১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘরিয়ার মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প থেকে বের হয়ে রেহাইচরের কাছ দিয়ে নৌকায় করে মহানন্দা নদী পার হন। ধ্বংস করে দেন পাকিস্তানিদের সুরক্ষিত বাংকার। পাকিস্তানি সেনারা তখন পালটা আক্রমণ চালায়। আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি সেনাদের গুলি এসে তাঁর কপালে লাগে। এ খবর বারঘরিয়া মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে পৌছালে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ওপর মরণপণ আক্রমণ চালান। আর ওই দিনই চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর হানাদারমুক্ত হয়।
যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন মহিউদ্দিন জাহাকীর পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। তিন সহকর্মীসহ সিদ্ধান্ত নেন যে, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা চারজন ৩রা জুলাই রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানের শিয়ালকোট হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে কলকাতায় পৌছান। চারজন বীর সেনাকে স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। এভাবেই মহিউদ্দিন আহাঙ্গীর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বিজয় দিবসের দুদিন আগে শহিদ হন। সেক্টর কমান্ডার কাজী নুরুজ্জামান মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সম্পর্কে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, 'মহিউদ্দিন ছিলেন একজন অনন্য সাধারণ দেশপ্রেমিক এবং যোগ্য সেনানায়ক।'
মতিউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে করাচির মাসরুর বিমানঘাটিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর এক ছাত্র রশিদ মিনহাজের বিমান ছিনতাই করে ভারতে যেতে চেয়েছিলেন। নোটিশ বোর্ডে টানানো ফ্লাইট শিডিউল দেখে তিনি জেনেছিলেন আগস্ট মাসের ২০ তারিখে মিনহাজ আকাশে উড়বে। সেদিন তিনি গাড়ি নিয়ে রানওয়ের পূর্ব দিকে চলে যান। তিনি দেখতে পান, মিনহাজ টি-৩৩ বিমান নিয়ে সামনের দিকে আসছেন। তখন তিনি মিনহাজকে বিমান থামাতে বলেন। বিমান থামালে তিনি ক্লোরোফরম মিশ্রিত রুমাল মিনহাজের নাকে ধরেন। মিনহাজ অজ্ঞান হয়ে যান। তখন তিনি বিমানটি ছিনতাই করেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘরিয়ার মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প থেকে বের হয়ে রেহাইচরের কাছ দিয়ে নৌকায় করে মহানন্দা নদী পার হন। তারপর অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের বাংকারে আক্রমণ চালান। তিনি একাই যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের একটি বাংকার ধ্বংস করে দেন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মহিউদ্দিন পেছনে না ফিরে অসীম সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শত্রুর গুলিতে শহিদ হন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মতিউর করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি নোটিশ বোর্ডে দেখতে পান ২০ আগস্ট তাঁর ছাত্র মিনহাজ আকাশে উড়বেন। তিনি দেখেন মিনহাজ টি- ৩৩ বিমান চালিয়ে আসছেন। তখন তিনি তাকে থামিয়ে বিমানের উপরের ঢাকনা খুলে কোনো সমস্যা আছে কি না জানতে চান এবং এই সুযোগে বিমানে ওঠেন। তারপর ক্লোরোফরম মাখিয়ে রাখা রুমাল মিনহাজের নাকে চেপে ধরে মিনহাজকে অজ্ঞান করে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজে নিয়ে দেশের দিকে এগোতে থাকেন। মিনহাজের জ্ঞান ফিরলে তিনি মতিউরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করেন। বিমানটি পাকিস্তানের থাট্টায় পৌঁছতেই সেটি বিধ্বস্ত হয়। এভাবে শহিদ হন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান।
পশ্চিম পাকিস্তানিরা এ দেশের মানুষকে নানাভাবে অত্যাচার করত। তাদের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে। একসময় বাঙালিরা আর সহ্য করতে না পেরে দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মূলত এই বাংলাদেশকে স্বাধীন ও শত্রুমুক্ত করার জন্যই বীরশ্রেষ্ঠরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন।
দেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। সিপাহি হামিদুর রহমানও দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে সেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিন প্লাটুন সৈন্য নিয়ে তিনি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি ধ্বংস করার জন্য এগিয়ে গেলেন। রাতের আঁধারে শত্রুর বাংকার নিশ্চিহ্ন করতে যাওয়ার সময় শত্রুর পুঁতে রাখা একটা মাইন বিস্ফোরিত হয়। তুমুল যুদ্ধ বেধে যায়। হামিদুরের সঙ্গে ছিল শুধু একটা রাইফেল আর দুটি গ্রেনেড। নির্ভুল নিশানায় প্রথম গ্রেনেডটা ছুড়ে তিনি শত্রুর আক্রমণকে স্তব্ধ করে দেন। কিন্তু দ্বিতীয় গ্রেনেডটা ছোড়ার সময়ই শত্রুর মেশিনগানের গুলি এসে তাঁর গায়ে লাগলে তিনি শহিদ হন।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির বীর সেনানীরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে তাঁরা এ দেশ স্বাধীন করেন। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে যাঁরা শহিদ হয়েছেন রাষ্ট্র তাঁদেরকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে শ্রদ্ধা জানায়। এছাড়া অন্যদের বীরউত্তম, বীরবিক্রম, বীরপ্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি পান সাতজন। তাঁদের আত্মত্যাগেই এক মহান বীরগাথা রচিত হয়েছে।
Related Question
View Allমুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য যাঁরা সর্বশ্রেষ্ঠ।
-স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগের জন্য সাতজন 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাব পেয়েছেন।
যুদ্ধের জন্য তৈরি করা মাটির গর্ত। যুদ্ধের সময় সৈনিকেরা এখানে আশ্রয় নিয়ে তাদের এলাকা পাহারা দেন এবং যুদ্ধ করেন।
-শত্রুসেনাদের আক্রমণ করার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা অনেক বাঙ্কার তৈরি করেছিলেন।
বীরের গল্প।
-আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। যেন একটি বীরগাথা।
চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া।
-গ্রেনেড ছুড়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি ক্যাম্প ধূলিসাৎ করে দেন।
যুদ্ধের স্থান।
-১৯৭১ সালে এ দেশটি একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য যাঁরা যুদ্ধ করেছেন তাঁদের বাহিনী।
-দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য বাঙালিরা মুক্তিবাহিনী গঠন করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!