বছরের মতাে ভূমিকম্প আঘাত হানলেও ২০১৫ সালের ভূমিকম্প ছিল ভয়ানক। একই সালে কয়েকবার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে বিভিন্ন এলাকায় দালানকোঠা ধসে যাওয়াসহ নানা ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। যদি ভূমিকম্পের মাত্রা বাড়ে তাহলে বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট ভেঙে পড়ে, যােগাযােগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ জানমালের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ভূ-তাত্ত্বিকরা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুরভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার আওতাভুক্ত।
 


লবণাক্ততা : সমুদ্র তীরবর্তী এদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলাে লবণাক্ততা। সমুদ্রের লবণাক্ত পানির প্রভাবে এদেশের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল লবণাক্ত থাকে। এতে কোনাে ফসল উৎপাদিত হয় না ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরােধের উপায় বা দুর্যোগ মোেকাবিলা করার উপায় : বিশ্বের সকল বিজ্ঞানীই একমত যে, জলবায়ু দূষণের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণেই প্রাকতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে। জলবায়ু দূষণের ক্ষেত্রে পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলােই বেশি দায়ী। বাংলাদেশসহ দরিদ্র দেশগুলাের দায় অনেক কম, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। কাজেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে বা একে মােকাবিলা করতে হলে সারা বিশ্বকেই একযােগে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের মতাে দরিদ্র দেশগুলাে রক্ষার জন্য শিল্পোন্নত দেশ গুলােকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সাহায্য দিতে হবে । তা দিয়ে সমদ্র উপকূলীয় দেশগুলাে উপকূলে উচু বাধ নির্মাণ করে। এবং বাধের ওপর ও আশপাশে ব্যাপক বনায়ন করে সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় ও জলােচ্ছ্বাসের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পেতে অনেকটা প্রতিরােধ গড়ে তােলা যায়। 

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মােকাবিলা করার জন্য নিমােক্ত উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে :

১। পৃথিবীর সব দেশ বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলাে যদি সমঝােতার মাধ্যমে অন্তত ১০/১৫ বছর গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে তাহলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে ।

২। গ্রিন হাউস গ্যাস কমাতে হলে জ্বালানি পােড়ানাে কমাতে হবে ।

৩। উন্নয়ন বান্ধব কার্বন কনটেন্ট বানাতে হবে ।

৪। জলবায়ু দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে শিল্পকারখানার মালিক ও জনগণকে সচেতন হতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিতে হবে ।

৫। কলকারখানার বর্জ্য ও শহরের মল-মূত্র এবং আবর্জনা সরাসরি নদীতে না ফেলে পরিশােধন করে ফেলতে হবে ।

৬। বায়ু দূষণ রােধকল্পে প্রতিটি দেশের মােট আয়তনের  শতকরা ২৫ ভাগ বনাঞ্চল থাকা  একান্ত আবশ্যক । কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৬% বলা হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে আছে ৯% থেকে ১০% । সুতরাং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অর্থাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য ব্যাপক ভাবে বনায়ন করতে হবে । বনভূমি উজাড়করণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগে গাছ।
কাটা বন্ধ করতে হবে।

৭। পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে বনাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে ।

৮। কৃষি জমি, জলাভূমি, পাহাড় ইত্যাদি ধ্বংস করে বসতবাড়ি বা কলকারখানা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে।

৯। দেশের ছােটো-বড়াে সকল নদীকে পর্যায়ক্রমে ড্রেজিং করে নাব্যতা বাড়াতে হবে ।

১০। যে নদী মরে গেছে বা যাচ্ছে সেগুলাে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ড্রেজিং করে নাব্যতা বাড়াতে হবে ।

১১। দুর্যোগ ঘটার পূর্বে জনগণকে সতর্ক করতে হবে ।

১২। সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে । সেজন্য প্রয়ােজনীয় নিরাপদ জায়গা বা বহুতল বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে ।

