ভূমিকা: বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের নতুন নতুন উদ্ভাবন মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের নাম প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রাকে করে তুলেছে আরামদায়ক। কৃষিক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের জয়যাত্রা লক্ষণীয়। অসংখ্য কৃষি প্রযুক্তি কৃষিকাজকে করে তুলেছে সহজসাধ্য। অজস্র উচ্চফলনশীল জাতের ফসল আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কৃষিপণ্যও হয়েছে সহজলভ্য।
কৃষির অতীত-কথা: কৃষি হলো মানব সভ্যতার আদিম পেশা। জীবন ধারণের তাগিদে আদিম মানুষ প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন ফলমূল গুহায় নিয়ে আসতো এবং বনজঙ্গলের পশু-পাখি শিকার করতো। প্রকৃতির উপরে পূর্ণ নির্ভরশীলতার কারণে প্রায়ই তাদের খাদ্য-সংকটে পড়তে হতো। বছরের কিছু সময়ে তাদের কোনো খাবার জুটত না। ফলে খাদ্যের সন্ধানে তাদের একস্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াতে হতো। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আদিম মানুষ এক পর্যায়ে পশুপালন ও বীজ বপন করতে শেখে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্য সুলভ হয় এবং জীবনযাত্রা হয়ে ওঠে অপেক্ষাকৃত সহজ ও নিশ্চিন্ত। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আগে পর্যন্ত কৃষিকাজ ছিল অত্যন্ত শ্রমসাপেক্ষ এবং প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।
কৃষি ও বিজ্ঞান: বিজ্ঞানের অবদানে ধীরে ধীরে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটছে। কৃষিকাজকে সহজ ও কম শ্রমসাধ্য করতে কৃষি-বিজ্ঞানীরা নিরন্তর গবেষণা করছেন। ফলে একদিকে যেমন চাষ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে, ফসল নির্বাচন ও নতুন নতুন ফসল তৈরির কাজেও অগ্রগতি হচ্ছে। কৃষি-বিজ্ঞানের এসব গবেষণা পৃথিবীকে আজ শস্যে ও ফসলে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। পৃথিবীর মানুষের জন্য এখন যতটা ফসল দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি ফসল পৃথিবীতে ফলছে। জমিকে উর্বর করতে আবিষ্কৃত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সার। পুরানো প্রযুক্তির লাঙল-মই প্রভৃতির পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাক্টর। উদ্ভাবিত হয়েছে উন্নত জাতের বীজ ও উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত। এতে অল্প সময়ে ও অল্প পরিশ্রমে অধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। ফসল ও বীজ উৎপাদন এবং তা সংরক্ষণেও বিজ্ঞান সহযোগিতা করছে। সেচ ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন। পশু-পাখি ও মাছের রোগজনিত মৃত্যুর হারও হ্রাস পেয়েছে কৃষি-চিকিৎসার অগ্রগতির কারণে। এভাবে কৃষি-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কৃষিকাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে।
উন্নত বিশ্বে কৃষি: উন্নত দেশগুলোর কৃষি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিজ্ঞাননির্ভর। জমিতে বীজ বপন থেকে শুরু করে ঘরে ফসল তোলা পর্যন্ত সমস্ত কাজেই রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার। বিভিন্ন ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন মোয়ার (শস্য ছেদনকারী যন্ত্র), রপার (ফসল কাটার যন্ত্র), বাইন্ডার (ফসল বাঁধার যন্ত্র), থ্রেশিং মেশিন (মাড়াই যন্ত্র), ফিড গ্রাইন্ডার (পেষক যন্ত্র), ম্যানিউর স্পেডার (সার বিস্তারণ যন্ত্র), মিল্কার (বৈদ্যুতিক দোহন যন্ত্র) ইত্যাদি উন্নত দেশগুলোর কৃষিক্ষেত্রে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের খামারে ট্রাক্টরের মাধ্যমে একদিনে ১০০ একর পর্যন্ত জমি চাষ করা সম্ভব হয়। একই ট্রাক্টর আবার একসঙ্গে ফসল কাটার যন্ত্র হিসেবেও কাজ করে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশও কৃষি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলেছে।
কৃষি ও বাংলাদেশ: কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয়ের শতকরা ৩৮ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ১৪ শতাংশ আসে কৃষিজাত দ্রব্য রপ্তানি থেকে। এছাড়া কর্মসংস্থান ও শিল্পের ভিত্তি হিসেবেও বাংলাদেশে কৃষি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু কৃষিকাজের জন্য খুবই অনুকূল। এদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক জল-ভাণ্ডার। আধুনিক প্রযুক্তি উন্নত দেশগুলোর মাটির অনুর্বরতাকে এবং পানির দুর্লভতাকে যেভাবে দূর করেছে, তাতে আধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য আরো বেশি সুবিধা নিয়ে আসবে, তা স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে প্রকৃতির উপরে নির্ভরশীল। ফলে বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখানে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়, আবার অনেক সময়ে প্রত্যাশার তুলনায় কম ফসল ফলে। কৃষকের কাছে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও কৃষি-বিজ্ঞানের জ্ঞান সঠিকভাবে পৌঁছে না দিতে পারাই এর প্রধান কারণ। কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এসব বাধা দূর করা যায় এবং উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশকেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা যায়।
বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা: কৃষির উন্নতির উপরেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই কৃষি-বিজ্ঞান ও কৃষি-প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এটা অত্যন্ত আশার কথা যে, বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ইতিমধ্যে বহু নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল ফসল উদ্ভাবন করেছে, বহু কৃষিবান্ধব প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে এবং বহু ধরনের কৃষিপণ্যকে বাজারজাত করণের ব্যাপারে নতুন নতুন কৌশল বের করেছে। অর্থাৎ কৃষি গবেষণায় বাংলাদেশ কোনোক্রমে পিছিয়ে নেই। তবে এখন প্রয়োজন এসব উদ্ভাবনকে দেশের সর্বত্র সহজলভ্য করে তোলা এবং কৃষককে এসব উদ্ভাবনের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা। শিক্ষিত জনবলকে কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারলে এবং কৃষিকাজের সঙ্গে তাদের যুক্ত করতে পারলে এই কাজ অনেকটা সহজ হয়। তাতে আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর যথাযথ প্রয়োগ সম্পর্কে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে। বর্তমানে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কৃষকদেরকে নিয়মিতভাবে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
উপসংহার: কৃষিকাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দিন দিন মজবুত হচ্ছে। বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে প্রয়োজন কৃষি সংক্রান্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে সহজলভ্য করা। এছাড়া বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতে ফসলহানির আশঙ্কা তৈরি না হয় অথবা উৎপাদিত ফসলের বাজারজাতকরণে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অন্যান্য শাখাকেও কৃষির স্বার্থে এগিয়ে আসা দরকার। তবে সবার আগে দরকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কৃষিপেশায় আকৃষ্ট করা এবং শিক্ষিত জনশক্তিকে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত করা। কেননা শিক্ষিত জনশক্তি কৃষিকাজে এগিয়ে এলে কৃষি-বিজ্ঞান ও কৃষি-প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব হবে। এজন্য সরকারের উচিত কৃষিপেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের, বিশেষভাবে কৃষিকাজে সফল হওয়া ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা ও সম্মানিত করা। এতে তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়বে এবং অধিক সংখ্যক শিক্ষিত লোক কৃষিপেশায় আকৃষ্ট হবে। কৃষিকাজের সঙ্গে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সম্পর্ক মজবুত করতে এমন পরিবেশই জরুরি।
