কুরআন শব্দটি আরবি। এটি কারউন (ত) শব্দমূল থেকে উদ্ভূত। কারউন অর্থ পড়া বা পাঠ করা। অতএব, কুরআন শব্দের অর্থ হলো: পঠিত। আল-কুরআন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পঠিত কিতাব। প্রত্যেক দিনই লক্ষ-কোটি মুসলমান এ গ্রন্থ তিলাওয়াত করে থাকে। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে এ গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন সূরা ও আয়াত পাঠ করে থাকি। এজন্য এ কিতাবের নাম রাখা হয়েছে আল-কুরআন।
ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য হযরত জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর উপর যে কিতাব নাজিল করেছেন তাকেই আল-কুরআন বলা হয়। এটি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব।
আল-কুরআন 'লাওহে মাহফুযে' বা সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ। এটি প্রথমে কদরের রাতে প্রথম আসমানের 'বায়তুল ইয়্যাহ' নামক স্থানে এক সাথে নাজিল করা হয়।
বায়তুল ইযযাহ' হলো প্রথম আসমান তথা দুনিয়ার আসমানের একটি জায়গার নাম। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কাদরের রাতে প্রথম আসমানের 'বায়তুল ইযযাহ' নামক স্থানে একসাথে নাযিল হয়। এরপর সেখান থেকে মহানবি (স.)-এর ওপ্র আস্তে আস্তে নাযিল হয়।
মহানবি (স.)-এর ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালে সর্বপ্রথম সূরা আলাকের ৫টি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তারপর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবদ্দশায় প্রয়োজন অনুসারে অল্প অল্প করে নাজিল করা হয়। এভাবে ২৩ বছরে খন্ড খন্ড আকারে পুরো কুরআন আমাদের প্রিয়নবি (স.)-এর উপর নাজিল করা হয়।
মহানবি (স.) আল্লাহর নির্দেশে নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। নবি করিম (স.)-এর এ হিজরতের পূর্বে নাজিল হওয়া সূরাসমূহ মক্কি সূরা হিসেবে পরিচিত। এ সূরাসমূহে সাধারণত আকাইদসংক্রান্ত বিষয়সমূহ বর্ণনা করা হয়েছে।
মহানবি (স.)-এর মদিনায় হিজরতের পর নাজিলকৃত সূরাসমূহকে মাদানি সূরা বলা হয়। এ সূরাসমূহ সালাত, যাকাত, সাওম, হজ, জিহাদ, হালাল-হারাম, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিধিবিধান বর্ণনা করা হয়েছে।
আল-কুরআনের অর্থসহ পাঁচটি নাম হলো- ১. আল-ফুরকান (পার্থক্যকারী), ২. আল হুদা (পথপ্রদর্শন), ৩. আর রাহমাহ (রহমত, দয়া), ৪. আয যিকর (উপদেশ), ৫. আন-নূর (জ্যোতি, আলো)
আল-কুরআনকে 'আল-ফুরকান' বলার কারণ হলো- আল-ফুরআন অর্থ পার্থক্যকারী। আল-কুরআন সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী। এজন্য 'আল-কুরআন'-কে 'আল-ফুরআন' বলা হয়।
আল-কুরআন'-কে 'আল-হুদা' নামে আখ্যায়িত করার কারণ হলো- 'আল-হুদা' শব্দের অর্থ হিদায়াত, পথপ্রদর্শন। কুরআন মজিদের মাধ্যমে ন্যায় ও সত্যের দিকে পথপ্রদর্শন করা হয় বলে একে আল-হুদা নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আল-কুরআন মানবজাতির হিদায়াতের প্রধান উৎস। কোন পথে চললে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করবে আল-কুরআন তা আমাদের দেখিয়ে দেয়। পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ ইত্যাদির পরিচয় দান করে। আল-কুরআনের নির্দেশনামতো চলে আমরা কল্যাণ লাভ করতে পারি।
আল-কুরআন আমাদের নৈতিক ও মানবিক আদর্শ শিক্ষা দেয়। আল-কুরআন অনুসরণ করে আমরা উত্তম চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারি। ফলে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা 'প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি ইত্যাদি দূরীভূত হবে।
কুরআন মজিদ তিলাওয়াত অনেক সাওয়াব পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে-যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তদনুযায়ী আমল করে, কিয়ামতের দিন তার পিতামাতাকে মুকুট পরানো হবে। এ 'মুকুটের ঔজ্জ্বল্য সূর্যের আলোর চেয়েও বেশি হবে। (বুখারি)
কুরআন তিলাওয়াত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে কুরআন শেষে এবং অপরকেও শিক্ষা দেয়।" (বুখারি) অন্য একটি হাদিসে বলেছেন, "তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর। কেননা কিয়ামতের দিন তা নিজ পাঠকারীদের জন্য সুপারিশ করবে।" (মুসলিম)
সহিহ শুদ্ধভাবে কুরআন পাঠের রীতিতে তাজবিদ বলে। আল-কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত লাভের জন্য সহিহ-শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে হবে। আর এজন্য তাজবিদের জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাজবিদ অনুসারে কুরআন তিলাওয়াত করা ওয়াজিব। তাজবিদ অনুসারে কুরআন না পড়লে পাঠকারী গুনাহগার হবে এবং তার নামায শুদ্ধ হবে না।
দুই' যরর , দুই যের , ও দুই পেশকে তানবিন বলা হয়। তানবিনের মধ্যে একটি জযমযুক্ত নূন উহ্য অবস্থায় থাকে। উচ্চারণের সময় তা প্রকাশ পায়। যেমন-رخلن-এর উচ্চারণ হবে رخلن-এর মতো
নুন সাকিন ও তানবিনের হুকুম চারটি। এগুলো হলো-
১. ইদগাম (اذغم)
২. ইখফা (خطاء)
৩. ইযহার (اظهای)
৪. কালব قلبবা ইকলাব (اقلاب)

নুন সাকিন বা তানবিনের পর (রা, লাম) এ দুটি হরফের কোনো একটি হরফ আসলে নুন সাকিন বা তানবিনকে গুন্নাহ না করে ঐ হরফের সাথে মিলিয়ে পড়তে হয়। একে গুন্নাহ ছাড়া ইদগাম বলে।
ইখফার হরফ ১৫টি। যথা- دث. ج . د . د. ز س ش . م . ض . ط . ظ. ف. ق. ك
নুন সাকিন বা তানবিনের পর ইখফার হরফ থেকে যেকোনো একটি হরফ এলে উক্ত নুন সাকিন বা তানবিনকে চন্দ্রবিন্দু উচ্চারণ করার মতো নাসিকা সংযোগে গোপন করে এক আলিফ পরিমাণ দীর্ঘ করে পড়াকে ইখফা বলে।
ইখফা অর্থ গোপন করা। ইখফার হরফ পনেরটি। যথা- ت ث ج د ذ ز س ش ص ض ط ظ ع غ ف ق ك
কালব বা ইকলাব অর্থ পরিবর্তন করে পড়া। তাজবিদের পরিভাভাষায় নুন সাকিন বা তানবিনের পর (বা) হরফ আসলে ঐ নুন সাকিন বা তানবিনকে মীম দ্বারা পরিবর্তন করে এক আলিফ পরিমাণ গুন্নাহসহ পড়াকে কালব বা ইকলাব বলে।
জজমযুক্ত মীম -কে মীম সাকিন বলে। অর্থাৎ মীম হরফের উপর জযম থাকলে তাকে মীম সাকিন বলা হয়। যেমন-
জজমযুক্ত মীম -কে মীম সাকিন বলে। অর্থাৎ মীম হরফের উপর জযম থাকলে তাকে মীম সাকিন বলা হয়। যেমন-

মীম সাকিন পড়ার নিয়ম তিনটি। যথা-
ক. ইযহার (اظهار)
খ. ইদগাম (اذغم)
গ. ইখফা (اِخفاء)
ইদগাম অর্থ মিলিয়ে পড়া। জযমযুক্ত মীম-এর পর হরকত যুক্ত মীম এলে উভয় মীমকে একসাথে মিলিয়ে এক আলিফ পরিমাণ গুন্নাহ করে পড়াকে ইদগাম বলে।
নাযিরা তিলাওয়াত হলো দেখে দেখে কুরআন মজিদ তিলাওয়াত করা। নাযিরা তিলাওয়াতের ফজিলত অনেক। কুরআন মজিদ তিলাওয়াতের ফজিলতের বর্ণনা আমরা জেনেছি। অতএব আমরা নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করব, এবং এর 'পূর্ণ ফজিলত লাভ করতে চেষ্টা করব।
নাযিরা তিলাওয়াত হলো দেখে দেখে কুরআন মজিদ তিলাওয়াত করা। নাযিরা তিলাওয়াতের ফজিলত অনেক। কুরআন মজিদ তিলাওয়াতের ফজিলতের বর্ণনা আমরা জেনেছি। অতএব আমরা নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করব, এবং এর 'পূর্ণ ফজিলত লাভ করতে চেষ্টা করব।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের কয়েকটি আদব নিচে লেখা হলো:
ক. পূর্ণরূপে ওযু করে পাক-পবিত্র স্থানে বসা।
খ. কিবলামুখী হয়ে নামাযের অবস্থার মতো বসা।
গ. তিলাওয়াতের আগে কয়েক বার দরুদ শরিফ পড়া।
ঘ. আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ বলে তিলাওয়াত শুরু করা
নাযিরা তিলাওয়াত বলতে দেখে দেখে শুদ্ধভাবে তাজবিদ অনুযায়ী কুরআন তিলাওয়াত করাকেই বোঝায়। নাযিরা তিলাওয়েতের ফজিলত অনেক। যেমন- হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, "যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফও তিলাওয়াত করবে সে একটি নেকি পাবে। আর এ নেকির পরিমাণ হলো দশগুণ।” (তিরমিযি)
সূরা আল-কাদর আল-কুরআনের অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন সূরা। এটি মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়। এর আয়াত সংখ্যা পাঁচটি। সূরা আল-কাদর কুরআন মজিদের ৯৭তম সূরা। এ সূরায় 'লাইলাতুল কাদর'-এর ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে।
লাইলাতুল কাদর মহিমান্বিত রাত হওয়ার কারণ হলো, লাইলাতুল কাদর বা কাদরের রাত অত্যন্ত মর্যাদাবান ও মহিমান্বিত রাত। আল্লাহতায়ালা এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাযিল করেন। এ রাতের ইবাদত হাজার মাস একাধারে ইবাদত করার চেয়ে উত্তম। এক হাজার মাস ৮৩ বছর ৪ মাসের সমান।
সূরা আল-কাদর এর শিক্ষা হলো-
লাইতুল কাদর অত্যন্ত মহিমান্বিত রাত।
এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।
এ রাতে ফেরেশতাগণ শান্তি ও কল্যাণ নিয়ে দুনিয়ায় নেমে আসেন।
এ রাতে সারাক্ষণ শান্তি ও রহমত বর্ষিত হয়।
আল-কুরআনের ৯৯তম সূরা আল-যিলযাল। এ সূরায় কিয়ামতের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত যিলযাল শব্দ থেকে এর নাম রাখা হয়েছে সূরা আল-যিলযাল। এটি মদিনা নগরীতে অবতীর্ণ হয়। এর আয়াত সংখ্যা আটটি।
একদা জনৈক ব্যক্তি একজন কাফিরকে অল্প পরিমাণ খাদ্যদান করে। অতঃপর সে বলল যে, এ সামান্য দানে কি সাওয়াব হবে? অপর এক ব্যক্তি ছোট ছোট গুনাহ করত। এগুলো থেকে বিরত থাকত না। বরং সে এগুলোকে অবহেলা করত, আর এগুলোর কোনো গুরুত্ব দিত না। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এ সূরা নাযিল করেন।
সূরা আল-যিলযাল-এর শিক্ষা হলো-
কিয়ামতে পৃথিবীর অবস্থা হবে ভয়াবহ। সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।
মানুষ মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হবে।
হাশরের ময়দানে মানুষ নিজ নিজ আমলনামা দেখতে পাবে।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাপ বা পুণ্য কোনো কিছুই এ আমলনামায় বাদ পড়বে না।
সূরা ফিল আল-কুরআনের ১০৫তম সূরা। এটি মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়। এর আয়াত সংখ্যা পাঁচটি। ফিল অর্থ হাতি। এ সূরায় হস্তিবাহিনীর করুণ পরিণতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে বিধায় সূরার নাম রাখা হয়েছে সূরা ফিল।
আবরাহা গর্ব ও অহংকারবশত আল্লাহতায়ালার সাথে শত্রুতা করে। ফলে সে ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা ছোট ছোট পাখির সাহায্যে তার বিশাল বাহিনী ধ্বংস করে দেন। বস্তুত এটা ছিল আল্লাহর কুদরত মাত্র। আল্লাহর সাথে শত্রুতা ও বিরোধিতাকারীদের তিনি এভাবেই ধ্বংস করে থাকেন।
সূরা আল-ফিল এর শিক্ষা হলো-
আল্লাহদ্রোহীদের আল্লাহতায়ালা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেন।
তিনি তাদের সমস্ত কলাকৌশল ব্যর্থ করে দেন।
সূরা কুরাইশ মক্কায় অবতীর্ন হয়। এর আয়াত সংখ্যা চারটি। এটি আল-কুরআনের ১০৬তম সূরা। এ সূরায় মক্কা নগরীর কুরাইশদের কথা
বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্য এর নাম রাখা হয়েছে সূরা কুরাইশ।
সূরা কুরাইশের দুটি আয়াতের অর্থ হলো:
১. যেহেতু কুরাইশের আসক্তি রয়েছে।
২. আসক্তি রয়েছে তাদের শীত ও গ্রীষ্মে সফরের।
এ সূরার শিক্ষা নিম্নরূপ:
আল্লাহতায়ালা আমাদের খাদ্য-পানীয় ও নিরাপত্তা দান।
তিনি সকল নিয়ামতের মালিক।
সকলেরই উচিত তার ইবাদাত করা।
