'শিল্পকলা' সম্পর্কে সংক্ষেপে নিচে বর্ণনা করা হলো-
শিল্পকলার উদ্ভব হয়েছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে সেই আদিম মানুষের হাত ধরে। হোমোস্যাপিয়েন মানুষ তার চারপাশে যা দেখেছে তা-এই তার শিল্প মাধ্যমে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। হোমোস্যাপিয়েন 'কথাটার অর্থ হচ্ছে বুদ্ধিমান মানুষ। আজ থেকে প্রায় ৪০ ৫০ হাজার বছর আগে ইউরোপে এ নতুন শিকারী মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল। বিভিন্ন শিকারের দৃশ্য ও জীবজন্তুর ছবি তারা সবচেয়ে বেশি এঁকেছে। সেখান থেকেই শিল্পকলার সৃষ্টি। তবে এখন শিল্পকলা একটি বিস্তৃত বিষয়। মানুষের মনের সৃজনশীল কর্মকান্ডের সামগ্রিক রূপই হচ্ছে শিল্পকলা।
Related Question
View Allনান্দনিক শিল্প আসলে চারুশিল্পেরই অন্য নাম। চারুশিল্প আমাদের মনকে আনন্দ দেয়, দৃষ্টিকে আনন্দ দেয়। অর্থাৎ যে শিল্প আনন্দদায়ক ও দৃষ্টিনন্দন, যা আমাদের মনের খোরাক যোগায় তাকেই আমরা নান্দনিক শিল্প বলতে পারি। নন্দন শব্দ থেকে নান্দনিক শব্দের উৎপত্তি। স্বর্গের উদ্যানকে বলা হয় নন্দনকানন। নন্দন শব্দটি সুন্দর অর্থে ব্যবহৃত হয়।
শিল্পী যখন কোনোকিছু সৃষ্টি করেন তখন তাঁর সৃষ্টির সাথে মিশে থাকে শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, তাঁর বুচি, চিন্তা-চেতনা, শিল্পবোধ, তার পরিবেশ ও সমাজ ইত্যাদি নানা কিছু। শিল্পী তাঁর আবেগ, আনন্দ, দুঃখ, ক্ষোভ এসব অনুভূতিকেই শিল্পরূপ দেন। দুঃখ-বেদনা থেকেও শিল্পসৃষ্টি হতে পারে। তবে তাতে মিশে থাকে সৃষ্টির আনন্দ। দুঃখকে শিল্পে প্রকাশ করার আনন্দ। এসব শিল্পসৃষ্টির মূলে থাকে শিল্পীর নিজেকে প্রকাশ করার অদম্য ইচ্ছা। শিল্পী চান দর্শক তাঁর শিল্পকর্ম দেখে আনন্দ পাক, শিল্পীর চিন্তাভাবনার সাথে দর্শক নিজের চিন্তার মিল খুঁজে পাক অথবা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকের হৃদয়কে আলোড়িত করুক। দর্শক তাতে চিন্তার কিছু খোরাপ পাক। শিল্পী নিজেকে প্রকাশ করার জন্য যে কোনো মাধ্যম বেছে নিতে পারেন। সেটা হতে পারে চিত্রকলা, ভাস্কর্য বা অন্য কোনো মাধ্যম। চিত্রকলার মতো ভাস্কর্য, কাঠখোদাই বা রিলিফ ওয়ার্ক-এর মাধ্যমেও নান্দনিক শিল্প হতে পারে। শিল্পীর এসব শিল্প মানুষের মনের গভীরের অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে যায়।
নিচে লোকশিল্প ও কারুশিল্পের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলনা করা হলো-
| লোকশিল্প | লোকশিল্প |
| ১. লোকশিল্প মূলত কারুশিল্পের ধারাতে তৈরি শিল্পকর্ম। | ১. কারুশিল্প থেকেই মূলত লোকশিল্পের উৎপত্তি। |
| ২. হাঁড়ি-পাতিলে রং করে তাতে নকশা ২. বা ছবি এঁকে যখন একে শখের হাঁড়ি বলা-হয় তখন তা লোকশিল্প। | ২. মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলাস ইত্যাদি বানানো হলো কারুশিল্প। |
| ৩. শিল্পী ও সাধারণ মানুষ উভয়েই লোকশিল্পের সামগ্রী তৈরি করে। | ৩. মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলাস ইত্যাদি বানানো হলো কারুশিল্প। |
নান্দনিক শিল্প, লোকশিল্প ও কারুশিল্পের ব্যবহারিক ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
নান্দনিক শিল্প: নান্দনিক শিল্প আসলে চারুশিল্পেরই অপর নাম। এ ধরনের শিল্পের মধ্যে রয়েছে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, খোদাইশিল্প আলোচনা করা হলো-
(i) চিত্রকলা: আমাদের দেশে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারকার্যে সাইবোর্ড, ফেস্টুন ব্যানার ইত্যাদিতে নানা ধরনের চিত্রকলার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
(ii ) ভাস্কর্য: শিল্পী চান দর্শক তার শিল্পকর্ম দেখে আনন্দ পাক এবং তার চিন্তাভাবনার সাথে দর্শক নিজের চিন্তার মিল খুঁজে পাক। এ কারণে শিল্পী নিজেকে, প্রকাশ করার জন্য যেকোনো মাধ্যম বেছে নিতে পারেন। ভাস্কর্য তেমনি একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে কোনো অতীত ইতিহাস বা সম্মানী ব্যক্তির ভাস্কর্য তৈরি করে রেখে দেওয়া হয়। যেমন-অপরাজেয় বাংলা, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি
(iii) খোদাই শিল্প: কাঠের তৈরি খাট, পালং, দরজা, চেয়ার, টেবিল, আলমারি, মূর্তি, ড্রেসিং টেবিল ইত্যাদিতে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য খোদাই শিল্প ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
লোকশিল্প: মাটির হাঁড়ি, খেলনা পুতুল, কলসি, নকশি কাঁথা, পাটের শিকা ইত্যাদি শিল্পসামগ্রী লোকশিল্পের অন্তর্গত। এসব শিল্প সামগ্রীর গায়ে বিভিন্ন প্রকার নকশি, ফুল, পিঠা, লতা-পাতা ইত্যাদি অঙ্কন করা লোকশিল্পের ক্ষেত্রসমূহ।
আবার লোকশিল্পীদের আঁকা বিভিন্ন পট, সরা ইত্যাদি ছাড়াও নকশি পিঠা, নকশি পাখাসহ বহু লোকশিল্প আমাদের সংসকৃতিকে উজ্জ্বল করেছে।
কারুশিল্প: কারুকাজ করা নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীকে কারুশিল্প বলা হয়। এ ধরনের শিল্পের ব্যবহারিক ক্ষেত্রসমূহ হলো- বাঁশের তৈরি কুলা, ডালা, চালনি, বুকসেলফ, বেতের তৈরি চেয়ার, সোফাসেট, মোড়া, ধামা, দাঁড়িপাল্লা, কাঠের তৈরি খাট, পালঙ্ক, দরজা, ধাতুর তৈরি বিভিন্ন উপাদান যেমন- দা, কুড়াল, খন্তা, কাঁচি, যাঁতী, লাঙলের ফলা ইত্যাদি।
জীবনের প্রয়োজনে মানুষ যা সৃষ্টি করে তার প্রাথমিক রূপটি হয় খুব সরল। যেমন- আমরা যদি আদিমকালের বিভিন্ন হাতিয়ার বা বাসনপত্রের ছবি দেখি, দেখা যাবে সেগুলো খুব সহজ ও সরলভাবে তৈরি। কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজনের কারণেই সেটা তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে সৌন্দর্যবোধ ও বুচিবোধের প্রয়োজনে সে সকল হাতিয়ার বা বাসনপত্রই মানুষ অনেক সুন্দর ও মনোমুগ্ধকরভাবে তৈরি করে তাকে শিল্পরূপ দিয়েছে। মানুষ তার জীবনযাপনকে সুন্দর করার জন্য, সুখে ও আনন্দে বসবাস করার জন্য শিল্পকর্মকে নানাভাবে ব্যবহার করে। গ্রামের সাধারণ গরিব কৃষক বা শ্রমিকও তাঁর কুঁড়েঘরটি বাঁশ, খড় ও ছন দিয়ে যথাসম্ভব সুন্দর করে তৈরি করার চেষ্টা করে। দরজা, জানালায় বাঁশ ও বেতের বাঁধন দিয়ে নানারকম নকশা করার চেষ্টা করে। এর কারণ সব মানুষের মনেই সৌন্দর্যবোধ থাকে। আর সে তার জীবনযাপনে ঐ সৌন্দর্যবোধের প্রয়োগ করতে চায়। আবার গাঁয়ে যারা অর্থশালী, তাদের বাড়িঘর পরিপাটি করে সাজানো থাকে। কাঠের দরজা, জানালায় থাকে কাঠ খোদাই করা, উঁচু উঁচু হয়ে থাকা নানারকম নকশা, ফুল, পাখি ও লাতপাতার ছবি। তাদের বাড়িতে ব্যবহৃত খাট, পালং, চেয়ার, টেবিল, নানারকম আসবাবপত্র, বেত ও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীতে নানারকম কারুকাজ করে সেগুলোকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা হয়। শহরের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তরাও কারুশিল্পকে নানাভাবে ব্যবহার করেন তাঁদের জীবনযাপনে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীর প্রায় সবই কারুশিল্পের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আমাদের সবার জীবনের জন্য কারুকলার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
'অপরাজেয় বাংলা' মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, যুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণসহ মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতিকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রকাশ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে 'অপরাজেয় বাংলা' ভাস্কর্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে স্থাপন করা হয়েছে। এটি তৈরি করেছেন ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। 'অপরাজেয় বাংলা' যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক ও প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
শিল্পকলা বলতে বোঝায় মানুষের সৃজনশীলতার এমন একরূপ, যা আবেগ, চিন্তা এবং কল্পনাকে সুনিপুণভাবে প্রকাশ করে। অর্থাৎ মানুষের মনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক রূপ হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পী তার কল্পনা ও প্রতিভার সাথে, দক্ষতা ও রুচির সমন্বয়ে শিল্প সৃষ্টি করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!