সূচনা : ব্যর্থতা কেউ চায় না। সবাই সাফল্য খোঁজে। কিন্তু কেউই সব কাজে একবারে সফল হয় না। সফলতার জন্য বারবার চেষ্টা করতে হয়। কোনো কাজে সাফল্য লাভের জন্য বারবার এই চেষ্টার নামই অধ্যবসায়। অধ্যবসায় ছাড়া জীবনে উন্নতি লাভ করা যায় না। অধ্যবসায়ই হচ্ছে মানব সভ্যতার অগ্রগতির চাবিকাঠি।
অধ্যবসায় কী : অধ্যবসায় শব্দের আভিধানিক অর্থ অবিরাম সাধনা, ক্রমাগত চেষ্টা। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অবিরাম সাধনা বা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে বলে অধ্যবসায়। ব্যর্থতায় নিরাশ না হয়ে কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের সাথে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর মধ্যেই অধ্যবসায়ের সার্থকতা নিহিত।
অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা : ব্যর্থতাই সফলতার প্রথম সোপান। ব্যর্থতা থেকে সাধনার শুরু, আর সফলতার মাধ্যমে তার শেষ। তাই মানবজীবনে সাধনা বা অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। অধ্যবসায়ী মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। এমনকি অধ্যবসায়ের গুণেই মানুষ পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করতে পারে। তাই মানবজীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
ছাত্রজীবনে অধ্যবসায় : ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। ছাত্রজীবনই ভবিষ্যৎ গড়ার উপযুক্ত সময়। এ সময় ব্যর্থ হলে সম্পূর্ণ মানবজীবনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যে ছাত্র অধ্যবসায়ী, সাফল্য তার হাতের মুঠোয়। অলস ছাত্র-ছাত্রী মেধাবী হলেও পড়াশোনায় কখনো সফল হতে পারে না। কঠোর অধ্যবসায় ছাড়া কোনো কাজেই জয়ী হওয়া যায় না। ছাত্রজীবনেই এই সত্য উপলব্ধি করে নিজেকে অধ্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষের বিখ্যাত উক্তি :
পারিব না একথাটি বলিও না আর,
কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার,
পার কি না পার কর যতন আবার
একবার না পারিলে দেখ শতবার।
অধ্যবসায় ও প্রতিভা : অধ্যবসায় প্রতিভার চেয়ে অনেক বড়। মনীষী ভলতেয়ারের ভাষায়, ‘প্রতিভা বলে কোনো কিছু নেই। পরিশ্রম ও সাধনা করে যাও তাহলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে।' ডালটন বলেছেন, ‘লোকে আমাকে প্রতিভাবান বলে; কিন্তু আমি পরিশ্রম ছাড়া আর কিছু জানি না।' বিজ্ঞানী নিউটনের উক্তি, ‘আমার আবিষ্কার প্রতিভা-প্রসূত নয়, বহু বছরের অধ্যবসায় ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার ফল।' এ থেকেই বোঝা যায়, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম ছাড়া শুধু প্রতিভার কোনো মূল্য নেই। প্রতিভাবান ব্যক্তিরা অধ্যবসায় দ্বারাই নিজের কাজকে সুসম্পন্ন করে তোলেন। আবার অধ্যবসায়ের দ্বারা অনেকে প্রতিভাবান হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
অধ্যবসায়ের উদাহরণ : পৃথিবীতে যেসব মনীষী সাফল্যের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে অমরত্ব লাভ করেছেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন অধ্যবসায়ী। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস ও ফ্রান্সের বিখ্যাত ঐতিহাসিক কার্লাইল অধ্যবসায়ের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। রবার্ট ব্রুস বারবার ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েও যুদ্ধ-জয়ের আশা ও চেষ্টা ত্যাগ করেন নি। ষষ্ঠবার পরাজিত হয়ে তিনি যুদ্ধ চিন্তায় মগ্ন আছেন, এমন সময় দেখতে পেলেন একটি মাকড়সা বারবার কড়িকাঠে সুতা বাঁধবার চেষ্টা করছে এবং ব্যর্থ হচ্ছে। এইভাবে ছয়বার ব্যর্থ হয়ে সপ্তমবারে মাকড়সাটি সফল হলো। এই দেখে রবার্ট ব্রুসও সপ্তমবার যুদ্ধ করে ইংরেজদের পরাজিত করেন এবং স্কটল্যন্ডের ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। মনীষী কার্লাইল তাঁর লেখা ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি এক বন্ধুকে পড়তে দিয়েছিলেন। বন্ধুর বাড়ির কাজের মহিলা সেটিকে বাজে কাগজ ভেবে পুড়িয়ে ফেলেন। কার্লাইল এতে একটুও দমে যান নি। তিনি আবার চেষ্টা করে বইখানা লিখে বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছিলেন। সম্রাট নেপোলিয়ান, আব্রাহাম লিঙ্কন, ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রমুখ মনীষীর জীবনও অধ্যবসায়ের এক বিরাট সাক্ষ্য। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অধ্যবসায়ের গুণেই আজ বিশ্ববিখ্যাত । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমরা বাঙালিমাত্রই তাঁদের জন্য গর্বিত।
উপসংহার : অধ্যবসায় হচ্ছে জীবনসংগ্রামের মূল প্রেরণা। এ সংগ্রামে সফলতা ও ব্যর্থতা উভয়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যবসায়ী মানুষ জীবনের সব ব্যর্থতাকে সাফল্যে পরিণত করতে পারে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, জীবনে সাফল্যের জন্য অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই।
ভূমিকা:
আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তার মধ্যে কম্পিউটার হলো একটি অপরিহার্য যন্ত্র যা মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, যোগাযোগ, গবেষণা ও বিনোদন—প্রায় সকল ক্ষেত্রে কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে।
কম্পিউটারের উদ্ভব ও বিবর্তন:
১৯৪০-এর দশকে প্রথম কম্পিউটার আবিষ্কৃত হয়। তখন থেকে কম্পিউটারের প্রযুক্তি ক্রমাগত উন্নতি হয়েছে। আজকের আধুনিক কম্পিউটার অনেক ছোট, দ্রুত ও শক্তিশালী। এই কম্পিউটারগুলি অনেক বেশি তথ্য সংরক্ষণ এবং দ্রুত প্রসেস করতে সক্ষম।
কম্পিউটারের ব্যবহার:
শিক্ষা ক্ষেত্রে কম্পিউটার শিক্ষার্থীদের তথ্য আহরণ ও বিশ্লেষণে সাহায্য করে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা গবেষণায় কম্পিউটারের ভূমিকা অপরিসীম। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে হিসাবনিকাশ, গ্রাহক ব্যবস্থাপনা ও অনলাইন লেনদেনে কম্পিউটার ব্যবহার হচ্ছে। যোগাযোগে ইমেইল, ভিডিও কল ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ একে অপরের সঙ্গে সহজে সংযুক্ত হচ্ছে।
কম্পিউটার প্রযুক্তি ও বিশ্বায়ন:
কম্পিউটারের মাধ্যমে বিশ্বায়ন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, মানুষ ও প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। এতে করে পণ্য, তথ্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান সহজ হয়েছে।
কম্পিউটারের প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ:
যদিও কম্পিউটার জীবনের নানা সুবিধা দিয়েছে, তবে এর অপব্যবহারও রয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, সাইবার অপরাধ ও তথ্য নিরাপত্তার সমস্যা কম্পিউটারের সঙ্গে জড়িত। তাই কম্পিউটার ব্যবহারে সতর্কতা ও সচেতনতা জরুরি।
উপসংহার:
কম্পিউটার আধুনিক বিশ্বের অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকা শক্তি। সঠিক ব্যবহারে এটি মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও উন্নত করেছে। তাই আমাদের উচিত কম্পিউটারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির উন্নতিতে এগিয়ে যাওয়া।
একুশের চেতনা
ভূমিকা:
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১ ফেব্রুয়ারি একটি অমর দিন। এই দিনটিকে স্মরণ করে আমরা “একুশের চেতনা” বলি, যা বাংলাভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রতীক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তানে তখনকার অকারণ একাধিক ভাষা-অধিকার রক্ষার আন্দোলনের চরম পরিণতি ঘটে। বাংলাভাষার জন্য সংগ্রামে প্রাণদানের ফলে একুশের চেতনা জাতির জন্য ঐক্যের মন্ত্রে পরিণত হয়।
একুশের পটভূমি:
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষীরা সংখ্যাগুরু হলেও রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্ব বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে চায়নি। ১৯৫২ সালে এই অবিচার প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের অন্যান্য স্থানে ছাত্ররা অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায় এবং কয়েকজন ছাত্র শহীদ হন।
একুশের চেতনার গুরুত্ব:
একুশের চেতনা আমাদের শেখায় ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য সংগ্রাম কত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের জাতীয় অহংকার ও ঐক্যের প্রতীক। ভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দেয়া ঐতিহাসিক সাহসিকতা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।
একুশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধ:
একুশের চেতনা স্বাধীনতার চেতনা হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পেছনে একুশের ভাষা আন্দোলনের অবদান অস্বীকার করা যায় না। একুশের চেতনা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও বীরত্বের মন্ত্র দেয়।
উপসংহার:
আমাদের উচিত একুশের চেতনাকে চিরকাল সম্মান ও বরণ করে তোলা। ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সেই বীর শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া। একুশের চেতনা বাংলাদেশকে একত্রিত করে জাতি হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-গণ আন্দোলন
ভূমিকা:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠিত প্রতিবাদ। কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। একাধিক ঘটনার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, তৎকালীন সরকারের পতনের মাধ্যমে এই আন্দোলন তার চূড়ান্ত সফলতা লাভ করে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট তিন দফা বড় ধরনের কোটা সংস্কারের আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আন্দোলনের পেছনের কারণ:
বাংলাদেশে কোটাব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭২ সালে। তখন সরকারি চাকরির জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০%, নারী ১০%, জেলা ১০%, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ৫%, এবং প্রতিবন্ধী ১% নির্ধারণ করা হয়। এতে মোট কোটার পরিমাণ ছিল ৫৬%, যা মেধাভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছিল। চাকরিপ্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ কারণেই কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ৪ মার্চ ২০১৮)
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পটভূমি:
২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর, শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রভাবে সরকার সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়। তখন শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে এ সংগ্রাম চালিয়েছিল এবং সরকার সেই দাবিকে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ওই ২০১৮ সালের কোটা বাতিল সংক্রান্ত নির্দেশনা অবৈধ ঘোষণা করে। এ সিদ্ধান্তের পর নতুন করে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার।
শিক্ষার্থীদের ভূমিকা:
সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনের শুরু হয় ঢাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন এই আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়করা। রাজু ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, শাহবাগ চত্বরসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি ছিল আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। সরকারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশনার পরেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নির্যাতন:
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্দোলন তীব্রতর হয়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে অংশ নেন। কিন্তু তাদের ওপর পুলিশি নিপীড়ন চালানো হয়। সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয় এবং কেউ কেউ প্রাণ হারান।
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি:
৬ জুলাই, শিক্ষার্থীরা সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পরীক্ষা বর্জন, ধর্মঘট ও সড়ক–মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি নামে ‘বাংলা ব্লকেড’ শুরু করে। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ গুলিতে হত্যা করে। ১৯ জুলাই আন্দোলনের একটি অংশ ৯ দফা দাবি নিয়ে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ২২ জুলাই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি জানিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ স্থগিত করে। ৩০ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ নামে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ মিছিল করে।
ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ–আন্দোলনে রূপান্তর:
কোটা সংস্কার থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের তরুণ, যুবক–যুবতী, নারী–পুরুষ, বৃদ্ধ–বৃদ্ধা সহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করে।
এক দফার অসহযোগ আন্দোলন:
অবশেষে আন্দোলন এক দফার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে পরিণত হয়, যার লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন।
ফ্যাসিবাদের পতন:
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এই এক দফার দাবির প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও, ৪ আগস্ট সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের কারণে তা ৫ আগস্টে এগিয়ে আনা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকামুখী হন। গণ–অভ্যুত্থানের চাপের মুখে ৫ আগস্ট দুপুরে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশের বাইরে চলে যান।
উপসংহার:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায়। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের গ্লানি কাটিয়ে, এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশা ও প্রত্যাশার সূচনা হয়। সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় একটি বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথচলা।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প: সমস্যা ও সম্ভাবনা
ভূমিকা:
বাংলাদেশ একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী, ঐতিহাসিক স্থান, সংস্কৃতি ও বন্যপ্রাণীর জন্য সমৃদ্ধ দেশ। এখানকার পাহাড়, সমুদ্র সৈকত, নদী ও বনাঞ্চল পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। তবে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে কিছু সমস্যা বিদ্যমান যা অতিক্রম করতে হলে যথাযথ পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সমস্যাসমূহ:
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বড় প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামোর দুর্বলতা। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সড়ক যোগাযোগ, পরিবহন, থাকার ব্যবস্থা অনেক সময় অপ্রতুল থাকে। পর্যটন স্থানগুলোতে পরিচ্ছন্নতার অভাব ও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে, যা পর্যটকদের প্রভাবিত করে। এছাড়া পর্যটন সেবায় দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রমোশন না হওয়াও বড় সমস্যা। পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব যেমন দূষণ ও বনাঞ্চলের অবৈধ কাটা-ছাঁটা পর্যটন শিল্পের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা:
অসংগঠিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি পর্যটন খাতকে ব্যাহত করে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পর্যটন শিল্পে অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ায় সম্ভাব্য আয় থেকে তারা বঞ্চিত হয়। পর্যটন শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ কম থাকায় উন্নয়ন ধীরগতিতে চলছে।
সম্ভাবনা:
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অপরিসীম। সুন্দরবনের বিশ্ববিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন, কক্সবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, সুন্দর পাহাড়ের চট্টগ্রাম ও সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লেক ও জলপ্রপাতগুলো পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। ঐতিহাসিক স্থান যেমন মহাস্থানগড়, পানাম নগর ও সোনারগাঁও দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরে। এসব সম্পদ পর্যটন শিল্পকে বিকাশের সুযোগ দেয়।
সরকারের ভূমিকা ও পরিকল্পনা:
সরকার পর্যটন খাত উন্নয়নে বিভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করেছে। পর্যটন শিল্পকে বেগবান করতে অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার, সেবা মানোন্নয়ন ও প্রচার-প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় জনগণের ক্ষমতায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
পরিষেবা খাতে উন্নয়ন:
পর্যটন শিল্পের সাথে সম্পর্কিত হোটেল, রেস্টুরেন্ট, গাইড ও পরিবহন সেবার মান উন্নয়ন করা জরুরি। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন বিনোদন ও তথ্যসেবা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
পরিবেশগত সংরক্ষণ:
পর্যটন উন্নয়নের সাথে পরিবেশ সুরক্ষা অবশ্যক। অবৈধ নির্মাণ, বর্জ্য পরিচালনা ও বনজ সম্পদের সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে যাতে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পর্যটন শিল্প গড়ে ওঠে।
স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা:
স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা ছাড়া পর্যটন শিল্প সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাদের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ সৃষ্টি করে পর্যটন খাতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে যাতে তারা উপকৃত হয়।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা:
পর্যটন শিল্প দেশকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সাহায্য করে। গ্রামীণ পর্যটন ও ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধি সম্ভব।
উপসংহার:
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে বিস্ময়কর সম্ভাবনা আছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশ রক্ষা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশ বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
Related Question
View Allএকজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।
একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।
একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।
সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।
একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।
একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।
অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।
সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।
লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।
সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।
আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।
সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।
আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।
শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।
বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।
আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।
আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ
বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।
অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র
য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ:
সাম্যবাদের পতন:
১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।
গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:
সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ:
অর্থনৈতিক সংকট:
সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের উত্থান:
অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা:
নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।
সামাজিক পরিবর্তন:
পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
- যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল।
পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-
১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:
সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয় একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।
অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।
অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।
২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। [ঊর্মি হোসেন]
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!