কিতাবুল হিন্দ' গ্রন্থের রচয়িতা আল বিরুনি।
ভৌগোলিক দিক থেকেও ভারতবর্ষ একটি বিচিত্র অঞ্চল। এর উত্তর, উত্তর পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব দিকে হিমালয় পর্বত, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বে ব্রহ্মদেশ (মিয়ানমার), পশ্চিমে পারস্য (ইরান) ও আরব সাগর। বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের বিস্তৃত অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত। ভারতবর্ষের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিন্ধ্যা পর্বত দেশটিকে দুটি অসমান ভাগে বিভক্ত করেছে। বিন্ধ্যা পর্বতের উত্তর অংশ 'আর্যাবর্ত' বা উত্তর ভারত এবং দক্ষিণাংশ 'দাক্ষিণাত্য' নামে পরিচিত।
উদ্দীপকের ঘটনাটি সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থার ধর্মীয় দিকটি তুলে ধরে।
জাতিভেদ প্রথা সনাতনপন্থি হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত একটি কু-প্রথা। মানুষ পরিচয়কে ছোট করে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য সৃষ্টি করাই এ প্রথার মূলকথা। এর ফলে অনেক মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতবর্ষে এ দিকটি প্রবল ছিল, যা উদ্দীপকেও পরিলক্ষিত হয়।
উদ্দীপকে বর্ণিত সুনীল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তথাকথিত ছোট জাতের বলে চাকরিতে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ ঘটনাটি হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথার এক বাস্তব দৃষ্টান্ত। মুসলমানদের সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতবর্ষে এ জাতিভেদ প্রথা আরও প্রকট ছিল। সে সময় পুরোহিত শ্রেণির অন্তর্গত ব্রাহ্মণেরা ছিল উচ্চ মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী। অথচ একই ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্য ও শূদ্ররা ছিল নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত। তাদের ধর্মীয় শাস্ত্র পাঠ ও শোনার অধিকারও ছিল না। পেশাগত ক্ষেত্রেও তাদের স্ব-স্ব পেশার বাইরে যাওয়ার অধিকার ছিল না। অর্থাৎ উদ্দীপকের সুনীল যেমন তার অধিকার ও প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত, তেমনি তৎকালীন সময়ে নীচু জাতের হিন্দুরাও বঞ্চিত ছিল। সুতরাং বলা যায়, সুনীলের পরিস্থিতি আমাদের সামনে তৎকালীন অধিকারবঞ্চিত হিন্দু সমাজের চিত্রই উপস্থাপন করে।
সুনীলের ভাগ্যোন্নয়নে সিন্ধু বিজয়ের ধর্মীয় ফলাফল থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ কার্যকর।
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ কিংবা ধন-সম্পদের ওপর ভিত্তি করে মানুষে মানুষে কৃত্রিম ভেদাভেদ করা ঠিক নয়। বরং সকল মানুষ সমান এমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করাই যুক্তিসংগত এবং বিবেকবান মানুষের কাম্য। এ সাম্যের জয়গান গেয়ে সিন্ধু বিজয়ের (৭১২ খ্রি.) পর ভারতবর্ষে ইসলামের বীজ রোপিত হয়েছিল। সিন্ধু বিজয়ের ধর্মীয় ফলাফল থেকে আমরা সাম্যের এ মহান শিক্ষাই পাই।
উদ্দীপকের সুনীলের ক্ষেত্রে যদি জাতিভেদ প্রথার নিষ্পেষণ না থেকে সাম্য বজায় থাকত তাহলে তিনি খুব সহজেই তার ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে পারতেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি অবহেলিত। অথচ ভারতবর্ষে সিন্ধু বিজয়ের ধর্মীয় ফলাফল থেকে আমরা ভেদাভেদহীন সমাজ গঠনের শিক্ষা পাই। এ শিক্ষা যদি সুনীলের নিয়োগকর্তারা ব্যস্তবজীবনে অনুসরণ করেন তাহলে সমাজে সহজেই সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। সিন্ধু বিজয়ের পর মুহাম্মদ বিন কাসিম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য কল্যাণকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তখন কারো বঞ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথার কুফল সিন্ধু বিজয়ের পর সবাই অনুধাবন করতে পেরেছিল। এ জন্য শান্তির ধর্ম ইসলামের সাম্য নীতিতে মানুষ আস্থা স্থাপন করেছিল। বর্তমান সময়ের আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে সব ধর্মের মানুষেরই এ শিক্ষায় উজ্জীবিত হওয়া উচিত।
উপর্যুক্ত আলোচনায় এটা প্রমাণিত যে, সুনীলের মতো মানুষদের প্রাপ্য সম্মান দিতে সিন্ধু বিজয়ের ধর্মীয় ফলাফলের সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
Related Question
View Allতরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ ১১৯২ সালে সংঘটিত হয়।
প্রাচীন হিন্দু সমাজে প্রচলিত স্বামীর শবদেহের সাথে জীবিত বিধবা স্ত্রীকে একই চিতায় দাহ করার রীতিই সতীদাহ প্রথা নামে পরিচিত।
মৃত স্বামীর প্রতি বিধবা স্ত্রীর চূড়ান্ত আনুগত্য প্রদর্শনের একটি আচার হিসেবে প্রাচীন সমাজে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সতীদাহ প্রথা মেনে চলত। তখন স্বামীর মৃত্যু হলে বিধবা স্ত্রী স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দিত। কিন্তু কালক্রমে এটি হিন্দু সমাজে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায় রূপ নেয়। এক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে সমাজপতিরা বিধবাদের মৃত স্বামীর সাথে সহমরণ বরণ করে নিতে বাধ্য করে। তারা জোর করে অনেক বিধবাদের মৃত স্বামীর সাথে পুড়িয়ে মারতে শুরু করে। হিন্দু সমাজের এ জঘন্য ও নিষ্ঠুর রীতিই সতীদাহ প্রথা নামে পরিচিত।
উদ্দীপকে বর্ণিত ঘটনার সাথে আমার পঠিত শাসক সুলতান মাহমুদের মিল রয়েছে।
যেকোনো দেশ, রাজ্য বা অঞ্চলকে সমৃদ্ধিশালী ও সুসজ্জিত করতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- এই অর্থের প্রয়োজনে অনেক শাসক বিভিন্ন রাজ্যে অভিযান চালিয়েছেন। উদ্দীপকের সুলতান সুলেমান এবং ইতিহাসখ্যাত সুলতান মাহমুদ উভয়ের মধ্যেই এ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
উদ্দীপকে বর্ণিত সুলতান সুলেমান নিজ রাজ্যকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী করার জন্য বিভিন্ন দেশে অভিযান প্রেরণ করেন। সেসব অভিযান থেকে প্রাপ্ত ধন-সম্পদ কাজে লাগিয়ে তিনি তার শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। তাছাড়া শিক্ষা বিস্তার ও দেশের উন্নয়নে তিনি ধন-সম্পদ ব্যয় করেন। বিখ্যাত সমরনেতা সুলতান মাহমুদও ধন-ঐশ্বর্যে ভরপুর ভারতবর্ষে বারবার আক্রমণ করে সুলতান সুলেমানের মতোই প্রচুর ধন-সম্পদ আহরণ করেছিলেন। তার উদ্দেশ্যও ছিল নিজের রাজ্যের উন্নয়ন ঘটানো। তাই তিনি ভারতবর্ষকে তার প্রয়োজনীয় অর্থভাণ্ডার মনে করে সেখানে ১৭ বার (১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) অভিযান প্রেরণ করেন এবং প্রতিবারই জয়লাভ করে প্রচুর সম্পদ হস্তগত করেন। তিনি আহরিত অর্থ-সম্পদ কাজে লাগিয়ে গজনি রাজ্যকে সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তুলেছিলেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি সুলতান সুলেমানের মতোই উদার ও আন্তরিক ছিলেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, উদ্দীপকের সুলতান সুলেমান ও গজনির শাসক সুলতান মাহমুদের মধ্যে সুস্পষ্ট সাদৃশ্য বিদ্যমান।
উত্ত শাসক তথ্য সুলতান মাহমুদ শুধু সেনানায়কই ছিলেন না, একটি রাজ্যের একজন প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন।
বিখ্যাত সমরনেতা সুলতান মাহমুদ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। শত্রুপক্ষের অধীন সকল রাজ্য জয় করে তাদের ক্ষমতার চূড়ান্ত বিলোপ সাধনই ছিল সুলতান মাহমুদের লক্ষ্য এবং তিনি তা অর্জনে সক্ষম হন। পাঞ্জাবে তার শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষুদ্র গজনি রাজ্যকে তিনি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।
ভারতীয় ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন, "সুলতান মাহমুদ ছিলেন বড় মাপের নৃপতি।" একটি পার্বত্য ক্ষুদ্র রাজ্যতে শুধু বাহুবলে বিশাল ও সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যে পরিণত করা অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচায়ক। তার পূর্বে এশিয়ার অন্য কোনো আরব বা তুর্কি শাসক হিরাত, কাবুল ও গজনির বাইরে অগ্রসর হতে পারেননি। তিনি যে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, তা বাগদাদের সমসাময়িক আব্বাসীয় খলিফার সাম্রাজ্য অপেক্ষা বিশাল ছিল বলে মনে করা হয়। মুসলিম শাসকদের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথে তিনিই প্রথম ভারতে অভিযান চালিয়েছিলেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মুসলিম রাজবংশ প্রতিষ্ঠায় কৃতিত্বের অধিকারী না হলেও তারই দেখানো পথে মুহাম্মদ ঘুরী এদেশে এসে মুসলিম শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, শুধু কৃতী সেনানায়ক নয়, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও সুলতান মাহমুদ খ্যাতি অর্জন করেন। অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা বলেই তিনি ক্ষুদ্র গজনিকে বিশাল সাম্রাজ্যে রূপায়িত করেছিলেন।
আরবদের সিন্ধু অভিযানের প্রাক্কালে সিন্ধু ও মুলতানের রাজা ছিলেন দাহির।
আরবদের সিন্ধু অভিযানের পূর্বে ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থা শোচনীয় ছিল।
প্রাক-মুসলিম ভারতীয় সমাজে সতীদাহ প্রথা ও বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল। তাছাড়া বিধবা বিবাহ প্রথার বিলোপ ঘটেছিল। তাই নারীরা সমাজে অবহেলিত হয়ে পড়েছিল। তারা সব ধরনের অধিকার বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে এ চিত্র নিম্ন শ্রেণির নারীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যেত। অভিজাত পরিবারের নারীরা শিক্ষাগ্রহণ ছাড়াও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!