আখলাক اَخلاق আরবি শব্দ "খুলুকুন" (ঊর্ম) এর বহুবচন। যার অর্থ চরিত্র বা স্বভাব। মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের মধ্য দিয়ে যে আচার-আচরণ ও স্বভাব-চরিত্রের প্রকাশ পায় তাকে আখলাক বলে।
মানবজীবনের উত্তম গুণাবলিকে আখলাকে হামিদাহ্ বা প্রশংসনীয় চরিত্র বলে। যেমন- ধৈর্য, সততা, দেশপ্রেম, সমাজসেবা প্রভৃতি। এ সকল চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি সমাজে নন্দিত ও সম্মানিত।
মানবজীবনের নিকৃষ্ট চরিত্রকে আখলাকে যামিমাহ্ বা নিন্দনীয় চরিত্র বলে। যেমন- অহংকার, ঘৃণা, মিথ্যাচার, সুদ, ঘুষ, অশ্লীলতা প্রভৃতি। এ সকল চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি সমাজে ঘৃণিত ও নিন্দিত।
আখলাকই উন্নত জাতির জীবনীশক্তি। কেননা যে জাতির চরিত্র যত ভালো থাকে সে জাতি তত শক্তিশালী। যে জাতির চরিত্র ঠিক নেই, সে জাতি পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে না। সকল নবিই নিজ নিজ জাতিকে উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দিয়েছে। আর উন্নত চরিত্রকে পূর্ণতা দানের জন্য শেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছেন।
উত্তম চরিত্র ব্যক্তিকে সুন্দর ও উন্নত করে। আর সমাজের সকল মানুষ চরিত্রবান ব্যক্তিকে ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে। অপরদিকে চরিত্রহীন ব্যক্তি সকলের নিকট ঘৃণিত ও নিন্দিত। যার চরিত্র যত উন্নত ধর্মের দিক থেকেও সে তত অগ্রসর।
ধৈর্য এর আরবি প্রতিশব্দ 'সবর' (সা)। যার অর্থ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, দৃঢ়তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, বিরত রাখা ইত্যাদি। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে সহিষ্ণুতার সাথে আল্লাহর বিধান মোতাবেক সকল কর্তব্য পালন করাকে ধৈর্য বলে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে ধৈর্য বিশ্লেষণ করলে এর তিনটি বিশেষ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১.অবৈধ ও হারাম বস্তু থেকে নিজের নফস বা প্রবৃত্তিকে বিরত রাখতে ধৈর্যধারণ করতে হয়।
২.আল্লাহ তায়ালার ইবাদত ও অনুগত্যে ধৈর্যধারণ করতে হয়।
৩.যেকোনো বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করতে হয়।
ধৈর্য মানবজীবনের একটি মহৎ গুণ। এটি মানবজীবনের সফলতার চাবিকাঠি। ধৈর্যের অনুশীলন ছাড়া ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে সাফল্য অর্জন করা যায় না। ধৈর্যধারণ করা খুবই কঠিন কাজ তথাপি সমাজের মানুষের কল্যাণের জন্য তা করা অপরিহার্য। সমাজ জীবনে শান্তি শৃঙ্খলা ও কল্যাণময় জীবনযাপনের জন্য ধৈর্যের (সবরের) গুরুত্ব অপরিসীম।
ধৈর্যের বিপরীত হচ্ছে অধৈর্য। অধৈর্য মানুষকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়। এ কারণে জীবনে চলার পথে মানুষকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে।
হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক বলার কারণ হলো-জালিম শাসক নমরুদের মূর্তিপূজার বিরোধিতা করায় তিনি অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে সাহায্য চান নি।
শরিয়তের বিধান পালন করতেও। ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়, রমযান মাসের সিয়াম পালন, প্রচুর অর্থ ব্যয় করে হজ সম্পাদন, সঞ্চিত সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত হিসাবে প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রচুর ধৈর্যধারণ করতে