ভূমিকা: বর্তমান বিশ্বসভ্যতা যে কয়টি মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন, মাদকাসক্তি তার অন্যতম। পুরোনো সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে দিনে দিনে, নতুন মূল্যবোধও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। সামগ্রিকভাবে সমাজব্যবস্থা চলছে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে, আর এই অবস্থা একদিকে যেমন স্বাচ্ছন্দ্য আনছে, অন্যদিকে সঞ্চারিত করছে হতাশা ও উদ্বেগ। ফলে বিশৃঙ্খল এক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে নানা মানুষ নানা বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যার কোনোটি খারাপ, কোনোটি আবার খারাপ আসক্তি তৈরি করছে। নানারকম এই আসক্তির মাঝে বিপজ্জনক ও ভয়ংকর এক আসন্তি হচ্ছে মাদকাসক্তি। এই আসক্তি এক ভয়ংকর ব্যাধিরূপে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি এখন সারাবিশ্বের অন্যতম সমস্যা। এমন দেশ সম্ভবত বিশ্বের কোথাও পাওয়া যাবে না, যেখানে মাদকাসক্তির কালো ছায়া তরুণসমাজকে স্পর্শ করছে না।
মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তি: মাদকদ্রব্য হচ্ছে সেসব বস্তু বা গ্রহণের ফলে স্নায়বিক বৈকল্যসহ নেশার সৃষ্টি হয়। সুনির্দিষ্ট সময় পরপর মাদক সেবনের দুর্বিনীত আসক্তি অনুভূত হয় এবং কেবল সেবন দ্বারাই সে আসক্তি দূরীভূত হয়। আর মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে নেশা সৃষ্টিকে মাদকাসক্তি বলা হয়। তবে বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার মতে- 'মাদকাসক্তি হচ্ছে চিকিৎসা গ্রহণযোগ্য নয় এমন দ্রব্য অতিরিক্ত পরিমাণে ক্রমাগত বিক্ষিপ্তভাবে গ্রহণ করা এবং এসব দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া।'
মাদকদ্রব্যের ধরন: বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের মাদক দ্রব্য চালু রয়েছে। মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম ইত্যাদি প্রাচীনকালের মাদকদ্রব্য। বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে হেরোইন, মারিজুয়ানা, এলএসডি, হাসিস, কোকেন, প্যাথিড্রিন, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে হেরোইনই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টিকারী মাদকদ্রব্য। বাংলাদেশে যেসব মাদকদ্রব্য সেবন সর্বাধিক সেগুলো হলো গাঁজা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, মদ, বিয়ার, তাঁড়ি, পচুই, প্যাথেড্রিন ইনজেকশন ইত্যাদি। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: মাদকদ্রব্য চোরাচালানের যাত্রাপথে বাংলাদেশের মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার এ সমস্যা আমাদের সমাজে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সীমান্ত গোল্ডেন ওয়েজ বা মাদক পাচার ও চোরাচালানের জন্য বিখ্যাত। আবার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হওয়ায় বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে অবাধে আর বাড়ছে এর ব্যবহার। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লক্ষ মাদকসেবনকারী রয়েছে এবং এই সংখ্যা দিন দিন আরও বাড়ছে। বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে এই মাদকের প্রভাব রয়েছে। তবে আমাদের দেশে মাদকাসক্তির অধিকাংশই যুবসমাজ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১৭ ভাগ মাদক ব্যবহার করে। দেশে ৩৫০টি বৈধ গাঁজার দোকান রয়েছে। বৈধ লাইসেন্স ছাড়াও আমাদের দেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর দেশিয় মদ উৎপাদন ও বিক্রি হয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও অবনতির মাঝামাঝি অবস্থান করছে। আর এই মধ্যবর্তী অবস্থাটিই সমাজে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করছে। তরুণসমাজ নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সঠিকভাবে ধারণ ও বিকশিত করতে পারছে না, আর দেশীয় অর্থনীতিতে বিরাজমান অস্থিরতা - তাদের মধ্যে তৈরি করে হতাশা, ক্ষোভ, বিষাদ, যার ফলশ্রুতিতে পূর্বের চেয়েও ভয়াল ত্রাসে বাংলাদেশকে ছেয়ে ফেলছে মাদকাসক্তি।
