কালীয় নামে এক মহাবিষধর সাপ কালিন্দী হ্রদে আশ্রয় নেয়। তার বিষে হ্রদের জল বিষাক্ত হয়ে পড়ে। একদিন শ্রীকৃষ্ণ গোপ বালকদের নিয়ে হ্রদের পাশে খেলছিলেন। তখন তৃষ্ণার্থ কয়েজন বালক হ্রদের জলপান করলে তাদের মৃত্যু হয়। শ্রীকৃষ্ণ দিব্যজ্ঞানে কালীয় নাগের কথা জানতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় গোপ বালকগণ জীবন ফিরে পান।
শ্রীকৃষ্ণ হ্রদের জলে ঝাঁপ দিলে কালীয় নাগ শ্রীকৃষ্ণকে পেঁচিয়ে ধরে। শ্রীকৃষ্ণ কালীয়কে এমনভাবে গলা চেপে ধরেন যে তার প্রাণ যায় যায়। কালীয় নাগ বুঝতে পারে ইনি স্বয়ং ভগবান। সে ক্ষমা প্রার্থনা করলে শ্রীকৃষ্ণ তাকে হ্রদ থেকে চলে যেতে বলেন। কালীয় তার মূল আশ্রয় রমনক দ্বীপে ফিরে যায়।
শ্রীকৃষ্ণের কালীয় নাগ দমনের মধ্য দিয়ে আমরা যে শিক্ষা পাই তা হল, কালীয় দমনের পর বিষাক্ত অপেয় জলকে সুপেয় করে তোলার মধ্য দিয়ে জনগণের উপকার সাধিত হয়েছে। আবার কালীয় নাগকে হত্যা না করে ক্ষমা করে দেয়ার মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ক্ষমার আদর্শও স্থাপন করেছেন। এর মধ্যে দিয়ে সমাজের মঙ্গল সাধনের আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে।
১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকার শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা করেন। তিনি উপস্থিত সকলকে ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ বলে সম্বোধন করেন। বিবেকানন্দের মুখে এই নতুন সম্বোধন শুনে উপস্থিত সকলে মুগ্ধ হন। বক্তৃতায় তিনি বলেন, 'হিন্দুধর্ম পৃথিবীর সকল ধর্মকে সমান সত্য বলে মনে করে। সব ধর্মের লক্ষ্যই এক। নদীসমূহ যেমন এক সাগরে গিয়ে মিলিত হয়, তেমনি সকল ধর্মেরই লক্ষ্য এক ঈশ্বর লাভ। তাই বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাব গ্রহপ্ত, মত বিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি, ধর্মসভার বিচারে বিবেকানন্দ শ্রেষ্ঠ বক্তা হন।
আমেরিকায় বিবেকানন্দের নাম ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বক্তৃতার জন্য আহ্বান আসে। তিনি বক্তৃতা দিয়ে আমেরিকা জয় করেন। তারপর তিনি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশে বক্তৃতা করেন। ইউরোপের মানুষ হিন্দুধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে জানতে পারেন। অনেকে তার পরমভক্ত হয়ে যান। বিবেকানন্দের আর্দশে উদ্বুদ্ধ হয়ে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল জন্মভূমি আয়ারল্যান্ড ছেড়ে ভারতবর্ষে চলে আসেন। বিবেকানন্দের কাছে দীক্ষা নেন। তখন তার নাম হয় নিবেদিতা ভগিনী।
সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সহধর্মিনী সারদা দেবী। তিনি স্বামীর আদর্শকে মন্ত্ররূপে গ্রহণ করে সাধনার পথে যাত্রা শুরু করেন। তিনি ঈশ্বর সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। সারদা দেবীর একটি উপদেশ হলো পৃথিবীর মতো সহ্যগুণ থাকা চাই। পৃথিবীর উপর কতো রকমের অত্যাচার হচ্ছে। পৃথিবী অবাধে সব সইছে, মানুষেরও সেই রকম চাই।
সারদা দেবীর জীবনী থেকে আমরা যে নৈতিক শিক্ষা পাই তা হলো ত্যাগ। সারদা দেবীর ত্যাগের কারণেই গদাধর শ্রীরামকৃষ্ণ হতে পেরেছিলেন। সংসারে আবদ্ধ থেকে জগতের জন্য কিছু করা যায় না। মানুষের সহ্যগুণ থাকতে হবে। মানুষ অসহিষ্ণু হলে সমাজে শান্তি আসবে না। জগতের সকলকে আপন করতে হবে। সাধন ভজন প্রথম বয়সেই করতে হবে। এ সময় শরীর সুস্থ থাকে। সারদা দেবীর এই শিক্ষা আমরা সব সময় মনে রাখব ও পালন করব।
শ্যামা মা ছিলেন রামপ্রসাদের ধ্যান জ্ঞান। আহারে-বিহারে শয়নে-স্বপনে তিনি শুধু মায়ের চিন্তাই করতেন। তিনি হাতে কাজ করতেন, মুখে শ্যামা মায়ের নাম নিতেন। এই একনিষ্ঠতার কারণে শ্যামা মা তাঁর একান্ত আপনজন হয়ে গিয়েছিলেন। কন্যারূপে ডিনি রামপ্রসাদের নিকট ধরা দিয়েছিলেন।
একদিন রামপ্রসাদ ঘরের বেড়া বাঁধছিলেন। অপর পাশ থেেেক মেয়ে জগদীশ্বরী তাঁকে সাহায্য করছিল। এক সময় জগদীশ্বরী খেলতে চলে যায়। তখন শ্যামা মা মেয়ের রূপ ধরে রামপ্রসাদকে সাহায্য করেন। অনেকক্ষণ পর জগদীশ্বরী এসে দেখে বেড়া বাঁধা হয়ে গেছে। সে বাবাকে সব খুলে বলল। রামপ্রসাদ বুঝতে পারলেন শ্যামা মা-ই এসেছিলেন।
রামপ্রসাদের সাধনা চলতে লাগল। রাতদিন তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন' থাকেন। তার একনিষ্ঠ সাধনায় একদিন মা চারদিক আলোকিত করে দেখা দিলেন। রামপ্রসাদ মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্জন করলেন। রামপ্রসাদের সাধনা সিদ্ধ হলো।
১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রভু জগদ্বন্ধু ফরিদপুরের ব্রাহ্মণকান্দায় আসন পাতেন। তখন ফরিদপুরের উপকণ্ঠে সাঁওতাল, বাগদী ও নমঃশূদ্রদের বাস ছিল। সামাজপতিদের দৃষ্টিতে তারা ঘৃণ্য ও অস্পৃশ্য। প্রভু জগদ্বন্ধু একদিন বাগদীদের সর্দার রজনীকে ডেকে পাঠালেন। রজনী এলে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। প্রভুর আলিঙ্গনে রজনী ধন্য হলেন। প্রভু তাকে বললেন, মানুষের মধ্যে কোনো উঁচু-নিচু নেই। সবাই সমান। সবাই ঈশ্বরের সন্তান। তোমরা মোহান্ত বংশের মানুষ। আজ থেকে তোমার নাম হরিদাস মোহান্ত।
প্রভু জগদ্বন্ধু হরিদাস মোহান্তকে হরিনামের মন্ত্র দিলেন। মোহান্ত বংশের সবাই হরিনামে মেতে উঠলেন। হরিদাস মোহান্ত অল্পদিনের মধ্যেই প্রভুর কৃপায় প্রসিদ্ধ পদকীর্তনীয়ারূপে আত্মপ্রকাশ করেন। পশ্চিমবঙ্গেও প্রভুর নামের মাহাত্ম্য পরিব্যপ্ত হলো। সেখানকার নিচু জাতি হিসাবে গণ্য ডোমেরা প্রভুর প্রেরণায় উজ্জীবিত হলো। তাদের মধ্যে কীর্তনের দল গড়ে উঠল। তখন ডোমেরা ব্রজজন হয়ে উঠে।
প্রভু জগদ্বন্ধুর জীবনী থেকে আমরা যে নৈতিক শিক্ষা পাই তাহলো সব মানুষ সমান কেউ উঁচু-নিচু নয়। কোনো মানুষই ঘৃন্য বা অস্পৃশ্য নয়। সমাজের সকলেই সমান। পিতা মাতাকে কষ্ট দিতে নেই। সাধনা করতে সংসার ত্যাগ করা লাগে না। পরনিন্দা, পরচর্চা ভালো নয়। এগুলো ত্যাগ করতে হবে।
Related Question
View Allযারা পরের কল্যাণ এবং জগতের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন তারাই হচ্ছেন মহাপুরুষ।
কৃষ্ণকে ভজন করতে জাতি ও কুলের বিচার করতে হয় না। বাণীটি বলেছেন শ্রীচৈতন্যদেব।
হিন্দু সমাজে তখন বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতা প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল। শূদ্র ও চণ্ডালদের সবাই ঘৃণা করত। কিন্তু কৃষ্ণ ভজনে উচ্চ-নীচ, বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতার কোনো স্থান ছিল না। এখানে ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও চন্ডালদের সাথে এক সারিতে বসে কৃষ্ণ নাম জপ করতে হতো।
শ্রীচৈতন্যদেবের নৈতিক আদর্শটি অধ্যাপিকা চিত্রলেখার আচরণের প্রতিফলিত হয়েছে।
শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর উদারতা ও ভালোবাসা দিয়ে নবদ্বীপবাসীকে আপন করে নিয়েছিলেন। উদ্দীপকের চিত্রলেখা দেবী তাঁর উদারতা ও ভালোরাসা দিয়ে সকলকে জয় করেছেন। শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন কৃষ্ণভক্ত। তিনি পথে পথে কৃষ্ণনাম প্রচার করতেন। অনেকে বাধা দেন। জগাই-মাধাই নামে মাতাল দুই ভাই একদিন চৈতন্যদেবকে আক্রমণ করে। কিন্তু চৈতন্যদেব তাঁর প্রেমভক্তি দিয়ে তিনি সবাইকে আপন করে নেন। তারা সকলে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে চৈতন্যদেবের প্রেমভক্তি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। চৈতন্যদেবের এসব আদর্শের কতকগুলো দিক অধ্যাপিকা চিত্রলেখার চরিত্রে লক্ষ করা যায়।
নিরহংকার আদর্শ সবাইকে আকৃষ্ট করে কথাটি বাস্তব সত্য।
উদ্দীপকের অধ্যাপিকা চিত্রলেখা একজন কৃষ্ণভক্ত। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও অমায়িক। তিনি জাগতিক ও আত্মিক উন্নয়নমূলক নানা গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি সন্তানদের অন্য বর্ণে বিয়ে দিয়ে এক দৃষ্টান্তমূলক নজির স্থাপন করেন। উদারতা ও ভালোবাসা দিয়ে তিনি সবার মন জয় করেন।
শ্রীচৈতন্যদেবও তাঁর কৃষ্ণভক্তি ও ভালোবাসা দিয়ে নদীয়াবাসীর মন জয় করেছিলেন। তিনি নবদ্বীতীর ঘরে ঘরে কৃষ্ণনাম প্রচার করেন। অনেকে তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু চৈতন্যদেব তাঁর প্রেমভক্তি দিয়ে সবাইকে আপন করে নেন। তাঁর কাছে কোনো জাতিভেদ ছিল না। নিজে ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও চন্ডালদের সাথে এক সারিতে বসে আহার করেছেন। পরিশেষে একথা বলা যায়, উদ্দীপকের চিত্রলেখা দেবী ও শ্রীচৈতন্যদেব উভয়েই তাঁদের নিরহংকার আদর্শ দিয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করেছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দের দীক্ষাগুরু হচ্ছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব
প্রত্যেক জীবের সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন ঈশ্বর, অর্থাৎ প্রতিটি জীবের মধ্যে স্রষ্টা বিদ্যমান। সেহেতু জীবের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেম স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমের শামিল। সুতরাং স্রষ্টাকে পাবার শ্রেষ্ঠ পথ হচ্ছে তার সৃষ্ট জীবের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা। সেহেতু জীবে দয়া মানুষের ধর্মীয় কর্তব্য। স্বামী বিবেকানন্দ তাই বলেছেন, "জীব সেবাই ঈশ্বর সেবা।"
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!