ই. এম. হোয়াইট-এর মতে, পৌরনীতি হলো জ্ঞানের সেই মূল্যবান শাখা, যা নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবতার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
সমাজকে সভ্য জীবনযাপনের আদর্শ স্থান মনে করে বলে মানুষ সমাজে বাস করে।
সমাজ বলতে এমন একটি সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা কোনো অভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একত্র হয়। সমাজের মধ্যেই মানুষের মানবীয় গুণাবলি ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল যথার্থই বলেছেন, 'মানুষ স্বভাবগত সামাজিক জীব। যে সমাজে বাস করে না; সে হয় পশু, না হয় দেবতা'। বস্তুত সামাজিক পরিবেশেই মানুষ নিজেকে বিকশিত করে। এসব কারণেই মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজে বসবাস করে।
উদ্দীপকে যে পাঠ্যপুস্তকের কথা বলা হয়েছে তা হলো পৌরনীতি ও নাগরিকতা, যা নাগরিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, নবম শ্রেণির ছাত্রী শিমলার একটি পাঠ্যপুস্তকে নাগরিকের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অনেক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সে বইটি পড়ে সামাজিক মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা, সাম্য, সংবিধান ও রাষ্ট্র প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে। বিষয়টি অধ্যয়নের পর তার মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতাবোধ জেগে ওঠে। এ থেকে বোঝা যায়, শিমলার পঠিত বিষয়টি হলো পৌরনীতি ও নাগরিকতা। নাগরিক জীবনে বইটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সুনাগরিক হিসেবে আদর্শ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করতে হলে পৌরনীতি পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়টি পাঠের মাধ্যমে নাগরিকতার যাবতীয় দিক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায়। সুদূর অতীতে নাগরিক জীবনের সূত্রপাত, নাগরিকতার স্বরূপ, বর্তমান যুগে নাগরিকতার ধরন, নাগরিকতা অর্জনের পদ্ধতি এবং ভবিষ্যত নাগরিকের সম্ভাব্য আচরণ ও কার্যাবলি ইত্যাদি বিষয় পৌরনীতি পাঠের মাধ্যমে জানা যায়। পৌরনীতিই ব্যক্তিকে সুনাগরিকে পরিণত হওয়ার জন্য অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞানদান করে। একইসঙ্গে কর্তব্য পালনের মাধ্যমে অধিকার ভোগে সচেষ্ট হতে তাগিদ দেয়। এ সচেতনতার ফলে নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল হয়।
উদ্দীপকে উল্লেখিত তথ্যগুলো ও পাঠ্যপুস্তকের আলোকে নাগরিক জীবনে সচেতনতার তাৎপর্য অপরিসীম।
পৌরনীতি ও নাগরিকতা নাগরিককে অধিকার ও কর্তব্য, সরকারের ধরন ও কার্যাবলি, সুশাসন, স্থানীয় প্রশাসন প্রভৃতি সম্পর্কে সচেতন করে। এই সচেতনতার ফলে নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় অধিকার ভোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালনে উৎসাহিত হয়। নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল হয়।
গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ প্রভৃতি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কার্যকর করার ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সচেতনতা না থাকলে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা যেমন রাষ্ট্রপ্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মৌলিক অধিকার ভোগ করা থেকে বঞ্চিত হবো তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যও পালন করতে পারব না। নাগরিক সচেতনতা না থাকলে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, আইন মান্য করা, সঠিক সময়ে কর প্রদান করা, সন্তানদের শিক্ষিত করা, রাষ্ট্রের সেবা করা, সততার সাথে ভোটদান প্রভৃতি যথাযথভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হবে না। সর্বোপরি সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠা যাবে না। রাষ্ট্রের সব নাগরিক সুনাগরিক নয়। আমাদের মধ্যে যে বুদ্ধিমান, যে সকল সমস্যা অতি সহজে সমাধান করে, যার বিবেক আছে সে ন্যায়-অন্যায়, সৎ-অসৎ বুঝতে পারে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে, আর যে আত্মসংযমী সে বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে। এসব গুণসম্পন্ন নাগরিকদের বলা হয় সুনাগরিক, যা দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যক।
পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা, সাম্য, সংবিধান নাগরিক জীবনে যথাযথভাবে প্রয়োগের জন্য সচেতনতা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Related Question
View Allফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো (Jean Jacques Rousseau) রাষ্ট্র সৃষ্টির সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রবর্তক ছিলেন।
রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতা হলো সার্বভৌমত্ব।
রাষ্ট্র গঠনের চারটি মৌলিক উপাদানের (জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার, সার্বভৌমত্ব) মধ্যে সার্বভৌমত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সার্বভৌমত্ব শব্দটি ল্যাটিন 'Superanus' শব্দ থেকে উদ্ভব হয়েছে। যার ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Sovereignty'। এর অর্থ চরম ক্ষমতা। সার্বভৌম ক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা বিধান করা হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলেই রাষ্ট্র দেশের ভেতরে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারির মাধ্যমে সকল সংঘ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব আরোপ এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। আর বাহ্যিক ক্ষমতা বলে রাষ্ট্র সকল প্রকার বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত রাখে।
সার্বভৌম শক্তির ওপর রাষ্ট্রের স্থিতি নির্ভরশীল।
'ক' রাষ্ট্র কর্তৃক 'গ' রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়া রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি, প্রয়োগ মতবাদকে সমর্থন করে।
বল প্রয়োগ মতবাদের মূল বক্তব্য হলো- বল বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে এবং শক্তির জোরে রাষ্ট্র টিকে আছে। এ মতবাদে বলা হয়, সমাজের বলশালী ব্যক্তিরা যুদ্ধ-বিগ্রহ বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বলের ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র সৃষ্টি এবং শাসনকাজ পরিচালনা করে। স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম (David Hume), ইংরেজ আইনজীবী এডওয়ার্ড জেংকস (Edward Jenks) প্রমুখ বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের সমর্থক। এ সম্পর্কে এডওয়ার্ড জেংকস বলেন- 'ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, আধুনিক সকল রাষ্ট্রব্যবস্থা সার্থক রণকৌশলের ফলশ্রুতি'।
উদ্দীপকে দেখা যায়, 'ক' তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল রাষ্ট্র 'গ'-কে যুদ্ধে পরাজিত করে দখল করে নেয়, যা রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কাজেই বলা যায়, 'ক' রাষ্ট্র কর্তৃক 'গ' রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়া রাষ্ট্র সৃষ্টির বল বা শক্তি প্রয়োগ মতবাদকে সমর্থন করে।
'খ' শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদের প্রতিফলন ঘটেছে, যা রাষ্ট্র সৃষ্টির মতবাদগুলোর মধ্যে অধিক যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য।
ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদের মূল বক্তব্য হলো রাষ্ট্র কোনো একটি বিশেষ কারণে হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরে বিভিন্ন শক্তি ও উপাদান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। যেসব উপাদানের কার্যকারিতার ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে সেগুলো হলো- সংস্কৃতির বন্ধন, রক্তের বন্ধন, ধর্মের বন্ধন, যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা এবং কার্যকলাপ ইত্যাদি। রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মতবাদটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ড. গার্নার (Dr. James Wilford Garner) বলেন, 'রাষ্ট্র বিধাতার সৃষ্টি নয়, বল প্রয়োগের মাধ্যমেও সৃষ্টি হয়নি; বরং ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে'।
উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, 'খ' তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং এক সময় সবগুলো রাষ্ট্র মিলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করে। এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে 'খ' রাষ্ট্রের শক্তিশালী হওয়ার দিকটি ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদকে ইঙ্গিত করে।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য। আর এ মতবাদের মধ্যেই রাষ্ট্রের উৎপত্তির সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
পারিবারিক কাঠামো অনুযায়ী পরিবার দুই প্রকার। যথা- ১. একক ও ২. যৌথ পরিবার।
আত্মসংযমের শিক্ষা পরিবারের শিক্ষামূলক কাজ।
পরিবারকে সমাজজীবনের শাশ্বত বিদ্যালয় বলা হয়। পরিবারেই একটি শিশু বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়। মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের পারস্পরিক সহায়তায় সততা, শিষ্টাচার, উদারতা, আত্মসংযম, নিয়মানুবর্তিতা, বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদেরকে ভালোবাসা ইত্যাদি মানবিক গুণ শিক্ষা লাভের প্রথম সুযোগ ঘটে পরিবারে। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক নিজেকে সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে রেখে সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন, সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, রাষ্ট্রের আইন মান্য করা প্রভৃতি করতে পারে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!