বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের অগ্রপথিক ড. এ. কে. নাজমুল করিম।
বাংলাদেশে তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের সামাজিক উন্নয়নে সমাজবিজ্ঞান পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়ন ছাড়া সমাজস্থ মানুষের চাহিদা, উপভোগ ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ সম্ভব হয় না। তাছাড়া বর্তমানে সমাজ উন্নয়নে যে সমস্ত উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তার সাথে যদি সামাজিক জ্ঞান না থাকে তবে সমাজে তার বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ নতুন পরিকল্পনার সাথে সাথে সমাজ ব্যবস্থায় যে নতুন মূল্যবোধের সৃষ্টি হবে তার সাথে পুরনো মূল্যবোধের বিরোধ বাধার সম্ভাবনা থাকবে। যার জন্য এ সমস্ত সমস্যা দূরীকরণে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অতি জরুরি।
উদ্দীপকের রিয়া জ্ঞানের যে শাখাটি নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় তা হলো সমাজবিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞান সমাজস্থ মানুষের কর্মকাণ্ডের বিজ্ঞান। অর্থাৎ, যে বিজ্ঞান সমাজের মানুষের বিভিন্ন কার্যাবলির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা করে তাই সমাজবিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞান তার আলোচনায় সমাজের মানুষের মানবিক সম্পর্কের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। কারণ সামাজিক সম্পর্কসমূহই হলো সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মূল ভিত্তি। সমাজবিজ্ঞান সমাজের সমগ্র সম্পর্কের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে। এ কারণে এ বিজ্ঞানটিকে এক কথায় ব্যাখ্যা করা সহজসাধ্য নয়। এজন্য সমাজবিজ্ঞানীগণ সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে একটি বা দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমন- সমাজবিজ্ঞানী গিডিংস বলেন, সমাজবিজ্ঞান সামাজিক ঘটনাবলির বিজ্ঞান। এমিল ডুর্খেইম বলেন, সমাজবিজ্ঞান হলো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান। কিংসলে ডেভিস বলেন, সমাজবিজ্ঞান সমাজের সাধারণ বিজ্ঞান। সুতরাং সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে এমন বিজ্ঞান যে বিজ্ঞান সমাজের সব দিক নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও ব্যাখ্যা করে থাকে।
উদ্দীপকের রিয়া এইচএসসিতে মানবিক বিভাগে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে সিলেবাস পর্যালোচনা করে দেখলো জ্ঞানের একটি শাখা সমাজের শ্রেণিবিন্যাস, শ্রেণিগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে। রিয়া সিদ্ধান্ত নিল এইচএসসিতে এই বিষয়টি সে পড়বে। অর্থাৎ, রিয়ার সিদ্ধান্তকৃত বিষয়টি হলো সমাজবিজ্ঞান। কারণ সমাজবিজ্ঞানই একমাত্র বিজ্ঞান যা সমাজের বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা করে। সুতরাং সমাজের শ্রেণিবিন্যাস, শ্রেণিগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক ইত্যাদি সমাজবিজ্ঞানের আলোচনার আওতাভুক্ত।
বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জ্ঞানের উক্ত শাখা অর্থাৎ, সমাজবিজ্ঞানের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ কারণে এদেশের উন্নয়ন হওয়া উচিত পরিকল্পনাভিত্তিক। আর এ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অপরিহার্য সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান। এজন্যই সমাজবিজ্ঞানকে বলা হয় সমাজ উন্নয়নের হাতিয়ার। কারণ সমাজবিজ্ঞান সামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়নের বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে আলোচনা করে। আবার এ পরিকল্পনা কীভাবে সফল করা যায় তার আলোচনাও এ বিজ্ঞান করে থাকে।
সমাজবিজ্ঞান মানবসমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুসন্ধান পরিচালনা করে এবং এ অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে সমাজের বা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এ উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সাধিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধিরোধে সাধারণত পরিবার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে এ পরিকল্পনাকে কার্যকর করা যাবে না। এ ধরনের পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য কতকগুলো বিষয় বিবেচনায় আনার প্রয়োজন হয়। যেমন- সনাতন মূল্যবোধ, বিভিন্ন সংস্কারমূলক ধারণা, পরিবার গঠন, প্রচলিত প্রথা প্রভৃতি। আর এর জন্য প্রয়োজন হয় সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান। সুতরাং উপরের আলোচনা বিশ্লেষণ করে বলা যায়, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমাজবিজ্ঞানের ভূমিকা ব্যাপক। সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
Related Question
View Allচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সমাজবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে সমাজের মানুষের অবদান ও অধিকার সম্পর্কে জানা যায়। শুধু সামাজিক অধিকারই নয়, সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কেও সমাজবিজ্ঞান আমাদের জ্ঞান দান করে। আর সে কারণেই বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন জনসংখ্যা সমস্যা, নিরক্ষরতা, অপরাধ ইত্যাদি মোকাবিলায় সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য। বস্তুত সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করা ও সমাধানের দিক নির্দেশনা দেওয়া আমাদের সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এসব কর্তব্য পালনের জন্য অর্থাৎ সমাজ সংস্কারের জন্য সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন।
উদ্দীপকে বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারার পরিচয় ফুটে উঠেছে। কেননা ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান পাঠ শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞান নামে একটি নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উক্ত বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞান চর্চা শুরু হয়। এছাড়া বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের জনক এ কে নাজমুল করিম ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন যা উদ্দীপকে বর্ণিত 'ক' দেশের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
উত্ত দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা একটিমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে- বক্তব্যটি আমি সমর্থন করি না। এর সপক্ষের যুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন শুরু হলেও পরবর্তীতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এটি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৪ সালের ২৪ আগস্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন শুরু হয়। ১৯৭০ সালে এখানে সম্মান কোর্স চালু হয়। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭০ সালে সমাজতত্ত্ব নামক আলাদা একটি বিভাগের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে সিলেটে অবস্থিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়। এর পরবর্তী দশকে ২০০২ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া ২০১২ সাল থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কিছু কলেজে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর স্তরে সমাজবিজ্ঞান পড়ানো হচ্ছে।
সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এ বিষয়ে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও অবদান রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞান মানবতাবাদী বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃত।
পঠন পরিসর ও উদ্দেশ্যের কারণে সমাজবিজ্ঞানকে মানবতাবাদী প্রায়োগিক বিজ্ঞান বলা হয়।
সামাজিক প্রয়োজন ও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার আলোকেই সমাজবিজ্ঞানের বিকাশধারা প্রবাহিত হয়। উদাহরণস্বরূপ পরিবারের কথা বলা যায়, পরিবার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- একক পরিবার, যৌথ পরিবার, পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, মাতৃতান্ত্রিক পরিবার ইত্যাদি। সমাজবিজ্ঞান সবধরনের পরিবারকেই স্বীকৃতি দেয়। আর এ কারণেই সমাজবিজ্ঞান মানবতাবাদী প্রায়োগিক বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!