১৩। দুর্যোগ মােকাবিলায় নিয়ােজিত কর্মীবাহিনীকে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব কাজে এবং স্থাপনা নির্মাণে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সাহায্য নিতে হবে ।

দুর্যোগ মােকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মােকাবিলায় বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন সংস্থা, বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন রাজনীতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী দল, এমনকি সর্বস্তরের মানুষ তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা দুর্যোগ মােকাবিলায় বিভিন্ন কাজে নিয়ােজিত থাকে। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে— খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (UNICEF), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP), বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি (WFP), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংক্রান্ত হাইকমিশনারের দপ্তর (UNHCR)। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের প্রায় দুশ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন কাজে জাতিসংঘকে সহযােগিতা করে থাকে।

দুর্যোগ মােকাবিলায় সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাবলি : দুর্যোগ মানব জীবনে বয়ে আনে অবর্ণনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা । দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়-ক্ষতিতে দেশের অবকাঠামাে নড়বড়ে হয়ে যায়, অচল হয়ে যায় দেশের অর্থনীতির চাকা। তাই বাংলাদেশেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় ভিত্তিতে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে একটি জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কার্য পরিকল্পনা (NEMAP) গহীত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযােগী সংস্থার কাছেও সরকার প্রয়ােজনে সাহায্য-সহযােগিতা চেয়েছেন। বিশেষ করে ১৯৮৭, ৮৮ ও ৯৮’র বন্যা '৯১-এর ঘূর্ণিঝড় এবং ২০০৭-এর জলােচ্ছ্বাসে দুর্গতের জন্য বাংলাদেশের আহ্বানে ব্যাপক আকারে বৈদেশিক সাহায্য এসেছে।

উপসংহার : পাকতিক দুর্যোগ যেকোনাে দেশের মানুষের জন্য অভিশাপস্বরূপ। এটি কেবলই অনাকাক্ষিত ও অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার দিকে ঠেলে দেয় জনজীবনকে। বাংলাদেশের মতাে একটি সমতল ভূমিতে অবিরত দুর্যোগ সংঘটিত হয়ে এদেশের জাতীয় অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে, রুদ্ধ করছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। এ দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে মানুষের কোনাে হাত না থাকলেও সরকার এবং সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এর মােকাবিলা করার প্রয়াস চালাতে হবে।

MD AL AMIN
MD AL AMIN
3 years ago
উত্তরঃ

কৃষি উদ্যোক্তা

ভূমিকা: অর্থ বিনিয়ােগের মাধ্যমে এবং জনবল কাজে লাগিয়ে কোনাে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ উপার্জনের প্রত্যাশায় যখন কোনাে কাজ করার পরিকল্পনা করে, তখন তাকে উদ্যোগ বলে। যারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের বলে উদ্যোক্তা। প্রতিটি পেশাকে কেন্দ্র করে উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব। একজন উদ্যোক্তা আত্মনির্ভরশীল হন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। কৃষিকে উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন। বিপুল জনসংখ্যা, কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস, বেকারত্ব – এ সবকিছুর ভিতরে একদল তরুণ কৃষিকে প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করছেন। শিক্ষিত তরুণদের কৃষিক্ষেত্রে পরিকল্পিত উদ্যোগ ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তা : কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তার মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন কৃষক তাঁর পণ্য বাজারে বিক্রির চেয়ে পরিবারের চাহিদা মেটানােকে বেশি গুরুত্ব দেন অথবা কিছুটা বিক্রির জন্য এবং কিছুটা পরিবারের চাহিদা মেটাতে ব্যয় করেন। অন্যদিকে, একজন কৃষি উদ্যোক্তার মূল লক্ষ্য বাজারজাতকরণ ও মুনাফা তৈরি। তাই একজন কৃষি উদ্যোক্তাকে ব্যবসায়িক মনােবৃত্তির হতে হয় এবং তার কাজে প্রচুর ঝুঁকি থাকে।

কৃষি উদ্যোগের ক্ষেত্রসমূহ : শস্য, প্রাণীসম্পদসহ কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট যে-কোনাে বিষয়কে কৃষি উদ্যোগের আওতায় আনা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাকে অবশ্যই মূলধন, জমির পরিমাণ, মাটির গুণাগুণ, অবকাঠামাে, বালাই ব্যবস্থাপনা, লােকবল, পরিবহণ ব্যবস্থা, বাজার ও চাহিদা, উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনা করতে হয়। ধান, গম, ডাল, আখ, পাট, ঘাস, শাকসবজি, ফুল, ফল, মসলা, মধু, মাশরুম, রেশম, মাছ প্রভৃতির চাষ ও উৎপাদন; গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি প্রভৃতি প্রাণীসম্পদের লালনপালন; গাছের চারা, জৈব সার, বায়ােগ্যাস, দুধ ও দুধজাত পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন ইত্যাদি কৃষি উদ্যোগের আওতাভুক্ত।

 

কৃষি উদ্যোক্তার করণীয়: একজন কৃষি উদ্যোক্তাকে নিম্নোক্ত করণীয় সম্বন্ধে অবগত থাকা উচিত:

 

ক. উদ্যোক্তাকে প্রথমেই তার পণ্যের বাজার সম্বন্ধে ভালাে ধারণা রাখতে হবে। 

খ. প্রয়ােজনীয় অবকাঠামাে ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে অপচয় ও ব্যয় হ্রাসের ব্যবস্থা করতে হবে।

গ. একজন কৃষি উদ্যোক্তাকে উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হয়। কারণ, তাঁর এই উদ্ভাবনী বুদ্ধি প্রতিযােগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে সাহায্য করবে। 

 

ঘ. কৃষিখাতে উদ্যোক্তাকে অনেক রকমের ঝুঁকি নিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে প্রয়ােজনীয় ঝুঁকি নিতে হবে এবং ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সম্ভাব্য প্রস্তুতি রাখতে হবে।

ঙ. উদ্যোক্তা যে ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করবেন, সে বিষয়ে যাবতীয় তথ্যের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখা জরুরি। উপযুক্ত খাবার, সার, কীটনাশক, আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ প্রযুক্তি সম্বন্ধে ধারণা থাকা দরকার।সম্প্রতি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার উদ্যোক্তাদের সাফল্যে ভূমিকা রাখছে। 

 

চ. একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কয়েকজন উদ্যোক্তা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। এতে বড়াে ব্রনের কাজে হাত দেওয়া সম্ভব হয় এবং ঝুঁকি হ্রাস পায়। তবে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে অংশীদার নির্বাচন করা উচিত। 

ছ. পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, শ্রমিক ও পণ্য পরিবহণ, বাজার পরিস্থিতি ও প্রতিযােগীদের কথা চিন্তা করে কাজে অগ্রসর হলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কয়েকটি উদ্যোগ: কৃষির উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন:

ক. সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলাে কৃষির ধরন অনুযায়ী স্বল্প সুদে বিভিন্ন অঙ্কের ঋণ প্রদান করছে। 

খ. কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর ও মৎস্য সম্পদ অধিদপ্তর উদ্যোক্তাদের যে-কোনাে প্রয়ােজনে পরামর্শ দিয়ে থাকে। 

গ. বছরব্যাপী চাষ করার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ‘ডিজিটাল শস্য ক্যালেন্ডার ও ‘বালাইনাশক নির্দেশিকা দেওয়া আছে, যা ঠিক সময়ে ঠিক ফসল ফলাতে সাহায্য করে। ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করে কৃষিসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কৃষি প্রযুক্তি সম্বন্ধে জানাতে কৃষি প্রযুক্তি ভান্ডার' নামে একটি মােবাইল অ্যাপ তৈরি করেছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কৃদ্রিব্যাদির বাজারদর, কৃষকপ্রাপ্ত বাজারদর, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক ভিত্তিতে প্রেরণ করে।

