উত্তরঃ
যুবসমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ
"তারুণ্যের জয়গান গাও, যারা ভেঙে ফেলে সব জরাজীর্ণের বাঁধ।"- কাজী নজরুল ইসলাম
ভূমিকা: একটি রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি, স্বপ্ন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার যুবসমাজ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, আঠারো বছর বয়স যেন-"স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, ভাঙতে চায় সে পাথর বাধা-বিপত্তি।" যেকোনো দেশের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত রূপান্তরের নেপথ্যে থাকে যুবসমাজের অদম্য শক্তি, সাহসিকতা ও সৃজনশীলতা। যুবসমাজ হলো রাষ্ট্রের সেই প্রাণবন্ত অংশ, যারা গৌরবময় অতীতকে শ্রদ্ধা করে, বর্তমানকে সাহসের সাথে যাপন করে এবং ভবিষ্যৎকে প্রগতির আলোয় নির্মাণ করে। রাষ্ট্র নামক যে বিশাল সৌধ, তার মূল স্তম্ভই হলো যুবশক্তির মেধা, শ্রম ও দেশপ্রেম। বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4R) এই যুগে একটি আধুনিক, স্বনির্ভর, উন্নত ও বৈষম্যহীন সাম্যের রাষ্ট্র গঠনে যুবসমাজের ভূমিকা কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং সম্পূর্ণ অপরিহার্য। তাই বলা হয়, "আজকের যুবকরাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, নীতিনির্ধারক ও জাতির কর্ণধার।"
যুবসমাজের ধারণা: সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, যুবসমাজ হলো একটি দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদের সবচেয়ে উৎপাদনশীল, সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময় অংশ, যারা সরাসরি অনুৎপাদনশীল নির্ভরশীল জনসংখ্যাকে সচল রাখতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘের বৈশ্বিক সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের যুবক হিসেবে গণ্য করা হলেও, আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক ও জনমিতিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিবেচনা করে 'বাংলাদেশের জাতীয় যুব নীতি (২০১৭) অনুসারে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিককে যুবসমাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বিপুল, বৈচিত্র্যময় ও সৃজনশীল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই মূলত রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক রূপান্তর ও প্রগতির মূল কারিগর বা যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'Agents of Change'।
রাষ্ট্র নির্মাণ কী?
'রাষ্ট্র নির্মাণ'একটি সুদূরপ্রসারী, বহুমুখী এবং অত্যন্ত জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া। এটি কেবল ইট-পাথরের বাহ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা যান্ত্রিকভাবে জিডিপি বৃদ্ধির নাম নয়। রাষ্ট্র নির্মাণ হলো এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান প্রধান মৌলিক উপাদান। একটি টেকসই, কল্যাণমুখী ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং একটি দূরদর্শী দীর্ঘমেয়াদী ভিশন; যার প্রতিটি ক্ষেত্রে যুবসমাজের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একান্ত অপরিহার্য।
রাষ্ট্র নির্মাণে যুবসমাজের গুরুত্ব:
যুবসমাজ একটি দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল শক্তি এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের কর্মস্পৃহা, সাহস, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, দ্রুত শেখার দক্ষতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর অসাধারণ সক্ষমতা একটি জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, সামাজিক সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলাসহ রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিটি ক্ষেত্রে যুবসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। যে জাতি তার যুবসমাজকে মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারে, সে জাতি বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে দ্রুত উন্নয়ন অর্জন করে। তাই যুবসমাজকে দেশের জনমিতিক সুবিধা (Demographic Dividend)-এর প্রধান ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধার এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে, যেখানে দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম। এই বিপুল যুবশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে, শিল্পায়ন ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন খাত আরও বিকশিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা পূরণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা তৈরিতে আর্থিক সহায়তা, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী নীতি বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র যদি দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে তারুণ্যের এই শক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে একটি উন্নত, আত্মনির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ও রাষ্ট্র গঠনে যুবসমাজের ঐতিহাসিক ভূমিকা:
বাংলাদেশের জন্ম এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের ইতিহাস মূলত এ দেশের যুবসমাজের রক্ত, ত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল জাতীয় অধ্যায়ের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে দেশের অকুতোভয় যুব ও ছাত্রসমাজ। ইতিহাসের সেই বাঁক পরিবর্তনকারী ভূমিকাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে প্রথম বুলেট ও বুটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল এ দেশের তৎকালীন তরুণ সমাজই। রফিক, শফিক, বরকত, জব্বারসহ অসংখ্য যুবকের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত মাতৃভাষার এই অধিকারই মূলত বাঙালিকে পরবর্তীকালে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল।
- ঐতিহাসিক আন্দোলনসমূহ (১৯৬২-১৯৬৯): পাকিস্তান আমলের প্রতিটি স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুবসমাজ ছিল প্রথম প্রতিরোধ প্রাচীর। ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-র ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে যুব ও ছাত্রসমাজের আপসহীন ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বই তৎকালীন সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে বাধ্য করেছিল।
- ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ জাতির পিতার স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের যে আপামর জনতা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, তাদের সিংহভাগই ছিল অদম্য তরুণ ও যুবসমাজ। গেরিলা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সম্মুখ সমরে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, লাল-সবুজের পতাকার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মাত্র ৯ মাসে দেশকে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন করেছিল এই তরুণ সমাজই।
- উত্তর-স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এক চরম অর্থনৈতিক শূন্যতার মাঝে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাস্তাঘাট, সেতু ও প্রশাসনিক অবকাঠামো পুনর্গঠনে তরুণরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় স্বৈরাচার বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে যুবসমাজ যেমন অগ্রণী ছিল, ঠিক তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে রাষ্ট্র সংস্কার ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের এক নতুন ঐতিহাসিক দ্বার উন্মোচন করেছে দেশের তরুণ সমাজ।
রাষ্ট্র নির্মাণে যুবসমাজের বহুমাত্রিক ভূমিকা:
একটি আধুনিক, কল্যাণমুখী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে যুবসমাজ বহুমুখী এবং যুগান্তকারী অবদান রাখতে পারে। রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের সেই প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
অর্থনৈতিক উন্নয়নে: একটি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীল জনশক্তির প্রধান এবং সবচেয়ে গতিশীল অংশই হলো যুবসমাজ। কৃষি খাতের আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ, ভারী ও মাঝারি শিল্পোৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, গতিশীল সেবাখাত এবং তথ্যপ্রযুক্তির নানাবিধ শাখায় তরুণদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ জাতীয় আয় বা জিডিপি (GDP) বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। যুবসমাজের মাঝে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণে সাহায্য করে। এই বিপুল কর্মক্ষম যুবশক্তিকে যদি যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়, তবে তা যেমন দেশীয় বাজারে নতুন ও বৈচিত্র্যময় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের যুবকদের উচ্চ আয়ের ও মর্যাদাপূর্ণ পেশাগত অবস্থান নিশ্চিত করে। ফলশ্রুতিতে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেগবান হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর ও গতিশীল করে তোলে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে: শিক্ষিত ও দক্ষ যুবসমাজ একটি আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি। প্রথাগত সনদসর্বস্ব এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল শিক্ষা, উচ্চতর বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নতুন নতুন তাত্ত্বিক উদ্ভাবন এবং প্রায়োগিক কারিগরি দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণরা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বর্তমান যুগে যেকোনো দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি পরিমাপ করা হয় তার মানবসম্পদের গুণগত মান দিয়ে। এই তরুণ সমাজ যখন নিজেদের মেধা ও শ্রমকে দক্ষতায় রূপান্তর করে, তখন তারা রাষ্ট্রের জন্য আর কোনো বোঝা থাকে না, বরং সম্পদে পরিণত হয়। এই দক্ষ মানবসম্পদই মূলত চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের নানাবিধ জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রাষ্ট্রকে একবিংশ শতাব্দীর নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্টার্ট-আপ: বর্তমান বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং বিগ ডাটার মতো অত্যাধুনিক ও রূপান্তরকারী প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে চালিত হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিশ্বমানের সফটওয়্যার উন্নয়ন, নতুন নতুন উদ্ভাবনী স্টার্ট-আপ, ই-কমার্স ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণায় যুবসমাজের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট রাষ্ট্রে পরিণত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তরুণ প্রজন্মের এই প্রযুক্তিবান্ধব মানসিকতা ও সৃজনশীলতা সনাতন আমলাতান্ত্রিক ও ধীরগতির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে একটি দ্রুতগতির 'নলেজ-বেজড' বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বিনির্মাণে সাহায্য করছে। তরুণদের এই উদ্ভাবনী চিন্তা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রযুক্তিগত উদ্যোগগুলো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং দেশের তরুণদের বিশ্ববাজারের সাথে সফলভাবে যুক্ত করছে।
গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায়: যুবসমাজ একটি দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে পারে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অগ্রগতির প্রধান প্রধান শত্রু হলো দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপশাসন। তরুণরা স্বভাবগতভাবেই প্রথাবিরোধী, আদর্শবাদী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন। তারা তাদের এই আপসহীন মানসিকতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম) সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গঠন করতে পারে। দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিক অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে তারা একটি স্বৈরাচারমুক্ত, সাম্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
সামাজিক উন্নয়ন ও কুসংস্কার প্রতিরোধ: একটি আদর্শ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো সামাজিক সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার, তৃণমূলের স্বাস্থ্য সচেতনতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং যেকোনো প্রাকৃতিক ও জাতীয় দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে যুবসমাজ সর্বদা অগ্রভাগে থাকে। তরুণদের প্রগতিশীল, মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক নেতৃত্বের তীব্র টানেই সমাজ থেকে যুগ যুগ ধরে চলে আসা নানাবিধ কুসংস্কার, বাল্যবিয়ে, যৌতুক প্রথা ও ইভটিজিংয়ের মতো ব্যাধিগুলো দূর হওয়া সম্ভব হয়। তাদের রক্তদান এবং নানাবিধ সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই সমাজে মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত বিকাশ ঘটে এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুদৃঢ় হয়।
যুবসমাজের বর্তমান সংকট ও অন্তরায়সমূহ:
রাষ্ট্র নির্মাণে যুবসমাজের অপার সম্ভাবনা ও অদম্য শক্তি থাকলেও, বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারা বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ ও সংকটের মুখোমুখি। যুবশক্তির বিকাশে প্রধান প্রধান অন্তরায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলোঃ
- বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব: বর্তমান যুবসমাজের সবচেয়ে বড় সংকট হলো তীব্র কর্মসংস্থানহীনতা। আমাদের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে বাস্তবমুখী কর্মবাজারের চাহিদার ব্যাপক অমিল রয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর উচ্চশিক্ষিত যুবকদের একটি বিশাল অংশ বেকার বা অর্ধ-বেকার থেকে যাচ্ছে, যা দেশপ্রেমিক তরুণদের বাধ্য করছে বিদেশে পাড়ি জমাতে এবং রাষ্ট্রকে 'ব্রেন ড্রেন' বা মারাত্মক মেধা পাচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
- মাদকাসক্তি ও নৈতিক অবক্ষয়: মাদকের নীল দংশন ও আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবে যুবসমাজের একটি অংশের মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে। মাদকের সহজলভ্যতা ও হতাশা তরুণদের অপরাধের দিকে ধাবিত করছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। যুবশক্তির এই উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়া রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
- মানসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব: আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো বহুলাংশে তত্ত্বীয় ও মুখস্থনির্ভর। এটি তরুণদের সৃজনশীল হতে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে বাধা দিচ্ছে। আধুনিক যুগের উপযোগী প্রযুক্তিগত, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় প্রথাগত ডিগ্রি অর্জন করেও তরুণরা বৈচ্ছিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
- হতাশা, সাইবার অপরাধ ও রাজনৈতিক অপব্যবহার: উপযুক্ত মূল্যায়ন ও মেধার ভিত্তি তৈরি না হওয়ায় তরুণদের একাংশের মাঝে চরম মনস্তাত্ত্বিক হতাশা ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অনেকে আবার সাইবার অপরাধ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তারে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় এই সুযোগ নিয়ে তরুণদের সুস্থ ধারার রাজনীতির পরিবর্তে লেজুড়বৃত্তিক ও পেশীশক্তি নির্ভর কলুষিত রাজনীতিতে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেয়।
সংকট উত্তরণে রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়:
যুবসমাজকে রাষ্ট্র নির্মাণের মূল ধারায় এবং জাতীয় উন্নয়নের স্রোতস্বিনীতে সফলভাবে সম্পৃক্ত করতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের যৌথ উদ্যোগে কিছু সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্যে প্রধান করণীয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও কর্মমুখী রূপান্তর: আমাদের প্রচলিত সনাতন ও তত্ত্বসর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে শিক্ষাক্রমকে সম্পূর্ণ কর্মমুখী, কারিগরি, বৃত্তিমূলক এবং আইসিটি ভিত্তিক করতে হবে। তাত্ত্বিক ডিগ্রির চেয়ে বাস্তবমুখী দক্ষতার ওপর জোর দিলে তরুণরা পড়ালেখা শেষ করেই সরাসরি কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।
- ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সহজ ঋণ সুবিধা: তরুণদের কেবল চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে 'চাকরিদাতা' বা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্যে নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে, কম সুদে এবং জামানতবিহীন 'স্টার্ট-আপ ঋণ' ব্যবস্থার পরিধি বাড়াতে হবে। একই সাথে তরুণদের যুগোপযোগী ব্যবসায়িক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
- মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলা: যুবসমাজকে ক্ষতিকর মাদকাসক্তি, অপরাধ ও মনস্তাত্ত্বিক হতাশা থেকে দূরে রাখতে প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের মানসিক সুস্থতার দিকে বিশেষ নজর দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ সহজলভ্য করা প্রয়োজন, যা তাদের ইতিবাচক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করবে।
- নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়গুলোতে, যেমন: জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার কিংবা রাষ্ট্রীয় থিংক-ট্যাংকগুলোতে যোগ্য ও মেধারী তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দিলে রাষ্ট্রীয় নীতিতে তারুণ্যের প্রকৃত কণ্ঠস্বর, নতুন আইডিয়া ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, যা রাষ্ট্র সংস্কারে গতি আনবে।
উপসংহার:
যুবসমাজ একটি রাষ্ট্রের কেবল জনসংখ্যা নয়, তারা রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং চালিকাশক্তি। বায়ান্নর রক্ত আর একাত্তরের স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে একটি বৈষম্যহীন, উন্নত ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনে যুবসমাজের কোনো বিকল্প নেই। কবি সুকান্তের ভাষায় বলতে হয়ড় "এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।" রাষ্ট্রকে যুবসমাজের মেধার মূল্যায়ন করতে হবে এবং তরুণদেরও সস্তা আবেগ ও মোহের ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। রাষ্ট্র ও যুবশক্তির এই যুগলবন্দী সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল একটি স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব।