ছোটবেলায় ছবি আঁকতে অনেকেই ভালোবাসে। ছবি যেকোনোভাবে ঘরবাড়ি, নদী-নৌকা, ফুল, ফল, মাছ-পাখি সব কিছুকেই পেন্সিল, কলম, কাগজ ও রং তুলির মাধ্যমে রূপ দেওয়া যায়। তবে সঠিক ও নিখুঁতভাবে আঁকার জন্য আমাদের কিছু-নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয়। সেগুলো মেনে ও সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আঁকলে ছবি সুন্দর ও প্রাণবন্ত হয়। সেই সাথে ছবি আঁকার জন্য বিষয়বস্তুকে অর্থাৎ যা আঁকতে চাই তা যথাসম্ভব সঠিক আকার ও আকৃতি মনের মাঝে কল্পনায় রাখতে হবে। প্রথমে তাই সঠিক ও সুন্দরভাবে বিষয়বস্তুর রেখাচিত্র অর্থাৎ ড্রইং করে নিতে হবে। তারপর তাতে যথাযথভাবে বিভিন্ন রং প্রয়োগ করে পরিপূর্ণতা দিতে হবে। কতকগুলো নিয়ম অনুসরণ করে আমরা সহজভাবে ছবি আঁকতে পারি। যেমন- আকৃতি ও গঠনসহ ড্রইং, দূরত্ব ও অনুপাত ঠিক রেখে বিষয় সাজানো, ছবিতে আলোছায়ার সঠিক প্রয়োগ ও রং ব্যবহার পদ্ধতি জানা-প্রয়োজন।
ছবিকে সুন্দর ও প্রাঞ্জল করতে রং অনস্বীকার্য। রং ছাড়া ছবি আঁকার কথা চিন্তা করা যায় না, পেন্সিল ও কালিতে ছবি আঁকলেও তা একটা রং হিসেবেই মনে করা হয়। তবে রঙিন ছবি বলতে আমরা বুঝি বিভিন্ন রকম রং দিয়ে আঁকা ছবি। ছবি আঁকার রং নানা রকম ও বিভিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। জল রঙে ছবি আঁকার জন্য এই রং বাক্সে, টিউব আঁকারে, ছোট ছোট কেক ও পাউডার হিসেবে এবং পোস্টার রং কাচের কৌটায় পাওয়া যায়। 'পোস্টার রং জল রং থেকে একটু ভিন্ন মাধ্যম হলেও পোস্টার রং দিয়ে জল রঙের মতো ছবি আঁকা যায়। পাউডার রং পানিতে মিশিয়ে সহজেই ছবি আঁকা যায়। তবে সাথে গাম বা আঠা মিশিয়ে নিতে হয়। অনেক শিল্পী অ্যারাবিক গাম বা আইকা গাম মিশিয়ে নেয়। প্যাস্টেল রং তিন রকম গুণের পাওয়া যায়। আরও আছে তেল রং। এটি তারপিন ও তিসির তেল মিশিয়ে আঁকতে হয়।
কোনো বিষয়ে ছবি আঁকার জন্য বিষয়বস্তুতে অর্থাৎ যা আঁকতে চাই সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়। এরপর যথাসম্ভব সঠিক আকার ও আকৃতিতে ছবিতে তুলে ধরতে হবে। প্রথমে এটি সঠিক ও সুন্দরভাবে বিষয়বস্তুর রেখাচিত্র ঠিক করে নেওয়াকে বলা হয় ড্রইং। ছবির আঁকার, আকৃতি অর্থাৎ ড্রইং সুন্দর হলে ছবি সুন্দর হবে। প্রত্যেক শিল্পীই ছবি আঁকার পূর্বে ছবিটি ভালোভাবে দেখেন এবং ছবি মোটা, সরু কিংবা গোলাকার, না চারকোণা তা দেখে প্রথমেই ছবিটি ড্রইং করে থাকেন।
ছবিতে ছোট ও বড় বস্তুর তারতম্য লক্ষ করা যায় আর এ তারতম্যকে অনুপাত বলে। একটি ছবি যতই সুন্দর হোক না কেন অনুপাত ও দূরত্ব সঠিকভাবে প্রয়োগ করা না গেলে, কোনো অবস্থাতেই সে ছবি বাস্তবধর্মী হবে না। অনুপাতের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে তুলনামূলকভাবে একটি জিনিস অপর একটি জিনিস হতে কত বড় বা কত ছোট তা নিরূপণ করা। যেমন- একজন মানুষ আঁকলে শরীরের তুলনায় মাথা কতটুকু হবে বা হাত কতটুকু লম্বা হবে, পুরো শরীরে কোমর থেকে পা পর্যন্ত কতটুকু এবং কোমর থেকে কাধ পর্যন্ত কতটুকু সে অনুপাত ঠিক রাখতে হবে। আবার নদীতে তিনটি নৌকা থাকলে একটি থেকে আর একটি নৌকার দূরত্ব কতটুকু হবে তা ঠিকমতো তুলে ধরতে হবে। কাছেরটির অনুপাতে দূরেরটি কতটুকু ছোট হবে তা ঠিকমতো আঁকতে পারলেই ছবির মধ্যে দূরত্ব বোঝানো যাবে। ছবিতে দূরত্ব ও অনুপাত ঠিক থাকলে ছবিটি বাস্তবধর্মী হয়ে উঠবে।
ছবিতে ড্রইং-এর পাশাপাশি আলোছায়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। আলোছায়ার কারণেই বিভিন্ন বস্তুর গঠনগত পার্থক্য অর্থাৎ গোল, চৌক বা অন্য যেকোনো আকৃতি আমাদের চোখে ধরা পড়ে। সূর্যের আলো যেদিকে থাকে তার উল্টোদিকে ছায়া বা অন্ধকার থাকা স্বাভাবিক। প্রকৃতিতে এরূপের আবার পরিবর্তন ঘটে। যেমন- সকালে এক রকম আলোছায়া, দুপুরে এক রকম আলোছায়া। প্রতিটি বিষয়ের যেমন নিজস্ব রং আছে তেমনি আলোছায়ার প্রয়োগও এ রঙের সাথে সমন্বয় করে করতে হবে। একই দৃশ্যে সামনের বিষয়ের রং পেছনের বিষয় থেকে উজ্জ্বল হবে। এভাবে আলোছায়ার মাধ্যমে ছবির বিষয়বস্তুতে নিকটত্ব, দূরত্ব, পরিপ্রেক্ষিত সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
আমরা প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরনের রং দেখতে পাই। ঠিক তেমনি ছবি আঁকায়ও বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করা হয়। এর ব্যবহারেও নানা কৌশল আছে। বিভিন্ন শেডের মধ্যে তিনটি রংকে মৌলিক রং বা প্রাথমিক রং বলে। মৌলিক রং তিনটি হলো লাল, নীল ও হলুদ। এই তিনটি রং একটির সাথে অন্যটি মিশিয়ে বিভিন্ন রং তৈরি করা যায়।
যেমন- হলুদ লাল মেশালে কমলা রং তৈরি হয়। আবার হলুদ ও নীল মেশালে পাওয়া যাবে সবুজ রং। লাল ও নীলের অংশ তারতম্য করে মেশালে পাওয়া যাবে খয়েরি। এভাবে এ তিনটি মৌলিক রং মিশিয়ে নানা ধরনের রং পাওয়া যায়।
যা দিয়ে কোনোকিছু তৈরি করা হয় তাকে উপকরণ বলে। উপকরণ এক বা একাধিক হতে পারে। যেমন- একজন কাঠমিস্ত্রি যখন চেয়ার, টেবিল, খাট ইত্যাদি বানায়, তখন তার হাতুড়ি, বাটাল, করাত ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। এগুলো তার উপকরণ। ঠিক তেমনি ছবি আঁকতে কতগুলো উপকরণের প্রয়োজন হয়। এগুলোকে আমরা ছবি আঁকার উপকরণ বলি। যেমন- কাগজ, পেন্সিল, কালি-কলম, তুলি, বোর্ড, ক্লিপ, ইজেল রং ইত্যাদি হলো ছবি আঁকার প্রাথমিক উপকরণ। এ সকল উপকরণের সাহায্যে আমরা ছবিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারি।
ছবি প্রাণবন্ত করতে বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করা হয়। বাজারে বিভিন্ন ধরনের রং পাওয়া যায়। তার মধ্যে-অন্যতম একটি রং হলো পাউডার রং। পাউডার রং থাকে পাউডার এর মতো শুকনা। তাই এ রং-এ পানি মিশিয়ে নিতে হয়। তবে সাথে গাম বা আঠা মিশিয়ে নিতে হয়। অনেক শিল্পী ব্যবহারিক গাম বা আইকা মিশিয়ে নেন। পাউডার রং অন্য রং থেকে সাশ্রয়ী। শিশু-কিশোরেরা সহজেই পানিতে মিশিয়ে এ রং তৈরি করতে পারে। তাই তাদের মধ্যে এ রঙের চাহিদাও অনেক বেশি।
চক প্যাস্টেল খুব নরম ও আঁকার পরে রঙের পাউডার ছবি নড়াচড়ার কারণে ঝরে যেতে পারে বা মুছে যেতে পারে তাই তরল ফিক্সাটিভ স্প্রে করে রংকে স্থায়ী করে নিতে হয়।
মোম প্যাস্টেল ব্যবহার করে ছবি আঁকা অনেক সুবিধা। এটা ব্যবহার করে সম্পূর্ণ রঙিন ছবি আঁকা সম্ভব। এই রঙের সাথে অন্য রং মেশানো সহজ।

এ অধ্যায় পড়া শেষ করলে আমরা-
- ছবি আঁকার সাধারণ নিয়মগুলো বর্ণনা করতে পারব।
- ছবি আঁকার প্রাথমিক উপকরণসমুহের নাম ও ব্যবহারবিধি ব্যাখ্যা করতে পারব।
- ছবি আঁকার বিভিন্ন মাধ্যমের নাম উল্লেখ করতে পারব।
- ছবি আঁকার মাধ্যম হিসেবে পেনসিল ও প্যাস্টেল রঙের ব্যবহার বর্ণনা করতে পারব।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!