মাদকের উৎস ও বিস্তার অঞ্চল: মায়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড সীমান্তে অবস্থিত পপি উৎপাদনকারী অঞ্চলকে বলা হয় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল। আবার আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান সীমান্তে অবস্থিত আফিম মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চলকে বলা হয় গোল্ডেন ক্রিসেন্ট। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন আফিম। পপি কুনোর নির্যাস থেকে তৈরি হয় আফিম। আফিম থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় হেরোইন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের আশপাশের দেশগুলোতেই মাদকের উৎস, তার বিস্তার থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। তবে শুধু এশিয়াতেই নয়, ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, জ্যামাইকা, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালাসহ দক্ষিণ আফ্রিকা ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশে মারিজুয়ানা উৎপাদন হয়। আবার দক্ষিণ আমেরিকা, পেরু, কলম্বিয়া, ব্রাজিল কোকেন উৎপাদনে খ্যাত। আর আফিম, হেরোইন উৎপাদন হচ্ছে এশিয়াসহ দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। এভাবে বিশ্বব্যাপী মাদক ছড়িয়ে পড়ছে নীরব ঘাতকের মতো। মাদক আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী: যেসব পরিবারে পারিবারিক বন্ধন শিথিল, ঘনিষ্ঠতা কম, সেসব পরিবারের সদস্যরাই মাদকাসক্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের গড় বয়স ১৮-৩২ বছর। অর্থাৎ আমাদের যুবসমাজ। জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে মাদকাসক্তরা বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।
মাদকাসন্তির ক্ষতিকর প্রভাব : মাদকাসক্তির প্রভাব নিঃসন্দেহে ধ্বংসাত্মক। আর সে প্রভাবগুলোই নিয়ে আলোচিত হলো
i. কর্মঠ ও সফল হতে পারত যে যুবসমাজ, মাদকাসক্তি সে যুবসমাজকে অবচেতন ও অকর্মণ্য করে তুলছে।
ii. বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণির মাদকাসক্তরা মাদকদ্রব্য সংগ্রহের জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত। এই সব অপকর্ম সৃষ্টি করছে সামাজিক বিশৃজালা।
iii. চোরাচালান বাড়ছে ও দেশের কর্মঠ জনশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে মাদক। ফলে দেশীয় অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়ছে।
iv. মাদকদ্রব্য আসক্তদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা ক্ষতি করে। অতিরিক্ত সেবন সমাজে আনছে চরম নৈতিক অধঃপতন।
vi. আসক্ত ব্যক্তি দ্বারা সৃষ্টি হচ্ছে পারিবারিক ভাঙন এবং পুরো সমাজব্যবস্থার মানুষের মাঝে হতাশা।
vii. সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয় হচ্ছে।
viii. অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।
ix. মেধাবী সমাজ ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে।
মাদকাসক্তি ও আমাদের যুবসমাজ : বিশ্বব্যাপী মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং চোরাচালানের মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রসার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। মাদকের নিষ্ঠুর ছোবলে অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ এবং অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে বহু তরুণের সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। প্রেমে ব্যর্থতা, হতাশা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য প্রভৃতি কারণে আমাদের দেশের যুবসমাজের এক বিরাট অংশ মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর মাদককে কেন্দ্র করেই সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে আরও বহু ধ্বংসের সামাজিক সমস্যা। নেশাগ্রস্ত যুবসমাজ শুধু যে নিজেরই সর্বনাশ করে তা নয়, এরা পরিবার ও জাতীয় জীবনকে বিপর্যন্ত ও বিপন্ন করে তুলছে। যে যুবসমাজ দেশকে আলোকিত করবে, সে যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের মাঝে অন্ধকার নেমে আসে, তাতে শুধু সে নয়, পুরো দেশ-জাতি অন্ধকারে পর্যবসিত হয়ে যাবে।
