বীরত্ব ও অসীম সাহসিকতার জন্য প্রথম আব্দুর রহমানকে কুরাইশদের বাজপাখি বলা হয়।
স্পেনের জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়ক ছিলেন উমর বিন হাফসুন।
তিনি ৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে রোনদার নিকটবর্তী ইউনাইটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল হাফস বিন উমর বিন জাফর। তার পৈতৃক। আবাসভূমি ছিল স্পেনের রোবাস্ট্রো অঞ্চলে। উমর বিন হাফসুন স্পেনের ইতিহাসে একজন প্রভাবশালী সংগঠক, সমরকুশলী ও আত্মপ্রত্যয়ী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তবে তিনি ধূর্ত ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবেও নিজেকে শাসকবর্গের কাছে পরিচিত করেন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত শাসক স্পেনের উমাইয়া খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমানের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তৃতীয় আব্দুর রহমান স্পেনের উমাইয়া শাসকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুদক্ষ ও গুণবান ছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ নানা প্রকার বিপদ থেকে স্পেনকে মুক্ত করে বাইরের শত্রুদের প্রতি দৃষ্টি দেন এবং তাদেরকে যুদ্ধের মাধ্যমে কিংবা কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে পরাজিত করেন। এভাবে তৃতীয় আব্দুর রহমান স্পেনের শত্রুদের শক্তি খর্ব করে রাজ্যের সুশৃঙ্খল অবস্থা বজায় রাখেন।
মধ্যযুগীয় মুসলিম স্পেনের ইতিহাসে তৃতীয় আব্দুর রহমানের রাজত্বকাল সর্বাপেক্ষা গৌরবময় অধ্যায়। তিনি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ স্পেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধিতে যে কৃতিত্বের পরিচয় দেন এজন্য তাকে স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক বলা হয়ে থাকে। তিনি কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি সাধনকল্পে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি নলযোগে পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা করে পতিত ও অনুর্বর জমিও চাষের উপযোগী করে তোলেন। ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কৃষির পাশাপাশি তিনি শিল্প-কারখানার প্রতিও গুরুত্ব দেন। তার সময়ে রাজধানীতেই ১৩ হাজার তাঁতশিল্প ছিল। তার সুশাসনের ফলে মুসলিম স্পেন একটি সুখী-সমৃদ্ধিশালী দেশে পরিণত হয়। উদ্দীপকে যার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
উদ্দীপকের চেয়ারম্যানের সাথে স্পেনের উমাইয়া শাসক তৃতীয় আব্দুর রহমানের কর্মকাণ্ডের মিল রয়েছে। কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বাইরেও তার কৃতিত্ব পরিব্যপ্ত।
তৃতীয় আব্দুর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সাম্রাজ্যে শৃঙ্খলা আনয়ন। তিনি যে সময় ক্ষমতা লাভ করেছিলেন, সে সময় তার সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ। অসংখ্য বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি আন্দালুসিয়াকে রক্ষা করে পূর্বাপেক্ষা বৃহদায়তন ও শান্তিশালী করেছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ বিপদ থেকে স্পেনকে রক্ষার পাশাপাশি বহিঃশত্রুর আক্রমণও প্রতিহত করেন। ফাতেমীয় ও বাবারদের পরাজিত করেন।
তৃতীয় আব্দুর রহমানের সময় শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। হিস্ট্রি বলেন, আব্দুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম স্পেন বিশ্ব-সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। স্পেনে তখন বন্ধু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সমাবেশ ঘটে। সাম্রাজ্যের সর্বত্র স্কুল, পাঠাগার, এতিমখানা স্থাপিত হয়। এগুলোর ব্যয়ভার সরকার বহন করত। তার প্রতিষ্ঠিত কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্চাত্যের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তৃতীয় আব্দুর রহমানের সময় স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ হয়েছিল। এ সময় রাজধানী কর্ডোভাতে ৩০০ মসজিদ, ১০০ প্রাসাদ, ১,১০,০০০ গৃহ এবং ৩৮০টি হাম্মামখানা ছিল। তার স্ত্রী জোহরার নামকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য তিনি ৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে কর্ডোভার ৩ মাইল উত্তরে আজ-জোহরা নামে একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই প্রাসাদ নির্মাণে তিনি প্রায় ৫০ লক্ষ দিনার ব্যয় করেন। তিনি কর্ডোভার মসজিদের উত্তর দিকে একটি সুউচ্চ মিনার নির্মাণ করেছিলেন। মিনারটি। ২৭ ফুট চওড়া এবং ১০৮ ফুট উঁচু ছিল।
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তৃতীয় আব্দুর রহমান অসামান্য অবদান রেখেছেন।
Related Question
View Allপ্রথম আব্দুর রহমানের অনন্য কৃতিত্ব ও গুণাগুণের জন্য ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী আব্বাসি খলিফা আল মনসুর তাকে 'কুরাইশদের বাজপাখি' বলে অভিহিত করেন।
