হিসাবচক্রের ৪র্থ ধাপে খতিয়ানে লেনদেনসমূহকে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণির হিসাব যেমন- সম্পদ, দায়, মালিকানাস্বত্ব, আয়, ব্যয় ও লাভ ক্ষতির হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। এসব হিসাবকে খতিয়ান বলা হয়। জাবেদা হতে লেনদেনগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করে খতিয়ানে স্থানান্তর করা হয়।
হিসাবরক্ষণের যে প্রধান বইতে একটি কারবারের অথবা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনগুলোকে শ্রেণিবিন্যাস করে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে সংক্ষেপে স্থায়িভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় তাকে খতিয়ান বা লেজার বলে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণির হিসাব যেমন- সম্পদ, দায়, মালিকানাস্বত্ব, আয়, ব্যয় ও লাভ-ক্ষতির হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। এসব হিসাবসমূহকে এককথায় খতিয়ান বলা হয়।
খতিয়ানের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো-
i. খতিয়ানে প্রতিটি হিসাবের শিরোনাম প্রদান করা হয়।
ii. খতিয়ানে প্রতিটি হিসাবের পৃথক জের বা উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয়।
খতিয়ানের দুটি সুবিধা হলো-
i . খতিয়ানের মাধ্যমে হিসাবের ভুলত্রুটি' সহজে ধরা পড়ে এবং সংশোধন করা সম্ভব হয়।
ii. খতিয়ান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাপ্তির মাধ্যমে ব্যবসায়ের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
ডেবিট ও ক্রেডিট খতিয়ানে লিপিবদ্ধকৃত প্রতিটি লেনদেনের দুটি পক্ষ। ডেবিট সাধারণত সম্পদ বৃদ্ধি বা ব্যয় নির্দেশ করে, আর ক্রেডিট দায় বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধি বা মালিকানাস্বত্ব বৃদ্ধি নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, নগদান খতিয়ানে টাকা জমা দিলে ডেবিট দিকে দেখানো হয়। অপরদিকে, টাকা উত্তোলন করা হলে তা ক্রেডিট দিকে দেখানো হয়। ডেবিট ও ক্রেডিট দিকের পার্থক্য নির্ণয়ের মাধ্যমে খতিয়ানে হিসাবের জের নির্ণয় করা হয়।
খতিয়ান ২ প্রকার। যথা-
(১) সাধারণ খতিয়ান হিসাব এই খতিয়ান হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। যেমন- ক্রয় হিসাব, মূলধন হিসাব, দেনাদার হিসাব ইত্যাদি। লেনদেনের শ্রেণিবদ্ধকরণ করে প্রতিটি
(২) সহকারী খতিয়ান সাধারণ খতিয়ানের বাইরে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি দেনাদার ও পাওনাদারের জন্য স্বতন্ত্রভাবে সহকারী খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। যেমন- দেনাদার হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। সেলিম হিসাব, মনির হিসাব ইত্যাদি।