মাদকদ্রব্য সেবনের কারণ: সাময়িক জীবনের প্রতি বিমুখতা ও নেতিবাচক মনোভাব থেকেই মাদকাসক্তির জন্ম। অভ্যাস থেকে আসক্তি, ধূমপান একদিন পরিণত হয় হেরোইন আসক্তিতে। ধনতান্ত্রিক সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যক্তির ভোগের উপকরণ অবাধ ও প্রচুর। ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে সেখানে চলে স্বেচ্ছাচারিতা, আনন্দের পোশাকে ঘুরে বেড়ায় উচ্ছৃঙ্খলতা। বর্তমানে সিনেমা ও টেলিভিশনে যেসব অশ্লীল নৃত্য, ছবি, কাহিনি ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে, সেসব অনুকরণ করতে গিয়ে তরুণসমাজ তাদের নৈতিক অধঃপতন ডেকে আনছে। তরুণদের এই বিপথগামিতার অন্যতম কারণ হচ্ছে বেকারত্ব। এই বেকারত্ব নামক অভিশাপটি যখন জীবনকে বিষিয়ে তোলে, তখন আপনাতেই মাদকাসক্তের এই ধ্বংসজালে আটকে যেতে হয়। তাছাড়া আবার অনেক সময় অস্থিরতা, কু-চিন্তা, অভাব-অনটন ও পারিবারিক কলহের কারণে তরুণসমাজ এই মোহের জালে আচ্ছন্ন হয়।
মাদকাসক্তি সমস্যা সমাধানের উপায়: বিশ্বজুড়ে মাদকাসক্তি একটি জটিল সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় এর সমাধানে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
ক. প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা: মাদকাসক্তদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের সুস্থ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বলা হয়। আসক্ত ব্যক্তিকে প্রথমে তাদের পরিবেশ থেকে সরিয়ে আনা হয়। যাতে সে পুনরায় মাদক গ্রহণ করতে না পারে। পরে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
খ. প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
১. মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও আমদানি নিষিদ্ধকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা।
২. স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা।
৩. প্রচার মাধ্যম ও আলোচনা সভার মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক তরুণসমাজের কাছে তুলে ধরা।
৪. মাদক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন করা।
৫. পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
৬. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে জোরালো করার প্রচেষ্টা করা।
৭. তরুণসমাজের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা।
৮. সামাজিক পরিবেশ উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকাসক্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য মাদকাসক্তি নিরাময় ও প্রতিরোধ আন্দোলনে আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। এর পূর্বশর্ত হিসেবে ধূমপান ও মাদকবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে। সরকারি মহল থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, আইনজীবী, সমাজকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদসহ সকল শ্রেণির মানুষকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলে এ বিশ্বকে বাসোপযোগী করে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের ফুটবল