উপসংহার: একজন কৃষি উদ্যোক্তা সফল হলে একদিকে যেমন দারিদ্র্য দূরীভূত হয়, অন্যদিকে জাতীয় অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা পায়। তবে কৃষি উদ্যোক্তাকে অবশ্যই সততার সঙ্গে কাজ করা উচিত। কারণ তাঁর পণ্য চূড়ান্ত বিচারে খাবারের চাহিদা মেটাবে।

MD AL AMIN
MD AL AMIN
3 years ago
উত্তরঃ

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

ভূমিকা: রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেনকে বলা হয় বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত। তিনি ১৮৮০ সালের ৯ই ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর কলকাতায়। তিনি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন যখন বাঙালি মুসলমান সমাজ, বিশেষত নারীসমাজ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক প্রতিষ্ঠা সব দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। তখন পর্দাপ্রথার কঠোর শাসনে নারীসমাজ ছিল অবরােধবাসিনী। রােকেয়া পিছিয়ে পড়া সমাজের এই বৃহত্তর অংশকে শিক্ষা ও কর্মের আলােয় আলােকিত করতে নিজের জীবনকে নিবেদন করেছিলেন। তাঁর বলিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফলে নারী আজ শিক্ষাদীক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে, আদালতে সকল ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

রােকেয়ার পরিবার ও সমাজ: রােকেয়ার পারিবারিক নাম রােকেয়া খাতুন। তাঁর পিতা জহির উদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী সাবের ছিলেন একজন জমিদার। তাঁর মাতার নাম রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রােকেয়ার দুই বােন করিমুন্নেসা ও হুমায়রা; তাঁর বড়াে দুই ভাই মােহাম্মদ ইব্রাহিম আবুল আসাদ সাবের ও খলিলুর রহমান সাবের। পারিবারিক প্রথা অনুসারে পাঁচ বছর বয়স থেকে পর্দার কঠোরতার মধ্যে রােকেয়াকে শৈশবকাল অতিবাহিত করতে হয়। শৈশবে আরবি-ফারসি-উর্দু শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও রােকেয়ার পিতা বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষার বিরােধী ছিলেন। তাছাড়া তঙ্কালীন সমাজব্যবস্থায় ঘরের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনাে সুযােগ মেয়েদের ছিল না। কিন্তু মেধাবী রােকেয়ার লেখাপড়ার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ।

 

পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় থাকার সময়ে তিনি একজন ইংরেজ মেমের কাছে কিছুদিন লেখাপড়ার সুযােগ পেয়েছিলেন। বােনের এই বিদ্যানুরাগ দেখে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষিত ভাই ইব্রাহিম সাবের ইংরেজি শেখান রােকেয়াকে। পিতার কঠোর নজর এড়িয়ে রােকেয়া বড়াে দুই ভাই-বােনের সহযােগিতায় বাংলা-ইংরেজি শিক্ষায় উৎসাহী ও পারদর্শী হয়ে ওঠেন। বােন করিমুন্নেসার অনুপ্রেরণায় রােকেয়া বাংলা সাহিত্য রচনা ও চর্চায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি একইসঙ্গে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্য আয়ত্ত করেন। ১৮৯৮ সালে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হােসেনের সঙ্গে রােকেয়ার বিবাহ হয়। স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন বা আর, এস, হােসেন নামে পরিচিত হন। স্বামীর ঐকান্তিক উত্সাহ ও সহযােগিতায় রােকেয়া পড়াশােনা ও সাহিত্যচর্চা অব্যহত রাখেন। ১৯০৯ সালে তার স্বামীর জীবনাবসান ঘটে।

 

