কুরআন সুন্নাহ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আহরিত শরিয়তের বিধানসমূহ যে শাস্ত্রে আলোচিত হয়েছে তাকে ফিকহশাস্ত্র বলে।
খুলাফায়ে রাশেদার যুগের পর মাযহাব উৎপত্তি লাভ করে । রাসুলুল্লাহ (স) এর যুগে মুসলিমদের মধ্যে মতবিরোধের সুযোগ ছিল না। খুলাফায়ে রাশেদার স্বর্ণযুগেও কোনো মাযহাব জন্ম নেয়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র, অঞ্চল, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দ্রুত ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে বিভিন্ন এলাকা, গোত্রের লোকদের মধ্যে চিন্তা ও দর্শনের বিভেদ তৈরি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মাযহাবের উদ্ভব হয়।
শরিয়তের কষ্টসাধ্য বিষয়গুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যেই ফিকহশাস্ত্র সংকলন করা হয়। ইসলামি বিধিবিধান ও মূলনীতির প্রধান উৎস কুরআন মাজিদ ও হাদিস। কিন্তু এ উৎস দুটিতে ইসলামি আইন-কানুন ধারাবাহিকভাবে বিন্যস্ত হয়নি। বরং কুরআন-হাদিসের বিস্তৃত অঙ্গনে বিক্ষিপ্ত আকারে এ বিধিবিধান গ্রন্থিত ছিল। সাধারণ মানুষের জন্য বিক্ষিপ্ত বিধিবিধান কষ্টসাধ্য হয়ে পড়লে তাদের জন্য বিন্যস্ত ইসলামি আইন সংকলন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এমনি প্রয়োজন ও গুরুত্বের প্রেক্ষিতেই মুসলিম মনীষীদের নিষ্ঠা ও আন্তরিক গবেষণায় স্বতন্ত্ররূপে ইসলামি আইনবিজ্ঞান যাত্রা শুরু করে। এটিই ফিকহশাস্ত্র (Islamic Jurisprudence) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। উদ্দীপকে এ শাস্ত্রের ইঙ্গিত রয়েছে।
উদ্দীপকে দেখা যায় ইসলামি জ্ঞানে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ কুরআন হাদিসের আলোকে শরিয়তের বিভিন্ন মাসয়ালা-সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ফিকহশাস্ত্র সংকলন করেন। বস্তুত ফিকহশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো- মানুষকে আল্লাহর নির্ধারিত হুকুম-আহকাম পালনের সঠিক রীতি পদ্ধতি নির্দেশ করা এবং এর মাধ্যমে তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের যোগ্য করে তোলা। সর্বসাধারণের পক্ষে সরাসরি কুরআন- হাদিস থেকে বিধান জেনে নিয়ে তা পালন করা সম্ভব নয়। কেননা কুরআন ও হাদিসে ধারবাহিকভাবে বিধান পেশ করা হয়নি। একই বিষয়ের আইন একাধিক স্থানে বর্ণনার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ইসলামি আইনের অনুশীলন ও বাস্তবায়ন অসম্ভব ছিল। এ সমস্যা দূর করে সাধারণ মানুষের জন্য ইসলামের অনুশীলন সহজসাধ্য করার লক্ষ্যে ফিকহশাস্ত্র কাজ করে। সেজন্য বলা যায়, আল্লাহর আইন সহজসাধ্যভাবে পালন করে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি অর্জনই ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
ইসলামি বিধি-বিধান পালনের সহজসাধ্য পদ্ধতি বর্ণিত হওয়ায় ফিকহশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
ফিকহশাস্ত্র হলো বিশুদ্ধ দলিল-প্রমাণাদি সহকারে মানুষের কর্মসংক্রান্ত ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম আহকাম সম্পর্কিত জ্ঞানশাস্ত্র। উদ্দীপকে এ বিষয়ের ইঙ্গিত করেছেন। ফিকহশাস্ত্র ইসলামি শরিয়তের ব্যাবহারিক দিকের প্রধান ভিত্তি। সর্বসাধারণের জন্য দীনকে সহজবোধ্য করার এ এক অসাধারণ পদ্ধতি। কুরআন ও হাদিসে ইসলামি জীবনব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে সুবিন্যস্ত অবস্থায় নেই। কাজেই জীবনব্যবস্থা সংবলিত আহকামে শরিয়ত গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করা না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে আল্লাহর আইন অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলা সম্ভবপর হবে না। তাছাড়া স্থান-কাল-পাত্রভেদে উদ্ভূত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন-হাদিসের ঘটনা, সমীক্ষা ও পরিবেশ বিশ্লেষণ করে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে গড়ে উঠে ফিকহশাস্ত্র। তাই এর মাধ্যমে সব দেশ ও কালের মুসলিমগণ অত্যন্ত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যে দীনের অনুশীলন করতে পারেন। আবার ফিকহের মাহাত্ম্য, গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। ইমাম বায়হাকি (র) দারে কুতনিতে বর্ণনা করেছেন-
لِكُلِّ شَيْءٍ عِبَادٌ وَعِبَادُ هُذَا الدِّينِ الْفِقْهُ
অর্থ: 'প্রত্যেক বস্তুরই খুঁটি রয়েছে। আর এ দীন ইসলামের খুঁটি হলো ফিকহ'।
পরিশেষে বলা যায় যে, ফিকহশাস্ত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।
Related Question
View Allসিহাহ সিত্তাহ বলতে বিশুদ্ধ ছয়টি হাদিস গ্রন্থকে বোঝায়। হিজরি তৃতীয় শতকে হাদিস সংকলনের স্বর্ণযুগে হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে ছয়জন মুহাদ্দিস এবং তাদের সংকলিত গ্রন্থ বিশেষ প্রাধান্য পায়। এগুলো সর্বজনীন ও সর্বাঙ্গীন বিশুদ্ধতার স্বীকৃতি লাভ করে। ইলমে হাদিসের পরিভাষায় তাদের সংকলিত বিশুদ্ধ ছয়টি হাদিস গ্রন্থকে সিহাহ সিত্তাহ বলা হয়। এগুলো হলো- সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিযি, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবন মাজাহ ও সুনানে আবু দাউদ। হাদিস সংকলকদের নাম অনুযায়ী উক্ত হাদিস গ্রন্থগুলোর নামকরণ করা হয়েছে।
জনাব ময়নুল দ্বিতীয় উৎস হিসেবে হাদিস অধ্যয়ন করেন- যার গুরুত্ব অপরিসীম।
হাদিস অর্থ- কথা বা বাণী। ইসলামি পরিভাষায়, মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতিকে হাদিস বলে। হাদিস হলো শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস। এটি আল কুরআনের মূলনীতিসমূহের বাস্তবরূপ ও ব্যাখ্যা। উদ্দীপকে এ উৎসের আলোকপাত হয়েছে।
উদ্দীপকের জনাব ময়নুল কুরআনের ব্যাখ্যা বোঝার জন্য হাদিস অধ্যয়ন করেন। মূলত ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস হলো হাদিসের জ্ঞান। মানুষ জীবন চলার পথে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতেই পারে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ভূত সব সমস্যার সমাধান দিতে হাদিস অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। হাদিস মুসলমান জাতির জন্য জীবন চলার অন্যতম উপকরণ। ইসলামি জীবনধারার অন্যতম শর্ত হলো আল্লাহর বন্দেগি বা ইবাদত করা। এ ইবাদত কীভাবে করতে হবে তার পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রদান করেছে হাদিস। একজন মুসলমানের সামগ্রিক আচার-আচরণ কেমন হবে তা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছে হাদিস। আর মহানবি (স) ছিলেন পরিচ্ছন্ন আচার- আচরনের বাস্তব প্রতিকৃতি। সুতরাং ইসলামি জীবনধারায় প্রত্যেক মুসলমানের জীবনাচরণ নিয়ন্ত্রিত হবে হাদিসের আলোকে।
উদ্দীপকে মাওলানা ফখরুলের কর্মটি ফিকহশাস্ত্র নিয়ে। ইসলামি শিক্ষা প্রসারে যার গুরুত্ব অপরিসীম। ফিকহ শব্দের অর্থ- অনুধাবন করা, বুঝতে পারা ইত্যাদি। পরিভাষায় যে শাস্ত্রে কর্মসংক্রান্ত তথা ব্যাবহারিক জীবনের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা সংক্রান্ত শরিয়তের হুকুম-আহকাম ও বিধি-বিধান আলোচিত হয়, সে শাস্ত্রকে বলা হয় ফিকহশাস্ত্র বা ইলমুল ফিকহ। উদ্দীপকে এ শাস্ত্রেরই ইঙ্গিত এসেছে।
উদ্দীপকের মাওলানা কুরআন হাদিস গবেষণা করে এর বিধি-বিধান একটি বইয়ের মধ্যে লিপিবদ্ধ করেন। তার কাজটি ইসলামি আইন সম্পর্কিত জ্ঞান প্রসারে অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে। কেননা কুরআন নাজিল সমাপ্তি ও রাসুলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের পর সর্বসাধারণের উপযোগী করে শরয়ি বিধান পরিবেশনের জন্য মূলনীতি ও বিধানাবলির চুলচেরা বিশ্লেষণ অনিবার্য হয়ে পড়ে। তাছাড়া কুরআন-হাদিসের অবিন্যস্ত ও বিক্ষিপ্ত বর্ণনা ইসলামি আইনের বিন্যাস ও সহজ উপস্থাপনার উপযোগিতা সৃষ্টি করে। ফিকহশাস্ত্র শরয়ি বিধানের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেয়। বিধান গুলোর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুসারে এগুলোকে বিন্যস্ত করে সব দেশের সাধারণ মানুষের উপযোগী করে। সর্বোপরি এ শাস্ত্রবিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে সহজ উপস্থাপনার রীতি গ্রহণ করে আপামর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মানুশীলনকে সহজসাধ্য করেছে।
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে গভীর সংযোগকারী বিষয় হলো- ইবাদত।
ইসলামের প্রসারের ফলে সাহাবিদের যুগে ফিকহশাস্ত্র বিকশিত হয়। সাহাবিদের যুগে ইসলাম দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়। সাহাবিগণ সম্মিলিতভাবে কুরআন-হাদিসের মূলনীতির আলোকে এসব সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ চেষ্টায় তারা ইজতিহাদের সূচনা করেন। এরপর ইজতিহাদি বিষয়ে ইজমা প্রতিষ্ঠিত করে সমস্যার সর্বসম্মত সমাধান দেওয়ার প্রয়াস পান। ফলে এ যুগে স্বতন্ত্র ফিকহশাস্ত্র সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!