লেনদেনসমূহ সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে লিখে রাখা হয় বিধায় হিসাব তথ্য ব্যবহারকারিগণ সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য খতিয়ান হতে পেতে পারে। খতিয়ান হতে ব্যবসায়ের আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় ও মালিকানাস্বত্বের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সম্ভব। রেওয়ামিল প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্বৃত্ত খতিয়ান হতে সংগ্রহ করা হয় এবং এর মাধ্যমে হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করা হয়। এসব কারণেই খতিয়ানকে হিসাবের সকল বইয়ের রাজা বলা হয়।
খতিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের সঠিক ও নির্ভুল হিসাব রাখার জন্য অপরিহার্য। খতিয়ান প্রতিটি লেনদেনের বিশদ বিবরণ সংরক্ষণ করে। যা ভবিষ্যতে আর্থিক বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। খতিয়ান ছাড়া লেনদেনের সঠিক তথ্য জানা এবং সেগুলো যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য খতিয়ান প্রস্তুত করা গুরুত্বপূর্ণ।
লেনদেন সংঘটিত হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করা হয়। জাবেদা প্রস্তুত বাধ্যতামূলক নয় এবং জাবেদায় হিসাবের জের নির্ণয় করা হয় না। অপরদিকে, খতিয়ানে প্রতিটি হিসাবের মোট ডেবিট ও ক্রেডিট পার্থক্যকরণের মাধ্যমে ব্যালেন্স নির্ণয় করা হয়। খতিয়ানের উদ্বৃত্ত হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা নির্ণয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল ও আর্থিক অবস্থা নির্ণয়ে সহায়তা করে।
খতিয়ান লেনদেনকে শ্রেণিকরণ করে লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করে। এটি ডেবিট ও ক্রেডিটের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, আয়ের খতিয়ান থেকে আয় ও ব্যয়ের খতিয়ান থেকে ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানের লাভ বা ক্ষতির সঠিক চিত্র পাওয়া যায়।
যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য খতিয়ান প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক। খতিয়ান তৈরি না করলে লেনদেনের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। ফলে আর্থিক বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা তৈরি হয়। এর ফলে আয়-ব্যয় এবং দায়-সম্পদের সঠিক হিসাব নির্ধারণ করা যায় না। খতিয়ানের উদ্বৃত্ত রেওয়ামিল ও আর্থিক অবস্থার বিবরণী তৈরিতে সহায়তা করে।
জাবেদা ও খতিয়ানের মধ্যে দুটি পার্থক্য হলো-
| জাবেদা | খতিয়ান |
| i. জাবেদা হিসাবের প্রাথমিক বা খসড়া বই। | i খতিয়ান হিসাবের চূড়ান্ত বা পাকা বই। |
| ii. জাবেদা বই সংরক্ষণ ঐচ্ছিক ii. বা বাধ্যতামূলক নয়। | ii খতিয়ান বই প্রস্তুত বাধ্যতামূলক। |
লেনদেনের ডেবিট ও ক্রেডিট পক্ষ বিশ্লেষণ করে তারিখের ক্রমানুসারে ব্যাখ্যা সহকারে জাবেদাতে লিখে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে খতিয়ান প্রস্তুতের ক্ষেত্রে জাবেদা সহায়ক বই হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি জাবেদা দাখিলা নির্দিষ্ট খতিয়ান হিসেবে স্থানান্তরিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিক্রয়সংক্রান্ত জাবেদা দাখিলা বিক্রয় খতিয়ানে পোস্টিং দেওয়া হয়। এই সম্পর্ক নিশ্চিত করে যে প্রতিটি লেনদেন সঠিকভাবে রেকর্ড ও শ্রেণিকরণ করা হয়েছে।
অধ্যায়
খতিয়ানে প্রতিটি লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। যা থেকে আয়-ব্যয় হিসাব এবং আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। আয় ও ব্যয় হিসাবসমূহ দ্বারা বিশদ আয় বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। আর সম্পদ, দায় ও মালিকানাস্বত্ব হিসাব দ্বারা আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিটি লেনদেনের জন্য সমপরিমাণ টাকা ডেবিট ও ক্রেডিট পোস্টিং প্রদান করা হয়। খতিয়ানের ডেবিট ব্যালেন্সের সমষ্টি এবং ক্রেডিট ব্যালেন্সের সমষ্টি সমান হয়। যা হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা নির্দেশ করে।
T-ছকের চারটি বৈশিষ্ট্য হলো-
i. হিসাবের একটি শিরোনাম থাকবে।
ii. ছকটি ডেবিট ও ক্রেডিট দুইটি অংশে বিভক্ত।
iii. উভয় অংশে চারটি করে মোট আটটি কলাম থাকবে।
iv. নির্দিষ্ট সময় পরপর হিসাবের উদ্বৃত্ত (ডেবিট ও ক্রেডিট দিকের যোগফলের পার্থক্য) নির্ণয় করতে হবে।
চলমান জের ছকের চারটি বৈশিষ্ট্য হলো-
i. হিসাবের একটি শিরোনাম থাকবে।
ii. টাকার কলাম মোট ৪টি।
iii. ডেবিট ও ক্রেডিট টাকার কলাম পাশাপাশি অবস্থিত।
iv. প্রতিটি লেনদেন লিপিবন্ধের পর হিসাবের উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয়।
T-ছক ও চলমান জের ছকের মধ্যে দুটি পার্থক্য হলো-
| T-ছক | চলমান জের ছক |
i. T-ছকে দুটি টাকার কলাম থাকে। ii. নির্দিষ্ট সময় পরপর হিসাবের উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয়। | i. চলমান জের ছকে মোট ৪টি টাকার কলাম থাকে। ii. প্রতিটি লেনদেন লিপিবন্ধের পর হিসাবের উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয়। |
খতিয়ান হিসাবের দুদিকের যোগফলের পার্থক্য নির্ণয় করাকে জের টানা বা ব্যালেন্সিং বলে। খতিয়ান হিসাবের দুটি দিক আছে। একটি হিসাবের উভয় দিক আপনাআপনি সমান হয়ে গেলে হিসাবটিকে সমতাপ্রাপ্ত বলা হয়। কিন্তু যদি হিসাবের দুদিক অসমান হয় তবে দুদিকের পার্থক্য কমের দিকে বসিয়ে হিসাবটিকে সমান করা হয়। হিসাবের দুদিক সমান করার কাজকে জের টানা বা ব্যালেন্সিং বলা হয়।
খতিয়ানের মাধ্যমে জাবেদা বই হতে প্রতিটি লেনদেনের পৃথক পৃথক হিসাব রাখা হয়। হিসাবে পোস্টিং পরবর্তী ডেবিট ও ক্রেডিট দিকের পার্থক্য নির্ণয় করাকে জের টানা বা ব্যালেন্সিং বলে। যেমন- পণ্য বাকিতে ক্রয় করা হলো ২০,০০০ টাকা এবং পরবর্তীতে ফেরত দেওয়া হলো ৪,০০০ টাকা। উক্ত লেনদেন দুটি খতিয়ানভুক্ত করা হলে পাওনাদার হিসাবের জের হবে ( ২০,০০০- ৪,০০০) বা ১৬,০০০ টাকা।
খতিয়ানের তারিখ কলাম লেনদেনের সঠিক সময় নির্দেশ করে। এটি লেনদেনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ভবিষ্যতে কোনো প্রয়োজনে নির্দিষ্ট লেনদেন খুঁজে পেতে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি নির্দিষ্ট তারিখে কত টাকা জমা বা উত্তোলন হয়েছে তা সহজেই জানা যায়। তাই খতিয়ানে তারিখের কলাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের শেষ তারিখে হিসাবের ডেবিট ও ক্রেডিট দিকের পার্থক্য নির্ণয় করা হয়। পার্থক্যটি ব্যালেন্স সি/ডি অর্থাৎ 'উদ্বৃত্ত স্থানান্তর হবে' কথাটি লিখে কম টাকার কলামে বসিয়ে উভয় দিক সমান করা হয়। বছরের শেষ তারিখের এই ব্যালেন্স সি/ডি পরবর্তী সময়ের প্রথম তারিখে ব্যালেন্স বি/ডি অর্থাৎ 'উদ্বৃত্ত স্থানান্তরিত হয়েছে' কথাটি লিখে বিপরীত পার্শ্বে বসাতে হয়।
C/D বা Carried down অর্থ নিচে নীত/স্থানান্তরিত হবে এবং C/F বা Carried Forward অর্থ সম্মুখে নীত। সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের শেষ তারিখে হিসাবের ডেবিট ও ক্রেডিট দিকের পার্থক্য নির্ণয় করা হয়। পার্থক্যটি 'ব্যালেন্স C/D' বা 'ব্যালেন্স C/F' লিখে কম টাকার কলামে বসিয়ে উভয় দিক সমান করা হয়।
B/D বা Brought Down অর্থ উপর থেকে আনীত/স্থানান্তরিত হয়েছে। B/F বা Brought Forward 'অর্থ পেছন থেকে আনীত। নির্দিষ্ট সময়ের শেষ তারিখে হিসাবের ডেবিট ক্রেডিট দিকের পার্থক্যকে 'ব্যালেন্স C/D' লিখে ছোট টাকার কলামে বসিয়ে উভয় দিক সমান করা হয়। 'ব্যালেন্স C/D' কে পরবর্তী সময়ের প্রথম তারিখে 'ব্যালেন্স B/D' বা 'ব্যালেন্স B/F' লিখে বিপরীত পাশে বসাতে হয়।
হিসাবের ডেবিট দিকের যোগফল ক্রেডিট দিকের যোগফল থেকে বেশি হলে যে জের বা উদ্বৃত্ত পাওয়া যায় তাকে ডেবিট ব্যালেন্স বা ডেবিট জের বলা হয়। ডেবিট জের ক্রেডিট দিকে বসিয়ে উভয়দিকের যোগফল সমান করা হয়।
হিসাবের ক্রেডিট দিকের যোগফল ডেবিট দিকের যোগফলের চেয়ে বেশি হলে যে জের বা উদ্বৃত্ত পাওয়া যায় তাকে ক্রেডিট ব্যালেন্স বা ক্রেডিট জের বলা হয়। ক্রেডিট জের ডেবিট দিকে বসিয়ে উভয়দিকের যোগফল সমান করা হয়।
একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে একটি হিসাবের ডেবিট ও ক্রেডিট দিক সমান করার জন্য যে জের বা উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয় তাকে বলে সমাপ্তি জের বা সমাপনী উদ্বৃত্ত। সমাপ্তি জের লেখার সময় 'স্থানান্তরিত হবে' বা 'সি/ডি' বা 'সি/এফ' লেখা হয়।
কোনো বছরের বা সময়ের সমাপনী জের নিয়ে পরবর্তী বছর বা সময়ের হিসাব শুরু করা হলে তাকে প্রারম্ভিক জের বা প্রারম্ভিক উদ্বৃত্ত বা প্রারম্ভিক ব্যালেন্স বলে। প্রারম্ভিক জের লেখার সময় 'স্থানান্তরিত হয়েছে' বা 'বি/ডি' বা 'বি/এফ' লেখা হয়।
সাধারণত T-ছক পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর হিসাবের জের নির্ণয় করা হয়। যখন কোনো হিসাবের মোট ডেবিট ও মোট ক্রেডিট টাকা সমান হয় তখন হিসাবের জের শূন্য হয়। এ ধরনের হিসাবকেই সমতাপ্রাপ্ত হিসাব বলে। তখন ব্যালেন্স বি/ডি বা সি/ডি লিখতে হয় না।
চলমান জের ছকে প্রতিটি পোস্টিংয়ের সাথে সাথে ব্যালেন্স নির্ণয় করা হয়। চলমান জের ছকে হিসাবের জের যেকোনো সময় জানা যায়। কেননা জাবেদা হতে তারিখের ক্রমানুসারে খতিয়ানভুক্তির সময় প্রতিটি লেনদেনের পোস্টিং এর পাশাপাশি ব্যালেন্স নির্ণয় করা হয়। তারপরে পরবর্তী তারিখের লেনদেন পোস্টিং করা হয়।
সাধারণ খতিয়ান প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি লেনদেন শ্রেণিকরণ করে এবং প্রধান খতিয়ানে সংরক্ষণ করে। এটি ডেবিট এবং ক্রেডিটের মাধ্যমে লেনদেনের প্রভাব প্রদর্শন করে। উদাহরণস্বরূপ, বিক্রয় খতিয়ান থেকে জানা যায় মোট বিক্রয়ের পরিমাণ। আর এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার সার্বিক চিত্র পাওয়া যায়।
বিভিন্ন শ্রেণির হিসাব সাধারণত যে খতিয়ানে লিপিবদ্ধ করা হয় তাই সাধারণ খতিয়ান। এটি প্রতিষ্ঠানের মূল বই হিসাবে কাজ করে। নগদান হিসাব, মূলধন হিসাব, ক্রয় হিসাব, বিক্রয় হিসাব, আসবাবপত্র হিসাব, দেনাদার হিসাব, পাওনাদার হিসাব প্রভৃতি সাধারণ জাবেদা। সাধারণ খতিয়ানের মধ্যে দেনাদার ও পাওনাদার হিসাবদ্বয়কে মূল হিসাব নামে অভিহিত করা হয়।
নগদান হিসাব, মূলধন হিসাব, ক্রয় হিসাব, বিক্রয় হিসাব, আসবাবপত্র হিসাব, দেনাদার হিসাব, পাওনাদার হিসাব প্রভৃতি সাধারণ খতিয়ান। প্রতিষ্ঠানে একাধিক দেনাদার ও পাওনাদার বিদ্যমান। সাধারণ খতিয়ানের মধ্য হতে শুধু দেনাদার ও পাওনাদার হিসাবদ্বয়কে মূল হিসাব বা Control Accounts নামে অভিহিত করা হয়। কারণ দেনাদার ও পাওনাদার উভয় হিসাব দেনাদারবৃন্দ ও পাওনাদারবৃন্দের সমষ্টি।
সাধারণ খতিয়ানের বাইরে প্রতিটি দেনাদার ও প্রতিটি পাওনাদারের জন্য স্বতন্ত্র খতিয়ান তৈরি করা হয়, যাতে করে নির্দিষ্টভাবে কোনো দেনাদার হতে কত টাকা পাওনা এবং কোনো পাওনাদারের নিকট কত টাকা দেনা রয়েছে সহজে জানা যায়। প্রতিটি দেনাদার ও পাওনাদারের জন্য প্রস্তুতকৃত খতিয়ানকে সহকারী খতিয়ান বলা হয়।
সহকারী খতিয়ান সাধারণ খতিয়ানের একটি নির্দিষ্ট অংশের বিশদ তথ্য সরবরাহ করে। এটি গ্রাহক, সরবরাহকারীকে বা পণ্যের পৃথক লেনদেনের হিসাব রাখে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রাহক খতিয়ান থেকে নির্দিষ্ট গ্রাহকের পাওনা বা পরিশোধের তথ্য জানা যায়। এর ফলে সাধারণ খতিয়ানের তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণ সহজ হয়।
সাধারণ খতিয়ান ও সহকারী খতিয়ানের ২টি পার্থক্য নিম্নরূপ:
| সাধারণ খতিয়ান | সহকারী খতিয়ান |
| ১. সাধারণ খতিয়ানকে নিয়ন্ত্রণ হিসাব বলা হয়। | ১. সহকারী খতিয়ানকে নিয়ন্ত্রিত হিসাব বলা হয়। |
| ২. নগদান হিসাব, মূলধন হিসাব, ক্রয় হিসাব, বিক্রয় হিসাব প্রভৃতি সাধারণ খতিয়ান। | ২. প্রতিটি দেনাদার ও পাওনাদারের জন্য প্রস্তুতকৃত খতিয়ান হলো সহকারী খতিয়ান। |
দেনাদার হিসাব বলতে একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের দেনাদারদের কাছ থেকে পাওনা অর্থের মোট পরিমাণকে বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ, তিনজন গ্রাহকের কাছ থেকে মোট ১২,০০০ টাকা পাওনা থাকলে দেনাদার হিসাবে ১২,০০০ টাকা লিপিবদ্ধ হবে। আর পাওনাদার হিসাব বলতে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পাওনাদারদের কাছে মোট প্রদেয় অর্থের পরিমাণ। উদাহরণস্বরূপ, দুইজন সরবরাহকারী ১০,০০০ টাকা করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নিকট পাওনা বলে পাওনাদার হিসাবে ২০,০০০ টাকা লিপিবদ্ধ হবে।
ক্রয় জাবেদা, বিক্রয় জাবেদা, ক্রয় ফেরত জাবেদা, বিক্রয় ফেরত জাবেদা, নগদ প্রাপ্তি জাবেদা, নগদ প্রদান জাবেদাকে একত্রে বিশেষ জাবেদা বলে। বিশেষ জাবেদা হতে সহকারী খতিয়ানে প্রতিদিন পোস্টিং দেওয়া হয়। আর সাধারণ খতিয়ানে সপ্তাহান্তে বা মাসান্তে পোস্টিং দেওয়া হয়।
বিক্রয় হিসাব = (ধারে পণ্য বিক্রয় -(ধারে পণ্য বিক্রয় কারবারি বাট্টা)}
টাকা
সুতরাং, বিক্রয় হিসাবে ৩৮,০০০ টাকা লিপিবদ্ধ হবে।
লেনদেনের সারিবদ্ধ ও শ্রেণিবদ্ধ সংক্ষিপ্ত বিবরণীকে বলা হয় খতিয়ান।
খতিয়ানকে বলা হয় হিসাবের পাকা বই, প্রধান বই, সকল বইয়ের রাজা।
লেনদেনের সামগ্রিক ফলাফল জানা যায় খতিয়ানের মাধ্যমে
হিসাবের জের টানা হয় না জাবেদায়।
খতিয়ান লেখা হয় জাবেদার ওপর ভিত্তি করে।
খতিয়ান প্রাথমিক বা সহকারী বই নয়।
লেনদেনের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল খতিয়ান।
হিসাব থেকে রেওয়ামিল তৈরি করা যায় খতিয়ান।
নির্দিষ্ট সময় শেষে প্রতিষ্ঠানের মোট ক্রয়-বিক্রয়, লাভ-ক্ষতি, সম্পদ, দায় ও দেনা-পাওনা ইত্যাদি জানা যায় লেনদেনের শ্রেণিবিন্যাস করে ও খতিয়ান হিসাব প্রস্তুত করে।
লেনদেনসমূহের স্থায়ী ভান্ডার হচ্ছে খতিয়ান বই।
জাবেদা থেকে লেনদেনগুলোকে পাকাভাবে লেখা হয় খতিয়ানে।
খতিয়ান বই থেকে তৈরি করা যায় রেওয়ামিল ও আর্থিক বিবরণী।
এর মাধ্যমে হিসাবের ভুলত্রুটি সহজে ধরা পড়ে খতিয়ান।
একটি ব্যবসায়ের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় খতিয়ান থেকে।
একটি ব্যবসায়ের যাবতীয় হিসাব সংরক্ষণ করা হয় খতিয়ানে।
খতিয়ান কয় প্রকার দুই প্রকার। যথা- সাধারণ খতিয়ান ও সহকারী খতিয়ান।
খতিয়ান হিসাব- প্রকার ছকে করা যায় দুই প্রকার।
খতিয়ানের T ছকে ঘর থাকে আটটি।
হিসাবের T ছকে প্রত্যেক দিকে ঘর থাকে চারটি।
T ছকের বৈশিষ্ট্য ৫টি। যথা- (১) হিসাবের একটি শিরোনাম (২) ছকটি ডেবিট ও ক্রেডিট দুটি অংশে বিভক্ত (৩) উভয় অংশে চারটি করে মোট আটটি কলাম (৪) নির্দিষ্ট সময় পর পর হিসাবের উদ্বৃত্ত (ডেবিট ও ক্রেডিট দিকের যোগফলের পার্থক্য) নির্ণয় (৫) হিসাবের কোড নম্বর।
লেনদেন প্রথমে জাবেদায় লিপিবদ্ধ না করেও সরাসরি লেখা যায় খতিয়ানে
চলমান জের ছক অনুসরণপূর্বক খতিয়ান প্রস্তুতে সময় ও শ্রম লাঘব করে, প্রতিনিয়ত হিসাবের জের পাওয়া যায়।
চলমান জের ছকের বৈশিষ্ট্য ৬টি। যথা- (১) হিসাবের একটি শিরোনাম (২) হিসাবের কোড নম্বর (৩) তারিখ, বিবরণ ও জাবেদা পৃষ্ঠার কলাম একটি (৪) টাকার কলাম মোট ৪টি (৫) ডেবিট ও ক্রেডিট টাকার কলাম পাশাপাশি অবস্থিত (৬) প্রতিটি লেনদেন লিপিবন্ধের পর হিসাবের উদ্বৃত্ত নির্ণয়।
প্রত্যেক দেনাদার ও পাওনাদারের জন্য আলাদা খতিয়ান প্রস্তুত করাকে বলা হয় সহকারী খতিয়ান।