প্রথম আব্দুর রহমান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার প্রদর্শনে তিনি কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি তার গতিপথের যাবতীয় প্রতিবন্ধকতাকে একক শক্তি দিয়ে নির্মূল করতেন। আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের বিরুদ্ধে খলিফা আল মনসুর একটি অভিযান প্রেরণ করেন। আদ-দাখিল আল মনসুরের সেনাপতিকে পরাজিত করে তার ছিন্ন মস্তক ও একটি চিঠিসহ আল মনসুরের দরবারে প্রেরণ করেন। তার এ অনন্য কৃতিত্ব ও গুণাগুণের জন্য ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী আব্বাসি খলিফা আল মনসুর তাকে 'কুরাইশদের বাজপাখি' বলে অভিহিত করেছেন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রতিহিংসার স্বরূপ প্রথম আব্দুর রহমানের ক্ষেত্রেও একই রকম ছিল।
উমাইয়া ও আব্বাসি দ্বন্দ্ব ছিল দীর্ঘদিনের। তাদের যে কোনো এক গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসলে অন্যদের চরমভাবে দমন-পীড়ন চালাত। উমাইয়াদের সরিয়ে আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় আসলে আব্দুর রহমান ভাগ্য বিপর্যয়ের শিকার হন।
উমাইয়া খিলাফতের পতন ঘটিয়ে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের নৃশংসভাবে হত্যা শুরু করে। এই নৃশংসতার হাত থেকে কেবল উমাইয়া যুবরাজ আব্দুর রহমান রক্ষা পান। তিনি পালিয়ে গিয়ে উত্তর আফ্রিকার সিউটায় মামার আশ্রয় লাভ করেন এবং একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন করে স্পেনে উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে যুবরাজ আলাল যেমন রাজ্য হারা হন, একইভাবে আব্বাসিদের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ও নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রথম আব্দুর রহমান নিজ বাস্তুভূমি ত্যাগ করে পলায়ন করতে বাধ্য হন। দীর্ঘকাল পথে-প্রান্তরে ঘুরে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তিনি নিজেকে সুসংগঠিত করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যুবরাজ আলালের প্রতিহিংসার শিকার হওয়া এবং আব্বাসিদের ষড়যন্ত্র ও নিষ্ঠুরতায় প্রথম আব্দুর রহমানের ভাগ্য বিপর্যয়ের ঘটনা একই ধারায় প্রবাহিত হয়েছে।
উদ্দীপকে বর্ণিত যুবরাজ আলালের মতো প্রথম আব্দুর রহমানও নিজ প্রচেষ্টা ও একাগ্রতায় আমিরাত প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিলেন।
আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের অন্যতম কৃতিত্ব হচ্ছে স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করা। বর্বর ইয়েমেনি ও খ্রিস্টানদের দ্বারা বহুবার আক্রান্ত হলেও নিজ বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং সামাজিক দক্ষতার বলে এ সকল বিপদ হতে তিনি মুসলিম রাজ্য স্পেনকে মুক্ত করতে সমর্থ হন। যদিও তিনি একসময় আব্বাসীয়দের অত্যাচারের শিকার হয়ে পালিয়ে স্পেনে এসেছিলেন। উদ্দীপকের আলালও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে রাজ্যহারা হন এবং পুনরায় নিজেকে সুসংগঠিত করে রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন।
উদ্দীপকে আলাল রাজ্য দখলের ক্ষেত্রে যে ধরনের কৌশল অবলম্বন করেন ঠিক একই ধরনের কৌশলের মাধ্যমে আব্দুর রহমানও স্পেন দখল করেন। শুধু কৌশল বা শান্তি প্রস্তাব নয়, আব্দুর রহমান আদ-দাখিলকে 'মাসারা' নামক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। এ যুদ্ধে স্পেনের শাসক ইউসুফ আল ফিহরি পরাজিত হলে আব্দুর রহমান স্পেন দখল করেন। স্পেনের তৎকালীন মুদারীয় শাসনকর্তা ইউসুফ আল ফিরির কুশাসনে রাজনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। সিমারীয়রা অতিষ্ঠ হয়ে আব্দুর রহমানকে স্পেন আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। এ প্রেক্ষিতে তিনি ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনে যান। তিনি বাবার, নির্যাতিত মুদারীয়দের ঐক্যবন্ধ করেন। ফলে তার শক্তি বৃদ্ধি পায় ও মুন্যে জয়লাভ করে স্পেনে আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। আব্দুর রহমান যেমন রাজ্য দখল ও জনগণের মন জয় করেছিলেন, উদ্দীপকের আলালের ক্ষেত্রেও তা লক্ষণীয়।
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপকের আলাল খলিফা আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের ন্যায় বিজিত অঞ্চলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে আমিরাত প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিলেন।
স্পেনে উমাইয়া আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আব্দুর রহমানকে আদ-দাখিল বলা হয়।
মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের রাজা রডারিককে পরাজিত করে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
স্পেনের সিউটা দ্বীপের শাসক কাউন্ট জুলিয়ানের আমন্ত্রণ পেয়ে খলিফা আল ওয়ালিদের অনুমতিক্রমে ৭১০ খ্রিষ্টাব্দে মুসা ইবনে নুসায়ের সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে স্পেনে পাঠান। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারিক রাজা রডারিকের সম্মুখীন হন। সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের পর তারিক বিজয় লাভ করেন এবং রডারিক পরাজিত হয়ে নদীতে ডুবে প্রাণ হারান। তারিকের সুদক্ষ রণকৌশল আর সাহসী মনোভাবে স্পেনে ইসলামের পতাকা উত্তোলিত হয়। এ কারণেই তিনি ইতিহাসে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!