বাংলায় পাল বংশের রাজত্বকাল ছিল চারশ বছর।
কুটিরশিল্পে প্রাচীন বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। কেননা, গ্রামের লোকদের দরকারি প্রায় সবকিছুই গ্রামে তৈরি হতো। যেমন- মাটির তৈরি জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল কলস, ঘটি-বাটি, হাঁড়ি-পাতিল, বাসনপত্র ইত্যাদি। লোহার তৈরি জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল দা, কুড়াল, খন্তা, খুরপি, লাঙল ইত্যাদি। কাঠ শিল্পেও সে সময় প্রাচীন বাংলা বেশ সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। সে সময় সংসারের আসবাবপত্র, ঘর-বাড়ি, মন্দির, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, রথ প্রভৃতি কাঠ দ্বারা তৈরি হতো।
উদ্দীপকে আর্যদের আগমনের আগে হিন্দুদের বৈদিক ধর্ম পালনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্রাচীন বাংলায় বৈদিক ধর্ম প্রতিষ্ঠার আগে অন্য কোনো ধর্মমত ছিল কি না, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া না গেলেও তৎকালীন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকদের ধর্মবিশ্বাস থেকে বৈদিক ধর্মের প্রভাব সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায়। সে সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা পূজা-অর্চনা, ভয়-ভক্তি ও সংস্কারে বিশ্বাসী ছিল। এখনো বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে নারী জাতির মধ্যে প্রচলিত বৃক্ষপূজা, পূজা-পর্বণে আম্রপল্লব, ধানছড়া, দূর্বা, কলা, পান-সুপারি, নারকেল, ঘট, সিঁদুর প্রভৃতির ব্যবহার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে দেখা যায়। একইভাবে মনসাপূজা, শ্মশান কালীর পূজা, বনদুর্গাপূজা, ষষ্ঠী পূজা প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরই পরিচয় বহন করে।
উদ্দীপকে লক্ষণীয়, রায়বাহাদুর বাড়ির কালীমন্দিরে প্রতিবছর ঘটা করে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। সেখানে দূরদূরান্ত থেকে নিমন্ত্রণ পেয়ে ব্রাহ্মণরা জড়ো হন, এই কালীমন্দিরে পাঁঠা বলি দেওয়া হিন্দুধর্ম শাস্ত্রের একটি পালনীয় সংস্কৃতি, যা হিন্দুদের বৈদিক ধর্মে দেখা যায়। তাই বলা যায়, উদ্দীপকে হিন্দুদের বৈদিক ধর্ম পালনের ইঙ্গিত রয়েছে।
ব্রাহ্মণদের প্রভবেই হিন্দুরা বৈদিক ধর্ম থেকে সরে এসেছে। এ ব্যাপারে উদ্দীপকের পঞ্চানন কর্মকার এর বক্তব্যের সাথে আমি একমত পোষণ করি।
খ্রিষ্টপূর্ব চার শতক থেকেই এই উপমহাদেশের তিনটি বড় ধর্ম-বৈদিক, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। মূলত মধ্যদেশ থেকে আগত ব্রাহ্মণরা বঙ্গদেশের নানা জায়গায় বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠ শতকে বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতির ঢেউ বাংলার সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাল আমলেও বৈদিক ধর্মের প্রভাব প্রতিপত্তি অটুট ছিল। বর্ম ও সেন রাজাদের রাজত্বকালে বৈদিক ধর্ম আরও প্রসার লাভ করে। কিন্তু কালক্রমে বৈদিক যাগ-যজ্ঞে পৌরাণিক দেব-দেবী ও বিশেষ বিশেষ তিথি নক্ষত্রে স্নান-দান-ধ্যান ক্রিয়াকর্মের প্রচলন শুরু হয়। নামকরণ, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, গৃহপ্রবেশ ইত্যাদি সংস্কার ব্রাহ্মণ্য সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বাংলার বুকে দ্রুত প্রসার লাভ করলেও কালক্রমে এর মধ্যে বিবর্তন দেখা দেয়। এ সময়ে আগের দেব-দেবীর পরিবর্তে নতুন নতুন দেব-দেবীর পূজা শুরু হয়। পরিবর্তন হতে থাকে ধর্মীয় রীতি-নীতির। ওই সময়কার শাসকরা মূলত ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মমতের। যার ফলে ব্রাহ্ম ধর্মমতের অনুসারীরা তাদের ধর্ম পালনের রীতিনীতিতে পরিবর্তন আনলে এর প্রভাবে বৈদিক ধর্মেও পরিবর্তন হতে শুরু করে। উপরের আলোচনা শেষে তাই বলা যায়, ব্রাহ্মণদের প্রভাবেই হিন্দুরা বৈদিক ধর্ম থেকে সরে এসেছে। তাই পঞ্চানন কর্মকারের বক্তব্য যথার্থ।
Related Question
View Allআর্যদের পূর্বে বাংলার ভাষার নাম অস্ট্রিক।