উত্তয়াত শব্দের আভিধানিক অর্থ ভ্রাতৃত্ব। পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্ব বলে। মানুষের মাঝে এ হৃদ্যতা ও আন্তরিকতা বিভিন্নভাবে গড়ে ওঠে।
ভ্রাতৃত্ব তিন প্রকার। যথা-
১. ঔরসজাত ভ্রাতৃত্ব,
২. বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং
৩. ইসলামি ভ্রাতৃত্ব।
একই পিতার ঔরসে বা একই মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করার কারণে যে ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হয় তাঁকে ঔরসজাত ভ্রাতৃত্ব বলে।
আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম, ইসলামের মূলবাণী- আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই হযরত মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসুল। যারা এই কালিমায় বিশ্বাসী তারা যেকোনো বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও অঞ্চলের অধিকারী হোক না কেন, তারা ইসলামি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
নারীর মর্যাদা বলতে সমাজের একজন মানুষ হিসেবে একজন নারীর যে যে অধিকার রয়েছে সে অধিকারগুলো কোনো ধরনের বাধা প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ভোগ করত পারাকে বোঝায়। মাতা, কন্যা, ভগ্নী, স্ত্রী প্রভৃতি হিসেবে সমাজে নারীদের যে বিশেষ অধিকার ও স্থান রয়েছে তা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করলে নারীর মর্যাদা সমুন্নত হবে।
প্রাচীন আরব সমাজে নারীর অবস্থা ছিল করুণ। কন্যাসন্তান জন্ম নিলে পিতা-মাতা অসন্তুষ্ট হতো। কোনো কোনো সম্প্রদায়, কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দিত।
ইসলাম একমাত্র ধর্ম যাতে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। মহানবি (স.) একজন সাহাবীকে তাঁর মায়ের ব্যাপারে বলেছেন, 'জান্নাত তাঁর দু'পায়ের নিচে।' (নাসায়ি) নবি করিম (স.)-এর একটি হাদিসে পিতা অপেক্ষা মায়ের অধিকার বেশি বলে উল্লেখ আছে। আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদার অধিকারী।
সমাজের বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে স্বেচ্ছায় গৃহীত কাজকে সমাজসেবা বলে। ব্যাপক অর্থে মানবকল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য গৃহীত সকল কর্মসূচিই সমাজসেবা নামে পরিচিত।
সমাজসেবায় ইসলামের নির্দেশ হলো- সম্পদশালী ব্যক্তিগণ অভাবী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নেও তাঁদের সম্পদ ব্যয় করবে। সমাজের অবহেলিত মানুষের কল্যাণে প্রতিষ্ঠান গড়বে।
সর্বস্তরের জনগণের উপকারে আসে এমন সব কাজের অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই করা দরকার। যেমন- ভাঙা রাস্তা মেরামত করা, নতুন রাস্তা নির্মাণে সাহায়্য করা, পুল-সাঁকো নির্মাণ করা, রুগ্ম ব্যক্তির সেবা করা, আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌছে দেওয়া ইত্যাদি।
জন্মভূমির প্রতি মানুষের অন্তরে একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং ভালোবাসা জন্মায়। ক্রমান্বয়ে এ আকর্ষণ বা ভালোবাসা বিস্তৃতি লাভকরে সমগ্র দেশ, দেশের মাটি ও দেশের জনগণের প্রতি। মাতৃভূমি তথা দেশের প্রতি এ প্রীতি ও দরদের আকর্ষণকেই দেশপ্রেম বলে।
দেশপ্রেম মানবজীবনের একটি মহৎ গুণ। দেশপ্রেমের মূলেই আছে দেশের ভূখণ্ডকে ভালোবাসা। দেশের জনগণকে ভালোবাসা, দেশের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষা এবং দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রথা, রীতি-নীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান করা কর্তব্য।
দেশপ্রেমের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম দেশপ্রেমের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। দেশপ্রেম মানুষকে দেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশপ্রেমিক নিজের জানমাল উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। দেশপ্রেম মানুষকে দায়িত্ব সচেতন করে তোলে। দেশের সম্পদ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করে।
কাফিরদের কঠিন ষড়যন্ত্রের কারণে এবং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে তিনি যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন মক্কার দিকে বার বার ফিরে তাকান, আর কাতর কণ্ঠে বলেন- "হে আমার স্বদেশ! তুমি কত সুন্দর! আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার আপন গোত্রীয় লোকেরা যদি ষড়যন্ত্র না করত, আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।"
পরমত বলতে বুঝায় অপরের মত, পথ বা আদর্শ, সেটা ধর্মীয় হতে পারে এবং আদর্শিকও হতে পারে। আবার রাজনৈতিকও হতে পারে। অন্যের মতামতকে অবজ্ঞা না করে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া বা Activate Windows অন্যের মত বা আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাকে পরমতসহিষ্ণুতা বলে।
পরমতসহিষ্ণুতা মানবচরিত্রের প্রশংসনীয় গুণ। এ গুণটির কারণেই সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় থাকে। এ গুণটির কারণেই মানুষ তার নিজস্ব পরিবেশে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্ভাব বজায় থাকে। সৌহার্দ ও সম্প্রীতির সৃষ্টি হয়।
একটি সুস্থ ও সুন্দর পারিবারিক জীবনের জন্য পরমতসহিষ্ণুতা গুরুত্ব অপরিসীম। পারিবারিক জীবনের সুখ শান্তি এর উপর নির্ভরশীল। পরিবারের জন্য সদস্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন বা সহানুভূতির মনোভাব পোষণ করার মাধ্যমে পারিবারিক শান্তি লাভ করা যায়।
সমাজে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক থাকতে পারে, তাদের সাথে সমঝোতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে হবে। তাদের মতের প্রতি সহিষ্ণুতার মনোভাব পোষণ করলে শান্তি বজায় থাকবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মতামত ও আদর্শের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে। তাহলেই সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরমতসহিষ্ণুতার উপর রাষ্ট্রীয় শান্তিশৃঙ্খলা নির্ভরশীল। একটি দেশে নানা ধর্ম, বর্ণ ও মতের লোক বসবাস করে। তাদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ, সম্প্রীতি, সমঝোতা ও সহাবস্থানের জন্য পরমতসহিষ্ণতা অপরিহার্য।
যে খারাপ কাজ বা আচরণ মানুষকে হীন ও নিন্দনীয় করে তোলে তাকে আখলাকে যামিমাহ বা নিন্দনীয় চরিত্র বলে। যেমন-অহংকার, ঘুষ, অশ্লীলতা, পরশ্রীকতরতা, ঘৃণা, চৌর্যবৃত্তি ইত্যাদি।
আখলাকে যামিমাহ্-এর কারণে ওইসব ব্যক্তি সমাজজীবনে নিন্দনীয় হয়। তারা মানুষের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের দ্বারা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। অন্যায় ও অসৎ কাজের প্রসার ঘটে। তারা আল্লাহ ও রাসুলের অপ্রিয় হয়। এর ফলে তারা পরকালে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে।
অহংকার শব্দের অর্থ অহমিকা, আমিত্ব, গর্ব, দর্প, দন্ড, বড়াই, নিজেকে বড় ভাবা ইত্যাদি। নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় গণ্য করা এবং অন্যকে তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট মনে করাকে অহংকার বলা হয়।