সূরা আন-নাস্ত্র পবিত্র কুরআনের একটি সূরা। এই সূরা মক্কায় বিদায় হজের সময় অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু যে সমস্ত সূরা হিজরতের পরে অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলো স্থান নির্বিশেষে মাদানি সূরা। এজন্য এ সূরাও মাদানি সূরা। এর আয়াত সংখ্যা তিন। সূরা আন-নাস্ত্র পবিত্র কুরআনের ১১০তম সূরা।
১. যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়।
২. এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবেন।
৩. তখন আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন, তিনি তো তওবা কবুলকারী।
সূরা আন-নাস্ত্র-এর দুটি শিক্ষা হলো-
*কোনো কাজে সফলতা আসলে আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করা উচিত।
*যাবতীয় ত্রুটি, অপরাধ বা পাপকাজের জন্য তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
কুরসি শব্দের অর্থ এক বস্তুর সাথে অন্য বস্তুর মেলানো। এজন্য চেয়ার বা আসনকে কুরসি বলা হয়। কেননা আসনে অনেক কাঠকে একত্র করা হয়। কুরসি শব্দের অন্য অর্থ হলো সাম্রাজ্য, মহিমা, জ্ঞান ও সিংহাসন। এ আয়াতে আল্লাহতায়ালার পরিচয়, ক্ষমতা, মহিমা ও গৌরবের কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ জন্য এ আয়াতকে আয়াতুল কুরসি বলা হয়।
আয়াতুল কুরসি অত্যন্ত বরকতময় আয়াত। রাসুলুল্লাহ (স.) এ আয়াতকে সবচেয়ে উত্তম আয়াত বলে অভিহিত করেছেন। মহানবি (স.) বলেছেন- 'যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য বেহেশতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ব্যতীত আর কোনো বাধা থাকে না।' (নাসায়ি)
এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় অতি সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতের প্রথমেই বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র ইলাহ, তিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। সকল ইবাদত ও প্রশংসা একমাত্র তারই জন্য নির্ধারিত। তিনি অনাদি অনন্ত। 'এককথায়, তিনি সর্বশক্তিমান, সকল শক্তির আধার, মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ।
সূরা আল-হাশরের ফজিলত অত্যন্ত বেশি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, যে ব্যক্তি সকালে তিনবার (আউযু বিল্লাহিস সামিইল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজিম) পাঠ করার পর সূরা হাশরের শেষ আয়াত তিনটি তিলাওয়াত করবে আল্লাহতায়ালার তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা নিয়োগ করে দেবেন। তাঁরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকবে। সেদিন সে মারা গেলে শহিদের মৃত্যু লাভ করবে।
সত্তর হাজার ফেরেশতার দোয়া লাভের জন্য পবিত্র কুরআনের ৫৯তম সূরা আল-হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করতে হয়। এ আয়াত পাঠ করার নিয়ম হচ্ছে, সকালে তিনবার (আউযু বিল্লাহিস সামিইল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজিম) পাঠ করার পর সূরা হাশরের ৩ আয়াত পাঠ করতে হবে। তাহলে সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা রহমতের দোয়া করতে থাকবে।
আল-কুরআন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। এটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল উৎস। নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এ কিতাব বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কুরআন মজিদ হলো নৈতিকতার আধার। নীতি-নৈতিকতার সকল দিকই এ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে নানাভাবে নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে।
দুনিয়াতে আগমনকারী নবি-রাসুলগণের বর্ণনা রয়েছে। আল-কুরআনে। এতে তাঁদের পরিচয়, তাঁদের স্বভাব-চরিত্র ইত্যাদি বিবরণ দেওয়া হয়েছে। নবি-রাসুলগণের সফলতা, কৃতিত্বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
নবি-রাসুলগণ ছিলেন নিষ্পাপ। নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি তাঁদের চরিত্রের ভূষণ ছিল। তাঁরা ছিলেন মানবজাতির জন্য আদর্শ'। আর যারা তাঁদের অনুসরণ করেছে তারাই সফলতা লাভ করেছে। আর আল-কুরআনের শিক্ষার দ্বারাই আমরা তাঁদের অনুসরণ করতে পারি।
কুরআন মজিদে পূর্ববর্তী বহু জাতি ও মানুষের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যারা তাদের পাপ ও অনৈতিক কাজের জন্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল তাদের সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যেমন- আদ জাতি, ছামুদ জাতি, ফিরআউন, নমরুদ, কারুণ ইত্যাদি।
নীতিমূলক দুটি আয়াত ও অর্থ লেখা হলো-
قَدْ أَفَلَحَ مَنْ زَكَهَانَ وَقَدْ خَابَ مَنْ دَشَهَانَ
অর্থ: "সে-ই সফলকাম হবে যে নিজেকে পবিত্র করবে। আর যে নিজেকে কলুষিত করবে সেই ব্যর্থ হবে।" (সূরা আশ্-শামস: ৯-১০)
আমরা মোনাজাতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করতে পারি। মহানবি হযরত মুহম্মদ (স.) ছিলেন মানবতার মহান শিক্ষক। তিনি সর্বদাই মানুষের কল্যাণ কামনা করতেন। রাসুলুল্লাহ (স.) জানতেন আল্লাহ তায়ালার নিকট মোনাজাত করার মাধ্যমে আমরা সার্বিক কল্যাণ লাভ করতে পারি।
اللَّهُمَّ مُصَرِفَ الْقُلُوبِ صَرِفَ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ
অর্থ: "হে আল্লাহ! হে অন্তরসমূহ ফিরানোর মালিক! তুমি আমাদের অন্তরসমূহকে তোমার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দাও।" (মুসলিম)
উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা শিক্ষাদানের জন্য মহানবি (স.)-এর আবির্ভাব, মহানবি (স.) বলেছেন, "উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতাদানের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি।" (মুসনাদে আহমাদ)
উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা শিক্ষাদানের জন্য মহানবি (স.)-এর আবির্ভাব, মহানবি (স.) বলেছেন, "উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতাদানের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি।" (মুসনাদে আহমাদ)
সততা, সত্যবাদিতা, শালীনতাবোধ, সৃষ্টির সেবা, আমানত রক্ষা, ক্ষমা, দয়া, পরোপকারিতা, ধৈর্য, ভ্রাতৃত্ব, সমাজসেবা, দেশপ্রেম, পরমতসহিষ্ণুতা, পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি - কর্তব্য এবং শিক্ষা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ, সহপাঠীদের প্রতি সুন্দর আচরণ ইত্যাদি নৈতিক গুণের অন্তর্ভুক্ত।
মহানবি (স.) নৈতিক আচার-আচরণ যেমন- মিথ্যাচার, পরনিন্দা, গালি দেওয়া, হিংসা, ক্রোধ, লোভ, প্রতারণা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, অহংকার, অশ্লীলতা, পরশ্রীকাতরতা, ঘৃণা, চৌর্যবৃত্তি, সন্ত্রাস ইত্যাদি বর্জন করার উপর জোর তাগিদ দিয়েছেন।
Related Question
View All'ইলমুল আহকাম্' হলো বিধিবিধান সম্পর্কিত জ্ঞান।
লাইলাতুল কদর বা কদর রাত অত্যন্ত মর্যাদাবান ও মহিমান্বিত রাত। আল্লাহ তায়ালা এ রাতে পবিত্র কুরআন নাযিল করেন। এ রাতের ইবাদত হাজার মাস একাধারে ইবাদত করার চাইতে উত্তম। আমাদের আয়ুষ্কাল খুবই সীমিত। এ অবস্থায় এ রাতে ইবাদত করলে আমাদের নেকির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এটি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নিয়ামতস্বরূপ। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে রহমত, বরকত ও শান্তির সওগাত দিয়ে প্রেরণ করেন। এ রাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুখ-শান্তি ও রহমত বিরাজ করতে থাকে।
মুহিবের দাদা বিশ্বজগৎ ধ্বংসের তথ্য সূরা আল-যিলযালে পেয়েছেন।
সূরা যিলযালে কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের অভিনব বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ যখন সমগ্র দুনিয়া ধ্বংস করে দেবেন তখন সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাবে। কবর থেকে মানুষ বের হয়ে আসতে থাকবে। সমস্ত মানুষ সেই মহান দিনে নিজ নিজ কৃতকর্মের হিসাব প্রদান করতে থাকবে। প্রত্যেকে দুনিয়াতে করা তার প্রতিটি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পাপপুণ্যের হিসাব দিতে থাকবে এবং তা অনুযায়ী প্রতিদানস্বরূপ পুরষ্কার অথবা তিরষ্কারে ভূষিত হবে। উক্ত অবস্থার সাথে মুহিবের দাদার বক্তব্যের মিল রয়েছে। তিনি বলেছেন, "কোনো এক সময় এমন এক ভূমিকম্প সংঘটিত হবে, তখন গাছপালা খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, পাহাড়গুলো তুলোর মতো উড়বে; সব কিছু চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।" সুতরাং বলা যায়, মুহিবের দাদা বিশ্বজগৎ ধ্বংস সংক্রান্ত তথ্য সূরা আল-যিলযালে পেয়েছেন।
মুহিবের দাদা 'মুক্তির সনদ' বলতে আল-কুরআনকে বুঝিয়েছেন। কেননা আল-কুরআনই বিশ্ববাসীকে হিদায়েতের সুপথ দেখাতে পারে।
মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সার্বিক দিক ও বিভাগের একটি সুসংহত ও সুসমন্বিত বিধান কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। এ মর্মে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- "এ হচ্ছে সমগ্র মানুষের বিধান, মুত্তাকিদের জন্য উপদেশ ও পথনির্দেশনা।" (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৮) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, "আমি এ কিতাবে কিছুই বর্ণনা করা বাদ রাখিনি।" (সূরা আন-আম ৩৮) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, "হে বিশ্বমানবতা তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে এসেছে উপদেশ ও তোমাদের অন্তরে যা আছে তার প্রতিকার এবং বিশ্ববাসীদের জন্য পথনির্দেশস্বরূপ।" (সূরা ইউনুস: ৫৭) তিনি আরও
বলেন, "আমি তোমার প্রতি (হে মুহাম্মদ) এ কিতাব অবতীর্ণ করেছি যা আত্মসমর্পণকারীগণের জন্য সবকিছুর বিশদ বিবরণ সুস্পষ্ট পথনির্দেশক ও সুসংবাদ।" (সূরা আন-নাহল: ৮৯) আল্লাহ তায়ালা আরও বর্ণনা করেন- "এ কিতাব এটি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষদেরকে তাদের পালনকর্তা নির্দেশক্রমে বের করে নিয়ে আসতে পারে অন্ধকার থেকে আলোকময় জীবনে, তাঁর পথে যিনি পরাক্রমশালী, প্রশংসিত।" (সূরা ইবরাহিম: ১) উদ্দীপকের মুহিবের এক প্রশ্নের জবাবে তার দাদা বলেন, আমাদেরকে মুক্তির সনদ হিসেবে যে নির্ভুল গ্রন্থটি দেওয়া হয়েছে, তা অনুসরণ করা উচিত।
অতএব উক্ত আলোচনা হতে বোঝা যায়, আল-কুরআনই বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ। তাই এ গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম।
আবাবিল এক ধরনের ছোট ছোট পাখি। যা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলে।
আয়াতুল কুরসি অত্যন্ত বরকতময় আয়াত। রাসুল (স.) এ আয়াতকে সবচেয়ে উত্তম আয়াত বলে অভিহিত করেছেন। নবি (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য বেহেশতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ব্যতীত আর কোনো বাধা থাকে না। (নাসাই) অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে সাথেই সে বেহেশতের আরাম-আয়েশ উপভোগ করতে শুরু করবে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!