খাদ্য নিরাপত্তা এমন এক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে দেশের সব মানুষ সবসময় বাহ্যিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে তাদের প্রয়োজন মতো খাদ্য সংগ্রহের ক্ষমতা রাখে।
খাদ্য মানুষের জীবন-মৃত্যুর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, তাই তা নিরাপদ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ খাদ্য মানুষকে সুস্থ-সবল ও কর্মক্ষম রাখে এবং আয়ুষ্কাল বাড়ায়। এর বিপরীতে কলুষিত খাদ্য মানুষকে রোগাক্রান্ত, দুর্বল, অক্ষমরূপে বেড়ে উঠতে বাধ্য করে, তার আয়ুষ্কাল কমায় এমনকি মানুষের মৃত্যুও ঘটায়। একারণে মানুষের জীবনে নিরাপদ খাদ্যের প্রয়োজন অনেক বেশি।
উদ্দীপকে উল্লিখিত রফিকুল মিয়ার কার্যক্রমটি হচ্ছে খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ। উক্ত কার্যক্রমটি নিরাপদ খাদ্যের কার্যক্রমকে যেভাবে ধ্বংস করছে তা হলো-
বর্তমানে ভেজাল খাদ্য এক মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ভেজাল খাদ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্যাদিগুলো হচ্ছে ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন, কাপড়ের রং, কীটনাশক ইত্যাদি। ফল কৃত্রিম উপায়ে পাকাতে ব্যাপকভাবে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কপার সালফেট, কার্বনের ধোঁয়া, পটাশের লিকুইড সলিউশন, কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধি নিয়ামকসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ এবং ফল তাজা ও সতেজ রাখতে ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে। মাছে ফরমালিন, শাক-সবজিতে কীটনাশক ও ফরমালিন, শুঁটকিতে ডিডিটি ব্যবহার করা হচ্ছে। মিষ্টিতে কাপড়ের রং, আলকাতরা এবং কৃত্রিম মিষ্টিদায়ক প্রয়োগ করা হয়। এমনকি মুড়ি ও চিড়াতেও হাইড্রোজ, ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়।
এসব ভেজাল খাদ্য খেয়ে জনসাধারণ পেটের নানা রকম পীড়ায় ভোগে, শরীর দুর্বল ও কৃশ হয়ে যায়, স্মরণ শক্তি হ্রাস পায়, শারীরিক ওজন অত্যাধিক কমা বা বাড়া, চুল পড়া, মানসিক অবসাদ, অতিরিক্ত ক্লান্তি, জন্ডিস এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। ভেজাল খাদ্য গ্রহণে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মৃত্যুও ঘটে। উদ্দীপকে মাছ ব্যবসায়ী শফিকুল মিয়া মাছ দীর্ঘদিন ভালো রাখতে এবং পচনের হাত থেকে রক্ষা করতে এক ধরনের কেমিকেল ব্যবহার করেন যা খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ নির্দেশ করে এবং নিরাপদ খাদ্যকে বিষে পরিণত করে।
অতএব বলা যায়, ভেজাল খাদ্য নিরাপদ খাদ্য কার্যক্রমকে যেমন ধ্বংস করে তেমনিভাবে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও কর্মক্ষম জনশক্তি সৃষ্টির পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
উদ্দীপকের সমস্যার আলোকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সরকারের যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি তা নিচে উল্লেখ করা হলো-
খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কোনো পর্যায়েই যাতে তা কলুষিত না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ।
কোনো খাদ্যদ্রব্যের উন্নতমানের সাথে তার নিম্নমানের সংমিশ্রণ রোধ করা।
কোনো খাদ্যদ্রব্য মান অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হলে একেক শ্রেণির খাদ্য একেক জায়গা থেকে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
খাদ্যশস্য মাড়াই ও সংরক্ষণের সময় তাতে ধুলা-বালি, পাথরকুঁচি ইত্যাদি, যাতে মিশ্রিত না হয় সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে।
খাদ্যশস্য, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনে ন্যূনতম কীটনাশক ব্যবহার।
কেবল সরকার বা পৌরসভা কর্তৃক অনুমোদিত ও লাইসেন্সধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন বা বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা।
ভেজাল খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের জন্য কঠোর দণ্ডদানের ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে।
মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদারকরণ এবং কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ।
প্রচারণার মাধ্যমে ভেজাল খাদ্যের কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।
কোনো প্রকার বৈষম্য বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ।
টিসিবির মাধ্যমে শুধু লাইসেন্সধারীদের নিকট ফরমালিন বিক্রি করা।
পরিশেষে বলা যায়, সরকার উল্লিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ, সচেতনতা ও সাবধানতা বৃদ্ধি এবং 'নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩' এর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পারে
Related Question
View Allযা ভোক্তার নিকট ক্ষতিকর হবে না এবং যা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত হবে ভোগের জন্য তা-ই নিরাপদ খাদ্য।
কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট সময়ে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যের প্রাপ্তিকেই খাদ্যের প্রাপ্যতা বলা হয়। পর্যাপ্ত উৎপাদন এবং নির্দিষ্ট স্থানে পর্যাপ্ত খাদ্যের যোগান খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পর্যাপ্ত খাদ্যের সরবরাহ নির্ভর করে সরকারি ও বেসরকারি খাদ্যশস্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উপর। কিছু কিছু জায়গায় পদ্ধতিগত দুর্বলতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা ও প্রয়োজনীয় খাদ্যে সরকারি সহযোগিতার অভাবে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাধাগ্রস্ত হয়।
উদ্দীপকে খাদ্যে ভেজালের কথা বলা হয়েছে। উক্ত বিষয়টি প্রতিরোধে সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-
⇨ সরকার ভেজালবিরোধী আইনের মাধ্যমে সকল পর্যায়ে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়ের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গকে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে সংসদে ভেজালবিরোধী আইন পাশ করার পাশাপাশি ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে।
⇨ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ভেজালে সহায়তাকারী বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
⇨ ভেজাল প্রতিরোধে সরকার জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করছে।
অতএব বলা যায়, সরকারের সদিচ্ছা এবং আইনের কার্যকরী প্রয়োগ দ্রুত দেশের ভেজাল প্রতিরোধ করতে পারে।
উদ্দীপকের শেষ উক্তিটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নিচে আমার মতামত উপস্থাপন করা হলো-
উন্নত বিশ্ব খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে কোনোরকম ছাড় দিতে নারাজ, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তারা নিরাপদ খাদ্য পেতে চায়। নিরাপদ খাদ্য পেতে তারা খরচের কথা চিন্তা করে না। ফলে তাদের খাদ্যের সরবরাহ ভালো। তাদের খাদ্য ক্রয়-বিক্রয়ও অনেক ভালো।
কিন্তু বাংলাদেশে ঠিক এর ব্যতিক্রম অবস্থা। বাংলাদেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি হলেও এই খাদ্য সরবরাহ করার পরও মানুষ প্রচুর অপচয় করে। এই অপচয় রোধে বিক্রেতারা খাদ্যে পচনশীলতা দূর করতে ফরমালিনের মতো বিষও প্রয়োগ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি সব খাদ্যে পচনশীলতা দূর করতে ফরমালিন প্রয়োগ করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। খাদ্যের এই ভেজাল দিন দিন মনে হয় আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আশু প্রতিক্রিয়া তেমন দেখা যাচ্ছে না। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের শেষ উক্তিটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।
খাদ্য নিরাপত্তা হলো নির্ভরশীল স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের পর্যাপ্ত যোগান যা ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বিদ্যমান থাকে।
কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী কর্তৃক শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রাপ্তির লক্ষ্যে নির্দিষ্ট খাদ্যদ্রব্য গ্রহণকেই খাদ্যের ব্যবহার বলে।
শরীরে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে যে সব খাদ্য গ্রহণ করা হয়, তার আত্তীকরণের উপর নির্ভর করে খাদ্যের ব্যবহার। খাদ্যভোগের ধরন, পুষ্টিমান, স্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক উপাদান; যেমন- খাদ্যে প্রাপ্যতা খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা এবং তার ব্যবহারের উপর নির্ভর করে। দারিদ্র্য, লিঙ্গ, বয়স, কাঠামো ও সামর্থ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি চর্চা খাদ্যভোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!