নারীশিক্ষা বিস্তার: বাংলার মুসলমান সমাজে রােকেয়া দুই ভাবে অবদান রাখেন। প্রথমত, শিক্ষাবিস্তারে এবং দ্বিতীয়ত, সাহিত্য সৃষ্টিতে। স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে রােকেয়া তাঁর স্বামীর স্মরণে মাত্র পাঁচ জন ছাত্রী নিয়ে সাখাওয়াত মেমােরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে তার নারীশিক্ষা বিস্তারের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯১১ সালে কলকাতায় স্কুলটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রােকেয়া মুসলমান নারীদের সামনে আধুনিক শিক্ষার দরজা খুলে দেন। স্কুলটিতে ধীরে ধীরে ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ ইংরেজি স্কুলে পরিণত হয়। রােকেয়া বাঙালি মুসলমান মেয়েদের শিক্ষিত করার জন্য কেবল স্কুলই প্রতিষ্ঠা করেননি, ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি মেয়েদের স্কুলে পাঠানাের জন্য অভিভাবকদের অনুরােধ করেছেন। মেয়েদের স্কুলে নেওয়ার জন্য পৃথক গাড়িরও ব্যবস্থা করেন তিনি। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় ১৯২৯ সালে কলকাতায় মুসলিম মহিলা ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

সাহিত্যে অবদান: বাংলা সাহিত্যে রােকেয়ার আনুষ্ঠানিক পদার্পণ ঘটে ১৯০২ সালে কলকাতার নবপ্রভা পত্রিকায় পিপাসা' নামক রচনা প্রকাশের মাধ্যমে। এরপর নবনূর, সওগাত', মােহাম্মদী' প্রভৃতি সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতে থাকেন। তাঁর লেখনী তৎকালীন মুসলিম সমাজকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। রক্ষণশীল সমাজ তাঁর যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। রােকেয়া তাঁর লেখায় যেমন নারীমুক্তির কথা বলেছেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ত্রুটিগুলােকে নির্দেশ করেছেন, একইভাবে নারীর মানসিক দাসত্বেরও সমালােচনা করেছেন। নারীর অলংকারকে রােকেয়া দাসত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। রােকেয়া তাঁর নারীবাদী চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন মতিচুর' প্রথম খণ্ড (১৯০৪) ও দ্বিতীয় খণ্ডে (১৯২২)। সুলতানাজ ড্রিম' (১৯০৮) তাঁর একটি ইংরেজি রচনা যা পরবর্তী কালে ‘সুলতানার স্বপ্ন নামে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যের একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া ‘পদ্মরাগ' (১৯২৪) ও ‘অবরােধবাসিনী' (১৯৩১) তাঁর উল্লেখযােগ্য দুটি রচনা। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়ােজনীয়তার কথা বলেছেন। হাস্যরস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহয্যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর সকল রচনাই নারীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সংস্কারের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত।

 

নারী জাগরণের অগ্রদূত রােকেয়াঃ রােকেয়া সাখাওয়াত হােসেন ছিলেন একজন সমাজসচেতন, সংস্কারমুক্ত, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রগতিশীল লেখক ও সমাজকর্মী। রােকেয়া মনে করতেন, পড়তে লিখতে পারাই নারীশিক্ষার উদ্দেশ্য নয়, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলাে নারীকে তার অধিকার লাভে সক্ষম করে তােলা। প্রকৃত শিক্ষা একজন নারীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তােলে। নারীরা যাতে অন্যের গলগ্রহ হয়ে জীবন যাপনে বাধ্য না হয়, সে-বিষয়ে তিনি নারীদের সচেতন করতে সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যান। শিক্ষাগ্রহণে নারীর সচেনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি ১৯১৬ সালে আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম বা মুসলিম নারীদের সমিতি' গড়ে তােলেন। মুসলিম নারী সমাজকে সংগঠিত করতে নিখিল ভারত মুসলিম মহিলা সমিতি’, ‘বেগম উইমেন্স এডুকেশনাল কনফারেন্স', নারীতীর্থ সংস্থা' প্রভৃতি সংগঠনে যােগ দেন এবং নারীর উন্নয়নে দেশবাসীকে উৎসাহিত করেন। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখনী ধারণ করেন। নারীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য পুরুষের বহুবিবাহ, নারীদের বাল্যবিবাহ এবং পুরুষের একতরফা তালাক প্রথার বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেন। রােকেয়ার এই প্রচেষ্টার ফলে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন পাশ হয়।