ভূমিকা: ফুটবল বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় খেলা। কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের গ্রামে, গঞ্জে, শহরে সর্বত্র ফুটবল প্রতিযােগিতা অনুষ্ঠিত হতাে। এর প্রতি মানুষের আগ্রহের মাত্রা বােঝা যায় বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলে। তখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় চূড়ান্ত পর্বে উন্নীত দেশগুলাের পতাকা উড়তে দেখা যায়। অনেকের গায়ে দেখা যায় পছন্দের দলের জার্সি। ফুটবলের প্রতি এ দেশের মানুষের ভালােবাসা ক্রমে এই খেলার প্রতি তাদের আগ্রহ আরাে বাড়িয়ে তুলছে।
আধুনিক ফুটবলের ইতিহাস: প্রতি দলে এগারাে জন করে দুটি দলে ভাগ হয়ে ফুটবল খেলতে হয়। একটি বায়ুপূর্ণ চামড়ার বলকে হাত ও বাহু ছাড়া শরীরের যে-কোনাে অংশ দিয়ে প্রতিপক্ষের গােলপােস্টের মধ্যে প্রবেশ করাতে হয়। পৃথিবীতে ফুটবল ধরনের বেশ কয়েকটি খেলা প্রচলিত আছে। যেমন, রাগিবি অনেকটা ফুটবল খেলার মতাে। তবে এখন ফুটবলের যে রূপটি দেখা যায়, তা ১৮৬৩ সালে প্রবর্তিত। মূলত এ সময়ে ইংল্যান্ডে ফুটবল অ্যাসােসিয়েশন গঠিত হয় এবং তারা ফুটবল খেলার কতগুলাে নিয়ম জারি করে। এই নতুন নিয়মের ফুটবল খেলা দ্রুত অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য ইংল্যান্ডকে আধুনিক ফুটবলের জনক বলা হয়। ইংল্যান্ডের ফুটবল এসােসিয়েশন কর্তৃক প্রবর্তিত হওয়ায় ফুটবলের আরেক নাম ‘এসােসিয়েশন ফুটবল। আমেরিকায় একে বলা হয় সসার’ বা কার'। এটিকে এসােসিয়েশন শব্দের বিকৃত রূপ বলে মনে করা হয়। রাগবি ফুটবল কেবল রাগবি নামে অধিক পরিচত হওয়ায় এসােসিয়েশন ফুটবল শুধু ফুটবল' নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বাংলাদেশে ফুটবল বলতে এসােসিয়েশন ফুটবলকেই বােঝায়। ফুটবল বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে উনিশ শতকের গােড়ার দিকে। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ২১শে মে প্যারিসে গঠিত হয় ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনালে ডি ফুটবল অ্যাসােসিয়েশন (ফিফা)। সংস্থাটি প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়ােজন করে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম বিশ্বকাপ আসরে শিরােপা অর্জন করে উরুগুয়ে। বর্তমানে ফিফার সদস্য সংখ্যা ২১১।
বাংলাদেশে ফুটবলের যাত্রা: ভারতীয় উপমহাদেশে ফুটবলের আগমন হয় ব্রিটিশদের হাত ধরে। ইংরেজ বণিক, খেলােয়াড় ও সৈনিকরা ফুটবল খেলত। মূলত তাদের মাধ্যমেই উপমহাদেশে ফুটবল খেলা জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ফুটবল জনপ্রিয় হতে থাকে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ১৯৪৮ সাল থেকে সমগ্র পাকিস্তানে ফুটবলের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় ‘ঢাকা লিগ' । ১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে ভিক্টোরিয়া স্পাের্টিং ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মােহামেডান স্পাের্টিং ক্লাব, ওয়ারি ক্লাব, আবাহনী ক্রীড়াচক্র, শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র প্রভৃতি ক্লাব বাংলাদেশে লিগ খেলাকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে ফুটবল একটি নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে বিশ্বকে অবগত করতে তখন গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মােট ১৬টি ম্যাচ খেলেছিল। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালে ঢাকায় ফুটবল লিগ শুরু করে। ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু হয় জাতীয় ফুটবল। এক বছর পর থেকেই অর্থাৎ ১৯৭৪ সাল থেকে যুব ফুটবল যাত্রা শুরু করে। ফেডারেশন কাপ শুরু হয় ১৯৮০ সাল থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশে নিম্নোক্ত ঘরােয়া টুর্নামেন্টগুলাে চালু রয়েছে:
১. বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ: এটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কর্তৃক আয়ােজিত একটি
টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ শুরু হয় ২০০৭ সালে।
২. বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ: এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রেণির ফুটবল লিগ। ২০১২ সালে এটি যাত্রা
৩. ফেডারেশন কাপ: এটি বাংলাদেশের প্রিমিয়ার নকআউট প্রতিযােগিতা। ১৯৮০ সাল থেকে এটি
আয়ােজিত হয়।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন: বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়ােজন, খেলােয়াড়দের প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা, জাতীয় দল গঠন ও নিয়ন্ত্রণ তথা ফুটবলের যাবতীয় উন্নয়নে কাজ করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। বাফুফে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল ও বাংলাদেশ মহিলা জাতীয় ফুটবল দলকে তত্ত্বাবধান করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ফুটবল: বাফুফে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে এএফসি (এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন), ১৯৭৬ সালে ফিফা (ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনালে ডি ফুটবল অ্যাসােসিয়েশন) ও ১৯৯৭ সালে সাফ (সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন) বাংলাদেশকে সদস্য করে। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল ১৯৭৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে। ১৯৮০ সালে ‘এএফসি এশিয়া কাপ টুর্নামেন্টে এবং ১৯৮৬ সালে ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেয়। ফুটবলে বাংলাদেশের গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা হয় ২০০৩ সালে। ওই বছরই বাংলাদেশ প্রথম সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া ২০১৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন গােল্ডকাপ-এ চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ মহিলা জাতীয় ফুটবল দল: বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল কমিটি। বাংলাদেশ মহিলা জাতীয় ফুটবল দল এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদস্য। ২০১০ সালের ২৯শে জানুয়ারি দলটি সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন গেমস-এ নেপালের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। বাংলাদেশ মহিলা জাতীয় ফুটবল দল ২০১০ সালের সাফ উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপে কক্সবাজারে ভুটানের বিপক্ষে ৯-০ ব্যবধানে এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। সম্প্রতি বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক নারী ফুটবল দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখযােগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে ময়মনসিংহের ধােবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেয়েরা বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মেয়েরা।
ফুটবল খেলার মাঠ: স্থানীয় মাঠ ছাড়াও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি উন্নত মানের ফুটবল মাঠ রয়েছে। এগুলাের মধ্যে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মােস্তফা কামাল স্টেডিয়াম, চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, সিলেট জেলা স্টেডিয়াম, যশােরের শামসুল হুদা স্টেডিয়াম, রাজশাহী জেলা স্টেডিয়াম, শহীদ কামারুজ্জামান স্টেডিয়াম, গােপালগঞ্জের শেখ ফজলুল হক মনি স্টেডিয়াম, ফেনীর শহীদ সালাম স্টেডিয়াম, ময়মনসিংহ জেলার ময়মনসিংহ স্টেডিয়াম উল্লেখযােগ্য।
উপসংহার: ফুটবল বিশ্বের জনপ্রিয়তম খেলা। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও ফুটবলের জনপ্রিয়তা কম নয়। তবে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য জাতীয় ফুটবল দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখযােগ্য সাফল্য নিয়ে আসতে পারেনি। এক সময়ে ঘরােয়া ফুটবল সারা বাংলাদেশে যে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করতে পারতাে, তাও এখন আবেদন হারিয়েছে। বয়সভিত্তিক ফুটবল দলগুলাে মাঝে মাঝে যে সাফল্য দেখাচ্ছে, তা আবার হারিয়ে যাচ্ছে। ফুটবলে গৌরব ফিরিয়ে আনতে দরকার কার্যকর নীতিমালা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায়ও সম্ভাবনাময় খেলােয়াড়ের সন্ধান অব্যাহত রাখা উচিত।
