ভূমিকা: বর্তমানে বিশ্ব ক্রিড়াঙ্গনে অন্যতম জনপ্রিয় খেলা হিসেবে ক্রিকেট তার স্থান দখল করে নিয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই খেলায় সুনাম অর্জন করেছে। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের এই সফলতা সত্যিই গর্বের বিষয়। সৌন্দর্য ও বিচক্ষণতা খেলাটিকে দিয়েছে রাজকীয় মর্যাদা। আর অনিশ্চয়তা এই খেলাটিকে দিয়েছে উত্তেজনা, উদ্দীপনা ও জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশ এই খেলার মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে ব্যাপক সুনাম ও পরিচিতি পেয়েছে। তাই এ দেশের মানুষের কাছে ক্রিকেট খেলা অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের।
ক্রিকেটের জন্ম ও আদিকথা: ক্রিকেটের জন্ম ইউরোপের ব্রিটেনে। ভদ্রলোকের খেলা বলে পরিচিত এই খেলার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের আমলের একটি গ্রন্থে। একটা সময় ছিল যখন ব্রিটিশরাই শুধু খেলতো এই খেলা। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্রমবিস্তারের সাথে সাথে বিশ্বের নানা প্রান্তে এই খেলা ছড়িয়ে পড়ে। ক্রিকেটে প্রথম আইন তৈরি হয় ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে। এ আইন তৈরি করে লন্ডন ক্রিকেট ক্লাব। ১৭৮৭ সালে এম. সি. সি (মেরিলির্বোণ ক্রিকেট ক্লাব) প্রতিষ্ঠার পর ঐ আইন আরও সংশোধিত ও পরিমার্জিত হয়। ১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে প্রথম টেস্ট খেলার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সূত্রপাত ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ১০টি দেশ ক্রিকেটের টেস্ট খেলুড়ে দেশ। প্রথম বিশ্বকাপ শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। প্রতি ৪ বছর পরপর একদিনের বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর ক্রিকেটের সর্বশেষ সংস্করণ টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে।
উপমহাদেশে ক্রিকেট : অবিভক্ত বাংলায় ১৭১৯ সালে ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের প্রতিষ্ঠা ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেট ইতিহাসের একটি অন্যতম মাইলফলক। বাংলাদেশ অর্থাৎ প্রাক্তন পূর্ব বাংলায় ক্রিকেট খেলার প্রচলন করে ব্রিটিশরাই। তখন অবশ্য কেবল এই খেলা অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পাকিস্তান আমলেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, পরিপূর্ণভাবে ক্রিকেটের বিকাশ ঘটে সত্তরের দশকের শেষার্ধে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বিশ্বক্রিকেটের গতিশীলতা বাড়তে থাকে। এরপর সময়ের সাথে সাথে পরিপক্কতা লাভ করে এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট।
বাংলাদেশের ক্রিকেট যাত্রা : উপমহাদেশে ভারত পাকিস্তানের পরপরই বাংলাদেশের ক্রিকেট যাত্রা শুরু হয়। পাশ্ববর্তী এই দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তাই স্বাধীনতা লাভের অল্প দিনের মধ্যেই ১৯৭৩ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড যা বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি নামে পরিচিত। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ প্রথম ICC ট্রফিতে অংশ নেয়। সেবার মালয়েশিয়া ও ফিজির বিরুদ্ধে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এভাবেই সময়ের পালাবদলের সাথে সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসতে থাকে।
আইসিসিতে বাংলাদেশ : ১৯৭৯ সালে প্রথম বাংলাদেশ আইসিসি টুর্নামেন্ট খেলে। প্রথম টুর্নামেন্ট থেকে ৬ষ্ঠ আইসিসি টুনার্মেন্ট '৯৭ পর্যন্ত বাংলাদেশ সবকটি খেলায় অংশগ্রহণ করে। টুর্নামেন্টের ৪টি খেলায় বাংলাদেশ ২টিতে জয় লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ২য় টুর্নামেন্টে ৯টি ম্যাচের মধ্যে ৪টি ম্যাচ জিতে বিশ্ব ক্রিকেটের নজর কাড়ে। এভাবে ধারাবাহিক খেলার মধ্য দিয়ে ৬ষ্ঠ আইসিসি-তে ৫ম বিশ্বকাপের তিন দল আরব আমিরাত, কেনিয়া, হল্যান্ডকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণ করে।
