যে কোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ লেখ:

Updated: 10 months ago
উত্তরঃ

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প: সমস্যা ও সম্ভাবনা

ভূমিকা: বাংলাদেশ একটি সুপ্রাচীন দেশ। প্রাচীনত্বের গরিমায় বাংলা সারা বিশ্বে পরিচিত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজরাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ-দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দারুণভাবে উন্নতি লাভ করেছে। দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে দেশের জনা আর্থিক সমৃদ্ধি আনয়ন করেছে। বর্তমানে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবন বর্তমান।

পর্যটনের বিকাশ: মানুষের একে অপরকে জানার আগ্রহ থেকেই পর্যটনের বিকাশ ঘটেছে। হয়ত পর্যটনের নামে নয়। কিন্তু পর্যটন বিষয়টি অনেক পুরাতন। মার্কোপোলো, ইবনে বতুতা, ফাহিয়েন, হিউয়েন সাং-সহ বিশ্ববিখ্যাত পর্যটকরা ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছেন, সেই সময়ে যখন যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল খুবই কষ্টকর, সেই সময়েও ভ্রমণপিপাসুরা। ঘুরে বেড়েয়িছেন দেশে দেশে। এসব বিখ্যাত পর্যটকদের অনেকেই এ উপমহাদেশে এসেছিলেন সে কথা আমরা ইতিহাস থেকে পাই। আজ পর্যটনের যে ধারণ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে পৃথিবীব্যাপী, দেশে দেশে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্প, লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশ-দেশান্তরে তা কিন্তু জগৎ সম্পর্কে তার কল্পন ও জগৎ সত্যের প্রত্যক্ষ সমন্বয়ের অদম্য অভিপ্রায়ের কারণে।

আমরা জনি খ্রিস্টপূর্বকালে প্রথম বিশ্ব জয় করেছিল বাংলার মসলিন। পৃথিবীব্যাপী এদেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সোনারগাঁও-এ তৈরি সুক্ষ্ম বস্ত্র মসলিনের মাধ্যমে। এছাড়াও পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বন (সুন্দরবন) রয়েছে বাংলাদেশে যা বিশ্ববাসীকে পর্যটন আকর্ষণে রাখতে পরে ব্যাপক ভূমিকা। আমাদের রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত যা অবিচ্ছিন্নভাবে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। আরো একটি কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে গৌরবজনক আসন অলংকৃত করে আছে যা 'একুশে ফেব্রুয়ারি' আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

পৃথিবীকে আজ আমরা গ্লোবাল ভিলেজ বলছি। অথাৎ সারা পৃথিবীর সব দেশ মিলেমিশে একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লবের ফলে সময় এসেছে পরস্পরের কাছে পরস্পরকে মেলে ধরার। নিজের দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ভ্রমণপিপাসু বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপনের এখনই সময়। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতে বাংলাদেশেও পর্যটন শিল্পের যথাযর্থ উন্নতি ও তদারকিতে লাভজনক হিসেবে গড়ে ওঠতে পারে।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া পর্যটন শিল্পের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরে মুল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও বেকারত্ব বিমোচনের লক্ষে ১৯৭২ সালে ২৭ নভেম্বর ভারিখে জারিকৃত মহামান্য রাষ্ট্রপতির ১৪৩ নং আদেশ বলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পর্যটন সম্ভাবনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের উদ্যোগ সূচিত হয়। এর প্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান জন্মলাভ করে এবং ১৯৭৫ সালে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রনালয় প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন নবগঠিত মন্ত্রণালয়ের অধীনে নীত হয়। জাতীয় পর্যটন সংস্থা হিসেবে এই সংস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে- বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থানসমূহের অবকাঠামোর উন্নয়ন, পর্যটকদের সেবা প্রদান, বিদেশে ইতিবাচক ভাবমুর্তি তুলে ধরা ও দেশের পর্যটন সম্পদের বিকাশের পাশাপাশি এ শিল্পের বিভিন্ন অঙ্গনে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ দেশের দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়তা করা।

শ্রেণিভিত্তিক বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ: বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণগুলোকে নিম্নরূপে ভাগ করা যায়। যথা:

(ক) প্রাকৃতিক বা বিনোদনমূলক পর্যটনঃ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ, শহরের যান্ত্রিক জীবনের বাইরে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসা কিংবা হঠাৎ করে কোনো নতুন পরিবেশের ছোয়া পাবার জন্য মানুষ ছুটে যায় প্রকৃতির কাছে। এ ধরনের নয়ন-কাড়া প্রাকৃতিক অবস্থান বাংলাদেশে প্রচুর। রয়েছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল ও চা বাগান, তামাবিল, জাফলং, রাঙামাটির নয়নভিরাম কৃত্রিম হ্রদ, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চল। এছাড়াও রয়েছে উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল, বর্ণাঢ্য উপজাতীয় ও গ্রামীণ জীবনধারা।

(খ) রোমাঞ্চকর ভ্রমণ এবং পরিবেশভিত্তিক পর্যটন: রোমাঞ্চকর ও পরিবেশভিত্তিক পর্যটনের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে বাংলাদেশে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিচিত্র বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিদসম্ভার দেখা যায়। রাঙামাটির হ্রদে নৌবিহার, মৎস্য শিকার, জলক্রীড়, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ট্রেকিং, হাইকিং ইত্যাদির সুযোগ রয়েছে। সাগরের বুক চিরে অপরূপ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটক আকর্ষণের এমনি অনেক সুযোগ আছে আমাদের এই বাংলাদেশে।

(গ) সাংস্কৃতিক পর্যটন: ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন সাংস্কৃতিক পর্যটনের পর্যায়ভুক্ত। মহাস্থানগড়, ময়নামতি , পাহাড়পুর, ঢাকার লালবাগের দুর্গ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় জাদুঘর, সোনারগাঁও জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, নাটোর ও পুঠিয়ার রাজবাড়ি এবং এমনি আরো অনেক সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্মিক নিদর্শন রয়েছে বাংলাদেশে।

(ঘ) ধর্মীয় পর্যটন: বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকেরা মূলত ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই কিছু কিছু স্থানে ভ্রমণ করে। ঐতিহাসিক ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আকর্ষণীয় স্থান বাংলাদেশে বিস্তত। মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মাজার, দরগাহ, মঠসহ বিভিন্ন নিদর্শন ছড়িয়ে আছে সারাদেশময়। এসব আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের ঘাটগম্বুজ মসজিদ, ঢাকার সাতগম্বুজ মসজিদ, রাজশাহীর শাহ মখদুমের মাজার, পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড়, নবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আর্মেনিয়ান চার্চ, চট্টগ্রমের বায়েজিদ বোস্তামীর দরগাহ, সীতাকুণ্ড মন্দির, সিনেটের হযরত শাহজালারের দরগা, কক্সবাজারের রামু মন্দির, রাজশাহীর তাহেরপুর রাজাবাড়ি প্রভৃতি।

(ঙ) নৌ পর্যটন: বিনোদনমূলক পর্যটনের জন্য এদেশের নদনদী আকর্ষণীয় উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে বহুকাল যাবৎ। বাংলাদেশ নদীবহুল দেশ। ২৫৭টি ছোটবড় নদনদী জালের মতে বিস্তৃত হয়ে আছে সারাদেশময়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃত সৌন্দর্য অনেকাংশেই ফুটে ওঠে নৌভ্রমণের মাধ্যমে এখান থেকেই অনুভব করা যায় সোনারবাংলার প্রকৃত ছবি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্প নানাভাবে অবদান রাখতে পারে। প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্র অর্জনে এ শিল্প একটি গরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাংলাদেশে এমনিতেই রপ্তানি কম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কোনো খাতই তেমন শক্তিশালী কিংবা যাতসহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে পর্যটনের মতো 'অদৃশ্য রপ্তানি পণ্য খাতে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পরে। পর্যটন কর্পোরেশন মুনাফা অর্জনকারী সংস্থার মধ্যে একটি। ১৯৮৩-৮৪ থেকে ২০০৩-২০০৪ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠান সর্বমোট ৪৯৭৩.১০ লক্ষ টাকা করপূর্ব মুনাফা অর্জন করেছে। বর্তমান সরকার পর্যটন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিত ও সুনাম অর্জনে বিরাট অবদান রেখেছে। বাংলাদেশ ২ বছরের জন্য (২০০১-২০০৩) বিশ্ব পর্যটন সংস্থার কমিশন ফর সাউথ এশিয়ান চেয়ারম্যয়ন নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ১৯৭৪ সালে জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পর্যন্ত এখানে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে ২২,০০০-এর বেশি ছাত্র-ছাত্রীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশ-বিদেশ কর্মরত আছেন। পর্যটন শিল্পের উন্নতির সঙ্গে যে সব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হতে পারে সেগুলো হল:

১. ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও বেকারত্ব লাঘব; 

২. প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়ন, 

৩. কুটিরশিল্প ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন; 

৪. বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি; 

৫. অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: 

৬. বৈদেশিক বিনিয়োগ;

৭. আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি।

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সমস্যা: অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ নানা কারণে পর্যটন শিল্পে আশানুরূপ অগ্রগতি সাধন করতে পারে নি। এক্ষেত্রে যেসব সমসয় রয়েছে সেগুলো হল: 

১. অবকাঠামোগত দুর্বলতা: এই খাতের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে দুর্বল। পরিবহণ ব্যবস্থা মান্ধাতার আমলের। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সত্ত্বেও এখনও রয়েছে অনেক দুর্বলতা। রাস্তাঘাট সংকীর্ণ, অনেক জায়গায় বিপজ্জনক। প্রায়শই যানজটে অযথা সময় ও শক্তি নষ্ট হয়। পর্যাপ্ত আধুনিক স্কেটেল ও মোটেল নেই। পর্যটন কেন্দ্রগুলোও অবহেলিত। এগুলোর সুপরিকল্পিত আধুনিকায়ন ও শুল্কমুক্ত বিপণির অভাবও এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। 

২. রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে বড় সমস্যা। 

৩. উন্নত সেব্য ও তথ্যের অভাব: দক্ষ, মার্জিত জনবলের অভাব এ শিল্পে একটা বড় সমস্যা। সেই সঙ্গে রয়েছে উন্নত ও দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থার অজব। 

৪. সামাজিক বাধা: বিদেশি পর্যটকদের সংস্কৃতিকে এদেশে অনেকেই সহজ ও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না। অনেকেই তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেকেই অদের সম্পর্কে পোষণ করেন নেতিবাচক মনোভাব। অনেক সময় পর্যটকরা দুষ্টলোকের পাল্লায় পড়ে ক্ষতিগ্রস্তও হন। এগুলোও এ শিল্পের বিকাশে সমস্যয় হয়ে আছে। 

৫. প্রচারের অভাব: আজকে আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, বিবিসি, সিএনএন, ডিসকভারী, ন্যাশনাল জিওগ্রাফির মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যসহ প্রাকৃতিক রূপ অবলোকন করে থাকি। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তেমন কোনো প্রচার নেই বললেই চলে। প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের কথা তুলে ধরা যায়।

৬. নিরাপত্তার অভাব: অস্থিতিশীলা, চুরি, ছিনতাই, হত্যা, রাহাজানি, সহিংসতা, থেকে পর্যটকদের রক্ষা করতে হবে। পর্যটকদের দিতে হবে নির্বিঘ্নে চলাফেরার নিশ্চয়তা।

পর্যটন শিল্প বিকাশে করণীয়: বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এ শিল্পের বিকাশে

(১) সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পর্যটন স্পটগুলোকে বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে; 

(২) যাতায়াতের সুষ্ঠু ব্যবস্থা তথা বিমান, নৌ ও সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন; 

(৩) নিরাপদ ভ্রমণের যাবতীয় ব্যবস্থাকরণ; 

(৪) দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসন সুবিধাদি করতে হবে।

এছাড়া সচেষ্ট হতে হবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে জাতীয় ঐকামত প্রতিষ্ঠায়। পাশাপশি পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য চাই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার। চাই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। আকর্ষণীয় এলাকাগুলোর পরিকল্পিত নান্দনিক উন্নয়ন যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন পর্যটন-কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। পর্যটন সংক্রান্ত নান বিষয়ে প্রয়োজন তথাপূর্ণ আকর্ষণীয় প্রচার। এই শিল্পের বিকাশের জনা পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে পর্যটকদের নিরাপত্তা। বিভিন্ন দেশের মতো পর্যটকদের বাড়তি কিছু সুবিধা দিতে হবে। সৈকতে রাখতে হবে বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা, ব্যবহার করতে হবে আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি। প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থানসহ অন্যন্য দৃষ্টিনন্দন স্থানকে পর্যটনের আওতায় এনে সমৃদ্ধ করতে হবে।

কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত: বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতের অবস্থান আমাদের বাংলাদেশের কক্সবাজারে যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। আরও রয়েছে দক্ষিণ অঞ্চলের কুয়াকাটি সমুদ্র সৈকত। যেখানে অবস্থান করে অবলোকন করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। যা খুবই বিরল। সেন্টমার্টিন: আমাদের আছে জগদ্বিখ্যাত প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রবাল দ্বীপের নামই সেন্টমার্টিন। নারিকেল বিথীতে ঘেরা যার সৈকত। এখানে রয়েছে পর্যটন শিল্প সমৃদ্ধ করার অপার সম্ভাবনা।

রাঙামাটি ও বান্দরবান: পাহাড়-পর্বত যেরা বান্দরবান, রাঙামটির সবুজ বনানীতে অপরূপ সৌন্দর্য সহসাই মনকে উচাটন করে দেয়। ছোট-বড় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী, কপা আর হ্রদের অপার নান্দনিকতা। যে-কোনো মানুষকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাহাড়ি উপজাতিদের কৃষ্টি সংস্কৃতি জীবনযাত্রার বর্ণাঢ্যও মুগ্ধ করে পর্যটন প্রিয়দের।

সুন্দরবন: এই বাংলাদেশেই অবস্থিত পৃথিবীর বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন যার নাম সুন্দরবন। খাল, নদী, সাগর বেষ্টিত সুন্দরবনের জলে কুমির আর ভাঙায় বাঘ। যে বাধ ভুবন বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামে অভিহিত। সুন্দরবন ছাড়া এই বাষ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এছাড় আছে ঝাঁকে ঝাঁকে চিত্রল হরিণ, বানর, শূকর, বনমোরগ, অজগরসহ নানা প্রকার বন্যপ্রাণী। সুন্দরবনে অবস্থানকালে পর্যটকদের ঘুম ভাঙাবে অগুনতি পাখির কল-কাকলীতে যা একজন পর্যটককে স্বপ্নিল আবেশে মুগ্ধ করতে পারে।

চা বাগান ও জলপ্রপাত: সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলোও বেশ সৌন্দর্যমণ্ডিত। যা পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।

জাফলংয়ের জলপ্রপাত, হায়কের পাথর কেয়ারী নয়নভোলানো স্থান। এছাড়া তামাবিল, চট্টগ্রামে ফয়েজ লেক, যমুনা সেতু ইত্যাদি পর্যটনের স্থান হিসেবে বেশ সমাদৃত।

উপসংহার: পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আরে উন্নত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ৭ম শতকে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন: 'A sleeping beauty emerging from mists and water. এই টাচ্ছ্বসিত প্রশংসাকে সর্বদা ধরে রাখার মাধ্যমে পঘটন শিল্পের বিকাশের দায়িত্ব আমাদের। সরকারের পাশাপাশি আমরা বেসরকারি উদ্যোগে বিকাশ ঘটাতে পারি পর্যটন শিল্পের। আমর সম্মিলিতভাবে যদি প্রচেষ্টা চালাই তাহলেই অচিরেই পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিবে। আসুন আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে অনিবার ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলি। আর জগদ্বাসীকে আপন করে গ্রহণ করি নিজের দেশে পরম আতিথেয়তায়।

উত্তরঃ

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বাংলাদেশ

ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে যা সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে ঝগড়া-বিভেদ সৃষ্টি করে সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করা। এতে সৃষ্টি হয় মানুষের মনে অমানবিক বিদ্বেষ ও ঘৃণা। তাই সাম্প্রদায়িকতা কোনো শুভবুদ্ধির উনোষ ঘটায় না। মানুষের মনকে করে সংকীর্ণ। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার কারণে হত্যা, দাঙ্গা, লুণ্ঠন প্রভৃতি ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। সভ্যতার অগ্রগতিতে সাম্প্রদায়িকতা একটি কঠিন বাধার সৃষ্টি করে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব - "আশরাফুল মাখলুকাত"। এ শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হলে মানুষকে অবশ্যই মানবতাবাদী হয়ে হবে। 

সাম্প্রদায়িকতা কী

'সম্প্রদায়' শব্দ থেকে সাম্প্রদায়িকতা শব্দটির সৃষ্টি। সম্প্রদায় শব্দের আভিধানিক অর্থ দল বা গোষ্ঠী, সুতরাং সাম্প্রদায়িকতা শব্দের যথার্থ অর্থ হলো দলীয় বা গোষ্ঠীগত মত বা মনোভাব। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা শব্দটি ইদানীং উগ্র ধর্মবিশ্বাসীদের অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপের অর্থ বহন করে। ধর্মের মহৎ উদ্দেশ্য বিচ্যুত হয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে কেউ যখন ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয় তখনই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে পথ হারায় সুস্থ ও সুন্দর জীবনবোধ। একদল মানুষ যখন নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বকে জোর করে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে বা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তখন সাম্প্রদায়িকতার অবশ্যম্ভাবী আবির্ভাব ঘটে। অনুদার জাত্যভিমান, সংকীর্ণ গোষ্ঠীচেতনা জন্ম দেয় ধৈর্যহীনতা ও অসহিষ্ণুতার। ফলে ধ্বংসের নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে মানুষ। তখন তাদের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লুপ্ত হয়ে যায়, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে।

সাম্প্রদায়িকতা কেন

মানুষে-মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই। বর্তমানে সাম্প্রদায়িকতার কারণে এ নীতিবাক্য ধূলিসাৎ হয়ে পড়েছে। নানা উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য সমাজের নেতৃস্থানীয় কিছু লোক সর্বসাধারণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রধান। ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নাড়া দিতে পারলেই তাদের সুপ্ত উদ্দেশ্য হাসিল হয়। 'এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের লোককে শাসন করবে এটা কখনও মেনে নেয়া যায় না' এটাই হয় সুবিধা ভোগীদের উসকানিমূলক বক্তব্য। ফলে শুরু হয়ে যায় দাঙ্গা, খুনাখুনি আর হানাহানি। আর এই ঘোলা জলে সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদগণ মৎস্য শিকারে তৎপর হয়ে ওঠেন। নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করার ব্যবস্থা করেন। বিশ্বের বহু দেশে আজ এ অবস্থা দেখা যায় । 

উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতা

এ উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা বিশ্বের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। বিহারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত, যেখানে হিন্দু জনতা মুসলিম পরিবারগুলিকে টার্গেট করেছিল। যা ১৯৪৬ বিহার দাঙ্গা নামে পরিচিত। মোগল আমলে ১৭৩০ সালে দোল খেলাকে কেন্দ্র করে হিন্দু- মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গা লেগেছিল এবং লক্ষ লক্ষ লোকের রক্তক্ষয় হয়েছিল। ১৯২০ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সুত্রপাত ঘটে। ১৯২২ থেকে ১৯২৭-এর মধ্যে ১৯২টি দাঙ্গার কথা জানা যায় এবং এতে অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই ভারতে দাঙ্গা সংঘটিত হয়। ১৯৪৬, ১৯৯০ সালেও ছোটখাটো দাঙ্গা লেগেছিল। ভারতের বাবরী মসজিদকে কেন্দ্র করে যে দাঙ্গা হয় তা অবর্ণনীয়। হাজার হাজার লোক সে দাঙ্গায় জীবন দিয়েছে। এর পেছনে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের অদৃশ্য হাত ছিল। এসব দাঙ্গার রেশ আজও কাটেনি।

সাম্প্রদায়িকতার কালো ছোবল

সাম্প্রদায়িকতা মানবকল্যাণে কখনো সুফল বয়ে আনেনি। বরং মানুষে- মানুষে বিভেদ সৃষ্টির বিষবাষ্প সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রভৃতি পড়ছে মুখ থুবড়ে। মানুষ শান্তি বিসর্জন দিয়ে যেন অশান্তির বাঁশি বাজিয়ে চলেছে। সাম্প্রদায়িকতার যুপকাষ্ঠে অগণিত শিশু-কিশোর-যুবা-বৃদ্ধ বলি হচ্ছে। পৃথিবীকে স্বর্গ করার প্রতিশ্রুতি গ্রহণের পরিবর্তে মানুষ যেন শশ্মশান করার ব্রত গ্রহণ করেছে। মানুষ তার মানবিক বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছে

সাম্প্রদায়িকতার কুফল

জীবন হল গতিশীল। প্রগতিই হল সমাজ উন্নয়নের চাবিকাঠি। এ যাত্রাপথে পাড়ি দিতে হলে মানুষকে ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ হতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে সমাজ প্রগতির পথকে রুদ্ধ করে দেয়। অথচ কোন ধর্ম, কোন আদর্শই পৃথিবীতে এ সর্বনাশা ভেদবুদ্ধিকে সমর্থন করে নি। এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গুরুত্বের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজও দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে সীমাহীন ভেদবুদ্ধি। আজও বিভেদ ও হিংসার অগ্নিদহন। সাম্প্রদায়িকতার জন্যেই একদিন হিটলারের গ্যাসচেম্বারে লক্ষ লক্ষ ইহুদি প্রাণ দিল। সেই ইহুদি অস্ত্রাঘাতেই আজ আবার কত প্যালেস্টাইনবাসী রক্তাপ্লুত। এখনও শ্বেতাঙ্গের কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতনের কলঙ্কিত ইতিহাস। এই সেদিনও ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বলে উঠেছিল। ভারতেও মাঝে মাঝে তারই নগ্ন বিভীষিকার চেহারা। ১৯৯২ সালে ভারতের কট্টর হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি অযোদ্ধার ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ভেঙে দিলে বাংলাদেশেও এর তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

প্রতিকারের উপায়

কিছু স্বার্থপর-কুৎসিত স্বভাবের মানুষ সাম্প্রদায়িকতা উসকে দিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। এদেরকে চিহ্নিত করে জনগণের সামনে এদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে জাতিকে উদ্ধারের জন্য মৌলবাদী রাজনৈতিক দলসমূহ নিষিদ্ধ করতে হবে। দেশের মধ্যে জনসংখ্যানুপাতে সরকার গঠনে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকেরই প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে এবং দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশের মানুষ সুখে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

বিভেদ নয়, ঐক্যই মুক্তির পথ

আমরা আজ উন্নয়নমুখী। আমাদের জাতীয় জীবনে গঠনমূলক কাজের উৎকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। চাষি, জেলে, কামার, কুমার, মুচি, ডোম, সকলকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেই জাতির উন্নয়নের জন্য গঠনমুলক পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা আমাদের জন্যে অপরিহার্য।

বিশ্বব্যাপী সাম্প্রদায়িকতার প্রসার

বর্তমানে বিশ্বের দিকে তাকালে সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ চোখে পড়ে। ভারত, পাকিস্তান, প্যালেস্টাইন, সার্বিয়া, বসনিয়া, হার্জেগোভেনিয়া, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে শুধু ভিন্ন ধর্মের নয়, গোত্রে গেত্রেও সংঘটিত হচ্ছে দাঙ্গা। তবে বিশ্বের বর্তমান দৃশ্যে শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার দৃশ্যগুলোই চোখে পড়ার মতো। ইসরাইলের ইহুদি সম্প্রদায় বছরের পর বছর ধরে প্যালেস্টাইনি মুসলমানদের নির্মূল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। মিয়ানমারে নির্যাতিত হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা। ভারতের দৃশ্যও তাই। পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া- সুন্নির দাঙ্গা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামার পরিবর্তে আরো যেন প্রসারিত হচ্ছে। ফলে মানুষের মনে অস্থিতিশীলতা এবং অস্থিরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সম্প্রীতির প্রয়োজনীয়তা

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপিত না হলে সে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমভাবে বিরাজ করে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের মাধ্যমে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটানোও সম্ভব হয় না। উপরন্তু দেশপ্রেমের মনোভাব জনসাধারণের মধ্যে জাগ্রত হয় না। বহিঃশত্রুর আক্রমণের ভয় থাকে। দেশের মানুষের মনে গড়ে। ওঠে বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসামূলক মনোভাব যার সবগুলোই স্বাধীনতা ও উন্নয়নের পরিপন্থী। দেশকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে এর ভূমিকা অপরিসীম।

জাতীয় জীবনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রয়োজনীয়তা

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেমন অপরিহার্য তেমনি আমাদের জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্যেও এটি একান্ত প্রয়োজনীয়। আমরা যতই উন্নয়ন পরিকল্পনা আর অর্থনৈতিক উন্নতির ঘোষণা দেই না কেন, জাতীয় অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অপরিহার্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হল আমাদের মত উন্নয়নকামী দেশের উন্নতির চাবিকাঠি। বিশ্বজনীন সামাজিক সম্প্রীতি তথা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করেই পৃথিবীতে শান্তি ও প্রগতি স্থাপন সম্ভব। এই সম্প্রীতিই কেবলমাত্র মানব-জীবনের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্যারান্টি দিতে পারে। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সকলের কাম্য হওয়া উচিত।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বাংলাদেশ

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম পীঠভূমি হল বাংলাদেশ। এটি আমাদের গৌরব। পার্শ্ববর্তী বৃহৎ রাষ্ট্র ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়েও মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ছে। চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এর বিষময় প্রতিফলন ঘটেনি আমাদের দেশে। এদেশের মানুষের সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা এখানে লক্ষণীয়। এ সচেতন মনোবৃত্তি আছে বলেই এ দেশের বুকে পার্শ্ববর্তী দেশের চরম সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড এবং ঘটনাবলির কোনো অশুভ প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর সাথে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলেই মিলেমিশে বসবাস করে আসছে।

শুধু আজ নয়, সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের নজিরটি এ দেশ বহন করছে। খেতে- খামারে, কলে-কারখানায়, অফিস-আদালত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নানা সম্প্রদায় কাজ করেছে। একে অন্যের দুঃখে-আনন্দে শরিক হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে গভীর সংহতি ও ঐক্য জাতীয় ইতিহাসে গৌরবময় ঐতিহ্য ও ইতিহাস হয়ে আছে। আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ তারই স্বাক্ষর। ১৯৭১ সালে এদেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে ঘোষিত হয়। আমরা তাই গৌরবান্বিত। জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এ সম্প্রীতি সংরক্ষণের পরিস্থিতিটি খুবই উপযোগী। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশ একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহান মন্ত্রে দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল। জাতীয়তাবোধের দৃঢ়বন্ধনে তারা আবদ্ধ।

বিশ্ব-শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

মানুষ আজ আর বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতে পারে না। তার মঙ্গল নিহিত রয়েছে বিশ্বজনীন শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্যে। বর্ণভেদ, ধর্মভেদ, সাদা-কালোর দম্ভ আজকের পৃথিবীতে স্থান পেতে পারে না। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের পাশাপাশি আজ কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রো জাতি তার আপন অবস্থানের স্বীকৃতি আদায় করে নিচ্ছে, আমরা আজ এ সত্যের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ, ছাত্রসমাজের ভূমিকা ও শিক্ষা সংস্কার

সাম্প্রদায়িকতা এক দুরারোগ্য ব্যাধি। এই ব্যাধির জীবাণু জাতির জীবনের গভীরে প্রোথিত। শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলার কঠোরতার মধ্যেই এর সমাধান সূত্র নেই। তরুণ শিক্ষার্থীরাই হল দেশের সবচেয়ে আদর্শপ্রবণ, ভাবপ্রবণ অংশ। ছাত্র-সমাজই দেশের ভবিষ্যৎ, জাতির কাণ্ডারী। তাদের মধ্যে আছে অফুরান প্রাণশক্তি। পারস্পরিক শ্রদ্ধার মনোভাব, আন্তরিক মেলামেশা, ভাবের আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় হবে এক নতুন প্রজন্মের। এরই মধ্য দিয়ে ছাত্ররা নতুন করে অনুভব করবে মানবতার উদার মহিমা। শুনবে সেই মহামিলনের মন্ত্র। ছাত্রাবস্থায়ই সাম্প্রদায়িকতার রাহু মুক্তির শপথ নিতে হবে। সম্প্রীতির মহাব্রত অনুষ্ঠানের তারাই হবে প্রধান পুরোহিত। শুধু পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া নয়, সুকুমার বৃত্তিগুলো যথাযথ বিকশিত হলেই তাদের শিক্ষার পূর্ণতা, সার্থকতা। মনুষ্যত্বের অধিকার অর্জনই হবে তাদের শিক্ষানুশীলনের পরম প্রাপ্তি। শিক্ষার নিবেদিত প্রাঙ্গণে তারা নতুন করে উপলব্ধি করবে সবার উপরে মানুষই সত্য। মানুষে মানুষে প্রীতি-বন্ধনই হবে তার শেষ কথা।

উপসংহার

সাম্প্রদায়িকতা বিশ্ববিবেকের কাছে নিঃসন্দেহে ঘৃণ্য বিষয়। মানবকল্যাণ পরিপন্থী এবং সভ্যতাবিধ্বংসী সাম্প্রদায়িকতা বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে না। আমরা যদি একটু সচেষ্ট হই তাহলে এ হানাহানি সমাজ থেকে নির্মূল করা অবশ্যই সম্ভব হতে পারে। এ বিষবাষ্প অপসারিত হলেই মানবসমাজে সম্প্রীতির শান্তির হাওয়া বইবে এবং 'মানুষ মানুষের জন্য' কথাটি সার্থকতা পাবে। আমাদের জীবন হয়ে উঠবে আরো সুন্দর, আরো সুখময়। বিশ্বের বুকে একটি সত্য ও আদর্শ জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাব আমরা।

উত্তরঃ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

সুচনাঃ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধ হলো ১৯৭১ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত বাংলার মানুষের একটি বিপ্লব ও সশস্ত্র সংগ্রাম। বাঙালির আবহমান কালের ইতিহাসের এক মাইলফলক ১৯৭১। এক মহিমান্বিত ইতিহাস রচিত হয়েছে ১৯৭১ সালে। স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। পাকিস্তানিদের অধীনে দাস হয়ে থাকতে চায়নি বাঙালিরা। রক্ত, অশ্রু আর অপরিসীম আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে একাত্তরে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। আর বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অভ্যুদয় হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধ তাই আমাদের জাতীয় জীবনে এক অহংকার, গৌরবের এক বীরত্বগাঁথা।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুইটি পৃথক রাষ্ট্র। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ছিল দুটি অংশ পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তান। স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক-বেসামরিক ও রাজনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যে জর্জরিত করতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানকে। শিল্প কারখানার কাঁচামালের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান নির্ভর করতো পূর্ব পাকিস্তানের ওপর। পুজিবাদী ভাবধারায় শ্রমিকদের অল্প বেতন দিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অপরদিকে উৎপাদনের কাজ করাহত। অপরদিকে রাজস্ব থেকে আয়, রপ্তানি আয় প্রভৃতির সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় যেখানে ৯৫% ব্যয় হতো, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় ব্যয় হতো মাত্র ৫ শতাংশ। পরবর্তীতে ১৯৭০ এর নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কোনোভাবে বাঞ্জলির হাতে শাসনভার তুলে দিতে চায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অভাব, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবহেলা, মৌলিক নাগরিক অধিকারে হস্তক্ষেপসহ সকল প্রকার বৈষম্য স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের দাবিকে জোরালো করে তোলে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ

বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয়তাবাদের সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই। তৎকালীন পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশেরই বাস ছিল পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু, শাসন ক্ষমতার চাবিকাঠি কুক্ষিগত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ক্রমেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর-শাসন শোষণের স্বরুপ পূর্ববাংলার জনগণের সামনে স্পষ্ট হতে থাকে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই শতকরা ৫৬ জনের মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানি শাসকরা শতকরা ৭ ভাগ লোকের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা পূর্ব বাংলার মানুষের মাঝে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ১৫৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ববাংলার প্রতিবাদী জনতা দেশের মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষা নেন। ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর এই আঘাতের পরই বাঙালি বুঝতে পারে তাদের স্বাতন্ত্র্যকে। তারা বাঙালি জাতি এই পরিচয় তাদের মধ্যে দৃঢ় হতে শুরু করে।

দেশ মাতৃকার কল্যাণে বাঞ্জলি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে এসময় গঠিত হয় বেশ কিছু সংগঠন। ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬২ এর শিক্ষন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ১৯৬৬ এর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে ১৬৭ টি আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়, এই প্রত্যেকটি ঘটনার মাধ্যমে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটে এবং ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সেই জাতীয়তাবাদ চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করে।

স্বাধীনতার ডাক

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। বরং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরকার তখন ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর ফলে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতায় উন্মুখ দশ লক্ষাধিক মানুষের সামনে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন। "আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শুনিয়েছিলেন তাঁর অমর-কবিতাখানি

"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, 

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" 

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

এরপর থেকেই গড়ে ওঠে তীব্র অসহযোগ আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সৃষ্টি হয়েছিল অনন্য এক ইতিহাস। তাঁর সেই ১১ মিনিটের বক্তব্যেই স্বাধীনতার বীজ লুকায়িত ছিল।

২৫ এ মার্চের কালরাত্রি এবং স্বাধীনতার ঘোষণা

নির্বাচনে এমন বিপুল জয়ের পরেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। এরই মধ্যে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে আসতে থাকে অস্ত্র আর সামরিক বাহিনী। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নয়, মাটি চাই বলে হানাদার বাহিনীকে নির্দেশ প্রদান করে ঢাকা ত্যাগ করে পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য গণহত্যার হোতা ইয়াহিয়া খান।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারেই শুরু হয় ইতিহাসের ঘৃণিত হত্যাযজ্ঞ, যা অপারেশন সার্চ লাইট নামে পরিচিত। এ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায় নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। তারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

মধ্যরাতের পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেফতারের পূর্বেই অর্থাৎ ২৬ এ মার্চের প্রথম প্রহরে গোপন তারবার্তায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার স্বাক্ষরিত ঘোষণাবার্তাটি তৎকালীন ইপিআর এর ট্রান্সমিটারের সাহায্যে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়। এরপর চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ ও ২৭ এ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৬শে মার্চ দুপুরে এম এ হান্নানও চট্টগ্রামের কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম।

মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধ

১২ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে সিলেটের তেলিয়াপাড়ার চা বাগানে কর্নেল এম এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য পুরো দেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এর সর্বাধিনায়ক। জুন মাসের শেষের দিকে গেরিলারা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আগস্টে গঠিত নৌ কমান্ডে বীরত্ব ও কৃতিত্বের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। ৩ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাগুলিদের সাথে ভারতীয় সেনারাও যোগ দেয়। মিলিতভাবে গঠিত হয় মিত্রবাহিনি।

মুজিবনগর সরকার গঠন

মুজিবনগর সরকার গঠন ১০ এপ্রিল ১৯৭১ কুষ্টিয়ার বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা ইউনিয়নের ভবের পাড়া গ্রামের আম্রকাননে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। এই জায়গার নতুন নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। তাই এই সরকারকে বলা হয় মুজিবনগর সরকার।

সে সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে, রাষ্ট্রপতি শাসিত এই সরকার ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এই দিনই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। পরবর্তীতে এই ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক পদক্ষেপ ছিল মুজিবনগর সরকার গঠন। এই সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। বিশ্বব্যাপী জনসমর্থন আদাযে এই সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও জনযুদ্ধ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালানোর পর বাঞ্জলি ছাত্র, জনতা, পুলিশ, ইপিআরসহ সর্বস্তরের মানুষ সাহসিকতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গনে শহিদ হন, আবার অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। মাতৃভূমির প্রতি তাই মুক্তিযোদ্ধাদের এ ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। এদেশের মানুষ চিরকাল জাতির এই সূর্য সন্তানদের মনে রাখবে। মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি দিল জনগণ। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ভূমিকা নেয়।

মুক্তিসংগ্রাম ও কৃষক

আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষ, এদেশের কৃষক শ্রমিকগণ যে ভূমিকা রেখেছিলেন স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছিল, তারা অস্ত্রহাতে যেমন ছিলেন যুদ্ধের মাঠে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরেও প্রতিরাধে ও সশস্ত্র অবরোধে অংশ নিয়েছিলেন ব্যাপকভাবে। মুক্তিসংগ্রাম ধারণার মধ্যে দুটি উপাদান আছে। একটি হলো জাতীয় মুক্তি এবং অন্যটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, শ্রেণিগত শোষণমুক্তি। আর এই মুক্তির মন্ত্রক দিল আমাদের কৃষকসমাজ। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন গ্রামের সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ। তাদের বীরত্বগাথা ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়। সুদীর্ঘ বন্ধনার পথ পেরিয়ে এসে তারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছেন। তাই যে হাতে তারা লাঙল ঠেলেছেন, ধান কেটেছেন, নৌকার দাঁড় টেনেছেন, জীবিকার জন্য প্রাণান্ত শ্রম দিয়েছেন সে হাত তাদের উদ্যত হযেছি শত্রুর মোকাবিলায়।

মুক্তিযুদ্ধ ও ছাত্র সমাজ

মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অহঙ্কার করার মতো। একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্রদের সংখ্যা ছিল বেশি। গোটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে অসাধারণ ভুমিকা পালন করেছিলেন বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। দেশের সব আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এদেশের ছাত্র সমাজ। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের অবদানের কথা বলতে গেলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা, সোপর্জিত স্বাধীনতা ভাস্কর্য। বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ ও ৬৪ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভ্যানগার্ড হিসেবে তৎকালীন ছাত্রসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক দল

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগই সর্বপ্রথম পূর্ববাংলার জনগণকে স্বাধিকার আন্দোলনে সংগঠিত করে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়েই এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। বস্তুত, তিনি দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ ছাড়াও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় কংগ্রেস ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকবাহিনীর সমর্থনে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপিসহ কতিপয় বিপথগামী রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে।

মুক্তিযুদ্ধ ও গণমাধ্যম

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে এবং জনমত গঠনে দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, মুজিবনগর সরকার ও প্রবাসী বাঙালিদের প্রকাশিত পত্রপত্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ, ধ্বংসলীলা, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, শরণার্থী শিবিরের বর্ণনা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। যুদ্ধের সময়ে দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ, মনোবল বৃদ্ধিসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পী-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ও অবদান ছিল খুবই প্রশংসনীয়। পত্রপত্রিকায় লেখা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ, দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, আবৃত্তি, নাটক, কথিকা, জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'চরমপত্র ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।

মুক্তিযুদ্ধে নারী

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা ছিল অনন্য অনবদ্য। নারী সক্রিয় ছিল কখনও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে, কখনো বা যুদ্ধক্ষেত্রের আড়ালে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন এমন নারীর সংখ্যা অসংখ্য। অজানা-অচেনা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা শুশ্রুষা করেছেন বহু নারী। চরম দুঃসময়ে পাকিস্তানি হানাদারের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিযেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। অনেক সময়ে শত্রুর কাছে নিজেদের সম্ভ্রম এবং প্রাণও দিতে হযেছে।

মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিদের অবদান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিরা সর্বতোভাবে পাশে ছিলেন। বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিভিন্ন দেশে তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের কাছে দুটে গিয়েছেন। তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন। পাকিস্তানকে অস্ত্র, গোলাবারুদ সরবরাহ না করতে বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের নিকট আবেদন করেছেন। এক্ষেত্রে ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব

১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের কাহিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়। ভারত সে সময় এক কোটিরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়ে বিশ্বজনমত তৈরিতে এগিয়ে এসেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দেয়। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের বিরোধিতা করলেও সে দেশের জনগণ বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়। তাদের প্রতিরোধের মুখে মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিটলস এর জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় পন্ডিত রবি শংকর 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এর আয়োজন করেছিলেন। ফরাসি সাহিত্যিক আন্দ্রে মারোযা, জ্যা পল সাত্রে সহ তানেকেই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে যৌথ বাহিনী

১৯৭১ সালে যুদ্ধের প্রায় শেষদিকে ২১ নভেম্বর ভারতীয় পূর্বাঞ্চল কমান্ডার লে. জে জগজিৎ সিং অরোরার অধিনায়কত্বে ঘোষিত হয় বাংলাদেশ ভারত যৌথ কমান্ড। ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী মিত্রবাহিনী নাম নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুক্ত হওয়। ভারতীয় বিমান হামলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি ও যৌথবাহিনীর দুর্বার প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখে পশ্চিমা হানাদার বাহিনী যখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তখন পরাজয় নিশ্চিত জেনে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে এ দেশের সুর্য সন্তানদের ওপর। আর এ কাজে তাদেরকে সাহায্য করে তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর আল শামস বাহিনী। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী দেশের মুক্তিকামী ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনকারী শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের বেশিরভাগের ক্ষত বিক্ষত মৃতদেহ রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়।

আত্মসমর্পণ এবং বাঙালির বিজয়

সংগ্রামী বাঙালি আর মিত্র বাহিনীর সাথে যুদ্ধে হানাদার বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অর্থাৎ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ৯৩০০০ সৈন্য নিয়ে জেনারেল নিয়াজি সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান জগজিৎ সিং আরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করেন। এসময় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার। এর মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের। 

"রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, 

শকুনে খেয়েছে যারে সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা। 

স্বাধীনতা, সে আমার স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন- 

স্বাধীনতা, সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।"

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ক্ষুধাদারিদ্র-অশিক্ষা-কুসংস্কার থেকে মুক্ত অসাম্প্রদায়িক একটি দেশের বঙ্গবন্ধু যার নাম দিয়েছিলেন 'সোনার বাংলা'। এই সোনার বাংলা গঠনের চেতনাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। নতুন প্রজন্মের কাছে এই চেতনাকে গৌঁছে দেওয়া জরুরি। কেননা উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এই চেতনার কোনো বিকল্প নেই।

উপসংহার

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির অহংকার। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ জাতিকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র এনে দেয়। এই স্বাধীনতা ত্রিশ লক্ষ ভাইযের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত, লক্ষ মা-বোনের সমভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া। তাই এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের নিবেদিতপ্রাণ হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানো যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকদের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কর্তব্যবোধে, ন্যায়নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাংলাদেশের যথার্থ অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব।

উত্তরঃ

স্মার্ট বাংলাদেশ

ভূমিকা

ডিজিটাল প্রযুক্তির উদ্ভাবনের পথ ধরে আসা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বিজয়ে আজ বাংলাদেশ অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুত "ডিজিটাল বাংলাদেশ" বাস্তবায়ন অনেকটা সম্পন্ন হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশর বাস্তবায়নের পর সরকারের নতুন লক্ষ্য "স্মার্ট বাংলাদেশ।" ভবিষ্যৎ স্মার্ট বাংলাদেশ হবে সাশ্রয়ী, টেকসই, জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং উদ্ভাবনী। অর্থাৎ সব কাজই হবে স্মার্ট।

ইতিহাস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ই ডিসেম্বর ২০২২ সালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের (বিআইসিসি) অনুষ্ঠানে ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস-২০২২ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে সর্বপ্রথম 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, 'আমরা আগামী ২০৪১' সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলব এবং বাংলাদেশ হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ।' এ স্মার্ট শব্দটি দেশ ও শহরের ক্ষেত্রে প্রথম ব্যবহার শুরু হয় ভারতে স্মার্ট সিটি প্রকল্প নামে।

পরিকল্পনা

স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার ভিত্তি চারটি। এগুলো হচ্ছে-

  • স্মার্ট নাগরিক
  • স্মার্ট অর্থনীতি 
  • স্মার্ট সরকার 
  • স্মার্ট সমাজ

স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণে এ চারটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে অগ্রসর হলে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের কোনো অবশিষ্ট থাকবে না। স্মার্ট নাগরিক ও স্মার্ট সরকার এর মাধ্যমে সব সেবা এবং মাধ্যম ডিজিটালে রূপান্তরিত হবে। আর স্মার্ট সমাজ ও স্মার্ট অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

স্মার্ট বাংলাদেশ হবে সাশ্রয়ী, টেকসই, জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিদীপ্ত ও উদ্ভাবনী। এককথায় সব কাজই হবে স্মার্ট। যেমন স্মার্ট শহর ও স্মার্ট গ্রাম বাস্তবায়নের জন্য স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট পরিবহন, স্মার্ট ইউটিলিটিজ, নগর প্রশাসন, জননিরাপত্তা, কৃষি, ইন্টারনেট সংযোগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। অনলাইনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এক শিক্ষার্থী, এক ল্যাপটপ, এক স্বপ্নের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় সব ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত ক্লাউডের আওতায় নিয়ে আসা হবে। ইতোমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের নাম পরিবর্তন করে 'স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্স' গঠন করেছে বাংলাদেশ সরকার।

টাস্কফোর্স গঠন

বাংলাদেশ সরকার 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার লক্ষ্যে ৩০ সদস্য বিশিষ্ট "স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্স' গঠন করেছে। এ টাস্কফোর্সের চেয়ারপারসন হলেন প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। বাকি ২৯ জন সদস্য।

টাস্কফোর্সের কার্যাবলী

  • অগ্রসরমান তথ্য প্রযুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে দিক নির্দেশনা প্রদান;
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও আর্থিক খাতের কার্যক্রমকে স্মার্ট পদ্ধতিতে রূপান্তরের সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দিক নির্দেশনা প্রদান;
  • স্মার্ট এবং সর্বত্র বিরাজমান সরকার গড়ে তোলার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, বাণিজ্যিক ও বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক বিধিবিধান প্রণয়নে দিক নির্দেশনা প্রদান। ইত্যাদি।

 

সম্মেলন

স্মার্ট বাংলাদেশের পরিকল্পনাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য সরকার ৫ অক্টোবর থেকে ৭ অক্টোবর "স্মার্ট বাংলাদেশ সম্মেলন" শুরু করেছে। ২০২৩ সালে এ সম্মেলন প্রথম শুরু হয়। ব্যবসায়ীরা স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণে সম্মেলন করে থাকে।

 

স্মার্ট বাংলাদেশ বিষয়ে সুধীজনের মন্তব্য

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে মাইন্ডসেট পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের আলেম সমাজ ও বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো। বিজ্ঞ আলেম সমাজের বক্তব্যে বলা হয়েছে, "আমরা প্রযুক্তিবান্ধব, প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনে দক্ষ মানুষ তৈরি করতে চাই। যাদেরকে মানবিক ও সৃজনশীল হতে হবে।" হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও হিউম্যানওয়্যারকে একসাথে কাজে লাগানোর উপর গুরুত্বারোপ করেন বিভিন্ন মুসলিম উদ্যোক্তারা।

স্মার্ট প্রযুক্তি

২০২১ সালেই আমরা পরীক্ষামূলকভাবে দেশে ফাইভজি (5G) সেবা চালু করেছি এবং এরইমধ্যে ফাইভজি (5G) কানেক্টিভিটি সেবা নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হয়েছে। স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট ভিলেজ বিনির্মাণে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও শিক্ষা ক্ষেত্রের উন্নয়নে আমাদেরকে ফাইভজি কানেক্টিভিটি সুবিধাকে কাজে লাগাতে হবে।

উপসংহার

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অত্যাধুনিক পাওয়ার গ্রিড, গ্রিন ইকোনমি, দক্ষতা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং পেশাকে স্বীকৃতি প্রদান এবং নগর উন্নয়নে বেশ জোরেসোরে কাজ চলছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময়কে মোকাবেলা করতে ডিজিটাল সংযুক্তির জন্য যতটুকু প্রস্তুতির প্রয়োজন, সরকার তার অধিকাংশই সুসম্পন্ন করেছে। 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বলতে স্মার্ট নাগরিক, সমাজ, অর্থনীতি ও স্মার্ট সরকার গড়ে তোলা হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও আর্থিক খাতের কার্যক্রম স্মার্ট পদ্ধতিতে রূপান্তর হবে। মনে রাখতে হবে, স্মার্ট বাংলাদেশ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের নয়, এটা দেশের ১৬ কোটি মানুষের, মুসলিম জনতার ধ্যানজ্ঞান ও চিন্তা-ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।

202

লেখক তার নিজের কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে কোনো মননশীল ভাব কিংবা তথ্য বা তত্ত্ব উপযুক্ত ভাষার মাধ্যমে যুক্তি পরম্পরায় উপস্থাপনের মাধ্যমে যে নাতিদীর্ঘ সাহিত্য রচনা করেন তাকে প্রবন্ধ রচনা বলে। এর সাধারণত তিনটি অংশ থাকে। যথা:

০১। ভূমিকা: ভূমিকা হচ্ছে প্রবন্ধের প্রারম্ভিক অংশ যেখানে লেখার মূল বিষয়গত ভাবের প্রতিফলন ঘটে। ভূমিকা যত আকর্ষণীয় হবে রচনাটিও পাঠকের কাছে ততো হৃদয়গ্রাহী হবে। ভূমিকাতে অপ্রাসঙ্গিক ও অনাবশ্যক বিষয়ের অবতারণা করা উচিত নয়।

০২। মূল অংশ: এ অংশে প্রবন্ধের মূল বক্তব্য উপস্থাপিত হবে। পরিবেশনের আগে বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় সংকেত (Points) এ ভাগ করে নিতে হবে। সংকেতের বিস্তার কতখানি হবে তা ভাব প্রকাশের পূর্ণতার ওপর নির্ভরশীল। এর আয়তনগত কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপ নেই।

০৩। উপসংহার: এটি প্রবন্ধের সিদ্ধান্তমূলক বা সমাপ্তিসূচক অংশ। এখানে লেখক তার আলোচনার সিদ্ধান্তে উপনীত হন এবং তার নিজস্ব অভিমত বা আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন।

Related Question

View All
উত্তরঃ

একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।

একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।

একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।

সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।

একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।

একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।

অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।

সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।

লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।

3.7k
উত্তরঃ

সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।

আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।

সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।

3.1k
উত্তরঃ

আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।

শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।

বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।

আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।

arif
arif
3 years ago
3.6k
উত্তরঃ

আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ

 

বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।

অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র

য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

2.4k
উত্তরঃ

"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ: 

সাম্যবাদের পতন:

১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:

সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ: 

অর্থনৈতিক সংকট:

সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের উত্থান:

অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা:

নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।

সামাজিক পরিবর্তন:

পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক: 

  • এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
  • যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল। 

Joy Roy
Joy Roy
8 months ago
2.2k
উত্তরঃ

পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে  দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান  বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-

১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ  পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:

সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়  একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।

অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা  জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে,  ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।

২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে।  [ঊর্মি হোসেন]

Md. Aminul Islam
Md. Aminul Islam
2 years ago
4.4k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews