ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক লিয়নেল চার্লস রবিন্সের (১৮৯৮- ১৯৮৪) মতে, অর্থনীতি হচ্ছে এমন একটি বিজ্ঞান যা অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য দুষ্প্রাপ্য উপকরণসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধনকারী কার্যাবলি আলোচনা করে।
একটি দ্রব্যের অতিরিক্ত একক উৎপাদন পাওয়ার জন্য অপর দ্রব্যের উৎপাদন যতটুকু ছেড়ে দিতে হয়, সেই ছেড়ে দেওয়ার পরিমাণই হলো সুযোগ ব্যয় (Opportunity Cost)।
সুযোগ ব্যয়কে দু'টি উৎপন্ন দ্রব্যের 'পারস্পরিক বিনিময়' বা 'ট্রেড অফ' (trade off) বলে। উদাহরণের সাহায্যে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি একটি মোটরগাড়ি ক্রয় করলেন, তার জন্য তাকে হয়তো পরবর্তী সর্বোত্তম পছন্দ হিসেবে ইউরোপ ভ্রমণ বাদ দিতে হলো। মোটরগাড়ি ক্রয়ের জন্য ত্যাগকৃত পছন্দই হলো সেই মোটরগাড়ি ক্রয়ের সুযোগ ব্যয়। অর্থাৎ একটি পছন্দ পূর্ণ করতে গিয়ে পরবর্তী সর্বোত্তম যে পছন্দটি ত্যাগ করতে হয়, সেই ত্যাগকৃত পছন্দ হলো সুযোগ ব্যয়।
আমাদের দেশ তথা বাংলাদেশে মিশ্র অর্থব্যবস্থা বিদ্যমান।
যে অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানা ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রণ বিরাজ করে তাকে মিশ্র অর্থব্যবস্থা বলে। এ অর্থব্যবস্থায় উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অধিকাংশ অর্থনৈতিক কার্যাবলি ব্যক্তি উদ্যোগে সংগঠিত ও পরিচালিত হলেও সরকার এ সকল ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এ অর্থব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় দাম প্রক্রিয়া (Automatic Price Mechanism) দ্বারা উৎপাদন ও ভোগ নির্ধারিত হয়। তবে এই দাম প্রক্রিয়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি বিধি-নিষেধ দ্বারাও আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। উদ্দীপকের শিপন বাজারে চিনি কিনতে গিয়ে দেখলেন চিনির অনেক দামা পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন ক্রেতা বলল, রাস্তার ওপারে এই চিনি সরকারি বিক্রয় কেন্দ্রে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। যেহেতু বাজারে স্বয়ংক্রিয় দামব্যবস্থার মাধ্যমে চিনির মূল্য নির্ধারিত হয়, তাই চিনির বাজারমূল্য বেশি। এজন্য সরকার ক্রেতার স্বার্থের কথা চিন্তা করে নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে ন্যায্যমূল্য চিনি বিক্রি করছে। এ আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, চিনির বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার বেসরকারি উদ্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কাজেই বলা যায়, শিপনের দেশের মতো আমাদের দেশেও মিশ্র অর্থব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে।
উদ্দীপকে মিশ্র অর্থব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। আর এই অর্থব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক।
মিশ্র অর্থব্যবস্থায় উৎপাদনব্যবস্থা, বিনিয়োগ, সম্পদের মালিকানা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের উপস্থিতি স্বীকৃত। এ অর্থব্যবস্থায় ভোক্তার পছন্দকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাজারে ভোক্তার পছন্দ অনুযায়ী দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদিত হয় এবং তারা পছন্দ অনুযায়ী দ্রব্য ক্রয় ও ভোগ করতে পারে। এ অর্থব্যবস্থায় সরকার জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। যেমন- কাজের বিনিময়ে খাদ্য, বেকার ও বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, নারী ও শিশু সুরক্ষা তহবিল, পেনশন, গ্র্যাচুইটি প্রভৃতি প্রদান করে। তাই বেসরকারিভাবে পরিচালিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যাবলির পাশাপাশি সরকারের এসব সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করে। মিশ্র অর্থব্যবস্থায় বণ্টন ক্ষেত্রেও উভয় (সরকারি ও বেসরকারি) খাতের কর্তৃত্ব লক্ষ করা যায়। এখানে বেসরকারি উদ্যোগে যে বণ্টনব্যবস্থা পরিচালিত হয় তা মুনাফাকে কেন্দ্র করেই গ্রহণ করা হয়। আবার সরকারি উদ্যোগে যে বণ্টনব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তার লক্ষ্য থাকে আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা মজবুত করা, শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান সংরক্ষণ, দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি তথা টেকসই সামাজিক উন্নয়ন যেন সাধিত হয়। বিশুদ্ধ সমাজতন্ত্র বা ধনতন্ত্র কোনোটিই সমাজের উন্নয়নের জন্য এককভাবে যথেষ্ট নয়। তাই বলা যায়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন তথা একটি দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য মিশ্র অর্থব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
Related Question
View Allভূমিবাদীদের (Physiocracy) মতে, কৃষিই (খনি ও মৎস্য ক্ষেত্রসহ) হলো অন্যতম বা প্রধান উৎপাদনশীল খাত।
দুষ্প্রাপ্যতা বলতে অসীম অভাবের তুলনায় সম্পদের সীমাবদ্ধতাকে বোঝায়।
মানুষ তার অভাব পূরণ করার জন্য যে পরিমাণ দ্রব্য ও সেবা ভোগ করতে চায় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। অর্থাৎ মানবজীবনের অসংখ্য অভাবের তুলনায় উৎপাদনের উপকরণ তথা প্রাপ্ত সম্পদের স্বল্পতাকে অর্থনীতিতে দুষ্প্রাপ্যতা বলে। উদাহরণ- সাকিবের কাছে এক হাজার টাকা আছে। তার শার্ট, প্যান্ট এবং ভালো জুতা দরকার। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তার টাকার পরিমাণ কম। এটি সম্পদের 'দুষ্প্রাপ্যতাকে' নির্দেশ করছে।
সুমি যে দেশে বাস করে সেখানে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা বিদ্যমান।
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় সমাজের অধিকাংশ সম্পদ ও উৎপাদনের উপাদানের ওপর রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত। সেখানে প্রায় সব শিল্প- কারখানা ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের মালিক সরকার এবং সেগুলো সরকারি বা সামাজিক নির্দেশে পরিচালিত হয়ে থাকে। তাছাড়া সমাজতন্ত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত দামে দ্রব্যাদি ভোগ করে থাকে। কোনো ভোক্তা চাইলেই নিজের খুশিমতো অর্থ ব্যয় করে কোনো কিছু ভোগ করতে পারে না। এ অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফা নেই বললেই চলে, কারণ সকল অর্থনৈতিক কার্যাবলি জনগণের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য পরিচালিত হয়। উদ্দীপকের সুমি যে দেশে বাস করে সেখানে জমি, কলকারখানা ও খনি প্রভৃতি প্রায় সকল কিছুর মালিকানা থাকে সরকার বা রাষ্ট্রের হাতে। সেখানে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়া (কোন দ্রব্য, কী পরিমাণে, কীভাবে এবং কাদের জন্য উৎপাদিত হবে) সম্পর্কে মৌলিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সুমির দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রচলিত।
সুমির দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রচলিত। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার সাথে মিশ্র অর্থব্যবস্থার কিছু পার্থক্য রয়েছে।
যে অর্থব্যবস্থায় সমাজের অধিকাংশ সম্পদ ও উৎপাদনের উপকরণের। ওপর রাষ্ট্রীয় বা সরকারি মালিকানা থাকে তাকে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা বলে। পক্ষান্তরে, যে অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানা ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রণ বিরাজ করে তাকে মিশ্র অর্থব্যবস্থা বলা হয়। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোক্তার স্বাধীনতা থাকে না। অপরদিকে মিশ্র অর্থব্যবস্থায় প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ভোক্তা অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে। উদ্দীপকের সুমি যে দেশে বাস করে সেখানে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা বিদ্যমান। কারণ সেখানে দাম-সংক্রান্ত সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত। সেখানে কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সকল অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালিত হয়। অপরদিকে মিশ্র অর্থব্যবস্থায় চাহিদা- যোগানের স্বয়ংক্রিয় ঘাত-প্রতিঘাতের দ্বারা দাম নির্ধারিত হয়। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় কোন কোন দ্রব্য, কী পরিমাণে ও কীভাবে উৎপাদিত হবে এবং কীভাবে বণ্টন করা হবে- এসব পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাই সেখানে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের কোনো সুযোগ থাকে না। অন্যদিকে, মিশ্র অর্থব্যবস্থায় ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা হয়, তাই সেখানে ধনতন্ত্রের মতো সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ও মুনাফা অর্জনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। সেই সাথে বেসরকারি পর্যায়ে - অর্থনৈতিক কার্যাবলির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণও বজায় থাকে।
কাজেই বলা যায়, সুমির দেশের অর্থব্যবস্থা তথা সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার সাথে মিশ্র অর্থব্যবস্থার অনেক পার্থক্য রয়েছে।
ইংল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের প্রদত্ত অর্থনীতির সংজ্ঞাটি হলো- "অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান, যা জাতিসমূহের সম্পদের ধরন ও কারণ সম্পর্কে অনুসন্ধান করে।"
অর্থনীতির ভাষায় শ্রমিকদেরকে কাজে উৎসাহিত করার জন্য গৃহীত বিভিন্ন ব্যবস্থাই হলো প্রণোদনা।
অর্থনীতিতে উৎসাহ বা প্রণোদনা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ প্রণোদনা পায় বলেই যে কোনো কাজ যত্নের সাথে সম্পন্ন করে। কাজের স্থায়িত্ব, শ্রমিকদেরকে লভ্যাংশ প্রদান, বিনামূল্যে পোশাক, চিকিৎসা, বাসস্থান, বেতনসহ ছুটি, বৃদ্ধ বয়সে পেনশন, কাজের ঝুঁকি হ্রাস ইত্যাদি প্রণোদনার কৌশল ব্যবহার করে শ্রমিকদেরকে অধিক উৎপাদনে উৎসাহিত করা যায়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!