ওয়ানডে স্ট্যাটাস ও বাংলাদেশ : ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জেতার পর বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির কাছে ওয়ানডে স্ট্যাটাস লাভের জন্য জোর দাবি জানায়। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ধারাবাহিক সাফল্য ও সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আইসিসি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশকে ওয়ানডে স্ট্যাটাস প্রদান করে।
টেস্ট স্ট্যাটাস ও বাংলাদেশ: টেস্ট খেলা হচ্ছে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড়ো ফরম্যাটের খেলা। ওয়ানডের পর বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য আইসিসির কাছে আবেদন করে। বিশ্বকাপ পরবর্তী সভায় বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে আইসিসি পর্যবেক্ষণ করে। অবশেষে ২০০০ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ বহুল কাঙ্ক্ষিত টেস্ট খেলার মর্যাদা লাভকরে। বর্তমানে ১১টি দেশ এই অভিজাত শ্রেণির সদস্য। বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে ২০০০ সালের ১০-১৪ নভেম্বর প্রথম টেস্ট খেলে।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ: ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রথম ৬টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেনি। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে বিশ্বকাপের সপ্তম আসরে।
আইসিসি বিশ্বকাপ ১৯৯৯ : ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয়। সে সময় বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। '৯৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভিষেক ঘটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে (১৭মে, ১৯৯৯ গেমস ফোর্ড) তৃতীয় ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ২২ রানে হারিয়ে প্রথম জয় পায় বাংলাদেশ। ঐ আসরে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশ।
আইসিসি বিশ্বকাপ ২০০৩: খালেদ মাসুদের নেতৃত্বে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার দঃ আফ্রিকা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে। এ আসরে বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ হেরে যায়। এমনকি দুর্বল কানাডার কাছেও পরাজিত হয় বাংলাদেশ।
আইসিসি বিশ্বকাপ ২০০৭: ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন হাবিবুল বাশার সুমন। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে শচীন, সৌরভের শক্তিশালী ভারতকে বাংলাদেশ ৫ উইকেটে হারিয়ে সুপার এইটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে এবং সুপার এইটে বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৬৭ রানে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করে।
আইসিসি বিশ্বকাপ ২০১১: প্রথমবারের মতো ভারত ও শ্রীলংকার সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশ বিশ্বকাপের আয়োজন করে। এ বিশ্বকাপের উদ্বোধন হয়েছিল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও হল্যান্ডকে পরাজিত করে। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে লজ্জাজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিদায় নিতে হয় টাইগারদের।
আইসিসি বিশ্বকাপ ২০১৫: ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন নড়াইল এক্সপ্রেস খ্যাত মাশরাফি বিন মর্তুজা। এ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানকে ১০৫ রানে ও স্কটল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারায় বাংলাদেশ। শ্রীলংকার কাছে হারলেও পঞ্চম ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২৫ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায়।
আইসিসি বিশ্বকাপ ২০১৯: সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ২০১৯ বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে এ আসরে বাংলাদেশ ৯টি ম্যাচের ৫টিতে জয় লাভ করে। কিন্তু এ আসরেও বাংলাদেশ সেমি ফাইনালে যেতে ব্যর্থ হয়। এ আসরে সাকিব আল হাসান ১১ উইকেটের পাশাপাশি ৬০২ রান করেন, যে সমগ্র টুর্নামেন্টে তৃতীয় সর্বোচ্চ। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি: বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও সাফল্য দিনদিন বেড়েই চলছে। এর সাথে বাড়ছে প্রত্যাশা। ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রথম কোনো বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি পান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ২০১৯ বিশ্বকাপে নজরকাড়া ৬০২ রানের পাশাপাশি ১১ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্ট সেরার দৌড়ে ছিলেন সাকিব আল হাসান। বোলিংয়ে ২০টি উইকেট নিয়ে কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান ছিলেন তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তাই আমাদের প্রত্যাশা বাংলাদেশ একদিন ক্রিকেট পরাশান্তিতে পরিণত হবে এবং জয় করবে বিশ্বকাপ।
উপসংহার: বাংলাদেশের খেলাধুলার মধ্যে ক্রিকেটের সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। এ দেশের মানুষ দলের জয়-পরাজয়ে পাশে থেকে উৎসাহ যুগিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে এ খেলা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাফল্য ঈর্ষনীয়। বস্তুত, সে দিন খুব বেশি দূরে নয়, যে দিন বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফির মতো বিশ্বকাপ ট্রপিও জয় করবে।
বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষ বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এসব অভিজ্ঞতার কোনোটি আনন্দদায়ক, কোনোটি রোমাঞ্চকর আবার কোনোটি প্রচণ্ড ভয়ের। যে ঘটনাগুলো মনকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়, আহত করে বা ভীতিবিহ্বল করে, মানুষ তা সহজে ভোলে না। একটি ঝড়ের রাত তেমনই আমার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। আমি যখনই সে-রাতের কথা ভাবি, ভয়ে শিউরে উঠি। অন্ধকার রাত, ঝোড়ো বাতাসের গর্জন, সঙ্গে মুষলধারায় বৃষ্টি, হুড়মুড় করে চালা ঘরগুলোর ভেঙে পড়ার শব্দ, ভয়ার্ত মানুষের আর্তনাদ- সবকিছু আমার মনে ছবির মতো ভেসে ওঠে।
সকাল থেকেই ঈশান কোণে মেঘ জমছিল। কালো কালো পুঞ্জীভূত মেঘে দুপুরের পরই দিনের আলো হারিয়ে গেল। বাতাসও যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। বেতার ও টেলিভিশনে বারবার বিপদ সংকেত জানানো হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা সবাইকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে। তা শুনে মানুষও দলে দলে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে। আমাদের পাকা দেয়ালে টিনের চালার বাড়ি। তাই বাবা বললেন, এখানে আমরা নিরাপদে থাকবো।
সন্ধ্যা হতে হতে প্রকৃতি এক অপরিচিত রূপ নিয়ে আবির্ভূত হলো। রাখালেরা গরুর পাল নিয়ে আগেভাগেই বাড়ি ফেরে। মাঝিরা নিরাপদ স্থানে নৌকা বাঁধে। নদীর ধারে দেখা গেল বেশ কয়েকজন নারী চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে অস্পষ্ট জেলে-নৌকাগুলোর দিকে। প্রিয়জনের জন্য কাতর অপেক্ষা, পাখিদের ব্যস্ত হয়ে নীড়ে ফেরা, হাটুরেদের আতঙ্কিত পদক্ষেপ, থেকে থেকে গবাদি পশুর আর্তনাদ যেন আসন্ন বিপদের আভাস দিচ্ছিল। অল্পক্ষণেই অন্ধকারের চাদরে চারপাশটা ঢেকে গেল। বিদ্যুৎ চমকে আঙিনা থেকে দিগন্ত পর্যন্ত যেটুকু চোখে পড়ে, তার সবটাই আমার কাছে ভূতুড়ে লাগছিল।
সন্ধ্যার পর থেকে বাতাসের বেগ বাড়তে লাগলো। তা ঝড়ো বৃষ্টিতে রূপ নিতে সময় নিল না। দানবীয় শক্তি নিয়ে ঝড় আছড়ে পড়ল আমাদের লোকালয়ে। আমি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বাবা-মার গা-ঘেঁষে বসে আছি। হারিকেনের আবছা আলোয় পরিবেশটা আরো থমথমে। এর মধ্যে ঝড়োবৃষ্টির একটানা শব্দে কানে তালা লাগার মতো অবস্থা। বাবা বললেন, শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চাল জায়গায় জায়গায় ছিদ্র হয়ে বৃষ্টির পানি পড়তে আরম্ভ হলো। মনে হলো যে-কোনো সময়ে পুরো চালাটি আমাদের মাথার উপরে খসে পড়বে। বাবা আমাদের নিয়ে একটি মজবুত খাটের নিচে অবস্থান নিলেন। কিছুক্ষণ পরেই পায়ের নিচে পানির প্রবাহ টের পেলাম। বুঝলাম দরজার নিচ দিয়ে ঘরে একটু একটু করে পানি ঢুকছে। তখনও পর্যন্ত বাবা খাটের নিচে থাকা নিরাপদ মনে করলেন। পাশের বাড়ি থেকে নারী-পুরুষের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছিল। বাবা চিৎকার করে তাদেরকে আমাদের ঘরে আসতে বললেন। কিছুক্ষণ পরেই বিকট শব্দে কিছু একটা আছড়ে পড়লো বাড়ির একপাশে। বাতাসের প্রবল তোড়ে উড়ে গেল পিছনের বারান্দার চাল।
অল্পক্ষণ পরে প্রতিবেশীদের কয়েকজন কাকভেজা হয়ে হুড়মুড় করে আমাদের ঘরে ঢুকল। তাদের একজনের মাথায় আঘাত লেগেছে। বাবা দেরি না করে কী একটা ওষুধ মেখে লোকটির মাথা গামছা দিয়ে বেঁধে দিলেন। তাকে ধরে একটি নিরাপদ জায়গায় বসালেন। শুনলাম একটা প্রকাণ্ড শিমুল গাছ উপড়ে গিয়ে তাদের ঘরের উপর পড়েছে। তারাই বললো, আমাদের গোয়ালঘরের চাল নাকি উড়ে গিয়েছে। গরুগুলোর কথা ভেবে আমাদের সবার মন খারাপ হয়ে গেল।
এক সময়ে বাতাসের বেগ খানিকটা কমে আসে। তখনও থেকে থেকে ভয়ানক শব্দে বাজ পড়ছে। বাবা-মা আমাকে শুকনো কাপড় বের করে দিলেন। প্রতিবেশীদের জন্যও কাপড়, কিছু শুকনো খাবার ও পানির ব্যবস্থা করে তাদেরকে মোটামুটি স্বাভাবিক করলেন। বাবা আহত লোকটিকে বারবার পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সে আগের চেয়ে ভালো বোধ করছে। আরো কিছুক্ষণ পর ঝড় পুরোপুরি থেমে গেল। তবে সমস্ত রাতই আমরা বসে কাটালাম।
দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বাবা দরজা-জানালা খুলে দিলেন। আমি বাইরে বেরিয়ে যা দেখলাম, এক কথায় তা অবিশ্বাস্য। বেশ কয়েকটি বড়ো গাছ উপড়ে পড়েছে। এখানে-সেখানে মৃত ও আহত পাখি পড়ে আছে। আমাদের ঘরের দুটি বারান্দার চাল উড়ে গেছে। অন্য একটি বাড়ির ঘরের চাল উড়ে এসে পড়েছে আমাদের উঠানে। গোয়ালঘরে ছুটে গিয়ে দেখি, এর চালা নেই একটি প্রকাণ্ড বৃক্ষ আছড়ে পড়েছে সেখানে। আমাদের চারটি গরুর একটি বড়ো রকমের আঘাত পেয়েছে। কয়েক বাড়ি পরে কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। গিয়ে দেখি, বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। একজনের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তাতে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোই কঠিন ব্যাপার। বাবা এবং আরো কয়েকজন যুবক মিলে একটি মাচা বানিয়ে লোকটিকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলেন। আমি মাকে সাহায্য করতে গেলাম। মনে মনে বন্ধুদের কথা ভাবছি আর অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠছি।
সেদিনের রাতে ঝড়ের যে দানবীয় তাণ্ডব দেখলাম, তা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি। ঝড় যেন তার প্রকাণ্ড গ্রাসে সবকিছু নিঃশেষ করতেই এসেছিল। ঘর, আঙিনা, বনবাদাড়, নদীর বাঁধ, মেঠো ও পাকা পথ- সর্বত্রই ধ্বংসলীলার ক্ষত। ওই রাতের পরে গ্রামবাসীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। আর মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছিল আরো বেশি।
ভূমিকা: বর্তমান বিশ্বসভ্যতা যে কয়টি মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন, মাদকাসক্তি তার অন্যতম। পুরোনো সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে দিনে দিনে, নতুন মূল্যবোধও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। সামগ্রিকভাবে সমাজব্যবস্থা চলছে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে, আর এই অবস্থা একদিকে যেমন স্বাচ্ছন্দ্য আনছে, অন্যদিকে সঞ্চারিত করছে হতাশা ও উদ্বেগ। ফলে বিশৃঙ্খল এক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে নানা মানুষ নানা বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যার কোনোটি খারাপ, কোনোটি আবার খারাপ আসক্তি তৈরি করছে। নানারকম এই আসক্তির মাঝে বিপজ্জনক ও ভয়ংকর এক আসন্তি হচ্ছে মাদকাসক্তি। এই আসক্তি এক ভয়ংকর ব্যাধিরূপে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি এখন সারাবিশ্বের অন্যতম সমস্যা। এমন দেশ সম্ভবত বিশ্বের কোথাও পাওয়া যাবে না, যেখানে মাদকাসক্তির কালো ছায়া তরুণসমাজকে স্পর্শ করছে না।
মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তি: মাদকদ্রব্য হচ্ছে সেসব বস্তু বা গ্রহণের ফলে স্নায়বিক বৈকল্যসহ নেশার সৃষ্টি হয়। সুনির্দিষ্ট সময় পরপর মাদক সেবনের দুর্বিনীত আসক্তি অনুভূত হয় এবং কেবল সেবন দ্বারাই সে আসক্তি দূরীভূত হয়। আর মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে নেশা সৃষ্টিকে মাদকাসক্তি বলা হয়। তবে বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার মতে- 'মাদকাসক্তি হচ্ছে চিকিৎসা গ্রহণযোগ্য নয় এমন দ্রব্য অতিরিক্ত পরিমাণে ক্রমাগত বিক্ষিপ্তভাবে গ্রহণ করা এবং এসব দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া।'
মাদকদ্রব্যের ধরন: বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের মাদক দ্রব্য চালু রয়েছে। মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম ইত্যাদি প্রাচীনকালের মাদকদ্রব্য। বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে হেরোইন, মারিজুয়ানা, এলএসডি, হাসিস, কোকেন, প্যাথিড্রিন, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে হেরোইনই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টিকারী মাদকদ্রব্য। বাংলাদেশে যেসব মাদকদ্রব্য সেবন সর্বাধিক সেগুলো হলো গাঁজা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, মদ, বিয়ার, তাঁড়ি, পচুই, প্যাথেড্রিন ইনজেকশন ইত্যাদি। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: মাদকদ্রব্য চোরাচালানের যাত্রাপথে বাংলাদেশের মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার এ সমস্যা আমাদের সমাজে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সীমান্ত গোল্ডেন ওয়েজ বা মাদক পাচার ও চোরাচালানের জন্য বিখ্যাত। আবার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হওয়ায় বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে অবাধে আর বাড়ছে এর ব্যবহার। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লক্ষ মাদকসেবনকারী রয়েছে এবং এই সংখ্যা দিন দিন আরও বাড়ছে। বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে এই মাদকের প্রভাব রয়েছে। তবে আমাদের দেশে মাদকাসক্তির অধিকাংশই যুবসমাজ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১৭ ভাগ মাদক ব্যবহার করে। দেশে ৩৫০টি বৈধ গাঁজার দোকান রয়েছে। বৈধ লাইসেন্স ছাড়াও আমাদের দেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর দেশিয় মদ উৎপাদন ও বিক্রি হয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও অবনতির মাঝামাঝি অবস্থান করছে। আর এই মধ্যবর্তী অবস্থাটিই সমাজে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করছে। তরুণসমাজ নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সঠিকভাবে ধারণ ও বিকশিত করতে পারছে না, আর দেশীয় অর্থনীতিতে বিরাজমান অস্থিরতা - তাদের মধ্যে তৈরি করে হতাশা, ক্ষোভ, বিষাদ, যার ফলশ্রুতিতে পূর্বের চেয়েও ভয়াল ত্রাসে বাংলাদেশকে ছেয়ে ফেলছে মাদকাসক্তি।
মাদকের উৎস ও বিস্তার অঞ্চল: মায়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড সীমান্তে অবস্থিত পপি উৎপাদনকারী অঞ্চলকে বলা হয় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল। আবার আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান সীমান্তে অবস্থিত আফিম মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চলকে বলা হয় গোল্ডেন ক্রিসেন্ট। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন আফিম। পপি কুনোর নির্যাস থেকে তৈরি হয় আফিম। আফিম থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় হেরোইন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের আশপাশের দেশগুলোতেই মাদকের উৎস, তার বিস্তার থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। তবে শুধু এশিয়াতেই নয়, ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, জ্যামাইকা, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালাসহ দক্ষিণ আফ্রিকা ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশে মারিজুয়ানা উৎপাদন হয়। আবার দক্ষিণ আমেরিকা, পেরু, কলম্বিয়া, ব্রাজিল কোকেন উৎপাদনে খ্যাত। আর আফিম, হেরোইন উৎপাদন হচ্ছে এশিয়াসহ দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। এভাবে বিশ্বব্যাপী মাদক ছড়িয়ে পড়ছে নীরব ঘাতকের মতো। মাদক আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী: যেসব পরিবারে পারিবারিক বন্ধন শিথিল, ঘনিষ্ঠতা কম, সেসব পরিবারের সদস্যরাই মাদকাসক্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের গড় বয়স ১৮-৩২ বছর। অর্থাৎ আমাদের যুবসমাজ। জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে মাদকাসক্তরা বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।
মাদকাসন্তির ক্ষতিকর প্রভাব : মাদকাসক্তির প্রভাব নিঃসন্দেহে ধ্বংসাত্মক। আর সে প্রভাবগুলোই নিয়ে আলোচিত হলো
i. কর্মঠ ও সফল হতে পারত যে যুবসমাজ, মাদকাসক্তি সে যুবসমাজকে অবচেতন ও অকর্মণ্য করে তুলছে।
ii. বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণির মাদকাসক্তরা মাদকদ্রব্য সংগ্রহের জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত। এই সব অপকর্ম সৃষ্টি করছে সামাজিক বিশৃজালা।
iii. চোরাচালান বাড়ছে ও দেশের কর্মঠ জনশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে মাদক। ফলে দেশীয় অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়ছে।
iv. মাদকদ্রব্য আসক্তদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা ক্ষতি করে। অতিরিক্ত সেবন সমাজে আনছে চরম নৈতিক অধঃপতন।
vi. আসক্ত ব্যক্তি দ্বারা সৃষ্টি হচ্ছে পারিবারিক ভাঙন এবং পুরো সমাজব্যবস্থার মানুষের মাঝে হতাশা।
vii. সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয় হচ্ছে।
viii. অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।
ix. মেধাবী সমাজ ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে।
মাদকাসক্তি ও আমাদের যুবসমাজ : বিশ্বব্যাপী মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং চোরাচালানের মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রসার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। মাদকের নিষ্ঠুর ছোবলে অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ এবং অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে বহু তরুণের সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। প্রেমে ব্যর্থতা, হতাশা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য প্রভৃতি কারণে আমাদের দেশের যুবসমাজের এক বিরাট অংশ মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর মাদককে কেন্দ্র করেই সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে আরও বহু ধ্বংসের সামাজিক সমস্যা। নেশাগ্রস্ত যুবসমাজ শুধু যে নিজেরই সর্বনাশ করে তা নয়, এরা পরিবার ও জাতীয় জীবনকে বিপর্যন্ত ও বিপন্ন করে তুলছে। যে যুবসমাজ দেশকে আলোকিত করবে, সে যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের মাঝে অন্ধকার নেমে আসে, তাতে শুধু সে নয়, পুরো দেশ-জাতি অন্ধকারে পর্যবসিত হয়ে যাবে।
মাদকদ্রব্য সেবনের কারণ: সাময়িক জীবনের প্রতি বিমুখতা ও নেতিবাচক মনোভাব থেকেই মাদকাসক্তির জন্ম। অভ্যাস থেকে আসক্তি, ধূমপান একদিন পরিণত হয় হেরোইন আসক্তিতে। ধনতান্ত্রিক সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যক্তির ভোগের উপকরণ অবাধ ও প্রচুর। ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে সেখানে চলে স্বেচ্ছাচারিতা, আনন্দের পোশাকে ঘুরে বেড়ায় উচ্ছৃঙ্খলতা। বর্তমানে সিনেমা ও টেলিভিশনে যেসব অশ্লীল নৃত্য, ছবি, কাহিনি ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে, সেসব অনুকরণ করতে গিয়ে তরুণসমাজ তাদের নৈতিক অধঃপতন ডেকে আনছে। তরুণদের এই বিপথগামিতার অন্যতম কারণ হচ্ছে বেকারত্ব। এই বেকারত্ব নামক অভিশাপটি যখন জীবনকে বিষিয়ে তোলে, তখন আপনাতেই মাদকাসক্তের এই ধ্বংসজালে আটকে যেতে হয়। তাছাড়া আবার অনেক সময় অস্থিরতা, কু-চিন্তা, অভাব-অনটন ও পারিবারিক কলহের কারণে তরুণসমাজ এই মোহের জালে আচ্ছন্ন হয়।
মাদকাসক্তি সমস্যা সমাধানের উপায়: বিশ্বজুড়ে মাদকাসক্তি একটি জটিল সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় এর সমাধানে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
ক. প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা: মাদকাসক্তদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের সুস্থ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বলা হয়। আসক্ত ব্যক্তিকে প্রথমে তাদের পরিবেশ থেকে সরিয়ে আনা হয়। যাতে সে পুনরায় মাদক গ্রহণ করতে না পারে। পরে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
খ. প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
১. মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও আমদানি নিষিদ্ধকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা।
২. স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা।
৩. প্রচার মাধ্যম ও আলোচনা সভার মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক তরুণসমাজের কাছে তুলে ধরা।
৪. মাদক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন করা।
৫. পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
৬. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে জোরালো করার প্রচেষ্টা করা।
৭. তরুণসমাজের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা।
৮. সামাজিক পরিবেশ উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকাসক্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য মাদকাসক্তি নিরাময় ও প্রতিরোধ আন্দোলনে আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। এর পূর্বশর্ত হিসেবে ধূমপান ও মাদকবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে। সরকারি মহল থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, আইনজীবী, সমাজকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদসহ সকল শ্রেণির মানুষকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলে এ বিশ্বকে বাসোপযোগী করে তুলতে হবে।
Related Question
View Allবৈশাখী মেলা
বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশ হলো বৈশাখী মেলা। প্রতি বছর বাংলা পহেলা বৈশাখ, অর্থাৎ ১৪ই এপ্রিল, এই মেলার আয়োজন করা হয়। বৈশাখী মেলা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাংলার জীবনযাত্রার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত এক ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান।
মেলার শুরু হয় সকালবেলায়, যেখানে গ্রামের মানুষ তাদের পোষাক ও সাজসজ্জায় মেতে ওঠে। বাজারে নানা ধরনের স্টল ও দোকান বসে, যা বিভিন্ন রকমের পণ্য ও সামগ্রী বিক্রি করে। এই মেলায় স্থানীয় হস্তশিল্প, জামদানি শাড়ি, মাটির পুতুল, কুটির শিল্পের নানা সামগ্রী পাওয়া যায়। মেলার এক দিকের গন্ধ আসে পিঠে-পুলি, মোয়া, চিড়েসুড়ির মত ঐতিহ্যবাহী খাবারের সুবাস।
বৈশাখী মেলা শুধু কেনাকাটার জন্যই নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আনন্দের মিলনমেলা। মেলা উপলক্ষে গীতিনাট্য, লোকনৃত্য, গান, কৌতুক পরিবেশিত হয়। এই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম গ্রামীণ জীবনকে প্রাণবন্ত করে তোলে এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করায়।
মেলা শেষ হওয়ার পর, সবাই একসাথে আনন্দের সাথে বাড়ি ফিরে আসে, মনে মনে ভরপুর আশা ও স্মৃতি নিয়ে। বৈশাখী মেলা একদিকে যেমন বাংলার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে, অন্যদিকে এটি সামাজিক মেলবন্ধনও শক্তিশালী করে।
এভাবে, বৈশাখী মেলা বাংলার সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ, যা সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যবাহী জীবনের সাথে সম্পৃক্ত।
বৈশাখী মেলা
বৈশাখী মেলা নববর্ষের একটি উৎসব । নববর্ষ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই মেলা বসে । এটি বৈশাখের প্রথম দিনে (মাসের) অনুষ্ঠিত হয় । মূলত বৈশাখী মেলার আয়োজন করে স্থানীয় লোকেরা । পহেলা বৈশাখ আয়োজন করা হয় বাংলাদেশের বিভিন্নজায়গায় ছোট বড় অনেক স্থানে । মেলা শুরু করে স্থানীয় লোকেরা এই মেলাতে বিভিন্ন ধরনের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা গুলো শুরু করে । এই মেলাগুলো এক সপ্তাহ কিংবা এক মাস ব্যাপী হয়ে থাকে । বৈশাখী মেলা সাধারণত খোলা আকাশের নিচে বসে । প্রতিবছর রমনার বটমূলে বসে এ মেলার প্রভাতি আসর । এছাড়া গ্রামের হাট-বাজার, নদীর তীর, মন্দির প্রাঙ্গণে এ মেলা বসে । মানুষের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ করা যায় । নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নানা ধরনের কুটিরশিল্প, খেলনাসহ হরেক রকম পণ্যের সমাহার ঘটে এ মেলায় । এছাড়াও থাকে যাত্রা, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাসসহ বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন । বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিজাতীয় খাবারও পাওয়া যায় মেলায় । এমেলায় বসে বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহি নানা খাবারের পশরা । হরেক রকমের মিষ্টি, বাতাসা, খই, মুড়ি, আচার সহ নানান রকম বাহারী বাঙ্গালী খাবার এ মেলার প্রধান আকর্ষন । এছাড়া রং-বেরঙের বেলুন আর বাঁশের বাঁশির সুর আর কচিকাচাদের কোলাহলে মুখরিত থাকে মেলা প্রাঙ্গন । বৈশাখী মেলায় গিয়ে তালপাতার তৈরি হাতপাখা কেনেন না এমন লোকের সংখ্যা খুব কম । লোহা ও কাঠের তৈরি সামগ্রীর মধ্যে দা, বঁটি, কাস্তে, ছুরি, খুন্তি, কোদাল, শাবল, পিঁড়ি, জলচৌকি, চেয়ার, টেবিল, খাট-পালঙ্ক ইত্যাদি পাওয়া যায় । বৈশাখি মেলা আনন্দের পাশাপাশি আমাদের জীবনের অনেক প্রয়োজন মেটায় ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!