Related Question
View Allবৈশাখী মেলা
বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশ হলো বৈশাখী মেলা। প্রতি বছর বাংলা পহেলা বৈশাখ, অর্থাৎ ১৪ই এপ্রিল, এই মেলার আয়োজন করা হয়। বৈশাখী মেলা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাংলার জীবনযাত্রার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত এক ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান।
মেলার শুরু হয় সকালবেলায়, যেখানে গ্রামের মানুষ তাদের পোষাক ও সাজসজ্জায় মেতে ওঠে। বাজারে নানা ধরনের স্টল ও দোকান বসে, যা বিভিন্ন রকমের পণ্য ও সামগ্রী বিক্রি করে। এই মেলায় স্থানীয় হস্তশিল্প, জামদানি শাড়ি, মাটির পুতুল, কুটির শিল্পের নানা সামগ্রী পাওয়া যায়। মেলার এক দিকের গন্ধ আসে পিঠে-পুলি, মোয়া, চিড়েসুড়ির মত ঐতিহ্যবাহী খাবারের সুবাস।
বৈশাখী মেলা শুধু কেনাকাটার জন্যই নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আনন্দের মিলনমেলা। মেলা উপলক্ষে গীতিনাট্য, লোকনৃত্য, গান, কৌতুক পরিবেশিত হয়। এই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম গ্রামীণ জীবনকে প্রাণবন্ত করে তোলে এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করায়।
মেলা শেষ হওয়ার পর, সবাই একসাথে আনন্দের সাথে বাড়ি ফিরে আসে, মনে মনে ভরপুর আশা ও স্মৃতি নিয়ে। বৈশাখী মেলা একদিকে যেমন বাংলার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে, অন্যদিকে এটি সামাজিক মেলবন্ধনও শক্তিশালী করে।
এভাবে, বৈশাখী মেলা বাংলার সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ, যা সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যবাহী জীবনের সাথে সম্পৃক্ত।
বৈশাখী মেলা
বৈশাখী মেলা নববর্ষের একটি উৎসব । নববর্ষ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই মেলা বসে । এটি বৈশাখের প্রথম দিনে (মাসের) অনুষ্ঠিত হয় । মূলত বৈশাখী মেলার আয়োজন করে স্থানীয় লোকেরা । পহেলা বৈশাখ আয়োজন করা হয় বাংলাদেশের বিভিন্নজায়গায় ছোট বড় অনেক স্থানে । মেলা শুরু করে স্থানীয় লোকেরা এই মেলাতে বিভিন্ন ধরনের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা গুলো শুরু করে । এই মেলাগুলো এক সপ্তাহ কিংবা এক মাস ব্যাপী হয়ে থাকে । বৈশাখী মেলা সাধারণত খোলা আকাশের নিচে বসে । প্রতিবছর রমনার বটমূলে বসে এ মেলার প্রভাতি আসর । এছাড়া গ্রামের হাট-বাজার, নদীর তীর, মন্দির প্রাঙ্গণে এ মেলা বসে । মানুষের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ করা যায় । নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নানা ধরনের কুটিরশিল্প, খেলনাসহ হরেক রকম পণ্যের সমাহার ঘটে এ মেলায় । এছাড়াও থাকে যাত্রা, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাসসহ বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন । বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিজাতীয় খাবারও পাওয়া যায় মেলায় । এমেলায় বসে বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহি নানা খাবারের পশরা । হরেক রকমের মিষ্টি, বাতাসা, খই, মুড়ি, আচার সহ নানান রকম বাহারী বাঙ্গালী খাবার এ মেলার প্রধান আকর্ষন । এছাড়া রং-বেরঙের বেলুন আর বাঁশের বাঁশির সুর আর কচিকাচাদের কোলাহলে মুখরিত থাকে মেলা প্রাঙ্গন । বৈশাখী মেলায় গিয়ে তালপাতার তৈরি হাতপাখা কেনেন না এমন লোকের সংখ্যা খুব কম । লোহা ও কাঠের তৈরি সামগ্রীর মধ্যে দা, বঁটি, কাস্তে, ছুরি, খুন্তি, কোদাল, শাবল, পিঁড়ি, জলচৌকি, চেয়ার, টেবিল, খাট-পালঙ্ক ইত্যাদি পাওয়া যায় । বৈশাখি মেলা আনন্দের পাশাপাশি আমাদের জীবনের অনেক প্রয়োজন মেটায় ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!