 

উপসংহার: সমাজ ও নারী কল্যাণ সাধনে রােকেয়ার অবদান অনস্বীকার্য। সমাজ ও সভ্যতার অগ্রসরতার পেছনে নারী ও পুরুষ উভয়ের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নারীকে পিছনে রেখে সমাজের সার্বিক অগ্রগতি যে সম্ভব নয়, তা রােকেয়া গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই রােকেয়ার সংগ্রাম ছিল পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা।

MD AL AMIN
MD AL AMIN
3 years ago
87

প্রবন্ধ এক প্রকার গদ্য রচনা। কোনো বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিতে প্রবন্ধ রচিত হয়। সব ধরনের প্রবন্ধকে অন্তত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যথা বর্ণনামূলক প্রবন্ধ, চিন্তামূলক প্রবন্ধ ও ব্যক্তি অনুভূতিমূলক প্রবন্ধ। পরবর্তী নমুনা অংশের 'বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প' বা 'ভাষা আন্দোলন' প্রবন্ধকে বলা যায় বর্ণনামূলক প্রবন্ধ, 'সময়ানুবর্তিতা' বা 'মাদকাসক্তি' প্রবন্ধকে বলা যায় চিন্তামূলক প্রবন্ধ, এবং 'লঞ্চ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা' বা 'কোনো ঘটনার স্মৃতি' প্রবন্ধকে বলা যায় ব্যক্তি অনুভূতিমূলক প্রবন্ধ।

প্রবন্ধ লেখার কিছু সাধারণ নিয়ম নিচে উল্লেখ করা হলো: 

ক. ভূমিকা হলো প্রবন্ধের প্রবেশক অংশ। এটি সাধারণত এক অনুচ্ছেদের হয়। এই অংশে প্রায়ই মূল আলোচনার ইঙ্গিত থাকে। 

খ. উপসংহার হলো প্রবন্ধের সমাপ্তি অংশ। প্রবন্ধের প্রকৃতি অনুযায়ী এখানে সাধারণত ফলাফল, সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা, প্রাসঙ্গিকতা ইত্যাদি স্থান পায়। 

গ. প্রবন্ধের মূল অংশ একাধিক অনুচ্ছেদে বিভক্ত হয়ে থাকে। অনুচ্ছেদগুলো যাতে সমরূপ থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হয়। যুক্তি বা কালের অনুক্রম মনে রেখে অনুচ্ছেদগুলোর সমরূপতা ঠিক করা যেতে পারে। 

ঘ. বিশেষভাবে বর্ণনামূলক ও চিন্তামূলক প্রবন্ধের বেলায় অনুচ্ছেদগুলোর আলাদা শিরোনাম থাকে। এগুলোর নাম অনুচ্ছেদ-শিরোনাম। এসব শিরোনামের পরে কোলন যতি (:) দিয়ে লেখা শুরু করা যায়।

ঙ. প্রবন্ধের ভাষা হওয়া উচিত সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল। 

চ. প্রবন্ধের প্রতিটি অনুচ্ছেদ লেখার সময়ে প্রবন্ধের শিরোনামের কথা মনে রাখতে হয়, তাতে প্রবন্ধের মধ্যে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা প্রবেশ করতে পারে না। 

ছ. উদ্ধৃতি ব্যবহারে সতর্ক হওয়া উচিত। অপরিহার্য না হলে উদ্ধৃতি ব্যবহার করা ঠিক নয়। বিশেষভাবে বাংলা প্রবন্ধের মধ্যে অন্য কোনো ভাষার উদ্ধৃতি বর্জনীয়। 

জ. প্রবন্ধের নির্দিষ্ট কোনো আয়তন নেই। এমনকি এর অনুচ্ছেদসংখ্যাও নির্দিষ্ট করা যায় না। তবে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রবন্ধের শব্দসংখ্যা কমবেশি এক হাজার হতে পারে।

প্রবন্ধের কয়েকটি নমুনা নিচে দেখানো হলো।

শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র

Related Question

মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews