সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধ জয়ী হলেও সুখী হলেন না। তিনি রাজ্য জয়ের বিনিময়ে দেখলেন রক্তপাত এবং মৃত্যুর বিভীষিকা। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি দারুণভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন। একদিন সম্রাট রাজপ্রাসাদের সিংহদ্বারে দাঁড়িয়ে কলিঙ্গ যুদ্ধের মৃত্যুর বিভীষিকার কথা চিন্তা করছিলেন এবং পাটলিপুত্রের শোভা দেখছিলেন। মনে ছিল অশান্তি এবং ভাবাবেগ। এমন সময় ভ্রাতুষ্পুত্র নিগ্রোধ শ্রমণ ধীরগতিতে রাজপ্রাসাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে সম্রাটের মনে শ্রদ্ধা জেগে ওঠে। সম্রাট নিগ্রোধ শ্রমণকে ডেকে আনলেন। শ্রমণ নিজেকে বুদ্ধের অনুসারী বলে পরিচয় দিলেন। নিগ্রোধ শ্রমণ ধম্মপদ গ্রন্থের অপ্রমাদবর্গের একটি গাথা সম্রাটকে ব্যাখ্যা করে শোনান। গাথার মর্মকথা শুনে বুদ্ধের ধর্মের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং সম্রাট নিগ্রোধ শ্রমণের কাছেই বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। এরপর তিনি রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্মজয়কে সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন।
বৌদ্ধধর্মের প্রচার প্রসারে সম্রাট অশোকের অবদান সর্বজন 1 স্বীকৃত। ধর্মপ্রচারক হিসেবে সম্রাট অশোকের খ্যাতি পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি বুদ্ধের বাণী প্রচার ও তীর্থ ভ্রমণের জন্য ধর্মযাত্রার ব্যবস্থা করেন। ধর্মপ্রচারের জন্য 'ধর্মমহামাত্র' নামে এক বিশেষ শ্রেণির রাজকর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁরা নগরের প্রান্তরে সর্বত্র ধর্মনীতি প্রচার করতেন। তিনি প্রজাদের ধর্মশিক্ষার জন্য স্থানে স্থানে, পর্বতগাত্রে, প্রস্তর স্তম্ভে ধর্মবাণীসমূহ খোদিত করান। সম্রাট নিজে বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দর্শনে যেতেন। কথিত আছে, সম্রাট অশোক বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ স্মরণীয় করে রাখার জন্য চুরাশি হাজার বিহার, চৈত্য, স্তূপ ও স্তম্ভ নির্মাণ করেন। বিহারের জন্য ভূমি দান করেন।
সম্রাট অশোক মহৎপ্রাণের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন, অত্যন্ত পরমতসহিষ্ণু। তিনি শুধু বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন না, অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রতিও ছিল তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি। তিনি ব্রাহ্মণ, জৈন ও আজীবকদেরও 'শ্রদ্ধা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁদের দান দিতেন। তিনি নৈতিক আচরণের নীতিসমূহকে সকল ধর্মের সার বলে মনে করতেন। এসব নীতিকে তিনি ভারতবর্ষের সর্বজনীন নীতি হিসেবে সকলের পালনীয় মনে করতেন। তাঁর প্রচারিত নীতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- পিতামাতা ও গুরুজনের প্রতি অনুগত থাকবে, জীবিত প্রাণীদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হবে, সত্য কথা বলতে হবে। নৈতিক ধর্ম হিসেবে এগুলো মানুষকে অনুসরণ করতে হবে। মোটকথা, সম্রাট অশোক পরধর্ম ও ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করতেন।
Related Question
View Allমগধ বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত।
নিগ্রোধ শ্রমণ সম্রাট অশোককে ধম্মপদ গ্রন্থের অপ্রমাদ বর্গের যে গাথাটি ব্যাখ্যা করে শুনিয়েছিলেন তার মমার্থ হলো, অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ আর প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমত্ত ব্যক্তিরা অমরত্ব লাভকরেন। কিন্তু যারা প্রমত্ত তারা বেঁচে থেকেও মৃতবৎ। এ সত্য বিশেষরূপে জেনে তাঁরা অপ্রমত্ত হয়ে আর্যদের পথ অনুসরণ করেন, সেই ধ্যাননিষ্ঠা, সতত উদ্যোগী, দৃঢ়পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরম শান্তিরূপ নির্বাণ লাভ করেন।
উদ্দীপকের রাজা জনবমের কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধধর্মের অনুসারী সম্রাট অশোকের সঙ্গে, সাদৃশ্যপূর্ণ। সম্রাট অশোক মৌর্য বংশের সম্রাট ছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান এবং সাহসী। ছোটবেলায় তিনি যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করেন। দুঃখসাহসী কাজ করতে তিনি খুবই পছন্দ করতেন। তিনি অবন্তীতে দাঙ্গা এবং রাজ অমাত্যদের বিদ্রোহ দমন করে তাঁর শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। পিতা বিন্দুসারের মৃত্যুর পর সম্রাট অশোক সিংহাসনে আরোহণ করেন। কথিত আছে যে, তিনি সিংহাসনে আরোহণের জন্য ৯৯ জন ভ্রাতাকে হত্যা করেন। সিংহাসনে আরোহণ করার 'পর থেকে তিনি রাজ্য বিস্তারের নেশায় মত্ত ছিলেন। তিনি বিভীষিকাময় এক যুদ্ধে কলিঙ্গ জয় করেন। যুদ্ধে জয়ী হলেও সম্রাট অশোক সুখী হন না। রাজ্য জয়ের বিনিময়ে দেখলেন রক্তপাত এবং মৃত্যুর বিভীষিকা এতে তিনি দারুণভাবে মর্মাহত হন। এরপর তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্মজয়ের সাধনায় মত্ত হন। এগুলো উদ্দীপকের রাজা জনবমের চরিত্র ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের রাজা জনবমের উক্তি। রাজ্য জয়ের চেয়ে ধর্মপ্রচার অতি শ্রেষ্ঠকর্ম। আলোচ্য কর্মটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন সম্রাট অশোক। সম্রাট প্রথমদিকে ভয়ঙ্কর এবং নির্দয় যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি লাভকরেন। কিন্তু কলিঙ্গ যুদ্ধের বিভীষিকার কথা চিন্তা করে নিগ্রোধ শ্রমণের নিকট বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি বৌদ্ধ উপাসকে পরিণত হন। সেদিন থেকেই তাঁর রাজ্য জয়ের পরিবর্তে মানুষের অন্তর জয় করার বাসনা জাগে। রাজ্য জয়ের প্রবল তৃষ্ণা মন থেকে মুছে ফেলেন। রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্ম বিজয়কে তিনি সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রজাদের কল্যাণে 'সর্বদা নিবেদিত থাকতেন। সবার প্রতি দয়াশীল আচরণ করতেন। সর্বপ্রাণীর প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম মমত্ববোধ। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' পরিণত হন। এমনকি 'দেবনাম প্রিয়দর্শী' উপাধি লাভ করেন।
অতএব বলা যায়, সত্যিকার অর্থে রাজ্য জয়ের চেয়ে ধর্মপ্রচারের কর্ম শ্রেষ্ঠ।
সম্রাট অশোক তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রমণ নিগ্রোধের নিকটে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন।
সম্রাট অশোক অহিংসা, সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, দান, সেবা প্রভৃতি আদর্শকে রাষ্ট্রনীতিতে গ্রহণ করে রাজ্য শাসন করতেন। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি 'চন্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' পরিণত হন। এছাড়া তিনি 'দেবনাম প্রিয়দর্শী' উপাধি লাভ করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!