অহংকারের ধরন তিনটি।
যথা-
১. অন্তরে অহংকার পোষণ করা।
২. চালচলন ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অহংকার প্রকাশ করা।
৩. কতাবার্তায় অংহকার প্রকাশ করা।
অহংকারের কুফল এবং এর অপকারিতা অনেক। অহংকারের কারণেই ইবলিস অভিশপ্ত হয়ে জান্নাত থেকে বিতারিত হয়েছে। অহংকারী ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে ঘৃণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করে না।" (সূরা লুকমান: ১৮)
অশ্লীলতা অর্থ জঘন্যতা, কদর্যতা, নির্লজ্জতা, অভদ্রতা ও যৌন বিষয়ক কুৎসিত আচরণ। অশ্লীতার দ্বারা নির্লজ্জ ও কুরুচিপূর্ণ কথা ও কাজকে বোঝানো হয়। এছাড়া যেসব কুকর্ম ধৃষ্টতাসহকারে প্রকাশ্যে করা হয় সেগুলোকেও অশ্লীল বলা হয়।
অশ্লীলতা একটি বড় অপরাধ। এটা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করে। সমাজকে কলুষিত করে। নিষ্পাপ ও কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের চরিত্র হনন করে যুবক-যুবতীদের কুকর্মের প্রতি প্রলুব্ধ করে। অশ্লীল আচরণকারী সকলের নিকট ঘৃণিত। অশ্লীলতা মানুষের পারলৌকিক জীবনকে দুঃসহ করে তোলে।
মহান আল্লাহ তায়ালা অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ করেছেন বলে তা পরিহার করতে হবে। যেসব কুকর্ম ধৃষ্টতাসহকারে প্রকাশ্যে করা হয় বা নির্লজ্জ ও কুরুচিপূর্ণ কথা ও কাজই অশ্লীলতা। অশ্লীলতা একটি বড় অপরাধ। এটি সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করে। অশ্লীল ব্যক্তিকে আল্লাহ অপছন্দ করেন
অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকার উপায়গুলো হলো-
১. ইসলামের নীতি ও আদর্শের অনুশীলন,
২. পারিবারিক ও সমাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা এবং
৩. সচেতনতার পাশাপাশি আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।
পরশ্রীকাতরতা অর্থ অন্যের উন্নতি ও সৌভাগ্য দেখে ঈর্ষা প্রকাশ করা। অর্থাৎ কারো ধন-দৌলত, সম্মান, ভালো ফল বা উচ্চ মর্যাদা দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং তার ধ্বংস কামনা করাকে পরশ্রীকাতরতা বলা হয়।
পরশ্রীকাতরতা একটি মারাত্মক মানসিক ব্যাধি। এ ব্যাধি বহু কারণে সৃষ্টি হয়। যেমন শত্রুতা, অহংকার, নিজের অসদুদ্দেশ্য নষ্ট হওয়ার আশংকা, নেতৃত্বের লোভ ইত্যাদি। এসব কারণে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির প্রতি হিংসা বিদ্বেষ করে থাকে। পরশ্রীকাতরতা মানুষের শান্তি বিনষ্ট করে। পরশ্রীকাতর ব্যক্তি আল্লাহ এবং মানুষের কাছে ঘৃণিত
পরশ্রীকাতরতা মানুষের পুণ্য কাজগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। এ সম্পর্কে মহানবি (স.) বলেছেন, "আগুন যেমন শুকনা কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয় পরশ্রীকাতরতা তেমনই পুণ্যকে ধ্বংস করে দেয়।" (ইবনু মাজাহ)
ঘৃণা অর্থ অবজ্ঞা, অপছন্দ, উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য, তুচ্ছজ্ঞান করা। কাউকে তুচ্ছ মনে করে তাকে সহ্য করতে না পারা এবং তার থেকে দূরে সরে থাকাকেই পরিভাষায় ঘৃণা বলে।
কাউকে তুচ্ছ মনে করে তাকে সহ্য করতে না পারা এবং তার থেকে দূরে সরে থাকাকেই ঘৃণা বলে। অহংকার, শত্রুতা, পদমর্যাদার লিপ্সা প্রভৃতি কারণে ঘৃণার উদ্রেক ঘটে। ঘৃণা করা অন্যায় তবে ক্ষেত্রবিশেষ ঘৃণা একটি মানবীয় গুণ। যেমন মন্দ কাজে ঘৃণা করা প্রশংসনীয়। সমাজে চুরি, ডাকাতি, হাইজ্যাক, সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, হেরোইন সেবন ইত্যাদি ঘৃণিত কাজ।
অনেক ক্ষেত্রে ঘৃণা একটি মহা গুরুতর ব্যাধি। এতে বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল ধরে। সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়। ঘৃণাকারী কখনো মনে শান্তি লাভ করতে পারে না। এতে তার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ক্ষতি সাধিত হয়।
ঘৃণা পরিহারের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, "তোমরা একে অপরকে হিংসা করো না, একে অপরকে ঘৃণা করো না, একে অন্যের ক্ষতি করার জন্য কৌশল করো না বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।" (বুখারি ও মুসলিম)
চুরির কারণে মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। সম্পদ পাহারা দিতে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। সর্বদা সম্পদ চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সামাজিক শান্তি ও স্বস্তি বিনষ্ট হয়।
চুরির দ্বারা সমাজে আরও নতুন নতুন অপরাধ সৃষ্টি হয়। চোর শুধু তার কাজ চুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না বরং সে ছিনতাই, অপহরণ, খুন এবং মাঝে মাঝে সম্ভ্রমহানির ঘটনাও ঘটায়।
চুরি সমাজের নিন্দনীয় কাজগুলোর অন্যতম। সমাজে চোরকে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখে। চোরকে মানুষ আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। পরিবার ও সমাজের লোকেরা তাকে ঘৃণার চোখে দেখে।
চুরির জন্য সম্পদ ও জীবন নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। চুরির কারণে মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। চুরির দ্বারা সমাজে আরও নতুন নতুন অপরাধ সৃষ্টি হয়। চুরি একটি অত্যন্ত জঘন্য ধরনের নিষিদ্ধ কাজ। এর ফলে ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন থাকতে পারে না।
অভাব না থাকা সত্ত্বেও স্বভাবগত কারণে কেউ যদি চুরি করে তাহলে সব দেশে এবং সব সমাজেই সেজন্য শাস্তির বিধান রয়েছে, ইসলাম ধর্মেও তার জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর পুরুষ চোর আর মহিলা চোর তাদের হাত কেটে দাও। তারা যা করেছে এ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।" (সূরা আল-মায়িদা: ৩৮)
ঘুষ অর্থ উৎকোচ। এর আরবি প্রতিশব্দ 'রেশওয়াত'। অবৈধ সহায়তার জন্য প্রদত্ত গোপন পারিতোষিকই ঘুষ। কর্তব্যরত কোনো ব্যক্তির নিকট থেকে কাজ আদায় করার উদ্দেশ্যে কিছু দেওয়া ঘুষের অন্তর্ভুক্ত।
ঘুষ একটি সমাজিক অপরাধ। ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। ঘুষগ্রহীতাকে সকলে ঘৃণা করে। ঘুষ গ্রহণ এবং দেওয়া দুটিই পাপ কাজ। ঘুষ গ্রহীতা ও দাতার উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশাপ বর্ষিত হয়। ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই অমার্জনীয় অপরাধ। ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামি।
ইসলাম ঘুষকে হারাম ঘোষণা করেছে। মুমিনদের ঘুষ আদান-প্রদান না করার বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ ঘুষের সম্পদকে হারাম ও অপবিত্র ঘোষণা করেছেন। মুমিনদের দায়িত্ব হলো এ নিষিদ্ধ অপবিত্র কাজে অংশগ্রহণ না করা।
কিয়ামত দিবসে ঘুষগ্রহীতার পরিণতি হবে খুবই লজ্জাজনক। মহানবি (স.) বলেছেন- "যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম! ব্যক্তি যা ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করবে কিয়ামতের দিন সে তা নিয়েই উপস্থিত হবে।
সন্ত্রাস হলো ফিতনা-ফাসাদের আধনিক রূপ। সন্ত্রাস শব্দের অর্থ অতিশয় ত্রাস বা ভয়ের পরিবেশ। অর্থাৎ ভয় দেখিয়ে বা জোর খাটিয়ে মানুষের কাছ থেকে কিছু আদায় করা বা আদায়ের পরিবেশ সৃষ্টির নীতিকে সন্ত্রাস বলে
সন্ত্রাসের ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত হয়। মানুষের স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন ব্যাহত হয়। সন্ত্রাসকবলিত জনপদে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা থাকে না। যখন তখন কেউ অপমৃত্যুর শিকার হতে পারে। সন্ত্রাসের কারণে মানুষের Activate Windows সম্পদের নিরাপত্তা থাকে না। সম্ভ্রমের নিরাপত্তা থাকে না
ইসলাম সন্ত্রাস প্রতিরোধে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থেকে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। আর এ যুদ্ধকে মুমিনদের ইমান রক্ষার যুদ্ধ ঘোষণা দিয়েছে। আল্লাহর বাণী, "এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয়।" (সূরা আল-
আনফাল : ৩৯)
সন্ত্রাস দমনে ইসলাম সাধারণত তিন প্রকার ব্যবস্থা নিয়েছে।
১ . শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: যারা আল্লাহর এ নিষেধাজ্ঞার পরও
বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয় বা সন্ত্রাস সৃষ্টির কাজ অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
২. কারণ উদঘাটন ও নিরসন: ইসলাম সন্ত্রাসের কারণ উদ্ঘাটন ও তা নিরসণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
৩. নৈতিকতাবোধ জাগ্রতকরণ: জীবনের সকল পর্যায়ে ইসলামি বিধান কার্যকর করে ও নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করে সন্ত্রাস দূর করা যায়।
এইচআইভি এবং এইডস যেসব কারণে ছড়ায় তার মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো-
ক. অবৈধ মেলামেশা।
খ. মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য সিরিঞ্জের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো।
গ. অপরিশোধিত রক্ত শরীরে প্রবেশ করানো।
এইচআইভি এবং এইডস প্রতিরোধের উপায়সমূহ হলো-
১. সুস্থ বৈবাহিক জীবনযাপন করা।
২. নারী-পুরুষের অবৈধ মেলামেশা এড়িয়ে চলা।
৩. মাদক ও নেশাজাতীয় সকল জিনিস বর্জন করা।
৪. অপরিশোধিত রক্ত শরীরে প্রবেশ না করানো
সদাচরণকে আরবিতে আখলাকে হামিদাহ্ বলা হয়।
আখলাকে হামিদাহ্ অর্থ প্রশংসনীয় চরিত্র, সচ্চরিত্র। ইসলামি পরিভাষায়, যেসব স্বভাব বা. চরিত্র সমাজে প্রশংসনীয় ও সমাদৃত, আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুল (স.)-এর নিকট প্রিয়, সেসব স্বভাব বা চরিত্রকে আখলাকে হামিদাহ্ বা সদাচরণ বলা হয়। এককথায়, মানব চরিত্রের সুন্দর, নির্মল ও মার্জিত গুণাবলিকে সদাচরণ বলা হয়। সদাচরণ বা আখলাকে হামিদাহকে আখলাকে হাসানাহ বা হুসনুল খুলুকও বলা হয়।
জন্মভূমির প্রতি মানুষের অন্তরে একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং ভালোবাসা জন্মায়। ক্রমান্বয়ে এ আকর্ষণ বা ভালোবাসা বিস্তৃতি লাভ করে সমগ্র দেশ, দেশের মাটি ও দেশের জনগণের প্রতি। মাতৃভূমি তথা দেশের প্রতি এ প্রীতি ও দরদের আকর্ষণকেই দেশপ্রেম বলে। দেশপ্রেম মানবজীবনের একটি মহৎ গুণ। দেশপ্রেমের মূলেই আছে দেশের ভূখণ্ডকে ভালোবাসা।
অশ্লীলতা অর্থ জঘন্যতা, কদর্যতা, নির্লজ্জতা, অভদ্রতা ও যৌন বিষয়ক কুৎসিত আচরণ। অশ্লীলতার দ্বারা নির্লজ্জ ও কুরুচিপূর্ণ কথা ও কাজকে বোঝানো হয়। এছাড়া যেসব কুকর্ম ধৃষ্টতা সহকারে প্রকাশ্যে করা হয় সেগুলোকেও অশ্লীলতা বলা হয়।
অশ্লীলতা একটি বড় অপরাধ। এটা সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট করে। সমাজকে কলুষিত করে। অশ্লীলতাকে আল্লাহ তায়ালা হারাম ঘোষণা করে ইরশাদ করেন- "বলুন, আমার প্রতিপালক নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা।" (সূরা আল-আরাফ: ৩৩)
