শীতের সকাল
সূচনা: ষড়ঋতুর প্রত্যেক ঋতু তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। শীতের সকালের আবির্ভাব কুয়াশাচ্ছন্ন অনন্যসাধারণ রূপ নিয়ে। বাংলাদেশের ঋতুচক্রে পৌষ ও মাঘ এ দুই মাস শীতকাল। প্রকৃতির সর্বত্রই এসময় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। শীতের সকালে জীবনের চাঞ্চল্য ম্লান হয়ে আসে। সকলেই রৌদ্রের প্রত্যাশায় থাকে। কিন্তু পূর্বদিকে তখনও আলোর সুষমা পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায় আলো ঝলমল একটি সুন্দর সকাল।
সূর্যোদয়ের পূর্বের শীতের সকাল: লেপের তলা থেকে উঠি উঠি করেও উঠতে ইচ্ছা হয় না। গরম বিছানার আরামদায়ক উত্তাপ ছেড়ে উঠতে গেলে সীমাহীন আলস্য সমস্ত চেতনাকে ঘিরে ধরে। কর্মের আহ্বান সত্ত্বেও মানুষ আরামের শয্যায় পড়ে থাকে।
শীতের সকালের রূপ: কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি শিশিরসিক্ত রাস্তা-ঘাট, হিমেল বাতাসের মিষ্টিমধুর আমেজ ইত্যাদি সব মিলিয়ে শীতের সকালের এক ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয় যা অন্য কোনো ঋতুর সকালের মতো নয়। পত্র-পল্লবহীন গাছপালাকে অলংকার শূন্য বিধবা বলে মনে হয়। পূর্বদিকে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে থাকে। উত্তরদিক থেকে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায়। টুপ টুপ করে শিশির ঝরে। বনের পথ শিশির সিক্ত হয়ে ওঠে। টিনের চালে এবং ঘাসে ঘাসে শিশিরের বিন্দু জমে ভোরের আলোয় ঝলমল করতে থাকে। গ্রামে কোথাও খেজুর রস জ্বাল দেওয়া হয়। বাতাসে তার লোভনীয় মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে। গ্রামে কৃষকরা বলদ হাঁকিয়ে মাঠের দিকে যাত্রা করে। দূরে কোনো মাদ্রাসায় ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা সুর উঁচিয়ে কোরআন তেলাওয়াত করে।
শীতের সকালের বৈরাগ্য মূর্তি: ততক্ষণে বাইরের পৃথিবীর ঘুম ভেঙেছে। দিকে দিকে কর্মের মুখরতায় শীতের সকাল কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছে। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের রথ আকাশ পরিক্রমায় বের হয়ে পড়েছে। একটি নীলকণ্ঠ পাখি রিক্তপত্র বাবলার ডালে বসে রোদ পোহাচ্ছে। শীতের সকাল যেন এক প্রৌঢ়া কুলবধূ। তার মুখখানি দিগন্তবিস্তৃত কুয়াশার অবগুষ্ঠনে ঢাকা।
ত্যাগের মূর্তি: শীতের সকালের হাতে যেন বৈরাগিনীর একতারা। সে তার একতারার নিঃসঙ্গ তারে আঘাত হানে নির্মমভাবে। তার সুরে বনের শুষ্ক বিবর্ণ পাতাগুলো একে একে ঝরে পড়ে।
রূপ-বদল: ধীরে ধীরে বেলা বাড়তে থাকে। শীতের সূর্য পূর্ব দিগন্তের কুয়াশার জাল ছিন্ন-ভিন্ন করে এক গভীর আলস্যে ওপরে উঠতে থাকে। সোনালি রোদে চারদিক ভেসে যায়। সেই রোদের স্পর্শ শীতের সকালে যেন এক বিন্দু শিশিরের মতো টলমল করে কাঁপতে থাকে।
শহরের শীতের সকাল: শহরে শীতের সকালগুলো ভিন্নরূপে আবির্ভূত হয়। ভোরে কাকের ডাকে শহরের শীতের সকালের ঘুম ভাঙে। সেখানেও শিশির পড়ে, কিন্তু তাতে সবুজ ঘাসের করুণ গভীর ঘ্রাণ মিশে থাকে না। সেখানেও উত্তরের শীতল হাওয়া বয়ে আসে, কিন্তু তাতে খেজুরের রস কিংবা পাকা ধানের ম-ম গন্ধ হৃদয়কে আন্দোলিত করে না। শহরের শীতের সকাল কেবল কাকের ডাক, কলের পানির শব্দ, কেরোসিন- কয়লার গন্ধ ও বাস-ট্রাকের ঝনঝনানি নিয়ে আসে।
উপসংহার: শহরের ইট-কাঠ-পাথরের নিদারুণ চাপে শীতের সকাল তার নিজস্ব মূর্তিতে প্রকাশিত হতে পারে না। এখানে কুয়াশার সেই স্নিগ্ধ জৌলুস নেই। তবে শহরের রাজপথে শীতের রূপ ম্লান হলেও গরম চা ও পরোটার গন্ধে তাকে সংগোপনে আত্মপ্রকাশ করতে দেখা যায়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!