স্বল্প পুঁজি, নিজস্ব চিন্তা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রচেষ্টায় জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা হলো আত্মকর্মসংস্থান। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের চেষ্টা ও গুণাবলি দিয়ে নিজেই কাজের সুযোগ তৈরি করে। অর্থাৎ নিজেই নিজের কর্মসংস্থান। সৃষ্টি করে। এজন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ও সাফল্য লাভের আকাঙ্ক্ষা। আত্মকর্মসংস্থান একটি স্বাধীন ও সম্মানীয় পেশা।
আত্মকর্মসংস্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আয়ের সম্ভাবনা অসীম। ঝুঁকি নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান হিসেবে কোনো ব্যবসায় শুরু করার প্রথম দিকে আয় কম হলেও ধীরে ধীরে ব্যবসায় সম্প্রসারিত হলে আয় বাড়তে থাকে। চাকরি বা অন্যান্য পেশায় এ সুবিধা পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। বেকারত্ব এদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। যে হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে তার চেয়ে অধিক হারে এদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য বর্ধিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হচ্ছে না বিধায় বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের বেকার সমস্যার সমাধান হয়। একজন আত্মকর্মসংস্থানকারী ব্যক্তি তখনই একজন উদ্যোক্তায় পরিণত হবেন, যখন তিনি নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সমাজের আরও কয়েকজন লোকের কর্মসংস্থানের চিন্তা নিয়ে কাজ শুরু করেন, ঝুঁকি আছে জেনেও এগিয়ে যান এবং একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
নিচে আত্মকর্মসংস্থানকারী ও ব্যবসায় উদ্যোক্তার মধ্যে ২টি পার্থক্য উল্লেখ করা হলো:
আত্মকর্মসংস্থানকারী | ব্যবসায় উদ্যোক্তা |
১. আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি শুধু নিজের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে কাজ করে। | ১. ব্যবসায় উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করে। |
২. স্বল্প পুঁজি ও নিজস্ব দক্ষতা প্রয়োজন হয়। | ২. তুলনামূলক অধিক পুঁজি লাগে। নিজের দক্ষতা না থাকলেও দক্ষ জনবলের সাহায্য নিতে পারে। |
কর্মসংস্থানকে প্রধানত তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. মজুরি বা বেতনভিত্তিক চাকরি;
২. আত্মকর্মসংস্থান এবং
৩. ব্যবসায়।
আত্মকর্মসংস্থান একটি স্বাধীন পেশা। এ পেশায় আয় চাকরির মতো সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে চাকরির চেয়ে বেশি পরিমাণ উপার্জন করা যায়। তাই আত্মকর্মসংস্থান থেকে প্রাপ্ত আয় প্রথমদিকে সীমিত ও অনিশ্চিত হলেও পরবর্তীতে এ পেশা থেকে আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা অসীম।
বেকারত্ব যেকোনো দেশের 'জন্য বিরাট হুমকি। কেননা শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী একপর্যায়ে সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবার, সমাজ এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়; যা সমাজ উন্নয়নের পথে বড় বাধা। এছাড়া বেকার যুবক-যুবতীদের মস্তিষ্ককে কেউ কেউ শয়তানের কারখানা হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। কেননা অলস আর কর্মহীন মস্তিষ্ককে শয়তান সবসময় অন্যায় কাজে প্ররোচিত করে। মূলত এজন্যই বলা হয়েছে বেকারত্ব সমাজের অভিশাপম্বরূপ।
আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সামান্য পুঁজি নিয়েই যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারে। ফলে দেশের মোট উৎপাদনের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রগতি হয়। সুতরাং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আত্মকর্মসংস্থানের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাংলাদেশে চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ে না। আর ইচ্ছে করলেই চাকরির ব্যবস্থা করা যায় না। এজন্য কর্মহীন লোকের সংখ্যা বেড়ে যায়। তাই তারা আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। এজন্য চাকরির বিকল্প পেশা হিসেবে তারা আত্মকর্মসংস্থানকে বেছে নেয়।
সাধারণত কাজের ব্যবস্থা করতে মানুষ শহরমুখী হয়। কিন্তু আত্মকর্মসংস্থান যেকোনো স্থানে থেকেই শুরু করা যায়। এতে জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা হয়। আবার শহরমুখী জনস্রোতও নিয়ন্ত্রণ হয়।
নিচে চাকরি ও আত্মকর্মসংস্থানের দুটি পার্থক্য উল্লেখ করা হলো-
চাকরি | আত্মকর্মসংস্থান |
১. চাকরি হলো কারো অধীনে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে কাজ করা। | ১. আত্মকর্মসংস্থান হলো নিজের দক্ষতা ও পুঁজি কাজে লাগিয়ে স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করা.। |
২. চাকরির ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা অর্জিত হয়।. | ২. আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আয়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। |
কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা চাকরির মাধ্যমেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চায়। এছাড়া আয়ের নিরাপত্তা, সম্মান, পদোন্নতি প্রভৃতি সুবিধা চাকরির ক্ষেত্রে উৎসাহিত করে। আর সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে।
অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করাকে চাকরি বলে। নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরি বা বেতন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকায় চাকরিতে ঝুঁকি কম থাকে। আর্থিক নিরাপত্তা, বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি প্রভৃতি চাকরির সুবিধাজনক, দিক। এজন্য শিক্ষার্থীরা চাকরিতে বেশি নিয়োজিত হতে চায়।
নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরি বা বেতন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকায় চাকরিতে ঝুঁকি কম থাকে। এতে প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি যাই হোক না কেন মাস বা নির্দিষ্ট সময় শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কর্মীকে দেওয়া হয়। এছাড়া ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি থাকায় চাকরি সকলের কাছে আকর্ষণীয়।
নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অধীনে কাজ করা হলো মজুরি ও বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থান। নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে তাদের শ্রম ও দক্ষতা নিয়োজিত করতে হয়। বিনিময়ে তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আনুষঙ্গিক নানা সুযোগ-সুবিধা (যাতায়াত, চিকিৎসা প্রভৃতি) পেয়ে থাকে।
মজুরির বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে কাজ করানোই হলো মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ। প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পাদনের জন্য কর্মী নিয়োগ দিতে হয়। মজুরির ভিত্তিতে সাধারণত যেসব কর্মী কায়িক শ্রম দিয়ে কাজ করেন, তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এ মজুরি দিন হিসেবে দেওয়া হয়।
আত্মকর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় মূলধন হলো নিজের দক্ষতা। দক্ষতা থাকলে যে কেউ সামান্য পুঁজি সংগ্রহ করে আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজ শুরু করতে পারে। এতে নিজেই নিজের কাজের ব্যবস্থা করা যায়। তাই দক্ষতাকে আত্মকর্মসংস্থানের বড় মূলধন বলা হয়।
নিচে আত্মকর্মসংস্থানের দুটি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:
ক. আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা এবং স্বেচ্ছামূলক কাজে উৎসাহিত করা যায়।
খ. আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত থাকলে তরুণ সমাজ নানা সমাজবিরোধী কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখে।
নিজেই নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাকে আত্মকর্মসংস্থান বলে। এর মাধ্যমে দেশের বেকার সমস্যার সমাধান হয়। এক্ষেত্রে । আত্মকর্মসংস্থানকারী ব্যক্তি নিজেই ব্যবসায়ের মালিক এবং শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। তার কাজের জন্য তাকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। একারণেই আত্মকর্মসংস্থানকে স্বাধীন পেশা বলা হয়।
নিচে আত্মকর্মসংস্থানের কয়েকটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তুলে ধরা হলো
- হস্তচালিত তাঁত
- মাদুর বা ম্যাট তৈরি
- মৃৎশিল্প
- টেইলারিং
- মাছের জাল তৈরি
- কাঠের আসবাবপত্র তৈরি
- কামারের কাজ
- রাবার চাষ
- গবাদি পশুর খামার
- বেকারি
আত্মকর্মসংস্থানেও ঝুঁকি আছে। তাই স্বনিয়োজিত পেশা গ্রহণের আগে উদ্যোক্তার নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা যাচাইয়ের প্রয়োজন। আর এজন্যেই "স্থনিয়োজিত পেশা গ্রহণের আগে লক্ষ্য নির্ধারণ প্রয়োজন।" কেননা লক্ষ্য নির্ধারণ যথাযথ না হলে ব্যর্থতা অনিবার্য।
সংগৃহীত কর্মীদের মধ্য হতে সর্বোত্তম কর্মী বাছাই করার প্রক্রিয়াকে সঠিক কর্মী নির্বাচন বলে। কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, বিশ্বস্ততা প্রভৃতি মানদণ্ডের ভিত্তিতে যাচাই করে নির্বাচন করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কার্য সম্পাদন যোগ্য কর্মী ছাড়া সম্ভব নয়। আর যোগ্য কর্মী পেতে হলে কর্মী নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। কোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য যে সকল
ব্যবসায়ের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ব্যবসায় পরিকল্পনা বলে। ব্যবসায় পরিকল্পনা প্রণয়ন ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কোনো ব্যবসায় গঠনের শুরু থেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন পর্যন্ত যাবতীয় কার্যাবলি পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। এটি ভবিষ্যৎ পালনীয় কর্মপন্থার একটি প্রতিচ্ছবি। ব্যবসায়ে হাত দেওয়ার পূর্বেই ব্যবসায় কাজ কখন এবং কীভাবে করা হবে তা অগ্রিম চিন্তা করে ঠিক করাই হলো ব্যবসায়।
একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গঠন করতে প্রাথমিকভাবে যে পুঁজির প্রয়োজন হয়, তাকে প্রাথমিক মূলধন বলে। স্থায়ী মূলধন সংগ্রহের মাধ্যমে প্রাথমিক মূলধন ব্যয় নির্বাহ করা হয়। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান শুরুর পর্যায়ে কিছু বড় ধরনের খরচ হয়ে থাকে। জমি ক্রয়, কারখানা নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রভৃতি প্রাথমিক ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। এসব খরচ নির্বাহের জন্যই প্রাথমিক মূলধনের প্রয়োজন হয়।
একজন ব্যবসায়ীর শিক্ষাগত জ্ঞান থাকলে ব্যবসায়ের সুযোগ-সুবিধাগুলো সহজে বিশ্লেষণ করতে পারে। অর্জিত শিক্ষা দিয়ে যেকোনো সমস্যা সমাধানের উপায় জানা যায়। আর, ব্যবসায় বিষয়ক প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থাকলে চ্যালেঞ্জমূলক কাজে দ্রুত সফল হওয়া যায়। তাই বলা যায়, যেকোনো ব্যবসায়ের সফলতা অর্জনে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সহায়তা করে।
ব্যবসায়ে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি থাকলে লোকসান হতে পারে। আবার ঝুঁকি না নিলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এজন্য কোন. ঝুঁকি কী পরিমাণ নিতে হবে তা আগেই পরিমাণ করা উচিত। তাই ঝুঁকি নিরূপণ ও তা মোকাবিলার উপায় নির্ধারণ ব্যবসায় সাফল্যের অন্যতম শর্ত।
ব্যবস্থাপকের উচিত কর্মী নিয়োগের সময় আবেগতাড়িত না হওয়া। এতে অদক্ষ ও অযোগ্য কর্মী প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে পারে। ফলে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
ব্যবসায় পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দেশনা দলিল বলতে পরিকল্পনাকে বোঝায়। পরিকল্পার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কী কাজ, কীভাবে, কে করবে প্রভৃতি আগে থেকে ঠিক করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়। পরিকল্পনাকে নির্দেশনা দলিল বলা হয়।
একজন উদ্যোক্তা লক্ষ্য অর্জনে নিরলস চেষ্টা করেন। কোনো কারণে ব্যর্থ হলে তিনি ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করে তা সংশোধন করেন। ফলাফল অর্জন না হওয়া পর্যন্ত উদ্যোক্তা অবিরাম শ্রম দিয়ে যান। যে কারণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন তা যেন আবার না হয়, সে ব্যবস্থা নেন। তাই, উদ্যোক্তার বিফলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা হলো ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ।
বাংলাদেশের যুবসমাজের নিকট আত্মকর্মসংস্থানের ধারণা স্বচ্ছ ও যথেষ্ট নয়। তাছাড়া আমাদের সমাজে চাকরিজীবীদের সামাজিক মর্যাদা বেশি। অন্যদিকে আত্মকর্মসংস্থান কিংবা ব্যবসায়কে পেশা হিসেবে গ্রহণের জন্য দক্ষতা ও পুঁজির পাশাপাশি ঝুঁকি নিতে হয়। তাছাড়াও পুঁথিগত বিদ্যার কারণে কিংবা প্রশিক্ষণের অভাবে কাম্য দক্ষতাসম্পন্ন জনবল এদেশে অপ্রতুল। তাই এদেশের যুবসমাজ চাকরিতে বেশি আগ্রহী। আর চাকরিতে আগ্রহের কারণ হলো-সামাজিক মূল্যবোধ ও পুঁথিগত পড়াশুনা। তাই যুবসমাজ জীবিকা বলতে চাকরিকে বুঝে থাকে।
নিচে আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধকরণে ৪টি করণীয় তুলে ধরা হলো
- কোনো কাজই ছোট বা অপমানজনক নয় বলে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।
- আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে যারা সফল হয়েছে তাদেরকে বিদ্যালয়ে এনে তাদের জীবনকাহিনি শিক্ষার্থীদের শোনাতে হবে।
- আত্মকর্মসংস্থানের উপযুক্ত ক্ষেত্রগুলোর তালিকা প্রণয়ন করে বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদের দেয়ালে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
- নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষাক্রমে বৃত্তিমূলক, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকে পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
নিজেই নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাকে আত্মকর্মসংস্থান বলে। এর মাধ্যমে দেশের বেকার সমস্যার সমাধান হয় বলে যুব ও তরুণ সমাজকে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নিচে আত্মকর্মসংস্থানে প্রশিক্ষণের দুটি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো:
- কর্মীর দক্ষতাবৃদ্ধি : প্রশিক্ষণ কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি করে। তাই নতুন বা পুরাতন সকল কর্মীর জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
- সম্পদের সদ্ব্যবহার: প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীর দক্ষতা বেড়ে যায়। ফলে উদ্যোক্তা বা কর্মী কর্তৃক প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি, সাজ-সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয়।
কোনো বিশেষ কাজ যথার্থভাবে সম্পাদন করার স্বার্থে এবং জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আর আত্মকর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় মূলধন হলো নিজের দক্ষতা। আর দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধির উপায় হলো প্রশিক্ষণ। তাই বলা যায়, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
প্রশিক্ষিত কর্মী কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারে। এতে সময় বাঁচে এবং অপচয় কমে যায়। আবার, তারা দক্ষভাবে কারখানার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারায় দুর্ঘটনা এড়ানো সহজ হয়। এভাবে প্রশিক্ষণ কর্মীর দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও অপচয় কমায়।
দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের অপ্রতুলতা দূরীকরণের উপায় হলো প্রশিক্ষণ। কেননা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সবসময় দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি সম্ভব নাও হতে পারে। তবে কর্মীদেরকে যদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাহলে তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রতিষ্ঠানের দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীর অভাব দূরীভূত হয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। নির্দিষ্ট ফি এর বিনিময়ে এটি আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোগ উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। উক্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা, নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠাকরণ, মহিলা উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইত্যাদি।
মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় মূলত মহিলাদের জন্য উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। বিশেষ করে গ্রামের দুস্থ, শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত মহিলাদেরকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া এর মূল উদ্দেশ্য। এটি উদ্যোগী মহিলাদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে অনানুষ্ঠানিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।
বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ড বা বিআরডিবি গ্রামের দুস্থ ও ভূমিহীন নারী-পুরুষদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন বৃত্তিমূলক | প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। উক্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর দুস্থ ও ভূমিহীন নারী-! পুরুষগণ স্বাধীনভাবে তাদের পেশা বেছে নিয়ে উপার্জন করতে পারে। দেশের সকল জেলা ও উপজেলায় বিআরডিবির কার্যক্রম বিস্তৃত।
গ্রামীণ মহিলাদের কর্মসংস্থান প্রকল্পের মাধ্যমে পল্লি অঞ্চলের ৭. মহিলাদেরকে বিভিন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অতঃপর প্রশিক্ষণ | শেষে তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয়। এক্ষেত্রে শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরাই উক্ত ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হচ্ছে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। দেশের প্রতিটি থানায় এর কেন্দ্র রয়েছে। এ সকল কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের বেকার যুবক-যুবতীদেরকে বিভিন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যেমন: হাঁস-মুরগির খামার তৈরি, মৎস্য চাষ, সবজি বাগান, নার্সারি করা, সেলাইয়ের কাজ, কুটির শিল্পের কাজ, কম্পিউটার চালানো ইত্যাদি।
নট্রামুস শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও কম্পিউটার চালনা শিক্ষা দেওয়াই এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ। এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বহু শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিয়েছে।
সমাজের কম বিত্তসম্পন্ন, অসহায় ও পশ্চাদপদ শ্রেণির মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য গঠিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও বলে। এনজিওগুলো দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে খুঁজে বের করে তাদেরকে সংগঠিত করে এবং ব্যবসায় করতে তাদেরকে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পুঁজির যোগান দিয়ে থাকে। তাই বেসরকারি সংস্থা সামাজিক উন্নয়নে এত গুরুত্বপূর্ণ।
Related Question
View Allবাংলাদেশ অর্থনৈতিক রিভিউ ২০১১-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ২০ ভাগ।
যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজের ব্যবস্থা করতে না পারাই' হলো বেকারত্ব। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল ও জনবহুল দেশ। এদেশে চাকরির চাহিদা যে হারে বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার কারণে এখানে চাকরির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করাও কষ্টকর। এসব কারণেই বাংলাদেশে বেকার সমস্যা দিন দিন বাড়ছে ।
সামীর হাঁস-মুরগির খামার প্রতিষ্ঠা আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে স্বল্প পুঁজি, নিজস্ব চিন্তা, চেষ্টা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে কোনো ব্যক্তি নিজেই তার বেকারত্ব দূর করতে পারে। তাই একে স্ব-কর্মসংস্থানও বলা হয়। উদ্দীপকে উল্লিখিত সামী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হাঁস- মুরগি পালনের ওপর দু'মাসের প্রশিক্ষণ নেয়। এতে তার মনোবল বেড়ে যায়। বিদেশ যাওয়ার টাকা দিয়ে সে দেশেই হাঁস-মুরগির খামার প্রতিষ্ঠা করে। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান খামারে প্রয়োগ করে সে স্বাবলম্বী হয়েছে। সামী হাঁস-মুরগির খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এসব বৈশিষ্ট্য আত্মকর্মসংস্থানের সাথে সম্পর্কিত। তাই বলা যায়, সামী'র প্রতিষ্ঠিত খামারটি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের আওতাভুক্ত।
স্বাবলম্বী হওয়ার পেছনে সামীর 'আত্মবিশ্বাস' গুণটি তাকে বেশি প্রভাবিত করেছে বলে আমি মনে করি।
আত্মকর্মসংস্থানকারী ব্যক্তি নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকেন। এ আত্মবিশ্বাসের জোরেই তিনি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবিরাম কাজ করেন। কোনো কারণে ব্যর্থ হলে তিনি নতুন উদ্যমে আবার কাজ শুরু করেন। ওপর দু'মাসের প্রশিক্ষণ নেয়। এতে তার মনোবল বেড়ে যায়। নিজের সিদ্ধান্তেই সে হাঁস-মুরগির খামার প্রতিষ্ঠা করে। সামী'র বিশ্বাস ছিল আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সে সফল হবে। তাই তার বাবা তাকে বিদেশে পাঠাতে চাইলেও সে রাজি হয়নি। তার আত্মবিশ্বাস ছিল বিদেশ না গিয়ে দেশে থেকে সে সফল উদ্যোক্তা হতে পারবে। এ কারণেই প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান খামারে প্রয়োগ করে সে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। এভাবে আত্মবিশ্বাসের গুণই তাকে স্বাবলম্বী করে তুলেছে।
উদ্দীপকের সামী বি. কম পাস করে এদেশেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চায়। এজন্য সে চাকরির পেছনে না ছুটে হাঁস-মুরগি পালনের ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন-২০১০ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছে যুবক-যুবতী।
স্বল্প পুঁজি, নিজস্ব জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেই নিজের কাজের ব্যবস্থা করা হলো আত্মকর্মসংস্থান।
আত্মকর্মসংস্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে আয়ের সম্ভাবনা অসীম। ঝুঁকি নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান হিসেবে কোনো ব্যবসায় শুরু করার প্রথম দিকে আয় কম হতে পারে। কিন্তু, ব্যবসায় সম্প্রসারিত হলে ব্যক্তির আয় বাড়তে থাকে। এ সুবিধা চাকরি বা অন্যান্য পেশায় পাওয়া যায় না।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