Related Question
View Allনমরুদের মূর্তিপূজার বিরোধিতা করায় হযরত ইবরাহিম (আ.) অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।
উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য মহানবি (স.) বলেন, "উত্তম চরিত্রের পূর্ণতাদানের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি।" সকল নবিই নিজ নিজ জাতিকে উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দিয়েছেন। আর উন্নত চরিত্রকে পূর্ণতাদানের জন্য শেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছেন।
পরমতসহিষ্ণুতা গুণের অভাবে লিপি ও হ্যাপির মধ্যে ঝগড়া হয়।
পরমত বলতে বোঝায় অপরের মত, পথ বা আদর্শ, সেটা ধর্মীয় হতে পারে, আদর্শিকও হতে পারে। আবার রাজনৈতিকও হতে পারে। অন্যের মতামতকে অবজ্ঞা না করে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া বা অন্যের মত বা আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাকে পরমতসহিষ্ণুতা বলে। উদ্দীপকের লিপি ও হ্যাপির মধ্যে ঝগড়ার মূল কারণ একজনের পছন্দকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, যা পরমতসহিষ্ণুতার পরিপন্থি। আর একটি সুস্থ ও সুন্দর সামাজিক জীবনের জন্য পরমতসহিষ্ণুতার গুরুত্ব অপরিসীম। পারিবারিক জীবনের সুখ-শান্তি এর ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন বা সহানুভূতির মনোভাব পোষণ করার মাধ্যমে পারিবারিক শান্তি লাভ করা যায়।
সাব্বির ও মনিরের ভূমিকায় সমাজসেবার গুণটি ফুটে উঠেছে।
সমাজের বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে স্বেচ্ছায় গৃহীত কাজই সমাজসেবা। ব্যাপক অর্থে মানবকল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য গৃহীত সকল কর্মসূচিই সমাজসেবা নামে পরিচিত। সমাজসেবা একটি মানবিক দায়িত্ব। সমাজের সম্পদশালী মানুষ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য সেবামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের উন্নয়ন ঘটানো সামাজিক দায়বদ্ধতা। শিক্ষা-চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে মানুষের প্রিয়ভাজন হওয়া সম্ভব। উদ্দীপকের সাব্বির ও মনির আহত পথচারীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জনসেবার অন্তর্ভুক্ত। কেননা রাসুল (স.) বলেন, আল্লাহ বান্দাদেরকে ততক্ষণ সাহায্য করেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইকে সাহায্য করে।
পরিশেষে বলা যায়, সাব্বির ও মনিরের কাজটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে আমাদের সকলেরই মানুষের কল্যাণে সমাজের সেবায় এগিয়ে আসা উচিত।
নারীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী হলেন হযরত আয়েশা (রা.)।
পৃথিবীর সকল মানুষের আদি পিতা হযরত আদম (আ.) ও আদি মাতা হযরত হাওয়া (আ.)-এর সন্তান বিশ্বে সকল মানুষ ভ্রাতৃসম।
আবহাওয়া ও ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে মানুষের আকার-আকৃতি, স্বভাব-প্রকৃতি এবং বর্ণ ও ভাষার মধ্যে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। যার ফলে মানুষ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তবুও বিশ্বের সব মানুষ এক পিতামাতার সন্তান হওয়ায় বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়েছে। মহানবি (স.) বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই আদম (আ.) হতে এবং আদম মাটি হতে সৃষ্টি। (বুখারি)
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!