শ্রেণিকরণের ভিত্তি হচ্ছে সংজ্ঞা, কিন্তু মতান্তরে লক্ষণ।
শ্রেণিকরণের মাধ্যমে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়। তবে অনেক সময় কয়েকটি শ্রেণির মধ্যে একই গুণ বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। এ অবস্থায় সেই শ্রেণিগুলোকে আবার গুণের মাত্রা অনুসারে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। আর এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ক্রমিক শ্রেণিকরণ।
জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে মানসিকভাবে সুবিন্যস্ত করার মাধ্যমে এগুলো সম্পর্কে সুশৃঙ্খল জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়াই হচ্ছে শ্রেণিকরণ। তবে জগতের এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে শ্রেণিকরণের প্রক্রিয়াটি প্রয়োগ করা যায় না। সেগুলো হলো-
১। পরমতম জাতির শ্রেণিকরণ করা যায় না।
২। প্রান্তস্থিত বস্তুর ক্ষেত্রে শ্রেণিকরণ প্রয়োগযোগ্য নয়।
৩। সংজ্ঞার অযোগ্য বিষয়ের ক্ষেত্রে শ্রেণিকরণের প্রক্রিয়াই প্রযোজ্য নয়।
৪। অনির্ধারণযোগ্য গুণসম্পন্ন বিষয় বা বস্তুর শ্রেণিকরণ করা যায় না।
৫। সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন বস্তুকে শ্রেণিবিন্যাস করা যায় না।
৬। নিয়ত পরিবর্তনশীল বস্তুর শ্রেণিবিন্যাস করা যায় না।
৭। অতুলনীয় বিষয়ের শ্রেণিকরণ করা যায় না।
মূলত জগতের সব ঘটনা ও বস্তু সম্পর্কে আমাদের সূক্ষ্ম ও অন্তর্নিহিত জ্ঞান থাকে না বলেই আমরা সেসব বিষয়কে শ্রেণিবিন্যাস করতে পারি না। এ ক্ষেত্রে আমরা শ্রেণিকরণের অযোগ্য এসব বিষয়কে অপনয়নের মাধ্যমে সঠিক বিষয়ের শ্রেণিকরণ করতে সমর্থ হই।
দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রেণিকরণকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আমরা জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে সুবিন্যস্ত করে এগুলো সম্পর্কে সুশৃঙ্খল জ্ঞান অর্জন করতে পারি। কারণ আমরা যখন কোনো বিষয়ের শ্রেণিকরণ করি, তখন সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য অনুসারে বিষয়বস্তুগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করি। আর তা করতে গিয়ে আমরা বিষয়বস্তুগুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত হই। কারণ কোনো বিষয়কে জানতে হলে তার সাথে অন্যান্য বিষয়ের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য লক্ষ করতে হয়। আর এভাবেই আমরা শ্রেণিকরণের মাধ্যমে বস্তুর সাথে বস্তুর, ঘটনার সাথে ঘটনার এবং শ্রেণির সাথে শ্রেণির সম্পর্ক নির্ণয়ের মাধ্যমে প্রকৃতি সম্বন্ধে সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করতে পারি। শ্রেণিকরণ আমাদের 'স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে থাকে।
প্রকৃতিতে অসংখ্য বস্তু ও ঘটনা রয়েছে, সেগুলোকে কোনো সুশৃঙ্খল পদ্ধতি ছাড়া স্মৃতিতে ধরে রাখা সব ক্ষেত্রে সম্ভম্ব হয় না। আর এই বস্তু বা ঘটনাগুলোকে যখন শ্রেণিকরণের মাধ্যমে সুবিন্যস্ত করা হয়, তখন এগুলো মনে রাখার বিষয়টি অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে। শ্রেণিকরণ আরোহ অনুমানের সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। বস্তুত আরোেহ অনুমানে আমরা কোনো শ্রেণির অন্তর্গত কয়েকটি দৃষ্টান্ত পর্যবেক্ষণ করে ওই শ্রেণির সব সদস্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সে ক্ষেত্রে আরোহের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে আমাদের সংশ্লিষ্ট শ্রেণিটি সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করতে হয়। আর শ্রেণিকরণের মাধ্যমেই আমরা এরূপ জ্ঞান পেয়ে থাকি।
অতএব বলা যায়, শ্রেণিকরণ কেবল আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধিরই সহায়ক নয়; বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও শ্রেণিকরণ আরও কিছু প্রায়োগিক সুবিধা দিয়ে থাকে।
Related Question
View Allবিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বিষয়বস্তুকে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে মানসিকভাবে একত্রিত করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে শ্রেণিকরণ।
শ্রেণিকরণের স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। যথা : (১) শ্রেণিকরণ এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া। (২) শ্রেণিকরণের ভিত্তি হলো সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য। (৩) শ্রেণিকরণ হলো শৃঙ্খলাবদ্ধকরণ বা সুবিন্যস্তকরণ। (৪) শ্রেণিকরণে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। (৫) শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যার সাথে জড়িত।
উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক রহমান সাহেব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাঁটতে এসে বিভিন্ন গাছপালা দেখেন। এর মধ্যে কিছু গাছে ফুল ফোটে, কিছু গাছে ফল ধরে, আবার কিছু গাছ ফুল-ফল ছাড়াই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এ বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছপালা দেখেই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, উদ্যানে দুই শ্রেণির উদ্ভিদ রয়েছে। যার কিছু সপুষ্পক উদ্ভিদ এবং কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদ। রহমান সাহেব তার ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই শ্রেণিকরণটি করেছেন।
সাধারণত ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গুরুত্বহীন ও বাহ্যিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করার মানসিক প্রক্রিয়াকে কৃত্রিম শ্রেণিকরণ বলে। বস্তুত কৃত্রিম শ্রেণিকরণে কোনোরূপ প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। এ জন্য একে অবৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ বলা হয়। মূলত ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক সুবিধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এরূপ শ্রেণিকরণের প্রধান কাজ।
সর্বোপরি সব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রহমান সাহেবের শ্রেণিকরণটি কৃত্রিম।
প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যকার পার্থক্যকে আমি যুক্তিসংগত বলে স্বীকার করি না। কারণ প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের পার্থক্যসমূহ গুণগত নয়, উদ্দেশ্যগত। এজন্য এদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো রেখা টানাও ঠিক নয়।
বস্তুত বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে এক অর্থে সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক, আবার অন্য অর্থে সব শ্রেণিকরণই কৃত্রিম। সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যায়, যেকোনো বিষয়ের শ্রেণিকরণ করতে গিয়ে প্রযোজ্য সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে আমরা আমাদের মনের উপর নির্ভরশীল বলে মনে করি। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো প্রকৃতিতেই বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ এসব সাদৃশ্য মনবহির্ভূত এবং এগুলো বহির্জগতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে বিরাজ করে। আমাদের মন কেবল সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে নির্বাচন করে সেগুলোর ভিত্তিতে জাগতিক বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলিকে শ্রেণিবদ্ধ করে মাত্র। অন্যদিকে সব শ্রেণিকরণকেই কৃত্রিম বলার কারণ হিসেবে বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট। অর্থাৎ মানুষই নিজেদের প্রযোজন অনুযায়ী প্রকৃতিতে বিদ্যমান বস্তু বা ঘটনাবলিকে নির্বাচন করে সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করে। কারণ প্রকৃতির এমন কোনো নিজস্ব শক্তি নেই, যার ফলে প্রকৃতির বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলি নিজে নিজেই শ্রেণিবদ্ধ হতে পারে। এককথায়, প্রকৃতিতে বস্তু বা ঘটনাবলি যেভাবে থাকার সেভাবেই থাকে। এমনকি মানুষও তাদেরকে বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে এনে পাশাপাশি শ্রেণিবদ্ধ করে না; বরং এগুলোকে মানুষ শ্রেণিবদ্ধ করে মনে মনে। কাজেই শ্রেণিকরণটি ঘটে মানুষের মনে মনে, বাস্তবে নয়। আর এদিক থেকেই বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট, সুতরাং তা কৃত্রিম।
তাই প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যে পার্থক্যকে আমি যথার্থ বলে মনে করি না।
শ্রেণিকরণের ভিত্তি হচ্ছে সংজ্ঞা, কিন্তু মতান্তরে লক্ষণ।
শ্রেণিকরণের মাধ্যমে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়। তবে অনেক সময় কয়েকটি শ্রেণির মধ্যে একই গুণ বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। এ অবস্থায় সেই শ্রেণিগুলোকে আবার গুণের মাত্রা অনুসারে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। আর এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ক্রমিক শ্রেণিকরণ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!