হিসাবের ডেবিট দিকের যোগফল, ক্রেডিট দিক অপেক্ষা বেশি হলে- প্রকাশ করবে ডেবিট উদ্বৃত্ত।
খতিয়ানের উদ্বৃত্তসমূহ দ্বারা প্রস্তুত করা হয় রেওয়ামিল।
জাবেদা থেকে দাখিলাসমূহ পৃথকভাবে খতিয়ানের হিসাবসমূহে স্থানান্তরিত করার কাজকে বলা হয় খতিয়ানভুক্তকরণ।
খতিয়ানে হিসাবের দুদিকের যোগফলের পার্থক্য নির্ণয় করাকে বলা হয় জের।
কোনো হিসাবের ডেবিট ও ক্রেডিট পার্শ্বের যোগফলের পার্থক্যকে বলে উদ্বৃত্ত।
জের টানার আরেক নাম ব্যালেন্সিং।
কোনো খতিয়ান হিসাবের উভয় দিক আপনা আপনি সমান হয়ে গেলে হিসাবটিকে বলা হয় সমতাপ্রাপ্ত।
খতিয়ান হিসাবের দুদিক সমান করাকে সমীকরণ বা জেরটানা বলে।
কোনো হিসাবের ব্যালেন্স বা উদ্বৃত্ত বলতে বোঝায় তার দুদিকের পার্থক্যকে।
হিসাবের উভয় দিকের যোগফলের নিচে দুটি সমান রেখা টেনে দিতে হয় একে বলে হিসাববন্ধ করা।
সি/ডি Carried Down অর্থাৎ নিচে নীত/স্থানান্তরিত হবে।
বি/ডি Brought Down অর্থাৎ উপর থেকে আনীত/স্থানান্তরিত হয়েছে।
সি/এফ Carried Forward অর্থাৎ সম্মুখে নীত।
বি/এফ Brought Forward অর্থাৎ পেছন থেকে আনীত।
সম্পদ হিসাব ডেবিট ব্যালেন্স।
সম্পদ হিসাব ডেবিট ব্যালেন্স।
দায় হিসাব ক্রেডিট ব্যালেন্স।
মালিকানাস্বত্ব ক্রেডিট ব্যালেন্স।
আয় হিসাব ক্রেডিট ব্যালেন্স।
ব্যয় হিসাব ডেবিট ব্যালেন্স।
লেনদেনসমূহকে প্রাথমিকভাবে জাবেদায় লিপিবদ্ধের পর হিসাবের শ্রেণি অনুযায়ী যথাযথ হিসাবে স্থানান্তর করা হয় । সারা বছর বিভিন্ন সময়ে নগদে ও বাকিতে পণ্য ক্রয় ও বিক্রয় করা হয়। ক্রয় জাবেদা হতে বাকিতে ক্রয় এবং নগদান বই হতে নগদ ক্রয় একত্রিত করা ব্যতীত মোট ক্রয় জানা সম্ভব নয়। খতিয়ান বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ক্রয়, বিক্রয় ও অন্যান্য আয়-ব্যয়সমূহকে একত্রিত করে মোট ক্রয়, মোট বিক্রয় এবং অন্যান্য সকল আয় ও ব্যয়ের মোট পরিমাণ নির্ণয়ে সাহায্য করে। একইভাবে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, দায় ও মালিকানা স্বত্ব সংশ্লিষ্ট লেনদেনসমূহের ফলাফল খতিয়ানে সংরক্ষিত সংশ্লিষ্ট হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। হিসাবের উদ্বৃত্ত নির্ণয়ের প্রক্রিয়া জানা এবং হিসাবের উদ্বৃত্তের ভিত্তিতে গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাইয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়ের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করা এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত।

এই অধ্যায় শেষে আমরা-
- পাকা বই হিসেবে খতিয়ানের ধারণা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
- খতিয়ানের শ্রেণিবিভাগ করতে পারব।
- জাবেদা ও খতিয়ানের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারব।
- ‘T” ও ‘চলমান জের’ ছকে হিসাব প্রস্তুত করে হিসাবের জের নির্ণয় করতে পারব।
- বিভিন্ন ধরনের খতিয়ানের ডেবিট ও ক্রেডিট জেরের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে পারব।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!