আর্যদের বৈদিক ভাষা থেকেই কালক্রমে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়। মূলত প্রাচীন যুগে আর্যরা যে ভাষা ব্যবহার করত এবং যে ভাষায় বৈদিক গ্রন্থ রচিত হয় তা সংস্কার করা হয়। সংস্কারের পর এ ভাষা সংস্কৃত নামে অভিহিত হয়। সংস্কৃত হতে প্রাকৃত এবং প্রাকৃত হতে অপভ্রংশ ভাষার উৎপত্তি হয়। অপভ্রংশ ভাষা হতে অষ্টম বা নবম শতকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়।
উদ্দীপকে বর্ণিত খাদ্য ও পোশাক পরিচ্ছদের সাথে বাংলার প্রাচীন আমলের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রাচীনকালেও বর্তমান সময়ের মতো বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল ভাত, মাছ, মাংস, শাক-সবজি, দুধ, ক্ষীর ইত্যাদি। খাওয়া-দাওয়া শেষে মসলাযুক্ত পান খাওয়ার রীতি ছিল। চাউল হতে প্রস্তুত নানা প্রকার পিঠা তখন জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার ছিল। তাছাড়া নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। পূর্ববঙ্গে ইলিশ ও শুঁটকি মাছ খুব প্রিয় খাবার ছিল। তরকারির মধ্যে বেগুন, লাউ, কুমড়া, ঝিংগে, কাকরোল, কচু উৎপন্ন হতো। ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, নারকেল, পেঁপে পাওয়া যেতো। দরকারি বিভিন্ন জিনিস গ্রামেই তৈরি হতো।
আর পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে প্রাচীন যুগে রাজা মহারাজা ও ধনীদের বাদ দিলে তেমন বিশেষ আড়ম্বর ছিল না। প্রাচীন বাংলার নারী-পুরুষ উভয়েই অলংকার পরতো। তারা কানে কুণ্ডল, গলায় হার, আঙুলে আংটি, হাতে বালা ও পায়ে মল পরিধান করতো। মেয়েদের সাজসজ্জায় আলতা, সিঁদুর ও কুমকুমের ব্যবহার প্রচলিত ছিল।
উদ্দীপকে দেখা যায়, টিনা নীলার বিয়েতে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে প্রাচীন বাংলার খাবারের সাথে টিনার বিয়ের আয়োজনে খাদ্যতালিকার মিল দেখতে পায়। সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও প্রাচীন যুগের সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পায় টিনা। তাই বলা যায়, উদ্দীপকে টিনা তার বান্ধবী নীলার গ্রামের বাড়িতে যা কিছু প্রত্যক্ষ করেছে সেগুলোর সাথে বাংলার প্রাচীন আমলের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
নীলাদের গ্রামের আর্থিক কাঠামোর মাঝে প্রাচীন বাংলার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে বলে আমি মনে করি।
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা কৃষির জন্য সুখ্যাত ছিল। এ অঞ্চলে পাট, ইক্ষু, তুলা, নারকেল, সুপারি, এলাচ, লবঙ্গ ইত্যাদি উৎপন্ন হতো। এছাড়াও কুটিরশিল্পের মধ্যে মাটির তৈরি কলস, ঘটি-বাটি, বাসনপত্র ইত্যাদি ছিল। আর লোহার তৈরি জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল দা, কুড়াল, কোদাল ইত্যাদি। বস্ত্রশিল্পের জন্য বাংলা প্রাচীনকালেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় প্রাচীন কাল থেকেই বাংলায় তৈরি হতো। আর কার্পাস তুলা ও রেশমের তৈরি উন্নতমানের সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্যও বঙ্গ প্রসিদ্ধ ছিল।
বঙ্গে স্থল ও জলপথেই বাণিজ্যের আদান-প্রদান চলত। দেশের ভেতরে বাণিজ্য ছাড়াও সে সময় বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্য বেশ উন্নত ছিল। তাছাড়াও প্রাচীন বাংলায় পূজা-পার্বণ ও আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা ছিল। দুর্গার অর্চনা উপলক্ষে বরেন্দ্রে বিপুল উৎসব হতো। ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া, আকাশপ্রদীপ, জন্মাষ্টমী, দশহরা, গঙ্গাস্নান ইত্যাদি অনুষ্ঠান হতো বঙ্গে। পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত গ্রামের আর্থিক কাঠামোর মাঝে প্রাচীন বাংলার চিত্র ফুটে উঠেছে।
সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব চার শতকের পূর্বে বাংলায় মুদ্রার প্রচলন আরম্ভ হয়।
প্রাচীন বাংলার মানুষের অবস্থা মোটামুটি উন্নত ছিল।
প্রাচীন বাংলার সমাজ জীবনে নানা ধরনের প্রথা বিদ্যমান ছিল। আর প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক জীবনের মূলভিত্তি ছিল কৃষি। এছাড়াও কুটিরশিল্প গড়ে উঠেছিল বঙ্গে। আর প্রাচীন বাংলায় স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পের বহু নিদর্শন ছিল। তাছাড়াও তৎকালীন বাংলায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হতো।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!